দুপুর ১২:৪৩ ; বুধবার ;  ২২ মে, ২০১৯  

রামকিঙ্কর বেইজ : প্রান্তিক জীবনের রূপকার || শরীফ আতিক-উজ-জামান

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

নুড়িপাথর ও বালির বদলে তিনি ইটের খোয়া ও সুরকির সাথে প্রয়োজনমতো সিমেন্ট ব্যবহার করেছিলেন। এই মিশ্রণ ব্যবহার করে তিনি ১৯৩৫ সালে সর্বপ্রথম শান্তিনিকেতনের খোলা মাঠে ১১ ফুট দীর্ঘ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। নাম দেন ‘সুজাতা’। 

একাধারে ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ আধুনিক বাঙালি শিল্পীদের অন্যতম। ১৯০৬ সালের ২৫ মে তিনি বাঁকুড়ার জুগিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাকে অনেকে আদিবাসী মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি তা নন। দলিত ও আদিবাসীদের জীবন নিয়ে ব্যাপক শিল্প সৃষ্টির জন্য তার সম্পর্কে মানুষের এই ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তার বেইজ পদবী সংস্কৃত বৈদ্য ও প্রাকৃত বেজ্জ-এর মিলিত রূপ। তিনি এক পরামাণিক পরিবারের সন্তান। কিন্তু ১৯২৫ সালে তার পরিবার ওই পদবী পরিত্যাগ করেন। 

শৈশবে বাঁকুড়ার কুমোরদের কাজ দেখে তিনি বড় হয়েছেন। তাদের দেখাদেখি কাদা দিয়ে মূর্তি গড়েছেন। এভাবেই ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। স্ব-শিক্ষিত শিল্পী বলতে যা বোঝায় রামকিঙ্কর বেইজ ছিলেন তাই। ১৯২৫ সালে ‘প্রবাসী’র সম্পাদক রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় তিনি বিশ্বভারতীর কলাভবনে ভর্তি হন। সেখানে নন্দলাল বসু ও রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে তার শিল্পশিক্ষা বিশেষ মাত্রা লাভ করে। অধ্যয়ন শেষে তিনি ১৯৩০ সালে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কলাভবনে যোগ দেন। শান্তিনিকেতনকে যারা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পচর্চা কেন্দ্রে রূপান্তরিত করেছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ, নন্দলাল বসু ও বিনোদবিহারী মূখার্জী তাদের অন্যতম। শিল্পী হিসেবে তার একটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। বিশেষ এক লক্ষ নিয়ে তিনি শিল্পচর্চা করতেন। চিরকুমার রামকিঙ্কর অত্যন্ত নির্মোহ ও খেয়ালি জীবনযাপন করতেন। তার সৃষ্টিকর্মে প্রকৃতি ও প্রান্তিক মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

তিনি প্রতীচ্যের শিল্পভাষাকে আত্মস্থ করে তার সৃষ্টিকর্মে ব্যবহার করেছিলেন। ভারতীয় শিল্পকলার আধুনিকতার পুরোগামী শিল্পী হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তিনি এমন এক সময় শিল্প নির্মাণ শুরু করেন যখন ভারতীয় শিল্পকলা ক্রমান্বয়ে আধুনিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।  তাই তার শিল্পকর্ম ভারতীয় শিল্প-ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। প্রথমদিকে রামকিঙ্কর ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অসহযোগ আন্দোলনের সংগ্রামীদের আবক্ষ চিত্র আঁকতেন। মানুষের মুখ, অভিব্যক্তি, তাদের শরীরের ভাষা নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রকাশ করাতে তার আগ্রহ ছিল বেশি। আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্প, প্রাচীন ও আধুনিক ভারতীয় ধ্রুপদী চিত্রকর্ম তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বিষ্ণুপুর মন্দিরের টেরাকোটা ভাস্কর্য দ্বারা তিনি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। টেরাকোটা রিলিফ ও পাথরখোদাইয়ের পাশাপাশি তিনি জল ও তেলরঙে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। শিল্প নির্মাণে তিনি দেশজ উপাদানের প্রাধান্য দিতেন এবং একইসাথে একজন মডেল ও তক্ষণশিল্পীর দক্ষতা ব্যবহার করতেন। তার ভাস্কর্য গতি ও প্রাণপ্রাচুর্যের আধার। ভাস্কর্যের বিমূর্ত রূপরীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারী প্রথম ভারতীয় শিল্পী ছিলেন রামকিঙ্কর। তার ভাস্কর্য গতিশীল, ছান্দিক ও প্রতিসম যার সাথে প্রকৃতির একটি আত্মিক যোগাযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতীয় ভাস্কর্যের চারিত্র্য নির্মাণে রামকিঙ্করের বিশেষ ভূমিকা অনস্বীকার্য । তিনি তার শিল্পকর্মে সাঁওতালদের জীবন ও কর্মের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন পাশ্চাত্য প্রকাশবাদী ঢঙে। তার ভাস্কর্য ও চিত্রকলার কোনোটিই তার সময়ের প্রচলিত ভারতীয় রূপরীতির অনুসারী নয়। সেগুলো তার নিজস্ব ভাবনার ঋদ্ধ প্রকাশ। শহরের আকর্ষণ ছেড়ে দূরে উত্তর কোলকাতায় শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছেন প্রায় সারাটা জীবন। ওখানকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষেরা তার আগ্রহ কেড়ে নিয়েছিল। ছবি ও ভাস্কর্যে তিনি তাদের জীবনকে ধরে রাখতে সচেষ্ট

সুজাতা

হয়েছিলেন। তার চারপাশে সচল, প্রাণবন্ত মৃত্তিকালগ্ন এই জীবন-প্রবাহ তাকে সার্বক্ষণিক টানতো। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও তার দানবীয় শক্তি উভয়ই তিনি তার শিল্পকর্মে ভিন্নমাত্রায় তুলে ধরেছেন। তাইতো তার ছবিতে দেখতে পাই ধানমাড়াইরত গ্রামীণ নারী, সাঁওতাল উৎসব, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবং ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ বৈশিষ্ট নিয়ে চিত্রিত। শিল্পী কে জি সুব্রামনিয়াম তার সম্পর্কে বলেছেন, “সম্ভবত তিনি প্রথম ভারতীয় ভাস্কর যাকে সৃষ্টিশীল ভাস্করের খেতাব দেয়া যায়, তিনি ফরমায়েশকারীর চাহিদা মেটাতে নয় বরং নিজের আনন্দের জন্য ভাস্কর্য নির্মাণ করতেন।” 

উন্মুক্ত ভাস্কর্য নির্মাণে তিনি সবসময় সিমেন্ট ও পাথর ব্যবহার করতেন, কারণ আর কোনো উপাদান ব্যবহার করার সঙ্গতি তার ছিলনা। তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও দ্রুততার সাথে উপাদানকে মিশিয়ে কাঙ্ক্ষিত আদল নির্মাণ করতেন। ‘কবি’ শিরোনামে ব্রোঞ্জে করা একটি বিমূর্ত আবক্ষ ভাস্কর্য তার নিজস্ব ভাবনার নতুনত্ব তুলে ধরে। তার বড় ভাস্কর্যগুলোর প্রায় সবই শান্তিনিকেতনে সংরক্ষিত রয়েছে। তার মধ্যে ‘সাঁওতাল পরিবার’ অন্যতম। 

ছবিটিতে দেখেতে পাই এক সাঁওতাল দম্পতি। নারীটির বাঁ-কাঁখে একটি শিশু, পুরুষটির কাঁধে থাকা বাঁশের বাঁকের সামনের দিকে আরেকটি শিশু, আর পাশে একটি কুকুর। ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শরীরগুলো ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্কের বাঁধনে জড়িয়ে আছে বোঝা যায়। প্রকৃত শরীরী আকার থেকে সেগুলো প্রায় দেড়গুণ উচ্চতা সম্পন্ন। ন্যাংটো শিশু ও ন্যূনতম কাপড়ে ঢাকা তাদের শরীর দেখে বোঝা যায় যে তারা অত্যন্ত দরিদ্র ও কৃষক পরিবারের মানুষ। ক্ষেতে উৎপন্ন আনাজ ঝুড়িতে নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে যাচ্ছে। সেগুলো বিক্রি করে অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনবে। ভাস্কর্যের উপাদান ছিল সিমেন্ট-কংক্রিট। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে প্রতিরক্ষা ব্যূহ নির্মাণের জন্য এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যুদ্ধের পর সুউচ্চ ভবন নির্মাণে এর ব্যবহার উল্লেখ করার মতো হলেও ভাস্কর্য নির্মাণে তা ব্রাত্যই ছিল। ভারতে ত্রিশ দশকের প্রথম দিকে সিমেন্ট-কংক্রিট ভাস্কর্যে প্রথম ব্যবহৃত হতে থাকে। রামকিঙ্কর সেই ব্যবহারকারীদের অন্যতম। নুড়িপাথর ও বালির বদলে তিনি ইটের খোয়া ও সুরকির সাথে প্রয়োজনমতো সিমেন্ট ব্যবহার করেছিলেন। এই মিশ্রণ ব্যবহার করে তিনি ১৯৩৫ সালে সর্বপ্রথম শান্তিনিকেতনের খোলা মাঠে ১১ ফুট দীর্ঘ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। নাম দেন ‘সুজাতা’। এর কাঠামো ছিল একটু আলাদা। কংক্রিটের গাঁথুনি ধরে রাখার জন্য ভিতরে একটি কাঠামো প্রয়োজন হয় যা নির্মাণে তিনি প্রথমে ব্যবহার করেছিলেন বাঁশ ও বেত। কিন্তু এত দীর্ঘ একটি কাঠামোর জন্য এই উপকরণ উপযুক্ত মনে না হওয়ায় তিনি সিদ্ধান্ত বদলে রড ব্যবহার করলেন। ১৯৪০ সাল থেকে তিনি মসৃণ উপরিতলের ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু করলেন যার জন্য রঞ্জক মিশ্রিত সাদা সিমেন্ট, পাথর, নুড়ি ও বালি এবং কাঠামো নির্মাণে লোহার পাইপ ও তার ব্যবহার করেছেন। এটা একটি বিমূর্ত রচনা এবং বিষয়বস্তুতে নৃত্যভঙ্গিমার সাথে বৃক্ষে নরাত্ব আরোপের (floro-morphic) একটি যোগসূত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। একটি বিমূর্ত ধারণার ঐক্ষিক নির্মাণের সূচনাকারী দৃষ্টান্ত হিসেবে একে দেখা চলে। একইসাথে তিনি শান্তিনিকেতনে শ্যামলীর পূর্ব ও পিছনের দেওয়ালে টেরাকোটা রিলিফের কাজ করেন। নাম দেন ‘কৃষ্ণগোপিণী।  

হিন্দু বিধবা

১৯৩৭ সালে তিনি তেলরং নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন এবং ‘কুকুর সাথে রমণী’ ও ‘পিকনিক’ শিরোনামে তেলরং আঁকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রামকিঙ্কর কয়েকটি যুদ্ধবিরোধী ছবি আঁকেন। তাছাড়া ১৯৪২ সালে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের তা-বের পর তিনি ‘ঝড়ের পরে’ শিরোনামে তার বিখ্যাত ছবিটি আঁকেন। তেতাল্লিশের মন্বন্তর নিয়েও তিনি ছবি এঁকেছেন। এছাড়া তেল ও জলরং দুই মাধ্যমেই আঁকা তার ‘বিনোদিনী’ সিরিজের ছবিগুলো বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। সাঁওতাল রমণীর অঙ্কিত মুখে আটপৌড়ে ভাব সুস্পষ্ট। উপবেশনে বিশেষ প্রকাশধর্মিতা নজর কাড়ে। তীক্ষ্ম দেহরেখা, আকার নির্মাণ, রং ও স্থানের পরিমিত ব্যবহারে শিল্পীর সামগ্রিক কম্পোজিশন তৈরি ও মাধ্যম ব্যবহারের দক্ষতা নজরে পড়ে। কিউবিক ফর্ম নিয়েও তিনি কিঞ্চিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন দেখা যায়। ‘হিন্দু বিধবা’ শিরোনামের ছবিটিকে এনালাইটিক্যাল কিউবিজমের     

দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা যায়। ভাস্কর্য ও চিত্রকলার মধ্যে কোন মাধ্যম তার বেশি পছন্দ সে বিষয়ে বলেছিলেন, ‘রং আর আলোর আনন্দ প্রকাশ করতে যখন মন চায়, আকাশ আর জলের খেলা, ফুল ও রূপবতী তরুণীর সৌন্দর্য যখন ব্যক্ত করতে চাই, তখন আমি হাত দেই রং আর চিত্রপটে। কিন্তু সূর্যাস্তের বিষণ্ন রাগের অবসানে আমি চোখ বুজি। মধ্যরাত্রির অন্ধকারে যে শিশু কেঁদে ওঠে, তাকে তোষণ করতে হয়, তার গায়ে স্নেহের পরশ বোলাতে হয়। এই হলো ভাস্কর্য।’ (আত্মপ্রতিকৃতি, রামকিঙ্কর, গ্রাফিত্তি, কোলকাতা, পৃষ্ঠা-২২)

মানুষ, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের ভাবনায় তিনি গভীরভাবে মোহাবিষ্ট ছিলেন। নারী, পুরুষ ও শিশু —এই থিম নিয়ে তিনি অনেক ছবি ও ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। এই বিষয়ের প্রতি নিজের আগ্রহের কথা তিনি স্বীকার করেছেন এইভাবে, ‘প্রকৃতিতে আমরা দুটি আকৃতি পাই, পুরুষ আর নারী। তৃতীয়টি হচ্ছে তার প্রজনী— বাচ্চা। এই থিমটি এক অদ্ভুত সুন্দর। এর উপর কত আনন্দ, কত সৌন্দর্য্যরে খেলা চলেছে।’ (আত্মপ্রতিকৃতি, রামকিঙ্কর, গ্রাফিত্তি, কোলকাতা)

শরীরের গড়ন বা রূপরীতির ক্ষেত্রে তিনি প্রকাশবাদী ধারার অনুসারী। তার অনুভূতিপ্রবণ মনের ভিত্তি গড়ে উঠেছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে ঘনিষ্ঠতায়। এর পিছনে বাম-সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রভাব রয়েছে যাকে তিনি তার শিল্পভাবনার সাথে সম্পৃক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। 

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’, রবীন্দ্রভারতী কর্তৃক ডি. লিট ও ভারতের রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘পদ্মভূষণ’ লাভ করেছেন। দেশে-বিদেশে তার অনেক একক ও যৌথ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতীয় শিল্পকলা চর্চায় আধুনিকতার প্রবক্তা হিসেবে যাদের নাম উচ্চারিত হয় তাদের মধ্যে রামকিঙ্কর বেইজ অন্যতম।  

 

এ সম্পর্কিত আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন—

রামকিঙ্করের প্রেম : নিদারুণ অকরুণের সাথে || মোস্তাফিজ কারিগর 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।