সন্ধ্যা ০৬:২৪ ; বুধবার ;  ১৬ অক্টোবর, ২০১৯  

ভারতে ধরা পড়লেই জেল, তারপর পুশব্যাক বাংলাদেশে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

দীগন্ত রায়, ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশি ছিটমহল থেকে ফিরে॥

‘নিজ ভূখণ্ডের বাইরে বের হলেই জেল, আর তারপর পুশ্যবাক করে বাংলাদেশ।' এটাই এখন ভারতের অভ্যন্তরে বসবাসরত বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দাদের রোজনামচা। যারাই গ্রেফতার হন ছিটের বাইরে বের হয়ে, তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে জেল খাটার পর নিয়ে যাওয়া হয় সীমান্তে। তারপর পুশব্যাক করে পাঠানো হয় বাংলাদেশে। এভাবেই দিনহাটা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে এসে জেলে ঠাঁই হয়েছে অনেক ছিটমহলবাসীর।

১৯৬২ সালে ছিট লাগোয়া ভারতীয় ভূখণ্ডের বামনহাটে নিজের জমির ধান ভাঙতে গিয়ে গ্রেফতার হন আসগর আলী। ৬ মাস জেল খাটেন দিনহাটায়। ২০০৬ সালের ২৭ মার্চ দক্ষিণ মশালডাঙা ছিটের আমির হোসেন (৫০), জব্বর আলি(৩৬), আলু মন্ডল(২৭), আক্কাছ আলি মন্ডল (২৯) ও হাসেম শেখ স্থানীয় ভারতীয় ভূখণ্ডের নাজিরহাটের হাসপাতালের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় গ্রেফতার হন। এরপর অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করার অপরাধে প্রথমে দুই মাস পরে আবার ছয় মাস জেল খাটার পর, ফের ছিটের ভেতর থেকে একই অভিযোগে গ্রেফতার হন। এরপরই তাদের পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হলে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির প্রবল আন্দোলনে কোচবিহার জেলা প্রশাসন তাদের ছিটে নিয়ে এসে ছেড়ে দেয়।

মধ্য মশালডাঙার ৩ নম্বর ছিটের বাসিন্দা মুহম্মদ তোজ্জামেল হক। তার ছেলে রুহুল আমিন (৩০)। বাংলাদেশি হওয়ার অপরাধে ভারতে জেল খেটে এখন পুশব্যাকের কল্যাণে বাংলাদেশে। ছেলের ঘরে ফেরার আশায় চোখের পানি ফেলছেন প্রবীণ এই মানুষটি। স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ স্থানীয় ভারতীয় ভূখণ্ডের সাহেবগঞ্জের এক বিহারী ঠিকাদারের শ্রমিকদের সঙ্গে রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে যান দিল্লির গুরগাঁও'র সামসিটিতে।

২০১২ সালের ২৯ জুলাই রুহুলের সঙ্গে কাজ করতে যাওয়া ভারতীয় নাগরিক মনু শেখ (নাজিরহাট) তাকে বাংলাদেশি বলে ধরিয়ে দেন। হরিয়ানার গুরাগাঁও জেলার ৫৬ নম্বর সেকটার থানার পুলিশ তাকে ফরটিন ফরেনার্স অ্যাক্টে গ্রেফতার করে। এর অনুপ্রবেশকারী তকমা গায়ে সেঁটে রুহুল এক বছর সাতদিন গুরগাঁও জেলে সাজা খেটে মুক্তি পান গত ১০ আগস্ট। জেল থেকে বের হওয়ার পর তাকে হস্তান্তর করা হয় বিএসএফের হাতে। রাত ৩টার সময় রাজশাহী সীমান্তের কাঁটাতারের গেট খুলে দিয়ে আরও ১৪ বাংলাদেশির সঙ্গে তাকে পুশব্যাক করা হয়।

রুহুল জানান, তিনি কুড়িগ্রাম জেলার ভুরঙ্গামারী থানার দক্ষিণ বাসজানি গ্রামে ইউনুস আলির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে রুহুল বলেন, ‘আমি দেখেছি গুরগাঁও জেলে আরও ২০ জনের মতো বাংলাদেশি আছে। তাদের অনেকেরই সাজা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তারা জেলে আছেন। তারা তো একদিন বাংলাদেশে ফিরবেন। কিন্তু আমি কী আর ছিটমহলে ফিরতে পারব? এখানে ভয়ে লুকিয়ে থাকি। না জানি ভারতীয় বলে আবার না বাংলাদেশের জেলে ঢুকিয়ে দেয়। আমার স্ত্রী আর দুই সন্তান এখনও দিল্লিতে রয়েছে। তারা কীভাবে আছে তাও জানি না।’

এই ঘটনার পর ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি কোচবিহারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহন গান্ধীর কাছে তার মুক্তির দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করে। রুহুলের ছবিসহ পরিচয়পত্রও প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়, যাতে তাকে পুশব্যাক না করা হয়। কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাকে পুশব্যাকই করা হয়।

ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির শীর্ষনেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বলেন, ওই ব্যক্তি ছিটমহলের বাসিন্দা। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ আদমশুমারিতে তার বাড়ির নম্বর দেওয়া হয়েছে এইচসি/১১/৪৯। মানবিক কারণেই ছিটমহলবাসীরদের ওপর এই মামলা করা যায় না। কারণ, ভারতের ছিটমহলের বাসিন্দা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের ছিটমহলের বাসিন্দারা ভারতের ওপর ভরসা করে জীবনযাপন করেন।

/এমপি/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।