বিকাল ০৪:০১ ; মঙ্গলবার ;  ২৩ এপ্রিল, ২০১৯  

শূন্য থেকে প্রীত রেজা

প্রকাশিত:

এহতেশাম ইমাম ॥

“শূন্য থেকে যার শুরু, তার আবার কিসের অহংকার। মানুষ বাঁচে তার স্বপ্নে আর সৃষ্টিশীল মানুষ বাঁচে সেই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবতায় রূপ দিয়ে। আর এটি কেবল স্বম্ভব কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই।”-কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়া ওয়েডিং ফটোগ্রাফির পথিকৃৎ প্রীত রেজা।

বিয়ের ছবিতোলা যে একটি সম্মানজনক পেশা,নিন্দুকের দৃষ্টি ভেঙ্গে সেই স্বীকৃতি অর্জন করে নিয়েছেন এই তরুণ এই ছবি কারিগর। গোটা বাংলাদেশকে চিনিয়েছেন ওয়েডিং ফটোগ্রাফির প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা। বাংলাট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন নিজের আদ্যোপান্ত।

সমাজ স্বপ্নের বিরুদ্ধে, তিনি স্বপ্নের পক্ষ্যে...

এই একটি কথায় ওপর বিশ্বাস করেই আজকের প্রীত রেজা। তিনি বলেন,বিখ্যাত মানুষদের অর্জনগুলো সাধারণত মধুর হয়না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় এসএলআর ক্যামেরায় শখের ছবি তোলাটা একটু বড় ধরনের বিলাসিতাই ছিল। কিন্তু, তাই বলেতো আর স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা চলে না। যে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছবি তোলার খরচ তুলতে বিভিন্ন উৎসব-পার্বনে স্বল্পমূল্যে সহপাঠীদের ছবি তুলে বিক্রি করতেন। যা দিয়ে নিজের পছন্দের তোলা ছবিগুলোর খরচ বহন করতেন।    চক্ষুলজ্জা এক পাশে সরিয়ে রেখে এ পথটুকু না পার হলে নাকি প্রীত স্বপ্নের এতো কাছে যেতে পারতেন না।

নিজেই নিজের অনুপ্রেরণা...

মানুষের স্বভাব হচ্ছে কোনও ব্যক্তিত্ব থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে নেওয়া। তবে প্রীত বিশ্বাস করেন মানুষ নিজের গুণের কারণে হয়ে উঠতে পারেন নিজের অনুপ্রেরণা।সেজন্য প্রয়োজন কেবল নিজের সুন্দর অভ্যাসটির প্রাত্যহিক পরিচর্যা। প্রীত বলেন, আমি নিজেকে স্বপ্নবাজ মনে করি। স্বপ্ন দেখতে খুবই পছন্দ করি। কারণ এই একটি বিষয় আমাদের সৃষ্টিশীল করে রাখে। উদাহরণ দিয়ে বলেন ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে পরিচিত হলেও হুটহাট মনে হয় আরও নতুন কিছু করতে। হতে পারে কপিরাইটার,ডকুমেন্টট্রি মেকারসহ যা আপনি করতে ভালেবাসেন।

 চেষ্টা করুন ‘আউট অব দ্য বক্স’ ভাবতে...

সময়ের বহুল আলোচিত এই ওয়েডিং ফটোগ্রাফারের আগে আরও একটি পরিচয় ছিল। তিনি কাজ করেছেন দৈনিক ইত্তেফাক, নিউ এইজ, দ্য ডেইলি স্টার, দৃক নিউজ, দৈনিক আজকের কাগজ এবং দৈনিক ভোরের কাগজের আলোকচিত্রী হিসেবে। তবে,টানা কয়েক বছরের এই পেশাগত জীবনে উপার্জনের দিক থেকে সামর্থবান না হলেও পেয়েছেন সম্মান। এ সময়গুলোতে উপার্জনের জন্য বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে ছবি তুলতেন। তবে এসময়টি মূলত তাকে কিছু ফেলে দিয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের সামনে।

সাংবাদিক হয়েও কেন টাকার বিনিময়ে বিয়ের ছবি তোলেন, এমন কটাক্ষ প্রশ্নের উওর দিতে তাই তৈরি করে নিয়েছেন নিজেকে। প্রীত বলেন, “যে কোন ধরনের ছবি তুলতেই আমার ভালো লাগে। তবে বিয়ের ছবি তোলার কারণে অনেক পরিচিতরাই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে এড়িয়ে চলতো । প্রশ্ন করতো এত ভালো ছবি তুলি, তাহলে বিয়ের ছবি তোলার কী দরকার। সেই মানুষগুলোর ওপর অভিমান কিংবা রাগ থেকে নয়, বরং প্রথা ভাঙ্গতে সিদ্ধান্ত নেই এই পেশায় প্রতিষ্ঠিত হবো। বাংলাদেশ আমাকে চিনবে ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে।”

দেশি মানুষের বিদেশ জয়...

শ্রেষ্ঠ ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে প্রথম কোন বাংলাদেশি হিসেবে ২০১১-১২ সালে শ্রেষ্ঠ ওয়েডিং ফটোগ্রাফারের কৃতিত্ব অর্জন করেন প্রীত। এছাড়া,র্বতমানে বাংলাদেশে ফুজি ফল্মিরে ফটোগ্রাফার ‌অ্যাম্বাসাডর হিসেবে কাজ করছেন। ওয়েডিং অ্যান্ড পোট্রেইট ফটোগ্রাফারস এশিয়া এর বাংলাদেশের অ্যাম্বাসাডর এবং প্রথম বাংলাদেশি স্পিকার প্রীত রেজা। এছাড়া প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারস অব আমেরিকা(পিপিএ),ওয়েডিং অ্যান্ড র্পোট্রেট ফটোগ্রাফার ইন্টারন্যাশনাল , ইন্টার‍ন্যাশনাল সোসাইটি অব প্রফেশনাল  ওয়েডিং ফটোগ্রাফারস, ওয়েডিং অ্যান্ড পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফারস এশিয়া  এবং ইপ্লাস ইন্টারন্যাশনালরে সদস্য তিনি। কাজ করছেন কাউন্টার ফটোর ফ্যাকালটি হিসেবে।

এছাড়া দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ২০১২ সাল থেকে শুরু করেছেন আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি। এরই মধ্যে থাইল্যান্ড,ভারত,সিঙ্গাপুর,মালোয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে, যুক্তরাজ্যে  বিভিন্ন দেশি-বিদেশিদের বিয়ের আয়োজনে কাজ করেছেন প্রধান চিত্রগ্রাহক হিসেবে। ১০ বছর আগেও স্বপ্ন দেখতেন, একদিন বিদেশ ঘুরে বেড়াবেন ছবি তুলতে। ২০১৪ সালে প্রীতর একক প্রদর্শনী হয় যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯তম পিএএসই র্আট ফেস্টিভ্যালে। আর সেই প্রদর্শনীর ওপরে তৈরি করা হয়েছে ডকুমেন্টারি।

ছবি:ওয়েডিং ডায়েরি

কোনও কিছুই অর্জন না,যদি না অন্যের উপকারে আসে…

প্রীত রেজা বর্তমানে উপস্থাপনা করছেন দেশের প্রথম আলোকচিত্রী নির্ভর টিভি শো ‘র্ডাকরুম’। গণশিক্ষামুখী এ কার্যক্রমের আরও বাস্তবরূপ দিতে এরই মধ্যে শুরু করেছে আরও কয়েকটি কাজ। এ ওয়েডিং ডায়েরী ছাড়াও এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে প্রীত রেজা প্রডাকশন, ড্বব্লিউবি স্কুল অব ফটোগ্রাফি, ড্বব্লিউবি স্টুডিও এবং ড্বব্লিউবি প্রডাকশন। ওয়েডিং ডায়েরীর তুলনায় বয়সে নবীন বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত তৈরি করা হয়েছে ভবিষ্যতে সৃজনশীল এই কাজগুলো মানুষের আরও কাছাকাছি পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যে। প্রীত বলেন,এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে একইসঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

বর্তমান ও ভবিষ্যত এক সূত্রে গাথা...

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেই বললেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা স্বপ্ন দেখাতে জানেনা । প্রীতর দাবি, আমাদের শিশুদের ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখার অভ্যাস ভেঙ্গে দেওয়া হয় বিভিন্ন কারণে। ফলে আমরা স্বপন দেখতে পারিনা বা সাহস পাইনা। আর প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন দেখার অভ্যাস গড়ে উঠলে বাকি কাজগুলো সহজ হয়ে আসবে।

পরকিল্পনার জন্য চাই প্রস্তুতি...

ভবষ্যিতে কী করতে চান জানতে চাইলে প্রীত বলনে,আমি মনে করি একা একা বনের বাঘ হয়ে কোনও লাভ নইে। এটা একটা শিল্প। এখানে অনেক মানুষের আনাগোনা প্রয়োজন। তাই আমি চাই তরুণ প্রজন্ম ওয়েডিং ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে বেছে নিক। এখানে শেখার সুযোগ রয়েছে অনেক। আমার মধ্যে এই বিষয়ে যতটুকু জ্ঞান আছে, তার সবটুকু নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই।  প্রীত দাবি করেন, আমাদের দেশে যারই একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা আছে সেই একজন ওয়েডিং ফটোগ্রাফার। দিনের বেলায় অন্য কোনও পেশায় আছেন আর রাতে কোন বিয়ে বা জন্মদিনের ছবি তুলে বাড়তি আয় করা যাবে। এ ধরনের মানসিকতা নিয়ে কখনও এ পেশায় ভাল করা সম্ভব নয়। এটা অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাই বললেন, শেখার কোনও বিকল্প নেই। আর তাই নিজের ইচ্ছা আর শখের আগ্রহ থাকলে সম্ভব আরও সামনের পথ দেখা।

ছবি: সাজ্জাদ  হোসেন

/এফএএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।