দুপুর ১২:৪২ ; বুধবার ;  ২২ মে, ২০১৯  

রামকিঙ্করের প্রেম : নিদারুণ অকরুণের সাথে || মোস্তাফিজ কারিগর

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ভদ্রলোকের মেয়ে বিয়ে করতে চাইলাম, বলল— কী আস্পর্ধা। এখন ছোটলোকের মেয়ের সাথে আছি, বলে— ছিঃ ছিঃ।

‘প্রেম এসেছিল জীবনে। সেক্সুয়াল রিলেশনও হয়েছে। তা কখনোই বলার নয়।’—এই কথাগুলো বলে রামকিঙ্কর তাঁর জীবনের গৌরব প্রকাশ করতে চাননি বরং ভদ্রলোকের সমাজে অন্ত্যজ এই মানুষটি— যার শিল্পীসত্তা ছোট ছোট পাহাড় অতিক্রম করে সর্বোচ্চ শিখর ছুঁয়ে যাওয়া সত্ত্বেও জীবনকালে শান্তিনিকেতন আশ্রমে জাত-বর্ণের নিষ্ঠুর করাতে বার বার ভাগ হয়ে যাওয়া এই শিল্পীর করুণ হাহাকার বিকালের মিয়্রমাণ আলোর মতো ঘোলা হয়ে চলল সারাজীবন। জাত বর্ণের দোহাই দিয়ে শান্তিনিকেতন পল্লীর ভদ্র লোকেরা উঁচু জাতের কোনো মেয়ের সাথে তাকে যেভাবে মিশতে দেয়নি, ঠিক নিচু শ্রেণীর মেয়েদের সাথে যখন মিশেছে রামকিঙ্কর— তখনও তাকে সহ্য করতে হয়েছে নিদারুণ বঞ্চনা। আর তখন ভদ্রসমাজ থেকে উপেক্ষিত এই শিল্পীর একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়াতো কোনো বিধুর বাউল গান— ‘ও দারুণ, অকরুণ সাথে, এমন নিঠুর সাথে, আমি পিরিতি করিলাম না বুঝিয়া।’

বাঁকুড়ার যোগীপাড়ায় গরিব, নিরক্ষর, দিন-আনি-দিন-খাই ক্ষৌরকার পরিবারে জন্ম নেওয়া রামকিঙ্কর বেইজের জন্ম তারিখ কোথাও লিখিত আকারে না থাকায় তার জন্ম সাল নিয়ে নানা মতান্তর রয়েছে। সমীর চট্টোপাধ্যায় ১৯৮০ সালে রামকিঙ্করের জীবনের শেষ বছরে নেশায় ও আড্ডায় বলা কয়েক দিনের কথা টুকে রেখেছিলেন ডায়েরিতে। সেই কথাবার্তায় রামকিঙ্কর বলেছিলেন— ‘উনিশশো দশে আমার জন্ম। পৈত্রিক নাম রামকিঙ্কর প্রামাণিক।’ শান্তিনিকেতনে আসার পর তাঁর এই নাম নিয়েও নানা ঠাট্টা-মসকরার সম্মূখীন হতে হলো। কবি নিশিকান্ত তাঁর নাম নিয়ে ছড়া কাটতেন— ‘রামকিঙ্কর প্রামাণিক/ নামটি বড় হারমোনিক।’

লখনৌ-বরোদা প্রদর্শনীতে পদক পাওয়ার পর তাঁর নাম প্রকাশে বিপত্তি ঘটলো। ‘বিশ্বভারতী পত্রিকা’ ছাপলো— ‘রামকিঙ্কর প্রামাণিক রুপোর পদক পেয়েছে।’ শান্তিনিকেতন পত্রিকা  ছাপলো— ‘রামকিঙ্কর প্রামাণিক সোনার পদক পেয়েছে।’ বিরক্ত হয়ে রামকিঙ্কর শান্তিনিকেতন-এর সম্পাদককে গিয়ে বললেন— তার পদবি প্রামাণিক নয়, বেজ। রামকিঙ্কর এই ‘বেজ’ পদবি কোথা থেকে পেলেন তার কোনো উৎস নেই। তার ভাইপো দিবাকর বেইজ লিখেছে— আমাদের পদবি বেইজ। কাকাবাবুই প্রথম লিখেছেন। ক্ষিতিমোহন সেন বেজ পদবির ব্যাখ্যা দিয়েছেন, বেজ-বৈজ্য-বৈদ্য। এর অর্থ ক্ষৌরকার হতে পারে। কেন না ক্ষৌরকাররাই তো এ দেশের আদি শল্য চিকিৎসক। এই নিয়েও শান্তিনিকেতনের ভদ্রলোকেরা ঠাট্টা কম করলেন না। কেউ বললেন রামকিঙ্কর বৈজ্য, কেউ ভিষগ্রন্ত, কেই বদ্যি। ১৯২৭-এ রামকিঙ্কর একুশে পা দিলেন। এর মধ্যে শান্তিনিকেতনে কেটে গেছে দু’বছর। প্রবাসী পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় তাঁর নতুন ছবি ছাপা হলো, নাম ছাপা হলো রামপ্রসাদ দাস। প্রিয়জন ও বন্ধুরা যখন বললেন বার বার নাম পাল্টানো ঠিক নয়। তখন শেষবারের মতো নিজের নাম স্থির করে রাখলেন— রামকিঙ্কর বেইজ।  

রামকিঙ্কর শিল্পী হিসেবে যতটাই সফল, ব্যক্তি রামকিঙ্কর বা একজন পুরুষ হিসেবে তার জীবনে রয়ে গেছে চরম চৈত্রে বীরভূমের বিদীর্ণ লাল মাটির শুষ্কতা বা পথ হারিয়ে পড়ে থাকা কোপাই নদীর নিঃসঙ্গতার মতো একলা জীবন অথবা পুজোর ছুটিতে খালি হয়ে যাওয়া শান্তিনিকেতন আশ্রমের মতো খা খা শূন্যতা। ব্যক্তি রামকিঙ্করের জীবনে বিভিন্ন সময় এসেছে বিভিন্ন নারী, চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের মডেল হয়েও এসেছে অনেক নারী। এতো নারী সংস্পর্শে আসার পরেও তার জীবনে যে অপূর্ণতা রয়ে গেল তার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর জাত-বংশ। না পেড়েছে কাউকে নিজের করে আকড়ে ধরতে, না কেউ তাকে আগলে রাখলো। জীবনের শেষের দিকে বেশ ক’বছর একমাত্র রাধারানীই তার পাশে ছিল। তবু সে থাকা প্রেমিকার মতো নয়, বিবাহিত স্ত্রীর মতো নয়, সমাজে স্বীকৃত কোনো সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে নয়। রামকিঙ্কর নিজে থেকে গিয়েছেন অনেকের কাছে, অনেকে তাদের আনন্দের জন্যে এসেছিল, চলেও গেছে।
রামকিঙ্করের জীবনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে যে সকল নারীর নাম, তাদের নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে বাঁকুড়ার শ্রেষ্ট শিল্পী রামাই পটুয়ার মেয়ে ধামাবতীর কথা। ধামাবতী ছিল রামকিঙ্করের বউদি বসন্তবালার সই। বিবাহিত জীবনে সুখী ছিল না ধামাবতী, স্বামী মদ্যপ, স্ত্রীর প্রতি উদাসীন। বসন্তবালাকে দেখতে আসার সুবাদে তখন কিশোর রামকিঙ্করের সাথে তার দেখা হয়ে যেতো। রামকিঙ্কর ছবি আঁকতে পারে সে কথা গ্রামের সব মানুষের মতো ধামাবতীরও অজানা ছিল না, সে নিজেও পারিবারিক পট আঁকা বিদ্যের চর্চা চালিয়ে নিচ্ছিল। একদিন কথা হলো— দু’জন দু’জনার ছবি আঁকবে, দেখা যাবে কার বিদ্যের কত জোর। এইরকম একটা লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে রামকিঙ্করকে ধামাবতী নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলো। নির্জন বাড়িতে রামকিঙ্করকে বসিয়ে ধামাবতী প্রথমে রামকিঙ্করকে পটুয়ার নিপুণ রেখায় আঁকলো। তারপর রামকিঙ্করকে নীরবে সিটিং দিলো। রামকিঙ্কর রোমাঞ্চিত হয়ে দেখলো তার স্তনের উপর থেকে আলগোছে খসে পড়ছে কাপড়— ধামাবতীর সাথে তার এই যোগ রাঢ়বাংলার পল্লীগীতিকার পালার মতো বিষণ্ণ ফুল হয়ে তোলা রইল নির্জন নারীর হাতের সুঁইয়ে ফোঁড়া চাদরের জমিনে। ধামাবতীর সাথে জীবনে আর একবারই তাঁর দেখা হয়েছিল কোনো এক গ্রাম্য মেলায়— সে দেখা দু’জন অপরিচিতের।
শান্তিনিকেতনে এসে জীবনের কত না বাঁকে হারালেন রামকিঙ্কর। শান্তিনিকেতনের সঙ্গীতভবনের ছাত্রী চন্দ্রা এখানে অধ্যায়ন করলেন, পাশ করে বাড়ি ফিরেও গেলেন। মধ্যিখানে রামকিঙ্করের জীবনে এই চন্দ্রাকে নিয়ে এক ঘূর্ণিপাক ঘটে গেল। সন্তোষ মজুমদারের বোন রমা— রমা মজুমদার, যাকে ছেলেমেয়েরা নুটুদি বলে ডাকতো, তারই বাড়িতে রবীন্দ্রগানের ঘরোয়া ক্লাসে রামকিঙ্করের সাথে পরিচয় চন্দ্রার। হালকা পাতলা গড়নের এই মেয়েটির সাথে ঘটলো রামকিঙ্করের গভীর যোগ। কিন্তু শান্তিনিকেতনের কলোনিচরিত্রের আক্রোশে রামকিঙ্করকে সইতে হলো নানা যাতনা। সংস্কৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা শ্রেণীভেদ, জাতিভেদ আর পরচর্চার বর্জ্যে স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছিল ভদ্রলোকের সমাজ। তবু রামকিঙ্কর এসব বিচার বিবেচনা করে প্রেম করবার লোক নন। আশ্রমের বাইরে ঘন শালের বন, লোকচক্ষুর অগোচরে আরও কত না জায়গা। রামকিঙ্কর আর চন্দ্রা হারিয়ে চলল সেই সব অবাধ জোয়ারে। বন্ধুরা তাঁর ছবিতে খুঁজে পেলেন চন্দ্রার মুখের ছাপ। কোপাইতে স্নান করতে গিয়ে জল থেকে কাদামাটি তুলে নদীর খাড়া পাড়ে চন্দ্রার রিলিফ করে রেখে আসেন। সে সময় প্লাস্টারে করা দেবযানী ও কচ গড়লেন। দেবযানীর মুখের আদলে আশ্রয় পেলো চন্দ্রার চপল মুখ। প্রেমের এই গভীর আবেগ আর তার নিরঙ্কুশ প্রকাশ চন্দ্রার জন্যে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করলে রামকিঙ্করের উপর পুরো দায় চাপিয়ে দিয়ে নুটুদির কাছে আশ্রয় নিলো চন্দ্রা। কিছুদিন দুজনের দেখা হলো না। বেশ কিছুদিন পর নুটুদির গানের ক্লাসে নুটুদির কাছে বসে আছে চন্দ্রা। নুটুদি চন্দ্রাকে আড়াল করে কঠিন গলায় বললেন— ‘কিঙ্কর, তুমি আর কোনোদিন এ বাড়িতে আসবে না। চন্দ্রাকে আর আজেবাজে কথা বলবে না কখনো। মনে রেখো, তুমি কে, তুমি কী।’ আসলে রামকিঙ্কর কে? নুটুদি আবার তাকে মনে করিয়ে দিলেন তার অন্ত্যজ জন্মের কথা। সেদিন নিশ্চয়ই তাঁর বাঁকুড়ার যোগীপাড়ার কথা মনে পড়েছিল, মা সম্পূর্ণার কথা। হয়ত শালবনের গভীর পথ ধরে হেঁটে অনেক দূরে গিয়ে চুপটি বসেছিলেন একাকী। আর গলা ভিজে বেড়িয়ে আসছিল— ‘ও দারুণ, অকরুণ সাথে, এমন নিঠুর সাথে, আমি পিরিতি করিলাম না বুঝিয়া’—সেই বিধুর গান।
ভদ্রলোকের মেয়েদের কাছ থেকে অন্ত্যজ রামকিঙ্কর ফিরে এলেন অন্ত্যজ পাতাকুড়ানিয়া খাদুবালা-আবরণের কাছে। রামকিঙ্কর তখন পঁচিশ পেরিয়ে ছাব্বিশ। খাদুবালার সাথে নির্জন বিকেলে একলা একটা ভাঙা ঘরের ভেতরে শুয়ে থাকেন। আবরণ নিজেই একদিন রামকিঙ্করকে ধাক্কা দিয়ে এক অন্ধকার ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে নিলো। আবরণ আর রামকিঙ্করের দু’জোড়া পায়ের উপর দিয়ে আবরণের বাচ্চাটা হামাগুড়ি দিয়ে খেলে বেড়াতে লাগলো। যৌবনের এই প্রবল সময়ে একজন শিল্পীর নারীসঙ্গ কী করুণ গল্পেই না পরিণতি পেল। আবরণ আর খাদুবালার অসংখ্য ড্রইং, চিত্রকর্মের ভেতরে লুকিয়ে রইল এক তরুণ শিল্পীর অবাধ লিবিডোর মৃত্যু।

পূনর্মিলন

তবু থেমে রইলো না রামকিঙ্করের নিম্নজাত হওয়ার অভিশাপে জর্জরিত হওয়া। বিশ্বভারতীর কলেজের ছাত্র রামকিঙ্করের বন্ধু সুজিত মুখোপাধ্যায় বিয়ে করেছিলেন যুগীপাড়ায়, রামকিঙ্করদের বাড়ির কাছাকাছি গোস্বামী বাড়িতে। কোনো এক ছুটিতে সুজিত শ্বশুর বাড়ি এলেন। সেই ছুটিতে রামকিঙ্করও যুগীপাড়াতেই ছিলেন। একদিন সকালে সুজিত রামকিঙ্করকে ডেকে নিয়ে গেলেন  গোস্বামী বাড়িতে। গিয়ে ও বাড়ির চেয়ারে বসেছেন রামকিঙ্কর, এসময় সুজিতের শ্বশুর মশাই এসে ঢুকলেন। রামকিঙ্কর মাত্রই উঠে দাঁড়াবেন প্রণাম করবার জন্যে, আর অমনি গৃহকর্তা গর্জন করে উঠলেন— তুই? তুই চণ্ডে নাপিতের ছেলে না? ওঠ, উঠে দাঁড়া। বার বার ভদ্র লোকের সমাজ থেকে তাড়া খেয়ে, অপমানিত হয়ে শান্তিনিকেতনের একলা নির্জনতায় নিজেকে বিছিয়ে রাখতেন তিনি, কোনো শুকনো ফুল পড়ে থাকবার মতো করে।
১৯৩৫-এ শিক্ষাভবনের ছাত্রী হয়ে জয়া আপ্পাম্বামী এলেন শান্তিনিকেতনে। পরিচয় ঘটলো রামকিঙ্করের সাথে। তার দীর্ঘ তন্বী কিশোরগঠনী দেহটি রামকিঙ্কররের ভালো লেগেছিল। প্রথমে তেলরঙে জয়ার ছবি আঁকেন। এরপর ১৯ ইঞ্চি একটি মূর্তি গড়লেন মাটি দিয়ে। তারপর জয়ার দুই মানুষ লম্বা একটি সিমেন্ট-কাকড়ের মূর্তি গড়লেন, তার নাম দেওয়া হলো ‘সুজাতা’। মাস্টার মশাই নন্দলাল বসু এই নামকরণ করে দিয়েছিলেন। সোমেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের সাথে এক কথোপকথনে রামকিঙ্কর বলেছিলেন, ‘সুজাতা— এই নামটি কিন্তু আমি দিইনি। কাছেই ছিল বুদ্ধমূর্তি— সেই পুরানো গোবর মাটি আলকাতরার বুদ্ধ। নন্দবাবু নাম দিলেন সুজাতা।’ সোমেন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেছিলেন, নাম আপনার পছন্দ হলো? রামকিঙ্কর বললেন, ‘আমার আর পছন্দ অপছন্দ কী? যে যা খুশি ডাকুক। তবে মূর্তি গড়ার সময় একটা চেহারা ছিল মনে— সুজাতা নয় গো, জয়া— জয়া আপ্পাস্বামী।’ রামকিঙ্করের এই কথার ভেতরে এক ধরনের গোপন বেদনাবোধ রয়ে গিয়েছিল।
রামকিঙ্করের জীবনে ঈগলের ডানার বিস্তার, মেঘের মধুর গর্জনে ময়ূরের মেলে ধরা পেখমের মতো করে প্রেম নিয়ে এসেছিল বিনোদিনী। বিনোদিনী ছিলেন মণিপুরী রাজার কন্যা। ১৯২২ সালে মণিপুরের রাজপ্রাসাদে বিনোদিনীর জন্ম। ১৯৪৩ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষাংশে ব্রহ্মদেশ অধিকার করে জাপান ব্রহ্মসীমান্ত অতিক্রম করে ভারতবর্ষে মণিপুরের সীমানায় চলে আসে। জাপানী আক্রমনের ফলে মণিপুরী রাজপরিবারে সবাই নবদ্বীপে চলে আসে। পরিবারের সাথে বিনোদিনী যখন নবদ্বীপে আসে, তার বয়স ২২। বাবা মহারাজ চূড়াচাঁদ সিংহ, মা মহারানি ধনমঞ্জরী। নবদ্বীপে এসে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হয়ে তিনি স্থানীয় বিদ্যাসাগর কলেজের তরুণ অধ্যাপক পীযূষ দাশগুপ্তের কাছে প্রাইভেট পড়তে লাগলেন। পীযুষবাবু ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক নেতা, রবীন্দ্রভক্ত। বিনোদিনীর মনে প্রথম তিনিই রবীন্দ্রপ্রীতি সঞ্চারিত করেন। এরপর নবদ্বীপের সংগীতাচার্য সুধাময় গোস্বামীর কাছে বিনোদিনী ধ্রুপদী কীর্তনে তালিম নেন। শিল্পী চণ্ডী লাহিড়ী তখন নবদ্বীপের বিদ্যাসাগর কলেজে পড়াতেন। মণিপুর রাজপরিবারের ছেলেদের সাথে সম্পর্কের সুবাদে বিনোদিনীর সাথে যোগাযোগ হয়। বিনোদিনী ছিলেন সেক্যুলার মনের অধিকারী—  চণ্ডী লাহিড়ী এ কথা লিখেছিলেন। মূলত পীযুষ দাশগুপ্ত ও চণ্ডী লাহিড়ীর অনুপ্রেরণায় বিনোদিনী ১৯৪৫ সালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে উচ্চশিক্ষার জন্যে ভর্তি হন। বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ভাস্কর্য। কাজের মধ্য দিয়েই প্রিয় হয়ে উঠলেন কলাভবনের ভাস্কর্যের শিক্ষক রামকিঙ্কর বেইজের সাথে। দিনে দিনে দুজনে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। এখানে এসে বিনোদিনীর রাজপোশাক আড়াল হয়ে গেলো, সাধারণ পোশাকে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন তিনি। বাক্স ভরে সঙ্গে আনা সকল গহনা, দামি শাড়ি বাক্সবন্দি করেই রাখা হলো। শালবনের নির্জন পথ ধরে শান্তিনিকেতনের উপকণ্ঠে সাঁওতালপাড়া, খোয়াইয়ের পাড় দু’জনার অবাধ বিচরণের ক্ষেত্র হয়ে উঠলো। রামকিঙ্করের চেয়ে ১৪-১৫ বছরের ছোট বিনোদিনী। দু’জনের মধ্যে বয়সের এই দূরত্ব কমে সমান কোঠায় এসে দাঁড়ালো। ১৯৪৫-এ সিমেন্টে বিনোদিনীর পোর্ট্রেট করলেন রামকিঙ্কর। ১৯৪৮ সালে তেলরঙে আঁকলেন বিনোদিনীকে। ১৯৫০ অসংখ্য ছবি করলেন জলরঙে। রামকিঙ্করের এসব কাজ আজও দিল্লির ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ণ আর্ট-এ ‘বিনোদিনী সংগ্রহ’ নামে গৃহীত আছে। কিন্তু সব ছাড়িয়ে আবারও মূখ্য হয়ে দাঁড়ালো বিনোদিনী আর রামকিঙ্করের সামাজিক পরিচয়ের দূরত্ব। অপস্রিয়মান আলোর মতো দূর দেশে মিলিয়ে চলল বিনোদিনীর আভা। কলাভবনের পাঠ শেষ করে বিনোদিনী ফিরে যান মণিপুরে। সেখানে স্বজাতি এক ডাক্তারের সাথে তার বিয়ে হলো। দুটি ছেলে সন্তান হলো। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে অসুখী বিনোদিনী সাহিত্য ও শিল্পে নিজেকে ডুবিয়ে দিলেন। ১৯৬৫-তে মণিপুরী ভাষায় লেখা তার নাটক রেডিওতে প্রচার হলো। ১৯৭৬ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেলেন ‘বড়  সাহেব ওংবি সানাতোংবি’ উপন্যাসের জন্যে। বিনোদিনী বেঁচে ছিলেন রামকিঙ্করের মৃত্যুরও অনেক বছর পর পর্যন্ত। ২০১১ সালে ১৭ জানুয়ারি মারা যান বিনোদিনী।
পরিবারের নির্দেশে বিনোদিনী কলাভবনের পাঠ শেষ করে মণিপুরে চলে যাওয়ার পর রামকিঙ্কর আবার এক অসীম বেদনাভারের ভেতরে নিমজ্জিত হয়ে গেলেন। পড়ন্ত যৌবনও তাকে উগ্র করে তুলছিল। এই কর্কশ, রূক্ষ, বেদনাপ্লাবিত সময়ে তাঁর জীবনে যোগ হলো আর এক নারী— রাধারাণী। মৃত্যুঅব্দি রাধারাণীই তার সাথে রয়ে গিয়েছিল একত্রিত হয়ে। শান্তিনিকেতনের মালঞ্চ বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে মীরা দেবীর পরিচারিকা ছিল রাধারাণী। এই রাধারাণীর সাথে মেলামেশা নিয়ে শান্তিনিকেতনে প্রকাশ্যে ও গোপনে আবারও ঘোঁট পাকালো, কুৎসা রটালো, নিন্দের বিশ্রি বাণ ছুঁড়ে দিলেন ভদ্রলোকেরা। রামকিঙ্কর তখন বলতেন, ‘ভদ্রলোকের মেয়ে বিয়ে করতে চাইলাম, বলল— কী আস্পর্ধা। এখন ছোটলোকের মেয়ের সাথে আছি, বলে— ছিঃ ছিঃ।’  এইসব প্রবল নিন্দা সাথে করে নিয়ে শেষ জীবন অব্দি তারা একসাথে রয়ে গেলেন। তারা মোটেও আদর্শ প্রেমিকযুগল ছিলেন না। বিস্তর মানসিক ফারাক থাকার পরেও কোনো এক আত্মসম্মান, কৃতজ্ঞতা বা বন্ধনে তারা এক হয়ে রইলেন।
মীরা দেবীর তথ্যানুসারে রাধারানীর জন্ম ১৯০৮-এর কাছেপিঠে। বর্ধমানের শুসকরায় স্টেশনের কাছে তাদের বাড়ি। রাধারাণীর বিয়ে হয়েছিল বোলপুরে। বোলপুরে মুদির দোকান ছিল স্বামী চণ্ডী গড়াইয়ের। একটি ছেলেও হয়েছিল তাদের। রাধারাণীর স্বামী পরকীয়াতে লিপ্ত হলে তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। বাবার বাড়িতে ফিরে এলে বাবা আবার বিয়ে করতে বললে একটা গোল বেঁধে যায়। পারিবারিক ঝামেলায় রাধারাণী শান্তিনিকেতনে চলে আসে। অন্নদাকুমার মজুমদারের সাথে পরিচয় হলো। তিনিই মীরা দেবীর কাছে তাকে নিয়ে যায়। কিঙ্করবাবু তখন মীরা দেবীর ওখানটাই যেতেন, ওখানে আলাপ পরিচয়। রামকিঙ্কর তাঁর ছবি ও মূর্তির মডেল করে রাধারাণীকে দু-চার দিন বাড়িতে নিয়ে যেতেন। কোনো কোনো দিন ছবি শেষ করতে রাত হয়ে যেত। অত রাতে মীরা দেবীর ওখানে আর আসা হতো না। রাত কেটে যেতো ওখানেই। সকালে ফেরার সময় বাবুরা দেখতে থাকলো রাধারাণীর ফেরার দৃশ্য। এই নিয়ে অনেক কথা হলো চারপাশে। রামকিঙ্করের সাথে বিবাদ ঘটলো। রামকিঙ্কর মন ভারী করে বসে থাকতেন। এই বিষয় নিয়ে শান্তিনিকেতনের অফিসে মারামারি, লাঠালাঠিও হলো একদিন। তারপর থেকেই কেউ কিছু আর বললো না। রাধারাণীও যেমন ভালোবাসার টানে রামকিঙ্করের কাছে আসেনি, রামকিঙ্করও তেমনি কেবল কাজের জন্যে তাকে ডেকেছিলেন। তার রান্নাবান্না, সেবাযত্ন করারও একজন লোক লাগে।
রাধারাণীই রামকিঙ্করের নুড মডেলদের প্রধান। প্রথমে যদিও রাধারাণী রাজি হয়নি। রামকিঙ্কর তাকে ২৫০ টাকা দিলেন, সেই টাকা দিয়ে সোনার মোটা হার গড়ল রাধারাণী। এভাবেই জড়াজড়ি করে থাকতে লাগলেন তারা। তিনবার সন্তান নষ্ট করলেন। রাধারাণীই তার জীবনের অসংখ্য শিল্পকর্মের মডেল। দিল্লির রিজার্ভ ব্যাংকের ‘যক্ষ্ম-যক্ষ্মী’ ভাস্কর্যের যক্ষ্মী প্রাথমিক ম্যাকেটের মডেল তো রাধারাণীই। আর যক্ষ্মার মডেল রামকিঙ্কর নিজেই। রিজার্ভ ব্যাংকের ভাস্কর্য করার সম্মানীর থেকে বেশির ভাগ টাকাই দিয়ে দিয়েছিলেন রাধারাণীকে। এই টাকা দিয়ে রাধারাণী দ্বিতল একটি বাড়িও করেছিলেন। রাধারানীর সাথে রামকিঙ্করের বিবাহিত সম্পর্ক নয়, রাধারানী সন্তান নিতে চাইলেও রামকিঙ্কর তা নষ্ট করে দিয়েছেন— এতো কিছুর ভেতরে কোথায় যেনো শিল্পী রামকিঙ্কর একা হয়ে ছিলেন। একদম একা। কিন্তু রাধারাণীর প্রতি তাঁর ছিল অগাধ সম্মানবোধ ও সহমর্মিতা। দুজনে সেজেগুঁজে বোলপুরের বাজারে সংসারের এটাওটা কিনতে যেতেন, বা অকারণে রিকশায় করে ঘুরে বেড়াতেন, কোথাও দাওয়াত থাকলে সাথে করে নিয়ে যেতেন। 

কিন্তু রামকিঙ্কর সম্পূর্ণ হয়ে ওঠার পর আজ আর তাঁর জাতের কথা নেই, ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক ভাস্করের পরিচয়ের কাছে আজ আর তাঁর জাতপরিচয় বড় কিছু নয়। কিন্তু ভদ্রলোকের সমাজ তাদের নিজেদের গড়া ডিসকোর্সের দোহাই দিয়ে রামকিঙ্করের মতো এতো বড় একজন শিল্পী, একজন মানুষকে, একজন প্রেমিককে কী নিষ্ঠুরভাবেই না একা করে রেখেছিল। 


শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্করকে নিয়ে নানা বাজে ধারণারও প্রচার ছিল। তিরিশের কোঠায় যখন রামকিঙ্কর, প্রচণ্ড লিবিডোতাড়িত এই মানুষটিকে আশ্রমবাসী সদাচারীরা সমাজবর্জিত করে রেখেছিলেন। তখন আশ্রমকেন্দ্রিক পরিবারগুলোর ভেতরে অদ্ভুত সব কেচ্ছার চল ছিল। শঙ্খ চোধুরীর ভাগ্নে ইরা ভকিল এমন একটা বিশ্রি গল্পের কথা বলেছিলেন— একজন বহুদিনের পুরানো অধ্যাপকের মেয়েকে সঙ্গে করে কলাভবনের সামনে দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন ইরা। সময়টা একটু একটু শীতের। দু’জনে একটা চাদর জড়িয়ে হাঁটছিল। সামনে রামকিঙ্কর আসছে দেখে ‘ও মা’ বলে মেয়েটা দিল দৌঁড়। ইরাকে পোটলার মতন করে জড়িয়ে সামনের কাঁকরের জমিতে টেনে নিলেন। ইরা ভকিল বাইরের মেয়ে, যথাযথভাবে বেড়ে ওঠা ইরার কাছে ভীষণ অভদ্রতা মনে হলো এই মেয়েটির আচরণ। ইরা বিরক্তি প্রকাশ করলে মেয়েটি বলেছিল, ‘তুমি জানো না, ছুটির সময় কিঙ্কর দা গাছের ডালে উঠে বসে থাকেন। নিচ থেকে কোনো মেয়ে গেলে লাফিয়ে ধরে নেন।’
সারাজীবন এই ভদ্রলোকেদের কাছে রামকিঙ্কর এক অচ্ছুত বস্তু হয়েই ছিলেন। কিন্তু রামকিঙ্কর সম্পূর্ণ হয়ে ওঠার পর আজ আর তাঁর জাতের কথা নেই, ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক ভাস্করের পরিচয়ের কাছে আজ আর তাঁর জাতপরিচয় বড় কিছু নয়। কিন্তু ভদ্রলোকের সমাজ তাদের নিজেদের গড়া ডিসকোর্সের দোহাই দিয়ে রামকিঙ্করের মতো এতো বড় একজন শিল্পী, একজন মানুষকে, একজন প্রেমিককে কী নিষ্ঠুরভাবেই না একা করে রেখেছিল। রামকিঙ্কর এ নিয়ে কোথাও কোনো উচ্চবাচ্য বা বিষাদগার করতে যাননি। হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার দেওয়ালি সংখ্যায় ১৯৭২ সালে শুদ্ধশীল বসুর নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রামকিঙ্করের জীবনে প্রেম ও কামবোধের এক দীপ্ত দীর্ঘশ্বাস পাওয়া যায়—
প্রশ্ন : শিল্পীর জীবনে প্রেমের ভূমিকা কী?
উত্তর : যে কোনো মানুষের পক্ষে এর গুরুত্ব যতটা, শিল্পীর ক্ষেত্রেও ততটাই। প্রেমের বিপক্ষে নিজেকে সংগঠিত রাখা উচিৎ। প্রেমই সব, প্রেম মহান, কিন্তু প্রেম ভয়ংকর ও সর্বনাশাও হতে পারে। 
প্রশ্ন : যৌনতায় কি তীব্র এক সৃজন শক্তি?
উত্তর : যৌনতায় সব। যৌনতা ছাড়া সব বন্ধ্যা।
কিন্তু রামকিঙ্করের জীবনে সত্যিকারের এই মোহন প্রেম, আর আশীর্বাদক কামের এক নিদারুন দরিদ্রতা রয়ে গিয়েছিল। কী গভীর নিস্তব্ধতা নিয়ে, একাকিত্বের বিরাট ভার নিয়ে চলতে হয়েছে তাকে। তবু আজ মনে হয় ধামাবতী, চন্দ্রা, খাদুবালা, আবরণ, জয়া, বিনোদিনী, রাধারাণী— এই সকল নারীদের থেকে পাওয়া কৃত্রিম বা অকৃত্রিম প্রেম, ঘৃণা, বেদনায় একটু একটু করে গড়ে তুলেছিল রামকিঙ্করকে। রামকিঙ্করের আত্মার গান হয়ে রইলো— ‘দারুণ, অকরুণ সাথে, এমন নিঠুর সাথে, আমি পিরিতি করিলাম না বুঝিয়া।’

 

এ সম্পর্কিত আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন—

রামকিঙ্কর বেইজ : প্রান্তিক জীবনের রূপকার || শরীফ আতিক-উজ-জামান

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।