বিকাল ০৪:৩০ ; শুক্রবার ;  ২২ নভেম্বর, ২০১৯  

সংকট না থাকলে তো আর জীবনটা সংগ্রামমুখর হয় না : মোস্তফা কামাল

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[কথাশিল্পী মোস্তফা কামাল ‘জননী’ উপন্যাসের জন্য তুমুল পাঠকপ্রিয় হলেও সাহিত্যের সব শাখায় তাঁর সমান বিচরণ। গত দুই দশক ধরে তিনি গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সায়েন্স ফিকশন এবং টিভি নাটক-সহ শিশু-কিশোর উপযোগি সব ধরনের লেখা লিখছেন। তাঁর গ্রন্থসংখ্যা ৮১। তাঁর ‘পাগলছাগল ও গাধাসমগ্র’ ব্যঙ্গ রচনা হিসেব সব শ্রেণির পাঠকের কাছে সমাদৃত। এছাড়া তাঁর অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে, ‘রুবীর কালো চশমা’, ‘চাঁদের আলোয় রাগিব আলী এবং সে’, ‘ডাকাতের কবলে ফটকুমামা’, ‘জনক জননীর গল্প’ ইত্যাদি। আজ ৩০ মে তাঁর জন্মদিন। ১৯৭০ সালের এই দিনে তিনি বরিশালের আন্ধার মানিক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখালেখি ও জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন প্রাবন্ধিক মিল্টন বিশ্বাস।]  

 

মিল্টন বিশ্বাস : লেখক হয়ে ওঠার পেছনে আপনার পরিবারের ভূমিকা সম্পর্কে বলুন। আপনার বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়-স্বজনরা লেখার ভেতরে এসেছে কি? আসলে কীভাবে? 
মোস্তফা কামাল : আমার লেখালেখির অভ্যাস সেই ছোটবেলা থেকে। ক্লাস সিক্স থেকে আমি নিয়মিত পত্রিকা পড়ি। গল্প উপন্যাস ছড়া কবিতা পড়তে পড়তেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। পত্রিকার সাহিত্য পাতায় গল্প কবিতা ছাপানোর আগ্রহও তৈরি হয় তখন থেকে। অষ্টম শ্রেণিতে থাকতে আমার লেখা ছড়া, কবিতা বরিশাল থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রবাসী পত্রিকায় ছাপা হয়। তখন প্রবাসী এবং সাপ্তাহিক ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ পত্রিকায় এলাকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে রিপোর্টও পাঠাতাম এবং সেগুলো ছাপা হতো। এতে আগ্রহটা আরো বেড়ে যায়। আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি আমি। আমাদের পরিবারে আর কেউ লেখক হয়ে ওঠেনি। আমার লেখালেখির প্রধান এবং একমাত্র উৎসাহদাতা আমার মা। মা’র উৎসাহ না পেলে হয়তো আমি লেখক-সাংবাদিক হতে পারতাম না। এজন্য আমি সব সময় বলি, আমার লেখালেখি এবং উত্থানের পেছনে মা অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। 

মিল্টন বিশ্বাস : আপনার জন্ম, বাল্যকাল, শিক্ষা এবং লেখা শুরুর কাহিনি জানতে চাই। প্রথম লেখা কি ছিল? প্রকাশিত প্রথম লেখা দেখে আপনার অনুভূতি কেমন হয়েছিল? 
মোস্তফা কামাল : আমার জন্ম ১৯৭০ সালের ৩০ মে, বরিশালের আন্ধার মানিক গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। মা বলেছেন, জৈষ্ঠ্য মাসে বৃষ্টিস্নাত চাঁদনি রাতে আমার জন্ম হয়। আমি একটু দেরিতে স্কুলে গিয়েছিলাম। আমি আমাদের বাড়ির কাছের একটি প্রাইমারি স্কুলে ওয়ানে ভর্তি হই। এক বছর মাত্র পড়েছি ওই স্কুলে। ফার্স্ট হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠেই আমি বৃহত্তর পরিবেশে পড়ার সিদ্ধান্ত নিই এবং সেটা নিজে নিজে। ওই বয়সে এই সিদ্ধান্ত কী করে নিয়েছিলাম তা নিয়ে এখনো আমি ভাবি। আমার পড়ার বিষয়ে কখনোই মা-বাবা কিছু বলতেন না। আমি বোধহয় সবচেয়ে বেশি স্বাধীনচেতা ছিলাম। হিজলা উপজেলা সদরে নামকরা প্রাইমারি স্কুল টিটিএন্ডডিসিতে ভর্তি হই। সেখানেও প্রথম স্থান অধিকার করে তৃতীয় শ্রেণীতে উঠি। এরপর বিসিডি হাই স্কুল। সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত আমার প্রথম স্থান কেউ টলাতে পারেনি। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ জীবন ঢাকায়। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 
আমার প্রথম লেখা ছড়া। দুষ্টুছেলে। প্রথম গল্প বীরাঙ্গনার লড়াই। প্রথম উপন্যাস ‘পাপের উত্তরাধিকার’। প্রথম লেখা প্রকাশের পর সন্তান লাভের আনন্দই পেয়েছিলাম। এখনো বই বের হওয়ার আনন্দ সন্তান লাভের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ১৯৯৩ সাল থেকে নিয়মিত বই প্রকাশিত হয়।    

মিল্টন বিশ্বাস : আপনি দীর্ঘদিন সাহিত্য চর্চায় নিবেদিত। এর ভেতর প্রথম গ্রন্থ সম্পর্কে বিশেষ কিছু স্মৃতি থাকে। আবার ব্যাপক জনপ্রিয় গ্রন্থ সম্পর্কে আলাদা অনুভূতি কাজ করে— এ বিষয়ে জানতে চাই। 
মোস্তফা কামাল : আসলে আমার প্রথম গ্রন্থ একটি গবেষণাধর্মী বই। ‘আসাদ থেকে গণঅভ্যুত্থান’। আমি এ বিষয়ে প্রথমে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় কভার স্টোরি করি। তাতে ব্যাপক সাড়া পড়ে। তারপর আমি ওই বিষয়ে আরো কিছু গবেষণা কাজ করি। তারপর একটি জাতীয় দৈনিকে ওই একই শিরোনামে লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ১ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। ২০ জানুয়ারি আসাদ দিবস মানে ওইদিনে আসাদ শহীদ হন। এর ফলে লেখাটি সুধীমহল থেকে শুরু করে অনেক সাধারণ পাঠকমহলেও প্রশংসিত হয়। আসাদ পরিষদের সভাপতি তখন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান। তিনি বললেন, লেখাগুলো বই আকারে গুছিয়ে দিতে। আসাদ পরিষদ বই বের করবে। আমি তখন আনন্দে আত্মহারা। সত্যিই সেই অনুভূতি আজও আমাকে নাড়া দেয়। পরে বই হলো। ওই বছরই একুশে বইমেলায় আসাদের রক্তমাখা শার্ট আসাদ পরিষদের স্টলে রাখা হয়। ফলে বইটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। তবে আমার মূল কাজ হচ্ছে, গল্প উপন্যাস লেখা। সেই কাজও চলছিল। প্রথম বের হয় গল্পের বই। বীরাঙ্গনার লড়াই। ১৯৯৬ সালে। পরের বছর উপন্যাস ‘পাপের উত্তরাধিকার’। এর পর থেকে প্রতি বছরই বই বের হতে থাকে। এখন তো প্রতি বছর ৬/৭টা বই বের হয়। 
আমার এ পর্যন্ত ৮১টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে ‘জননী’ উপন্যাসটি। পর পর দুটি বইমেলায় সর্বোচ্চ বিক্রির তালিকায় ছিল। আমার জানামতে, বইটি পশ্চিমবঙ্গেও পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছে। আমাকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জননী খ্যাত লেখক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যা আমার জন্য অনেক বেশি আনন্দের, গর্বের।      

মিল্টন বিশ্বাস : পেশাগত দিক থেকে আপনি একজন সাংবাদিক। আপনার লেখক জীবন নির্মাণে সেই পেশার কোনো ভূমিকা আছে কি? অথবা লেখক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে দেশ কাল রাজনীতি আপনাকে নাড়া দিয়েছে কীভাবে?
মোস্তফা কামাল : আমার লক্ষ্যই ছিল আমি লেখক সাংবাদিক হবো। লেখাপড়া ছাড়া আমার আর কোনো জগত নেই। সাংবাদিকতা পেশায় থাকার কারণে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার অনেক সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও অনেকে বলেন, পত্রিকা অফিসে এতো সময় দেয়ার পর লেখালেখির সময় পান কোথায়? আসলে আমি প্রতিদিন লিখি বলেই বছর শেষে কয়েকটি বই দাঁড়িয়ে যায়। যা বলছিলাম, আমি এ পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশ বাদে সবগুলো মহাদেশে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশে তৃণমূল পর্যায়ে রিপোর্টিংয়ের কাজ করেছি। সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ নিয়ে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে উপন্যাস লিখেছি। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম এবং অনেক ঘটনার সাক্ষী আমি। ফলে এসব অভিজ্ঞতা লেখালেখিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অন্য পেশায় থাকলে হয়তো এই অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতো। 

মিল্টন বিশ্বাস : গল্প-উপন্যাসের বিচিত্র ভাবনা আপনার লেখনিতে উঠে এসেছে। কখনও হাস্যরস, ব্যঙ্গ, কল্পবিজ্ঞান, সমাজ সংকট— নানা বৈচিত্র্য আছে আপনার লেখনিতে। লেখার সময় কোনো সংকটের মুখোমুখি হলে কীভাবে তা অতিক্রম করেন। সংকট বলতে লিখতে না পারা, কিংবা স্বৈরশাসকের কারণে সব কথা বলতে না পারার ব্যর্থতাকে বোঝাচ্ছি।
মোস্তফা কামাল : চমৎকার প্রশ্ন। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমার রঙ্গব্যঙ্গ লেখার জন্য মামলা হয়েছে। এখনও সেই মামলা আদালতে বিচারাধীন। পৃথিবীর কোথাও কোনো লেখক এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে কিনা জানি না। যারা ধর্ম নিয়ে বিদ্রুপ করে তাদের কথা আলাদা। আমি মনে করি, আমি একজন জাত লেখক। আপাদমস্তক আমি লেখক। আমার কাছে লেখালেখিটা ইবাদতের মতো পবিত্র। সারাক্ষণ লেখালেখিই আমার ভাবনাজুড়ে। সংকটে তো পড়তেই হয়। তাই বলে কি আর কলম তুলে বসে থাকতে হবে! আপনি জানেন, আমি একটি জাতীয় দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদক। কাজেই অফিসের জন্য আমাকে ১৩/১৪ ঘণ্টা দিতে হয়। বাকি সময় আমার পরিবার, লেখালেখি আর পড়ার মধ্যদিয়ে কাটে। এটাই আমার জগৎ। সংকটকে আমি কখনোই বোঝা মনে করি না। সংকট আসবে। তাকে অতিক্রম করেই এগোতে হবে। সংকট না থাকলে তো আর জীবনটা সংগ্রামমুখর হয় না। আর সে রকম কোনো সংকট হলে আমি রম্য ও হাসির উপন্যাস লিখি। সায়েন্স ফিকশন লিখি। গোয়েন্দা কাহিনী লিখি।  

মিল্টন বিশ্বাস : আপনার দুঃখ-কষ্টের স্মৃতি সাহিত্য চর্চায় প্রভাব ফেলেছে কি? সেই বাস্তবতা নিয়ে লিখতে বসার অনুভূতি বলুন। কিংবা সুখের অনুভূতি?
মোস্তফা কামাল : অবশ্যই প্রভাব ফেলে। ‘জননী’ উপন্যাসে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ এসেছে। তখন সচ্ছল পরিবারও সংকটে পড়েছিল। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জননীর যে সংগ্রাম; তার মধ্যেই তো দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনার চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে একবিংশ শতাব্দি পর্যন্ত বাংলাদেশের যে আর্থ-সামাজিক বিবর্তন তা পুরোপুরিভাবে উঠে এসেছে ‘জননী’ উপন্যাসে।  

মিল্টন বিশ্বাস : ঘরজামাই, হাড়কিপটে, হ্যালো ব্যাচেলর, জামাইবাবু— এরকম আপনার একাধিক হাসির উপন্যাস আছে। হাসির কাহিনি লেখার উদ্দেশ্য কি? দুঃখ ভুলে থাকার জন্য কি?
মোস্তফা কামাল : আমি মূলত নিজের আনন্দের জন্য লিখি। ওই যে বললেন, সংকটে পড়লে কি করেন? আমি তখন হাসির লেখা লিখতে পছন্দ করি। জীবনকে দুঃখ কষ্টে ভারাক্রান্ত করার পক্ষপাতি নই আমি। কারণ, জীবনটা খুবই ছোট। দুঃখ কষ্ট আসতেই পারে। তাকে হাসি মুখে গ্রহণ করতে জানতে হবে। সে রকম পরিস্থিতিতে হয়তো আমার হাসির লেখালেখি বেড়ে যায়।  

মিল্টন বিশ্বাস : আপনি নিয়মিত রঙ্গব্যঙ্গ কলাম লেখেন। আমাদের সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা এটি। ‘পাগল-ছাগল ও গাধাসমগ্র’ নতুন সিরিজ প্রতিবছরই বের হচ্ছে। হাসির উপন্যাস লেখার সঙ্গে এই ধারা চললেও সিরিয়াস কাজের পাশে এটা লেখার জন্য বেশি কষ্টের নয় কি?
মোস্তফা কামাল : আমার সিরিয়াস কলামের চেয়ে রঙ্গব্যঙ্গ কলাম লিখতে বেশি সময় যায়। বেশি ভাবতে হয়। আমি মনে করি আমার প্রতিটি লেখাই মৌলিক। তারপরও সিরিয়াস কলামের ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্তগুলো কোনো না কোনো সোর্স থেকে নিতে হয়। রঙ্গব্যঙ্গ কলাম প্রতিটিই সমসাময়িক ঘটনার ওপর। কিন্তু প্রতিটিই আপনার মনে হবে আলাদা একেকটি গল্প। 

মিল্টন বিশ্বাস : আবার হাসি-রঙ্গব্যঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে সায়েন্স ফিকশনও লিখছেন। ক্লোনমামা, মিরাকুলাস, বিমান রহস্য বেশ জনপ্রিয়। এতকিছু একসঙ্গে লেখেন কীভাবে?
মোস্তফা কামাল : সায়েন্স ফিকশন লিখি কিশোর তরুণদের ভাবনার জগতটাকে প্রসারিত করার জন্য। সায়েন্স ফিকশন পড়লে চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়। আমি নিজেও পড়তে পছন্দ করি। সায়েন্স ফিকশনের কোনো ছবি সুযোগ পেলেই দেখি। আমি পুরোপুরিভাবে বিজ্ঞানের ছাত্র নই। তবে আমি পুরোপুরি একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। আর এতো কিছু লিখি কি করে সেটা আমি নিজেও জানি না। আমাকে এই প্রশ্ন অনেকেই করেন, আপনার লেখার অনেক বৈচিত্র্য। কি করে সম্ভব? ওই যে বললাম, নিজের ভালো লাগার জন্য লিখি। যখন যা ভালো লাগে তাই লিখি। 

মিল্টন বিশ্বাস : কেবল বড়দের উপন্যাস কিংবা সমকালীন প্রসঙ্গ নিয়ে রঙ্গব্যঙ্গ নয় আপনি শিশু-কিশোরদের নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। ছোটদের বই লেখার অভিজ্ঞতার কথা বলুন। আপনার ফটকু মামা চরিত্রটি কোথা থেকে পেলেন। গোয়েন্দা চরিত্র নির্মাণে লেখককে কি কি বিষয়ে মনোযোগী থাকতে হয়। শিশু সাহিত্য সৃষ্টিতে আপনার প্রস্তুতি কেমন থাকে?
মোস্তফা কামাল : শুরুতে আমি শিশু-কিশোরদের জন্য লিখতাম না। অনেক পরে শুরু করেছি। নিজেকে প্রস্তুত করার ব্যাপার তো ছিলই। তারপরও একটা ঘটনার কথা বলি। একবার একুশে বইমেলায় একটি শিশু বইয়ের স্টল থেকে আমার একটা উপন্যাস হাতে নিয়ে বলল, এই লেখক আমাদের জন্য লেখেন না? আমি তখন ওই স্টলে ছিলাম। স্টলের ছেলেরা আমাকে দেখিয়ে বললো, তুমি ওনার সঙ্গে কথা বল। তারপর শিশুটি আমার কাছে এসে বলল, আঙ্কেল, আপনি আমাদের জন্য লেখেন না? আমি বললাম, স্যরি, এখনো শুরু করিনি। তবে লিখবো। শিগগিরই আমার লেখা তোমরা পাবে। পরের বছর থেকেই আমি শুরু করি। সেটাও প্রায় বার বছর আগের কথা।  

মিল্টন বিশ্বাস : আপনার ‘বারুদপোড়া সন্ধ্যা’ সিরিয়াস উপন্যাস। এর বিষয়বস্তু কি? কেমন করে লিখলেন এই কাহিনি।
মোস্তফা কামাল : দেশের রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, সমাজনীতি, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও সমাজ জীবনের নানা কাহিনি উঠে এসেছে আমার উপন্যাস। বারুদপোড়া সন্ধ্যা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধীদের বাড়বাড়ন্ত, প্রগতিশীল রাজনীতি ও জঙ্গিবাদ বিরোধী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে লেখা উপন্যাস। এর ইংরেজি সংস্করণও বেরিয়েছে ২০১০ সালে। তার নাম ‘ফ্লেমিং এভেনটাইড’। ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলাম পাঠকদের কাছ থেকে।  

মিল্টন বিশ্বাস : ‘হ্যালো কর্নেল’ কি এ ধারারই উপন্যাস? হ্যালো কর্নেল নাম দিলেন কেন? 
মোস্তফা কামাল : এটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান জঙ্গিবাদের উত্থান, তাদের কর্মকাণ্ড, সেনাবাহিনী ও তালেবান জঙ্গিদের সম্পর্ককে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাস। এটি ভবিষ্যৎ ও সত্যাশ্রয়ী একটি উপন্যাস। ওই উপন্যাসে আমিই প্রথম বলেছিলাম, ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানেই আছে। তার আরো দুই সহযোগি আইম্যান আল জাওয়াহিরি ও মোল্লাহ ওমরও পাকিস্তানে অবস্থান করছেন। তাদের ব্যাপারে আইএসআই সব জানে। এ উপন্যাসে একটি বড় সময়কে ধরে রাখা হয়েছে। আবার আছে ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও। একটি উপন্যাসের কাহিনি দশ বছর পরে সত্য প্রমাণিত হওয়ার ঘটনা কিন্তু বিরল! আমার মনে হয়, এ কারণেই উপন্যাসটি যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে।    

মিল্টন বিশ্বাস : উপন্যাসের জন্য বিষয়ের বৈচিত্র্য খোঁজেন কি? বিষয় ও আঙ্গিক নিয়ে আপনার ভাবনার কথা বলুন।
মোস্তফা কামাল : বিষয় বৈচিত্র্য তো থাকতেই হবে। লেখক প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙবে নিজেকে গড়বে। তাহলেই বড় কিছু সৃষ্টি হবে। আপনি জানেন, আমি নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করি। কখনো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে লিখি। মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহাসিক ঘটনা, রাজনীতি আমার বিষয়। এছাড়া হাসির উপন্যাস, মজার কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পছন্দ করি। লিখি সায়েন্স ফিকশন, গোয়েন্দা কাহিনি, রম্যরচনা। কিশোরদের জন্যও লিখি। আমাদের দেশে বিষয়বস্তু খুঁজতে হয় না। অনেক বিষয় লেখার আছে। একটু ভাবলেই বেরিয়ে আসে অনেক বিষয়। যখন যেটা লিখতে ভালো লাগে সেটাই লিখি। তবে কিছু পরিকল্পনা তো করতেই হয়। আমি নিজে একজন গোছানো মানুষ। আমার লেখালেখিটাও তেমনি। 

মিল্টন বিশ্বাস : জিনাত সুন্দরী ও মন্ত্রীকাহিনী স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনকালকে তুলে এনেছেন। এ ধরনের নিকট ইতিহাস লিখতে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয় কি? হুমকি ধামকি?
মোস্তফা কামাল : এরশাদের শাসনামলের ভেতরের কাহিনি উঠে এসেছে ওই উপন্যাসে। ওই শাসনামল যারা কাছে থেকে দেখেছেন তারা উপলব্ধি করতে পারবেন। সত্যিই বাংলাদেশের বড় দুর্ভাগ্য। স্বৈরশাসকেরা দেশটাকে কিভাবে লুটেপুটে খেয়েছেন তার উদাহরণ হচ্ছে, এরশাদের শাসনকাল। অপশাসন, দুর্নীতি আর নারী কেলেঙ্কারির নয় বছর বললেও ভুল বলা হবে না। হুমকি ধামকি তো এসেছেই। এরশাদ নিজেই দেখিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, একটি জাতীয় দৈনিকে একবার এই উপন্যাসের আলোচনা ছাপা হয়েছিল। সেজন্য সংশ্লিষ্টদের চাকরি চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। 

মিল্টন বিশ্বাস : আবার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন ‘জনক-জননীর গল্প’। এটি লেখার গল্প বলুন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস লেখার আর কোনো পরিকল্পনা আছে কি? থাকলে কেন? 
মোস্তফা কামাল : আমার শ্বশুর ডা. আবু সোলায়মান মণ্ডল মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। তিনি ছাত্রজীবনে ঢাকা মেডিকেল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস ছিলেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগের মূল দলের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। তখন এমসিএ নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরুর আগেই তিনি রংপুরে জাতীয় পতাকা নিয়ে বিশাল র‌্যালি বের করেন। সেই অপরাধে পাক বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। পরিবারের কাছে খবর পাঠানো হয়েছিল, তাকে হত্যা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ওই পরিবারের কী অবস্থা হয়েছিল চিন্তা করা যায়! এসব কাহিনি শোনার পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে উপন্যাস লিখবো। মুুক্তিযুদ্ধের আরো অনেক বই পড়লাম। প্রায় পাঁচ বছর পড়াশুনা করার পর লিখলাম ‘জনক জননীর গল্প’। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরো অনেক কাজ করার চিন্তা আছে আমার।  

মিল্টন বিশ্বাস : সামাজিক উপন্যাস রচনায় আপনার কৃতিত্বের পরিচয় রয়েছে। বিশেষত ‘জননী’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। রাজনীতিবিদ হায়দার আকবর খান রনো এটি নিয়ে দীর্ঘ সমালোচনাও লিখেছেন। এই নামে বিশ্বসাহিত্যে একাধিক উপন্যাস থাকা সত্ত্বেও আপনি কেন এটি লিখলেন? আপনি কোন দিক থেকে অন্যদের থেকে আলাদা?
মোস্তফা কামাল : ‘জননী’ উপন্যাসটি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আপনিও নিশ্চয়ই জানেন, উপন্যাসটি লেখার জন্য আমি দশ বছরের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এ সংক্রান্ত অনেকগুলো উপন্যাস আমি পড়েছি। তারপর লিখতেও আমার দুই বছর লেগে গিয়েছিল। ম্যাক্সিম গোর্কির মা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী, শওকত ওসমানের জননী, আনিসুল হকের মা উপন্যাসের পর আমি কেন আবার জননী লিখলাম; সে প্রশ্ন আমাকে অনেকেই করেছেন। আমি সবগুলো উপন্যাসই পড়েছি। কিন্তু বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের মা; তাঁর দুঃখকষ্ট, তাঁর সংগ্রাম, একটি পরিবারকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া; অর্থাৎ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সত্যিকারের চিত্র কোনো উপন্যাসেই উঠে আসেনি। আমার উপন্যাসে শুধু একটি মধ্যবিত্ত পরিবারই নয়, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের যে আর্থ-সামাজিক বিবর্তন, তা পুরিপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। এজন্যই হয়তো আমার জননী অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা।  

মিল্টন বিশ্বাস : চার-জয়িতা, চার-অপরূপা প্রভৃতি সংকলিত উপন্যাসসমূহে আপনি নাগরিক মধ্যবিত্তের কাহিনি লিখেছেন। গ্রামীণ জীবন কম আছে। প্রেমের কাহিনি লিখতে নগরের পটভূমি কেন বেশি দরকার হয়। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘রুবীর কালো চশমা’ একইভাবে নাগরিক জীবনের কাহিনি? নাগরিক জীবন বেশি টানে কেন আপনাকে?
মোস্তফা কামাল : আমার উপন্যাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণীটাই বেশি আসে। আমি নিজেও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। এ কারণে আমি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংকটটা ভালো জানি। সমস্যাটা কোথায়, কেন, কিভাবে তৈরি হয় তা আমার ভালো জানা। গ্রামীণ পটভূমিতেও আমার উপন্যাস রয়েছে। পাপের উত্তরাধিকার, মায়াবতীসহ বেশ কিছু উপন্যাস এবং গল্প গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত। লেখা ঘটনাপ্রবাহ যেদিকে যায় সেদিকেই নিয়ে যাই। লেখাটা আসলে একদম পরিকল্পনা মাফিক হয় না। ঘটনাপ্রবাহ টেনে নিয়ে যায়। 

মিল্টন বিশ্বাস : ‘চাঁদের আলোয় রাগিব আলী এবং সে’ উপন্যাসটি একটি ম্যাজিক রিয়েলিজম। এ ধরনের ফর্ম নিয়ে উপন্যাস লেখায় আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন কি? 
মোস্তফা কামাল : আমি আগেই বলেছি, আমি প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙতে এবং গড়তে পছন্দ করি। আমি কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকি না। সব সময় নতুন কিছু দেয়ার চেষ্টা করি। আগের বার হয়তো ম্যাজিক রিয়েলিজম নিয়ে কাজ করেছি; এবার সেটা নাও থাকতে পারে। দেখবেন, অন্য একটা নতুন ঘটনা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছি। ওই যে বললাম, আমি ভেতরে ভেতরে একটা গল্প সাজাই। সেটাই লিখতে থাকি। যতদূর যায় ততদূর এগিয়ে নিয়ে যাই। 

মিল্টন বিশ্বাস : সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা আছে কি? তাদের অধিকারের কথা যেহেতু আপনি কলামে তুলে ধরেন। কাহিনিতে রূপায়ণ করার পরিকল্পনা থাকলে বলুন।
মোস্তফা কামাল : আমার সব লেখাই তো সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে। তবে একেবারে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে তেমন লেখালেখি করিনি। আমার লেখায় বার বার উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী। লেখার প্রয়োজনে এসেছে কিছু নিম্ন শ্রেণীর মানুষের জীবনচিত্র। কিছু গল্প লিখেছি। তবে বড় কাজ করার পরিকল্পনা আছে। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষদের নিয়ে। সময় সুযোগ মতো তা লিখব বলে আশা রাখি। 

মিল্টন বিশ্বাস : ২০১৫ সালে কলকাতা থেকে আপনার গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কেমন সাড়া পেলেন। সেখান থেকে গ্রন্থ প্রকাশের কারণ কি? আপনি তো এদেশেই ব্যাপক জনপ্রিয়।
মোস্তফা কামাল : কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা সাহিত্যম থেকে আমার দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। পাঁচটি গোয়েন্দা কাহিনী এবং ছয়টি সায়েন্স ফিকশন। গত বইমেলায় বই দুটি ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। বইমেলার পরেও বই পাইকারি বিক্রি হচ্ছে এবং পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে বলে প্রকাশক জানিয়েছেন। তিনি এও বলেছেন, পশ্চিমবাংলার পাঠকরা আমাকে গ্রহণ করেছেন। এটাই আমার জন্য বড় আনন্দের।  

মিল্টন বিশ্বাস : সাহিত্য চর্চায় আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলুন?
মোস্তফা কামাল : বাংলা সাহিত্যের সবক্ষেত্রে কাজ করে যাবো। আরো বড় কিছু কাজ করার পরিকল্পনা আছে আমার। এমন কিছু কাজ করতে হবে যা বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী আসন করে নিতে পারে। আমার ধ্যানজ্ঞান হচ্ছে লেখালেখি। আমি নিরলসভাবে সেটাই করছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সেই কাজটি করে যেতে চাই। 

মিল্টন বিশ্বাস : নতুন কি লিখছেন?
মোস্তফা কামাল : সামনে ঈদ। তিনটি পত্রিকার ঈদসংখ্যার জন্য তিনটি উপন্যাস লিখবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবার একটি হাসির উপন্যাস লিখছি। আরেকটি উপন্যাস লিখবো এক হতভাগ্য মেয়ের জীবন নিয়ে। সত্য এবং আমার কল্পনার মিশেলে তৈরি হবে হতভাগ্য মেয়ের জীবনালেখ্য। নতুন ধরনের এক উপন্যাস। 

মিল্টন বিশ্বাস : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মোস্তফা কামাল : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।   

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।