বিকাল ০৫:২৮ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

আয়েশাকে হারিয়ে || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন || শেষ পর্ব

প্রকাশিত:

পূর্বপ্রকাশের পর

আমি এখন যা জানি তা যদি তখন জানতাম তাহলে আয়েশার সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার অনেক আগেই আমি শেষ করে দিতাম। লন্ডন থেকে আসার দিনই যথারীতি আয়েশাকে আমি দেখতে গেলাম। একমাস পরে দেখা। আয়েশাকে অনেকটাই অন্যরকম দেখাচ্ছিল। বেশ আঁটসাট বাদামি-লাল একটা টি-শার্ট গায়ে। সামনে সাদা সোফার ওপর গিফটের পুরো এক পসরা। গিফটের দিকে আমার কোনো খেয়াল নেই, এমনকি বইগুলোর দিকেও না। ওরে দেখার পর থেকেই আবার আমার সেই পাগলের মতো ভালোবাসা। আমি ওর পাশই ছাড়ি না। সেই ভালোবাসায় ওর ক্রমবর্ধমান সাড়াই শুধু আমার কামনা। আমি ওকে বসার ঘরে একা পেতে চেষ্টা করি, করিডোরে একা করে ফেলি। আমি সাবধানতাই যেন ভুলে গেছি। খালি কিচেনে, গাড়ি পার্কিংএ যেখানে সেখানে আমি ওকে এখন চুমুতে ভাসিয়ে ফেলি যদিও আগে এ জায়গাগুলো যথেষ্ট অনিরাপদই ভাবতাম।
খুব রেগে না হলেও ও বলে, ‘তোমার মধ্যে কী ভর করেছে রে’?
কয়েক মাসেই ও চলে যাবে- এই ভাবনাটি আমাকে যথারীতি আতঙ্কিত করে তুলল। আমি ভাবতেই পারছিলাম না যে, আমি ঢাকায় থাকব আয়েশাকে ছাড়া। আমি ঢাকা ছেড়ে যেতে পারব এমন কোনো সম্ভাবনাও কোনোদিক দিয়ে দেখছিলাম না। আমি জানতাম আমাদের দুজনের দুটি পথ দুটি দিকে বেঁকে যাবে এর কোনো বিকল্প নেই। এ অবস্থায় অন্তরঙ্গতাকে আরো গভীরতর করা মানেই হলো বিচ্ছেদকে আরো ব্যথাতুর করে তোলা। আয়েশা কেন যেন তার মধ্যেও আশাবাদী। সে দুজনের দুটি পথ দুটি দিকে বেঁকে যাওয়াকে অপরিহার্য মনে করছিল না। ও বলছিল, ‘তুমি একটা স্কলারশিপ পেয়ে যাবে’। ও আমাকে দোষ দিচ্ছিল আমি কেন স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করছি না। এই দোষাদুষিতে বড় এক ঝগড়া হয়ে গেল। নববর্ষের সেই পুরনো ঘটনা আবার ঘটল। অনেক দিন আলাদা হয়ে থাকলাম।
এক সময় আবার ঠিকঠাক হয়ে গেল। এবার শেষ পর্যন্ত রতি আনন্দও কপালে জুটল। প্রথম দিনেরটি ছিল একেবারেই এক কোনোমতে ঘটানো অভিজ্ঞতা। তাও ঠিক উদোম বসার ঘরে। তড়িঘড়ি এবং একেবারেই যাচ্ছেতাই। রতিকালে যদি স্মরণ রাখতে হয় কে আসছে কিংবা পর্দাটা কেন নড়ছে তাহলে সে কী রতি হয় তা সহজেই অনুমেয়। তবে ঐটুকু দিয়েও আমার আয়েশাকে নিয়ে নতুন ঘোর তৈরি হল। একটা নারীর শরীর যে কীভাবে টানতে পারে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। ওর ঘ্রাণ, আমার স্পর্শে ওর সাড়া, ওর শারীরিক স্পন্দন প্রতিটি বিন্দুতে বিন্দুতে আমার মনের চোখে দৃশ্যমান হত এবং সে দৃশ্য থেকে আমার মাঝে জন্ম নিত এক অবাক করা সঙ্গীতের সুর। আয়েশার আবেগ এতদিন তো বেশ নিয়ন্ত্রিতই মনে হচ্ছিল। অথচ এই নতুন ও কাঁচা অভিজ্ঞতা তাকেও যেন বেসামাল করে তুলেছিল। প্রথমদিনের বাঁধা অতিক্রান্ত হওয়ার পরে ওর কাছ থেকে আর কোনো বাঁধা আসেনি। এই বাঁধাহীন অভ্যর্থনাও অবশ্য আমার জন্য স্থায়ী কোনো সান্ত্বনা হয়ে উঠতে পারল না। ওর কাছে বা দূরে যেখানেই থাকতাম একটা ভাবনাই শুধু সরাতে পারতাম না, সেটি হল ও আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে। খাঁচার মধ্যে পাখি ঢুকলে যেমন ছটফট করে আমার মাথার মধ্যে এই ভাবনাও তেমন ছটফট করতে থাকল। আমি ওকে যত চুমুই খাই, যেখানে আটকে ধরেই চুমু খাই, যেভাবে দুহাতে আগলে রাখার চেষ্টাই করি সময়টাকে তো আমি মোটেও আটকাতে পারছিলাম না। মহাসুখের সময়টুকুতেও থাকত হারানোর আতঙ্ক আর বেদনার ছাপ। আর এই কষ্ট আরো বড় মনে হত এই ভেবে যে এই হারানোর অনুভব আয়েশার মাঝে তো দেখছি না। তার মধ্যে মূর্খের মতো বিশ্বাস যে, সে চলে যাওয়ার পরেও আমরা যেভাবে হোক চালিয়ে যেতে পারব। অবশ্য একত্রে আমরা কেউই বিষয়টি বহুদূর ভেবে নিতে চাইতাম না কারণ তাতে শুধু চোখের জল কিংবা পারস্পরিক দোষাদুষিই বাড়ত। আমি কোনোভাবেই চাইতাম না আর আমাদের মাঝে কোনো ঝগড়া হোক। কতটুকু সময়ই বা আর আছে।
বসন্তের শেষ দিকটায় দেখছিলাম আমাদের দিন কটা আর হাতে গোনা। আমি দিনগুলো আর গুনতেও সাহস করি না কারণ তাতেও কষ্টটা খুব বেড়ে যায়। আমার স্বাভাবিক আশংকা যে আয়েশা লন্ডনে অবশ্যই নতুন কাউকে বেছে নেবে আর আমার এই প্রাণ মোচড়ানো প্রেম থেকে দম ফেলার অবকাশ খুঁজতে হবে এই হাসি ও আনন্দশূন্য ঢাকায়। কয়েকটা দিন আমি খুব কষ্ট করে চেষ্টা করলাম আয়েশার কাছে না আসার। আমি চেখে দেখতে চাচ্ছিলাম ওকে ছাড়া আমার দিনগুলো কেমন যাবে। আমি না পারছিলাম বাসায় থাকতে, না পারছিলাম রাকিবদের বাসায়ও যেতে কেননা রাকিবদের বাসা মানেই তো আয়েশার বাসা। মাত্র কয়েক পায়েরই পথ। নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকানে কাটানোর চেষ্টা। আবার ঢাকার রাস্তায় একা একা হেঁটে বেড়ানোর চেষ্টা। সবই করলাম। তারপর শেষ পর্যন্ত এক অপ্রতিরোধ্য টানে শেষপর্যন্ত আয়েশাদের দুয়ারে এসেই থামা। তাও বেশ অসময়ে। 
আয়েশা বলল, ‘এমন কাঁদ কাঁদ হয়ে থেকো না তো’। 
‘তুমি তো নতুন জায়গায় যাচ্ছ, নতুন মানুষ পাচ্ছ, ফূর্তি তো তোমার থাকতেই পারে’- আমি বললাম।
‘দেখো, এভাবে বল না। আমি অবশ্যই তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য লন্ডন যাচ্ছি না। যদিও এ কথা তুমি শুনতে চাও না। তারপরও বলি আমি জানি আমার যাওয়ার পর তোমার যাওয়ারও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
আমাদের কথাবার্তা এর আগে ছিল এক অভূতপূর্ব আনন্দের উৎস। এখন সেই আনন্দ চরায় আটকে যাওয়া এক বস্তু। যতক্ষণ কথাটুকু অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে হয় ততক্ষণ আনন্দই থাকে। কিন্তু লন্ডন প্রসঙ্গ কেমনে সরিয়ে রাখি? আয়েশা লন্ডন যাচ্ছে আর তা নিয়ে কথা হবে না এটা কি আয়েশার জন্যও খুব ভালোলাগার? এছাড়া আয়েশা যে ইউনিভার্সিটিতে পড়বে সেটা কোথায় অবস্থিত, সেখানে আর কারা এখান থেকে পড়ছে এসব জানায় আমারও তো ভালোলাগার বিষয় ছিল। সেই সব জায়গা নিয়ে আমারও তো অনেক স্বপ্ন ছিল। এই মুহূর্তে লন্ডন আমার ভালো না লাগার একমাত্র কারণ লন্ডন আমাকে আয়েশার কাছ থেকে আলাদা করে দিচ্ছে।
তখন মে মাস চলছিল। আমরা সে বিকেলে আয়েশাদের ছাদের ওপর পানির ট্যাংকের ওপর বসা ছিলাম। সকালে বৃষ্টি হয়েছিল এবং বিকালে আমাদের ছাদে ওঠার ঠিক আগেও বৃষ্টি হয়েছে। নুমায়ের একটা কালো ঘুড়ি কিছুক্ষণ উড়িয়ে নামিয়ে আনছে। যে বাতাসটা ছিল সেটা ঘুড়িটার আকার বা প্রকারের সাথে মিলছিল না বলেই মনে হল সে ঘুড়িটাকে নামিয়ে আনছিল। পিছন দিকটায় আমাদের জিন্স প্যান্ট ভিজে যাচ্ছিল তবে সে নিয়ে আমরা মোটেই গা করছিলাম না। আমি কনুইয়ে ভর দিয়ে অনেকটা শোয়ার কায়দায় ছিলাম। ফলে আমার শার্টটাও পিছনটায় বেশ জবজবে হচ্ছিল। বৃষ্টির পরের ঠাণ্ডাটা বেশ ভালো লাগছিল।
‘লন্ডনের বৃষ্টি থেকে অবশ্যই এই ঘ্রাণ তুমি পাবে না’- আমি বললাম।
‘তুমি কী করে জানলে? তুমি তো ওখানে কখনো ছিলে না।’
‘থাকিনি, তবে না থেকেও বিষয়টি আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এটা আমার দিব্য চোখের দেখা। আমার যে দিব্য চোখ আছে তা তো তুমি জানোই। আমি না দেখেই বলে দিতে পারি আমার না-দেখা জায়গাগুলো ও সময়গুলো কেমন।’
ও হেসে ফেলল- ‘তাই নাকি’?
‘হ্যাঁ, তাই। এই মুহূর্তে আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি লন্ডনে আছ। হাঁটছ বিশ্রী জলের গুড়োতে যাকে ওরা বৃষ্টি বলে। ছাতা নিয়ে নামতে ভুলে গেছ তাই জামাকাপড় ভিজিয়ে ফেলছ। খুঁজছ কোথাও কোনো শেডের নিচে একটু দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যায় কি না। ভাবছ এই সময় বাইরে না থেকে আমার সাথে বাসায় থাকতে পারলে কী মজাই না হত!’
আমার দিকে ফিরে আয়েশা আমার মুখের ওপর হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘ওরে আমার অদৃশ্য দেখনেওয়ালা! এমনটাই বুঝি দেখা যাচ্ছে!’ এর আগে বসা ছিলাম বৈঠকখানায় এবং ওর মা সেখানে আমাদের জন্য সদ্য ভাজা কিছু পিঠা নিয়ে আসায় আমাদের আদর সোহাগ কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছিল। ছাদে ওর হাতের স্পর্শে সেই বিঘ্নিত সোহাগের আকাঙ্ক্ষা বেশ জ্বলে উঠল। ও আমার চোখে সে আকাঙ্ক্ষা টের পেয়ে ওর ভাইয়ের দিকে ইঙ্গিত করে ‘না’ বলে দিল। নুমায়ের তার বড় ঘুড়িটা ওড়ানোর জন্য তখন খুলছে।   
ঐ আকাঙ্ক্ষা মাথায় একবার জেগে উঠলে নেভানো কঠিন। আমি একটু উঠে বসলাম এবং আয়েশার জামার পিছনটায় টান দিলাম। ও আমার হাতটা সরিয়ে দিল। তবে সরানোটা এমন না যে আর হাত দেয়া যাবে না। আমি সেই শেষ দিনগুলোয় এত লোভী হয়ে উঠেছিলাম যে আমি যেন ওর শরীরটা লোকমায় লোকমায় গিলে খেতে চাচ্ছিলাম। প্রতিটি সম্ভোগ সময়ে যেন আমি ওর শরীরের নতুন আরেক টুকরা হজম করছি কিংবা আমার শরীরের কোথাও সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি। মনে হচ্ছিল সেই টুকরাগুলো ওর চলে যাওয়ার পর ওকে আমার মধ্যে জাগিয়ে রাখবে এবং আমার অখণ্ডতা রক্ষা করবে।
আয়েশা জানত আমি কতটা নাছোড়বান্দা হতে পারি। আয়েশা ট্যাংকের নিচে নামল এবং ছাদের সবচেয়ে নিরিবিলি জায়গাটি চোখে চোখে খুঁজে নিল। আমরা নিজেদেরকে ঐ জায়গায় এর আগেও লুকিয়েছি। এটা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার উল্টোদিকের দেয়ালের পিছনে। দুই দিক গাছে ঢাকা। অপর দিকে পানির ট্যাংক। নুমায়েরের হঠাৎই ওখানটায় ছুটে আসার কথা না। আমি ওকে দেয়ালে চেপে ধরে দাঁড়িয়েছি। ওর শরীর বা নিঃশ্বাস যেন এক ফুলের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। তখন আর মাথায় লন্ডন নেই, সময়জ্ঞান নেই, উচিত-অনুচিতের ভাবনা নেই। স্বল্পায়তন ব্লাউজটুকুর নিচ থেকে ওর শরীরটুকুও যেন বেশ আকাঙ্ক্ষার সাথে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। আমার হাতটি ওর বাহু থেকে নেমে নেমে কোমর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। শুরু হল চুমু। ওর চোখ বন্ধ হয়ে গেল এবং আমাকে যেন আরো অন্তপুরে আহ্বান করল। যেন ধীর শান্ত এবং কোনো তাড়া নেই। ছাদে কখনো আমরা এ আনন্দের পুরোটুকু ঘটতে দেইনি। অন্তত যখন অন্য কেউ ছাদেরই অন্য কোনো কর্নারে নড়াচড়া করছে তখন। কিন্তু আজ যখন ওর জিন্সপ্যান্টের ঠান্ডা বোতামটিতে হাত রাখলাম ও বাধা দিল না। ঐখানে- ঐ অবস্থায়? আমি নিজেও এর পরিণতি নিয়ে ভেবে দেখতে পারলাম না। আবার আমি খুব নিশ্চিতও হচ্ছিলাম না যে ও চাচ্ছে। ও আমার মাথার পিছনটা হাত দিয়ে টেনে ধরে চুমুটা আরো গভীর করে তুলল।
ঠিক এই মুহূর্তে ছাদের অপর প্রান্ত থেকে এক তীব্র চিৎকার। সে চিৎকারের কানফাটা তীব্রতায় আমি কিছু না দেখেই বুঝে ফেললাম নুমায়ের ছাদ থেকে পড়ে যাচ্ছে। লাফ দিয়ে বেরিয়ে ছাদের এপাশটায় আসলাম কিন্তু নুমায়ের ছাদের কোথাও নেই। আয়েশা ‘নুমায়ের’ বলে এমন চিৎকার দিল যে সে যেন এই চিৎকারের স্বরেই পৃথিবীটা বাঁচিয়ে রাখতে চায়। আমি দেখলাম ঘুড়িটা একটা কাঁঠাল গাছে বেধে আছে এবং সাথে সাথে বুঝে ফেললাম কী ঘটেছে। নুমায়ের অনেকবার দেখেছে ঘুড়িটা গাছে বাধলে আমি গাছে গিয়ে নামিয়ে আনি। সেও ছাদের পাশের কোনো ডাল ধরে সেভাবেই গাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু পা’টা ঠিকমত রাখতে পারেনি। আমি লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে এলাম যেখানটায় নুমায়েরের নিষ্প্রাণ দেহটি পড়ে আছে।

বোধের এমন কিছু উচ্চতম বিন্দু আছে যেখান থেকে অনুভব করতে গেলে ট্রাজেডিগুলোও আর ট্রাজেডির মতো কাজ করে না। আমরা যদি পৃথিবীর সব দুঃখ একটা দুঃখের মধ্যে আটকে দিয়ে কারোর মাথায় চাপিয়ে দিতে পারতাম তাহলে ঐ দুঃখের বোঝাটি নিয়ে মানুষটি কি কেঁদে দিত? সম্ভবত কান্নার বোধ ঐ লোকটির থাকতই না। ‘বোধের উচ্চতম বিন্দু’, ‘একটি দুঃখ’- এতগুলো বছর ধরে এই শব্দগুলো দিয়েই আমার কথাটুকু- আমার অর্থটুকু- আমি বলার চেষ্টা করছি। সেই বলায় যে গল্পটি দাঁড়ায় সেটি এখনো চলমান এবং তার সত্যিকারে কোনো শেষ নেই। 
নুমায়েরের মাথাটি কোলে নিয়ে আয়েশা চিৎকার করে চলছে ‘নুমায়ের’ ‘নুমায়ের’। তখনো আর কেউ এসে পৌঁছায়নি। আয়েশা মাথাটি জাগিয়ে পানি-চোখে হঠাৎ বলল, ‘কাউকে বলব না যে তুমিও ছাদে ছিলে’। আমি আজও জানি না সেই ভয়ঙ্কর কষ্টের মাঝে হঠাৎ আয়েশা এই কথা কেন বলল। ও কি আমাকে যে কোনো রকম বিপদ থেকে বাঁচাতে এই কথা বলেছিল?  না কি, ও বুঝিয়েছিল নুমায়েরের মৃত্যুটি আগলাতে আমরা কেন ব্যর্থ হয়েছিলাম সে কথা কেউ যেন কখনো না জানে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রথমে বাবুর্চি, পরে ড্রাইভার ও মা এসে হাজির। সবাইর প্রশ্নে আমি দিশেহারা। আয়েশাকে আমি বলতেও পারিনি যে তার সিদ্ধান্তের সাথে আমি একমত কিনা। ঘটনার আকস্মিকতা ও কান্না-চিৎকার সকল ‘কী হয়েছে’ এবং ‘কেমনে হয়েছে’-র চেয়ে বড় হয়ে উঠল। এই আঘাত ও কষ্ট পরের দিনগুলোয় সকলকে যেন গিলে নিল। ততদিনে ঘটনার বিষয়ে আয়েশার বর্ণনাই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হল। আয়েশার সাথে এ নিয়ে আর আমার কোনো কথা হল না। দাফনের পূর্ব পর্যন্ত আমরা শুধু একে অপরের দিকে কয়েকবার তাকিয়েছিলাম মাত্র। এক বিশাল দূরত্ব আমাদেরকে আলাদা করতে শুরু করল। ও আর কোনো দিন সুযোগ দিল না ওর সাথে একা হয়ে একটি কথাও বলার। এরপরে ওদের বাসায় আর যে কদিন গিয়েছি বৈঠকখানায় আরসব আত্মীয়স্বজনের সাথে বসেছি। সেখানে কখনো মনে হয়নি আয়েশা আমাকে চেনে। বন্ধ করে দিলাম সেই যাওয়াটুকুও। কয়েকদিন পরে রাকিব জানাল আয়েশা তার নির্ধারিত সময়ের কিছুদিন আগেই লন্ডন চলে গেছে। এরপর থেকে আয়েশাকে আমি আমার স্মৃতিতে দেখি, এবং প্রতিনিয়তই দেখি স্বপ্নে। আমি ওর হাসি দেখি, আমাকে দেয়া ওর উপহারগুলো দেখি। এইসবই দেখি এক অলঙ্ঘ্য সাগরের এপারে বসে যেখান থেকে আয়েশার ওপারে আমি কোনোদিন পৌঁছাতে পারব না।   

 

(অলঙ্করণ : মোস্তাফিজ কারিগর)

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন—

আয়েশাকে হারিয়ে || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন || পর্ব-৩

আয়েশাকে হারিয়ে || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন || পর্ব-২

আয়েশাকে হারিয়ে || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন || পর্ব-১

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।