সন্ধ্যা ০৭:৩১ ; মঙ্গলবার ;  ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭  

নির্যাতনের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন কারাফেরত নারীরা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম।।

পুরুষের অত্যাচারের শিকার তো আমরা চিরদিনই- শূন্য দৃষ্টিতে, শরীরে ক্ষত আর মনে ক্ষোভ নিয়ে এমন মন্তব্য করেন আসমা (ছদ্মনাম)। তিনি একজন যৌনকর্মী।একদিন রাতে তাকে হঠাৎ রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে ছিলেন আরও দুই যৌনকর্মী। প্রথমে থানা হাজতে রাখা হয় তাদের। তাদের বিরুদ্ধে কী মামলা চলছে, জানতে চাইলেও কিছু বলে না পুলিশ। উপরন্তু টাকা চায়। কিন্তু আসমারা কোথায় পাবে টাকা?

এরপর তাদের নারী ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে দিয়ে আসা হয়। সেখানেও ‘নরকবাস’। আসমা জানান, আমি যতদিন থেকেছি পুনর্বাসন কেন্দ্রে, ততদিন কেবল আহাজারি শুনেছি। সেখানে নারীদের জন্য কঠিন জীবন।আমি যৌনকর্মী বলে আমাকে নানা জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। না যেতে চাইলে চলতো মারধর।

সুরাইয়া গত তিনবছর আগে হটাতই কাজ ছেড়ে রাজশাহী গোদাগাড়ি ফিরে যায় মায়ের কাছে। মা তাকে বিয়ে দিবে। পরে তার চেয়ে তিনগুন বড় ৩৯বছর বয়সী একজনের সাথে তার বিয়ে দেওয়া হয় ঠিকই কিন্তু মা জানেন না সেই বরের বাড়ি কোথায়। মেয়ে সেই যে গেছে মাঝে ৭দিনের দিন ফোনে কথা হয়েছে। তারপর আর হয়নি। মাকে সেদিন সুরাইয়া বলেছিল, দুবাই যাই। কিন্তু এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। নিকাহনামা ছাড়া, সুরাইয়ার কাগজপত্র ছাড়া কিভাবে ৭দিনে দুবাই যাওয়া হলো সে উত্তর মায়ের জানা নাই। দুইবছর পর মেয়ে ফিরে এলে জানতে পারেন, সে এতোদিন সিলেট কারাগার ঘুরে গাজীপুর পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছিলো। স্বামীর সাথে কোন যোগাযোগ নেই। এই দুইবছরে তার শরীরে নির্যাতনের দাগ। কিভাবে তাদের নানা যৌন কাজে ব্যবহার করা হতো সে বর্ণনা করতে গিয়ে ১৬ বছরের মেয়েটি মুর্ছা যায় বারবার।

সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাও এক সভায় কারাগারে বিচারহীন অবস্থায় নারীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,গাজীপুরে অনেক তরুণীকে ৫৪ ধারায় আটক রাখা হয়। তাদের আদালতে হাজির করা হয় না। জেলা জজকে বিষয়টি তদন্ত করে তালিকাসহ প্রতিবেদন দিতে বললে জানা গেছে, ‘যৌন কাজে’ ব্যবহারের জন্য সেসব নারীকে আদালতে হাজির করা হয় না। এদের কেউ কেউ একেবারেই নিখোঁজ আবার কেউ কেউ পাচার হয়েছে বলে জানেন তাদের বাবা-মা।

বাংলাদেশের বিভিন্ন নারী ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র নিয়ে অভিযোগ অনেক দিনের।চাইলেই সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। অনুমতি নিয়ে ঢুকলে সব সাজিয়ে-গুছিয়ে দেখানোর চেষ্টা চলে। তবে অনেকেরেই অভিযোগ অন্তরালে চলে চরম অনিয়ম এবং নির্যাতন।

প্রধান বিচারপতি দাবি করেন, তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানকে সুপ্রিম কোর্টে তার কার্যালয়ে ডেকে এনে এসব নারীর তালিকা দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

জানা গেছে, প্রায় সব কারাগারে জমিজমা ও যৌন হয়রানিতে সহায়তার অভিযোগ অনেক নারী অযথা বিনাবিচারে আটকে আছেন। তাদের পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই। মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় তার উদ্যোগের বিষয়ে জানা না গেলেও কমিশন অফিস সূত্র প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কিছু কাগজপত্র সংগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করে।

সূত্র জানায়, এ বিষয়ে আদৌ কোনও অগ্রগতি আছে কিনা তা কেবল চেয়ারম্যান বলতে পারবেন। তিনি দেশে ফিরলে জানা যাবে।

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, বিচার ছাড়া আটকে থাকা নারীদের বিষয়ে আমরাও উদ্যোগ নিয়েছি। এমন ঘটনা যে ঘটছে সেটা আমাদের নজরেও এসেছে। দ্রুত এ বিষয়ে কোনও একটি সিদ্ধান্তে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

এলিনা খান বলেন, আমাদের উচিত এসব নারীর পাশে দাঁড়ানো।

‘যৌনকাজে ব্যবহার’ বিষয়ে জানেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি প্রধান বিচারপতির বক্তব্য থেকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়েছি ।কারা যৌনকাজে ব্যবহার করে বা কীভাবে করে সে বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ করছি। যেহেতু প্রধান বিচারপতি বিষয়টি অবহিত আছেন, তিনি এখনই এসব নারীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে পারেন।

/এসএস/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।