রাত ১১:৪০ ; শুক্রবার ;  ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯  

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || ষষ্ঠ পর্ব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

পূর্ব প্রকাশের পর


এই লেখা লিখতে বসে বিব্রত পরিস্থিতি দিনে দিনে বাড়তে থাকে। প্রবলভাবে আমি ঘরকুণো মানুষ। পৃথিবীর রূপ-রস-রঙ আমিও ভালোবাসি। কিন্তু ছুটে বেড়াতে পছন্দ করি না। ভ্রমণে আমার আগ্রহ প্রায় শূন্য। মাঝে-মাঝে মনে হয়, এতো ক্ষুদ্র আমি, এই যে জানলা দিয়ে পৃথিবী দেখছি এটাই যথেষ্ট। এর বেশি দেখা, এর বেশি ধারণ করার যোগ্যতা আমি রাখি না। জন্মাবোধি আরেকটা বিষয় টের পেয়েছি, ছুটে চলা সভ্যতার সঙ্গে আমি বড় বেমানান। পৃথিবীকে যেভাবে দেখতে চাই, তার আয়োজনের সাধ্য আমার নেই। ফলে আমার অবস্থা ওই কবিতার মতো— ‘আমি বলতে বাধ্য সেই ঝর্ণাটার কথা, স্থীরতা যাকে নদী হতে দেয়নি।’ সাগর অনেক দূরের, আমার নদী হওয়ারও সাধ জাগে না। তার মানে এই নয়, আমি নদীতে-সাগরে-পাহাড়ে-পর্বতে-মরুতে-জঙ্গলে যাইনি। গিয়েছি। গতির সঙ্গে, বিশ্বচাকার দ্রুত গতির সঙ্গে খাপখাওয়াতে পারিনি বলে ঘরকুণো হয়ে থাকতেই ভালো লাগে। এতোগুলো কথা বলার পেছনে একটাই কারণ, এই লেখা আমার লেখার কথা নয়। এই লেখা লেখার জন্য আমার সামান্য প্রস্তুতিও ছিলো না। আরো পরিষ্কার করে বলি, এই লেখা লিখতে হবে আমি যদি জানতাম; তবে আমি বরিশাল যেতাম না। আমি গদ্যের মানুষ নই। পদ্য লিখি। তাও টুকটাক। কথাশিল্পী জাকির তালুকদার বেশ কয়েকবার আলাপে-আড্ডায় আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন— এই লোকটা লিখলই না। তার মানে দাঁড়ালো লেখকের তালিকায় সংযুক্ত হওয়ার মতো কিছুই আমার নেই। ভেবে দেখেছি, কবি-সাহিত্যিক হওয়ার সামান্য খায়েশ আমার ভিতর মাথাচাড়া দিয়ে উঠেনি। লেখক হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রতিযোগিতা আমি অনুভব করি না। অথচ আশ্চর্য; এই কবি-সাহিত্যিক এবং লেখালেখির সঙ্গেই আমার আস্ত একটা জীবন অযথাই পার হয়ে গেলো। বরিশাল থেকে ফেরার পর কবি শামীম রেজা এবং কবি জাহিদ সোহাগ এই কর্মে আমাকে যুক্ত করে ছেড়েছেন। সুতরাং এই প্রায় কিছুই খেয়াল না করা লেখাটির ভালোমন্দের দায়ভার রেজা এবং সোহাগের।

দুই.
কবি জহর সেনমজুমদারের পূর্বপুরুষদের গড়ে যাওয়া শোলক ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমাদের ফিরে আসার কথা। কিন্তু এক পর্যায়ে দেখলাম, কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। গ্রামের বিশিষ্টজনেরা আমাদের নিয়ে চললেন গ্রাম দেখাতে। বাজার দেখাতে। মন্দির দেখাতে। স্কুল থেকে আমরা পায়ে হেঁটে গ্রামের দিকে এগুই। প্রথমেই পড়ে শোলক বাজার। সেখানে আমরা থামি না। বাজারের পেছনটায় দ্বাদশ শিবমন্দির। আমাদের বহরের নেতৃত্ব ওই সময়টায় গ্রহণ করেন গ্রামের বিশিষ্টজন কার্তিক চন্দ্র দাস, ওই এলাকার একাধিকবার জাতীয় পুরস্কার পাওয়া স্থানীয় চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মনু, অধ্যাপক মুহম্মদ মুহসিন এবং স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক। দ্বাদশ শিবমন্দিরের স্থানটিতে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক আমি। গুনে দেখি ১২টি মন্দির নেই। আছে ১১টি। আরেকটি গেলো কোথায়? কেউ কেউ জানালেন, ওই যে ঘরটি দেখছেন, একটি মন্দির ভেঙে এই ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না। ১১টি মন্দির যেভাবে গড়ে উঠেছে তাতে হঠাৎ একটি মন্দির ভেঙে এভাবে ঘর নির্মাণ করার কথা নয়। ভাঙলে সবগুলোই ভেঙে ফেলা হতো। প্রায় ধংস হয়ে যাওয়া জরাজীর্ণ মন্দিরের সারি শত বছর ধরে জহর সেনমজুমদারের পরিবারের স্মৃতি বহন করে চলেছে। কেউ বলেন মজুমদারদের শিবমন্দির। আবার কেউ কেউ বলেন সেনদের শিবমন্দির। সেনমজুমদার মিলিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে শত শত বছর ধরে এই দ্বাদশ শিবমন্দির শোলক এলাকার ঐহিত্য হয়ে আছে। আমার মনের খচখচ তাড়াতে একপাশে ডেকে নেই কার্তিক চন্দ্র দাসকে। বলি আরেকটি মন্দির গেলো কই? সবগুলো দাঁত পড়ে যাওয়া কার্তিক বাবু ফোকলা মুখে হাসেন। বলেন, ‘আমার সঙ্গে আসো।’ একটু সামনে গিয়ে দেখালেন মজুমদারদের পুকুর। পুকুরের অপর পাড়ে আরেকটি একলা মন্দির। প্রশ্ন করি, ওখানে ১১ টা, এখানে আলাদা একটা কেন? কার্তিক বাবু জানালেন বিষয়টিকে এতো কঠিন করে দেখার কিছু নেই। ১১টি মন্দির পর পর ওঠার পর আরেকটি মন্দির করার স্থান হচ্ছিলো না। ফলে একটি মন্দির আলাদা করে এখানে তৈরি করা হয়েছে। আর ওই যে কেউ কেউ বলছেন, একটি মন্দির ভেঙে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, একদম বানোয়াট কথা। দ্বাদশ শিবমন্দিরের স্থাপনা তিনি জন্মের পর থেকে এভাবেই দেখে এসেছেন। 
এবার প্রশ্ন করি, মজমুদার পরিবার এতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এই গ্রামাঞ্চলে দ্বাদশ শিবমন্দির নির্মাণ করলেন কেন? আমার প্রশ্নে কার্তিক বাবু বাইফোকাল চশমার ভিতর দিয়ে বড় বড় চোখে তাকান। বলতে থাকেন, জন্মের পর থেকে এই জনশ্রুতি তিনি শুনে এসেছেন, ভারতবর্ষে তখন ভূবনেশ্বরে দ্বাদশ মন্দির ছিলো। বিষয়টি সেনমজুমদার পরিবার জানতেন। ফলে তারাও ভূবনেশ্বরের আদলে এই শোলক গ্রামে দ্বাদশ মন্দির নির্মাণ করেছেন। শত শত বছর ধরে এই দ্বাদশ শিবমন্দির প্রাঙ্গণে শিবের পুজো হয়। মেলা বসে। এর ধারাবাহিকতা এখনো অক্ষুন্ন রয়েছে। দ্বাদশ শিবমন্দিরের স্থাপনা দেখেই টের পাওয়া যায় সেনমজুমদার পরিবার কি বিপুলভাবে সমভ্রান্ত ছিলেন। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া গেলো না, সেনমজুমদারদের জমিদারি কতোটা বিস্তৃত ছিলো। কেউ বলেন, শ্রুতি আছে পুরো শোলক গ্রাম সেনমজুমদারদের জমিদারির আওতাভূক্ত ছিলো। কেউ বলেন আশপাশের গ্রামগুলোও তাদের জমিদারির অংশ। আবার কেউ বলেন, ঠিক কোন স্থানটিতে সেনমজুমদারদের জমিদারি ছিলো তা জানা যায় না। তবে তাদের বসত এই শোলক জুড়ে। শোলকে বসেই তারা তাদের জমিদারি পরিচালনা করতেন। যার প্রমাণ, শোলক ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল, দ্বাদশ শিবমন্দির, বসবাসের দ্বিতল জমিদার বাড়ি ইত্যাদি।
কার্তিক বাবু দেখালেন দ্বাদশ মন্দিরের পাশে যে পুকুরটি রয়েছে তার পাড়ের প্রাচীন সিঁড়ি। জরাজীর্ণ হলেও এখনো চিহ্ন রয়েছে। কিন্তু আমাদের জমিদার নন্দন কবি-অধ্যাপক-গবেষক জহর সেনমজুমদার কই? তাকিয়ে দেখি তিনি বিভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক দেখছেন। সম্ভবত ভাবছেন, গত ৫৫ বছর ধরে পূর্বপুরুষদের যেসব গল্প শুনে আসছেন এবং যেসব গল্পের প্রায় কিছুই বিশ্বাস করতেন না সেসব গল্পই তার জন্য এতো কঠিন বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। দ্বাদশ শিবমন্দির বাস্তবে দেখার পর জমিদার নন্দনের আর বুঝতে বাকি থাকে না; পূর্বপুরুষেরা যা যা বলে গেছেন তার একটি অক্ষরও মিথ্যে নয়। আমাদের বহর এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। কথাশিল্পী রবিশংকর বল প্রায় নির্বাক। প্রিয় বন্ধুর মুখে শোলকের গল্প শুনেছেন টুকটাক। কিন্তু বাস্তবে এ যে শতগুণ বেশি সত্য। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাক না হয়ে উপায়ও নেই। অধ্যাপক-অনুবাদক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী নিজের কাছেই যেন হার মানলেন। বললেন, কবির এতো দেখি এই অঞ্চলের সভ্যতা আর ঐতিহ্যের অপূর্ব নিদর্শন। আমি আপ্লুত।
কবি জহর সেনমজুমদারকে ঘিরে রেখেছেন স্কুলের শিক্ষক এবং গ্রামের বিশিষ্ট জনেরা। অধ্যাপক মুহম্মদ মুহসিন আমাদের ওই অঞ্চলের ভূ-কাঠামো এবং সংস্কৃতির একটা ধারণা দিয়ে চলেছেন। দীঘি কিংবা পুকুরের প্রাচীন ঘাটের প্রতি আজন্ম আমার পক্ষপাত রয়েছে। ফলে সেনমজুমদারদের পুকুরের প্রায় ধংস হয়ে যাওয়া ঘাটটিও দৃষ্টি এড়ায় না। আবার কে কখন কিংবা আদো আর এই স্থানে আসা হবে কি-না জানা নেই। সুতরাং অন্তত স্মৃতি করে রাখা যাক। জহর সেনমজুমদারকে স্মৃতির সাক্ষ্য করতে পুকুর ঘাটে নামিয়ে বসানো হলো। বিভ্রান্ত তিনি ফ্যাল ফ্যাল তাঁকিয়ে থাকেন। মনটা কেমন করে ওঠে যেন। জমিদার নন্দন ঘাটে একা বসবেন? তার একজন সই থাকবে না পাশে? বহরের সবাই হই হই করে মুহূর্তের মধ্যে কবি ও কথাশিল্পী শাহনাজ নাসরিনকে সই বানিয়ে জহর সেনমজুমদারের পাশে বসিয়ে দিলেন। শুরু হয়ে যায় ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। জহর দা যেন আরো বিভ্রান্ত হয়ে ওঠেন। একটাই কথা বলতে থাকেন, কাগা, তোমরা আমাকে এ কোথায় নিয়ে এসেছো! একি সত্য; না স্বপ্ন! কাগা, এক জীবনে এতো কিছুর মুখোমুখি হবো; কখনো ভাবিনি...!

তিন.

পুকুর ঘাটে শাহনাজ নাসরিন ও জহর সেনমজুমদার

পুকুর ঘাট থেকে দৃষ্টি যায় একটু দূরে দক্ষিণে একটি প্রাচীন স্থাপনার দিকে। কার্তিক বাবু আমাদের সেদিকে নিয়ে অগ্রসর হন। ভেবেছিলাম প্রাচীন কোন স্থাপনার ধংসাবশেষ। চারপাশে বাগান। নানান প্রজাতির বৃক্ষের সারি। কার্তিক বাবুর মধ্যে একটা রহস্যের নমুনা পেলাম। তিনি এদিক-ওদিক নিয়ে গেলেও মুখে কিছু বলেন না। প্রাচীন স্থাপনার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে একপাশে সরে যান কার্তিক বাবু। অন্যপাশ থেকে কে যেন একজন বলে উঠেন; এটিই সেনমজুমদারদের বাড়ি। প্রায় ধংস হয়ে যাওয়া দ্বিতল বাড়িটির দিকে তাঁকালে যে কারো বুকের ভিতর হাহাকার জন্মাবে। কতো কতো মানুষের কোলাহল ছিলো একদা এই বাড়িতে। না। এখনো আছে। তবে বাড়িটি একদা যাদের ছিলো তাদের নয়, অন্য কারো। নানান কারুকাজ করা প্রাচীন বাড়িটির বারান্দায় স্কুল ড্রেস পরা দুজন শিশুকে বসে থাকতে দেখা যায়। বাড়ির সামনেটায় পশ্চিমপাশে নতুন পাকা বাড়ি উঠছে। ভুল যদি না করে থাকি, তবে বলতে হয় এই সময়টায় আমাদের বহরের প্রত্যেকের মধ্যে নানান বিভ্রম ছড়িয়ে পড়ছিলো। খুঁড়ে খুঁড়ে অজানা স্মৃতি বের করে আনার বিভ্রম।
বাড়িটির চারপাশ ঘুরে দেখি আমরা। কিছুই করছিলেন না জহর সেনমজুমদার। শুধু বলছিলেন, জানো; বাবা-মা কতো শত হাজার বার এই বাড়ির প্রতিটি বিন্দু নিয়ে গল্প করেছেন। কখনো বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি; ফেলে যাওয়া স্মৃতি নিয়ে সুখময় স্মৃতির বাড়াবাড়ি তর্পন। এখনতো দেখছি সবকিছু সত্য। একটুও বাড়াবাড়ি নেই। জহর সেনমজুমদারের উচ্চারণ করা পরিমিত প্রতিটি শব্দের মধ্যে শীতল হাহাকার আমি টের পাচ্ছিলাম। মানুষটি সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে আড়ালে নিয়ন্ত্রণ করার অপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। যার সামান্যও দৃষ্টি এড়ায়নি রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীর। তিনি বলছিলেন, জহর সম্ভবত অধ্যাপক বলেই এভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন। বাড়ির পেছনে আরেকটি পুকুর রয়েছে। যে পুকুরটি ব্যবহার করতেন সেনমজুমদার পরিবারের মেয়েরা। আমাদের সেই পুকুরটিও দেখানো হলো। কারা যেন বলছিলেন, আরেকপাশে কূপ রয়েছে। আগ্রহ দেখাইনি। এতো এতো আলোর মধ্যে অন্ধকার টানতে কার ভালো লাগে?

দুই বন্ধুতে বাড়ির সিঁড়িতে

পেছনের পুকুরঘাট থেকে ফিরে আসলে জহর দা বার বার বাড়িটির ছাদ আর সিঁড়ির কথা বলছিলেন। বলছিলেন কোন সিঁড়িতে কি আছে, ছাদের কোথায় কি আছে। সবই বাবা-মা-জেঠাদের কাছে শোনা। মিলিয়ে দেখতে চাইলেন। প্রচুর ছবি তোলা হলো জহর সেনমজুমদারকে বাড়ির বিভিন্ন ফোকাসে রেখে। বাড়িটি এতো প্রাচীন, ছাদে যেতে আমার সাহসে কুলায়নি। আর সিঁড়িও অনেক জটিল। প্রাচীন জমিদার বাড়িগুলো যা হয়; এটিও তার ব্যতিক্রম নয়। কবি শামীম রেজা জহর দাকে নিয়ে ঝুঁকিবহুল সিঁড়ি বেয়ে জমিদার বাড়ির ছাদে যায়। আমার বুকের ভিতরটা ধুকফুক করতে থাকে। বাড়ির পেছন দিক থেকে সামনের দিকে চলে আসি রবিশংকর বল, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী এবং আমি। চিৎকার করে রেজাকে সাবধান করতে থাকি।

কিন্তু কারা থাকেন বর্তমানে এই বাড়িতে জানতে ইচ্ছে হয়। কোথাও যেন জড়তা টের পাই। এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বলেন, আমার নাম এলাহি খান। বর্তমানে আমরা এই বাড়িতে থাকি। অবশ্য একটা বিষয় নজর এড়ায় না, সেনমজুমদার পরিবার যেসব স্থাপনা রেখে গেছেন, সেসব জরাজীর্ণ হয়ে গেলেও ধংস করে ফেলা হয়নি। যারা বর্তমানে সেনমজুমদারদের জমিদার বাড়িতে থাকেন তারা ইচ্ছা করলে বাড়িটি ধংস করে সেখানে নতুন বাড়ি নির্মাণ করতে পারতেন। কিন্তু সেটা করেননি। বরং মনে হয়েছে সেনমজুমদার পরিবারের যেসব স্মৃতি রয়েছে, তা যেন থাকে সে রকম চেষ্টাই তারা করছেন। না করলেও কারো কিছু বলার ছিলো না।

বাড়ির সামনের দিক

ছাদ থেকে নেমে আসলে জহর সেনমজুমদার জানালেন তার মায়ের স্মৃতি তিনি খুঁজে পেয়েছেন ছাদে। অর্থাৎ মা তাকে ছাদের যেসব গল্প করেছেন তার স্মৃতি এখনো বহন করে চলেছে এই প্রাচীন বাড়িটি। কার্তিক চন্দ্র দাস এবং মশিউর রহমান মনু আমাদের শোলক গ্রামে হাঁটিয়ে দেখালেন কোথায় এই গ্রামের সীমা শেষ হয়েছে। অগেই বলেছি; শ্রুতি আছে এই শোলক গ্রাম সেনমজুমদারদের জমিদারির আওতাভূক্ত ছিলো। আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ওই অঞ্চলের আশ্রমশালায়। সেখানেই আমরা শোলক গ্রামের শ্লোক শেষ করতে চেয়েছি। সবার কাছ থেকে আবেগঘন বিদায়ও নিলেন জহর সেনমজুমদার। কিন্তু মশিউর রহমান মনু শেষ করতে দিচ্ছিলেন না। আমাদের বহর এড়িয়ে গেলে কিছু পথ জহর দা আমাকে নিয়ে হাঁটলেন মশিউর রহমান। তারপর দেখালেন নিজের বসত। গড়ে তোলা মানবকল্যাণ সংস্থা। আন্তরিক উষ্ণতায় জহর সেনমজুমদারকে পুরো পরিবারসহ আমন্ত্রণ জানিয়ে দিলেন অগ্রিম। সে আমন্ত্রণে পরিপূর্ণ সাড়া দিলেন জহর সেনমজুমদার।
শোলক গ্রাম থেকে আমাদের বহর বরিশাল সার্কিট হাউসে ফিরে এলে সবার ভিতর এক ধরনের ভূতগ্রস্থ নীরবতা নেমে আসে। আমরা নিজ নিজ কক্ষে ফিরে যাই। সন্ধ্যায় অধ্যাপক মুহম্মদ মুহসিন আয়োজন করেছেন সাহিত্য অনুষ্ঠানের। সেখানে আবার ছুটতে হবে। কক্ষের মধ্যে সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে করাঘাত। সোহাগ পরম মমতায় জহর দাকে আমার আর হামীমের কক্ষে নিয়ে আসেন। কিছুটা আশ্চর্য হই। উদভ্রান্তের মতো লাগছিলো জহর সেনমজুমদারকে। এমন দৃশ্যের সঙ্গে আমি পরিচিত নই। অশ্রুসজল জহর সেনমজুমদারকে আমি চিনি না। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে জানেন রেজা। আমার বিছানায় তাকে শুইয়ে দিলে কবি গুমরে গুমরে কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে আওড়াতে থাকেন—

তুমি দ্বৈত, তুমি অদ্বৈত, জোৎস্নায় স্রোতস্বিনী, পাঁকে পাঁকে পদ্মফুল, যেন বনরাজি
দুই হাতে অগ্নিশিল্প, লাশকাটা বাংলা, পদপ্রান্তে কৃষিক্ষেত, জলহীন মাঝি
আমি তবে কোথা যাব? চারিদিকে পড়ে আছে হাতকাটা প্রেমিকের রক্ত আর ঘাম
বালিকার হৃদিজলে মাঝরাতে একা একা, মর্মরিত শিহরিত, এইবার স্নানে নামলাম
জল দাও স্থল দাও, পৃথিবীর পাণ্ডুলিপি জলে জলে যায় যেন ভিজে
সাইকেলে স্বর্গে যাবো, সাইকেলে মর্গে যাবো, দ্বারপ্রান্তে তুমি থেকো নিজে
চারিদিকে চূর্ণ চাঁদ, চারিদিকে কাতরোক্তি, এইখানে ওইখানে হৃদি হত্যা হয়
আমি তবে কোথা যাব? নীল সন্ধ্যা নিয়ে আসে অফুরন্ত জরা ব্যাধি ভয়
পাঁকে পাঁকে পদ্মফুল, ঝাঁকে ঝাঁকে পদ্মফুল, প্রেমিকের সাইকেলে রাত্রি নেমে আসে
শ্রাবণের স্তন থেকে খসে পড়ে ফোঁটা জল, মাতৃগর্ভে দুইখান নৌকা ভাসে

স্রোতস্বিনী/ ভবচক্র; ভাঙাসন্ধ্যাকালে      

(চলবে) 

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন— 

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || পঞ্চম পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || চতুর্থ পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || তৃতীয় পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || দ্বিতীয় পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || প্রথম পর্ব


 

           


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।