সন্ধ্যা ০৭:০৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ জুলাই, ২০১৯  

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || পঞ্চম পর্ব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

 

পূর্ব প্রকাশের পর

অন্ধকারে-আলোয়, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে, নগরে-গ্রামে, পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে কতভাবে যে আমাদের জীবন আর স্বপ্নগুলো চুরি গেছে, যাচ্ছে এবং যাবে তার হিসেব কে মেলাবে? পৃথিবী কতটা এগুলো; এ প্রশ্ন এখনও আমাকে নানাভাবে বিব্রত-বিষণ্ন করে। সভ্যতার বিপুল উৎকর্ষকালে পৃথিবীর পথে পথে এখনও যখন বিপন্ন মানুষের কাফেলা ছুটে চলে একটু আশ্রয়ের খোঁজে, খাদ্যের খোঁজে, নিরাপত্তার খোঁজে, লজ্জা পাই। জলে ভেসে বেড়ানো প্রতারিত অভিবাসী জাতিসংঘের অনুরোধের পরও যখন কোথাও ঠাঁই খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়ে মৃতের সারিতে গলা মেলায়, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে, পৃথিবী কিংবা সভ্যতা এক তিল পরিমাণ এগোয়নি। লোভ-রিরংসা-ক্ষমতা-আধিপত্য এই মানুষ আমাদের রক্তের শিরায় শিরায় মিশে আছে। সুযোগ, পরিস্থিতি ইত্যাদির বাস্তবতায় মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা থরে থরে অন্ধকারগুলো ঠিকরে বেরিয়ে এসে দখল করে নেয়, কেড়ে নেয়, অন্ধকারে-আলোয়, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে, নগরে-গ্রামে, পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে অপর মানুষের বসত, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, অধিকার। প্রান্তরে প্রান্তরে তাই মানুষের কান্না, হাহাকার কখনও থামেনি, থামছে না। ভবিষ্যতেও থামবে বলে বিশ্বাস করি না। ফলে মানুষ যেমন সভ্যতা নির্মাণ করে, ধংসও করে। মানুষ যেমন অপর মানুষের পাশে দাঁড়ায়, এই মানুষই আবার ড্রাকুলা সেজে অপর মানুষের শরীর থেকে চুষে নেয় রক্ত। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে মানুষের বিবাদ-বিরোধ রক্ত হয়েই মিশে আছে। সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রায়, মানুষের ক্রমবিবর্তনের ধারায়; রক্ত আর মানুষের দীর্ঘ-দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস অভিশাপ হয়ে যেন মিলে-মিশে আছে। এরে কিভাবে এড়াবে মানুষ? এরে কিভাবে লুকাবে মানুষ? কোথায় লুকাবে?
স্বাধীনতার সমান এই আমি জবাব খুঁজে পাই না। কেবল চোখে ভাসে দূর থেকে লাঠি হাতে অমানি অন্ধকার ঠেলে কে কেন ন্যুব্জ দেহে হাজার হাজার বছর ধরে হেঁটে চলেছেন। কিন্তু কোথায় চলেছেন কেউ কি জানে? বরিশালে কীত্তনখোলা নদীতে কুয়াশার আস্তর জড়ানো ভোরে আমাদের কাফেলা লঞ্চের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসতে থাকলে ওই একই প্রশ্ন আমাকে ফের বিষণ্ন করে। ১২ এপ্রিল বরিশাল লঞ্চঘাটে শামীম রেজার হাঁক-ডাকও আমাকে আমার ভাবনা থেকে বিরত রাখতে পারে না। পুরো বহরকে রেজা যখন লঞ্চঘাট আর কয়লা চালিত পুরানো ইস্টিমার দেখাচ্ছিলেন, জলের ভাষা ব্যাখ্যা করে বুঝাচ্ছিলেন, আমার ভিতরে তখন নদীর কান্না আরও অধিক করে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছিল। আহা গোপন; গোপনতরো হাহাকার! 
কী কারণে যেন কেবল প্রাচীন স্থাপত্য খুঁজি, জানি না। রেজা যখন বলছিলেন, আমাদের বহরের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে বরিশাল সার্কিট-হাউসে, তখন থেকেই মাথার ভিতরে ঘুরছিল প্রচীন কোনও দালানের চিত্র। কিন্তু বাস্তবে বরিশাল সার্কিট হাউসের আধুনিক নতুন ভবন দেখে কিছুটা দমে যাই। কিছু একটা খুঁজে বের করার বাসনা মুছে যেতে থাকে। লঞ্চ থেকেই আমি পিছু নিয়েছি কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের। এমন চুক্তি করে নেই দলনেতা কবি শামীম রেজার সঙ্গে, এই যাত্রায় আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয় যেন হামীমের সঙ্গে। যে কোনও কারণেই হোক, হামীমকে আমি আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম। রেজা সেটি পাশ করে নেন। সার্কিট হাউসে পৌঁছালে সবাই যখন শাওয়ারের জলে রাতের ক্লান্তি ধুয়ে নিচ্ছিলেন, রেজা তখন কবি হেনরী স্বপনের সঙ্গে সবার কক্ষ নিশ্চিত এবং সকালের নাস্তার ব্যবস্থা নিয়ে ছুটোছুটি করছিলেন। অন্যদিকে অধ্যাপক-গবেষক মুহম্মদ মুহসিনের তাড়া। কখন-কিভাবে জহর সেনমজুমদারের বসত-ভিটার উদ্দেশে রওয়ানা করা হবে তার বিস্তারিত বুঝিয়ে দিলেন রেজাকে। রেজা সেটি-ই আমাদের অবগত করলেন। কোনও এক অজানা বিরক্তি আমার ভিতর গুনগুনিয়ে উঠলে সিদ্ধান্ত নেই, এই যাত্রায় আমি কোথাও না গিয়ে সার্কিট হাউসের কক্ষে ঘুমিয়ে কাটাবো। রেজাকে অকপটে সে কথা জানালে মেনে নেন। কেন মেনে নেন জানি না। একটু পর যখন জানি; আমার বিরক্তি-সকল বহরে থাকছে না; ফের রেজাকে আবার বলি; সার্কিট হাউসে ঘুমিয়ে কাটাতে তো বরিশাল আসিনি। জহর সেনমজুমদারের বাড়িতে অবশ্যই যাবো। রেজা বিস্ময়ে আমার দ্রুত পাল্টানো এসব সিদ্ধান্ত প্রশ্নহীন মেনে নিচ্ছিলেন। ভিতরে হয়তো বিরক্ত হচ্ছিলেন; কিন্তু অবয়বে সেসব আমি দেখতে পাইনি। সার্কিট হাউসের পাশেই একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁয় সকালের নাস্তা শেষে ফিরে এলে গাড়ি নিয়ে হাজির অধ্যাপক মুহম্মদ মুহসিন। 
আমি দৃষ্টি রাখছিলাম চারজন মানুষের উপর। রবিশংকর বল, জহর সেনমজুমদার, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী আর মোস্তফা তারিকুল আহসানের উপর। রবিশংকর বল শান্ত-স্থীরভাবে এদিক-ওদিক পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার চোখ দুটিকে জহুরির চোখ বলেই প্রথম থেকে আমার মনে হয়েছে। এমনভাবে তাকান, পৃথিবীর কোন কিছু ফসকে যাবার উপায় নেই। আর কি এক গোপন অস্থিরতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলো জহর সেনমজুমদারকে তাও টের পাচ্ছিলাম। বার বার স্থান পরিবর্তন করতে করতে তার মুখে একটি শব্দই উচ্চারিত হচ্ছিলো—কাগা...! সব কিছু থেকে বিযুক্ত হতে চাইলেই আমি তাকাচ্ছিলাম রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী আর মোস্তফা তারিকুল আহসানের দিকে। সদাহাস্য এই মানুষ দুটির দিকে তাকালে মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। দুজনই অধ্যাপক হলেও লেশমাত্র তার ছায়া দেখিনি।

দুই.

ইস্টিমার

মুহম্মদ মুহসিন এ যাত্রার নেতৃত্ব নিলেন। বরিশাল শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার শোলক গ্রামে ঐতিহ্যবাহী সেনমজুমদার পরিবারের খোঁজে আমাদের গাড়ি যখন এগুচ্ছিলো পথে পথে মুহসিন এবং রেজা ঐতিহাসিক আরও অনেক স্থানের কথা বিস্তারিত বলে যাচ্ছিলেন আমাদের। যাকে ঘিরে আমাদের এই শোলক-সন্ধান, সেই জহর সেনমজুমদার অনেকটাই চুপ। মুখে ম্লান হাসির রেখা জড়িয়ে থাকলেও কোথাও এক বিষণ্নতা ঘুরে-ফিরে আঁকড়ে ধরছিলো তাকে। এই পরিস্থিতি কাটাতে কিছুটা সহায়ক ভূমিকা রাখেন রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, মোস্তফা তারিকুল আহসান এবং কবি ও কথাসাহিত্যিক শাহনাজ নাসরিন। নাসরিন আপার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান পুরো পরিবেশকে পাল্টে দেয়। আর কবি শামীম রেজা এক কথায় অসাধারণ। গানে-গল্পে-রসে আলোচনায় পুরো বহরকে মাতিয়ে রাখেন। অন্যদিকে ছায়ার মতো সার্বক্ষণিক জহর সেনমজুমদারকে আগলে রাখছিলেন জাহিদ সোহাগ। সোহাগ না থাকলে আমাদের কাগাকে সামলানো অতো সহজ ব্যাপার ছিল না। উপরে যতটা স্থির; ভিতরে ততটাই অস্থির এই মানুষটা সার্বক্ষণিক সৃষ্টিশীল।
বরিশাল মানে জীবনানন্দ দাশ। শহরের সড়কগুলো যখন পার হচ্ছিলো আমাদের গাড়ি, বার বার মনে পড়েছে; এই পথে জীবনানন্দ হেঁটেছেন। এই পথের ধুলোয় মিশে আছে জীবনানন্দের পায়ের চিহ্ন। এই শহরের হাওয়ায় নিশ্চয়ই এখনও খেলা করে জীবনানন্দের শ্বাস-প্রশ্বাস। আর বরিশাল থেকে শোলক গ্রামে যেতে কতো মহান ব্যক্তিদের স্মৃতিচিহ্ন ছুঁয়ে গেলাম আমরা! কবি মুকুন্দ দাশের কালিমন্দির, ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত এবং অশ্বিনিকুমার দত্তের বাড়ি। প্রকৃতির অপূর্ব সুন্দর ‘সন্ধ্যা’ এবং ‘দোয়ারিকা’ নদী। বস্তুত বরিশালের ভাঁজে ভাঁজে প্রকৃতির অপার রহস্য যেমন গেঁথে আছে, মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে সৃষ্টিশীলতাও। এত এত কবি এবং কথাসাহিত্যিকের জন্মস্থান এই বরিশাল, বিস্ময়ে হাত জোড় করি। বিস্ময়ে প্রণাম জানাই।
মুহসিন ভাই বলছিলেন পথে গাড়িতে আরেকজন উঠবেন সঠিকভাবে আমাদের শোলক গ্রামে নিয়ে যেতে। তিনি মুহসিন ভাইয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। অত সহজেতো জহর সেনমজুমদারের বাড়ি খুঁজে বের করা যায়নি! এর জন্য মুহসিন ভাইকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বহুলোকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে। কথা বলতে হয়েছে। তবেই খুঁজে পাওয়া গেছে জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির সন্ধান।
আবু সাঈদ গাড়িতে উঠে এলেন ডাবের পানি নিয়ে। এই ডাবের পানি তিনি বয়ে এনেছেন জহর সেনমজুমদারের জন্য। কোথায় কিভাবে যেতে হবে মুহসিন ভাইয়ের নির্দেশে সাঈদ বার বার ফোন করে জেনে নিচ্ছিলেন। জানা গেলো গত শতাব্দীতে জহর সেনমজুমদারের পরিবারের নির্মাণ করা শোলক ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক সরদার মোজাম্মেল হোসেন সাঈদের পিতা। এই শোলক গ্রাম খুঁজে বের করতে কার্তিক চন্দ্র দাসও মুহম্মদ মুহসিনকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি শোলকের বিশিষ্টজন, জহর সেনমজুমদার পরিবারের স্মৃতিবহন করে চলা মানুষ। 

তিন.

বরিশালে একটা বিষয় খুব করে নজরে পড়লো। অজপাড়াগাঁয়ের সড়কগুলোও পরিপাটি করে পাকা। কথা বলে জানা গেলো, এসবই আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর অবদান। আঁকাবাঁকা সড়ক পার হয়ে এক সময় আমরা পৌঁছে যাই শোলক গ্রামে। শুধু জহর সেনমজুমদারই নন, বহরের কারোরই ধারণায় ছিল না কী বিস্ময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। আমাদের গাড়ি স্কুলের বাইরে যেখানে থামে সেখানে এগিয়ে এলেন অসংখ্য মানুষ। এরা সবাই শোলক গ্রামের বিশিষ্টজন এবং শোলক ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলের শিক্ষক। রীতিমতো রাজকীয় কায়দায় তারা গ্রহণ করে নিলেন জহর সেনমজুমদারকে। ৫৫ বছর পর যে মানুষটি তার ছেড়ে যাওয়া পুর্বপুরুষের সন্ধানে ছুটে এলেন শোলক গ্রামে তারও জানা ছিলো না কত ভালোবাসা তার জন্য অপেক্ষা করছে। জহর সেনমজুমদারের জন্ম বরিশালে নয়। তার পূর্বপুরুষদের আবাস এই শোলক গ্রাম। এই শোলক গ্রামের ধুলোয় মিশে আছে জহর সেনমজুমদারের পিতামহ হরশঙ্কর সেনমজুমদারের দেহের চিহ্ন। আর পিতা জগদীশ সেন একদিন রাতের আঁধারে পবিত্রগ্রন্থ কোরআন শরীফ এবং মনসামঙ্গল কাব্য বুকে জড়িয়ে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন এই শোলক গ্রাম। এই গ্রন্থ দুটি জগদীশ সেনের কাছে মহানগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত ছিল। সেই স্মৃতি বহন করে চলেছেন জহর সেনমজুমদারও। বার বার তার কথায় সে স্মৃতি প্রকাশিত হচ্ছিল। 

চার.

স্কুলের আঙ্গিনায় প্রবেশ করতেই আমাদের বহরের সকলের ঘোর আরও বেড়ে যায়। হাজার দেড়েক ছেলে-মেয়ে স্কুলের পুরো আঙ্গিনা জুড়ে

স্থানীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে জহর সেনমজুমদার ও রবিশংকর বল

সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে বরণ করে নিল জহর সেনমজুমদারকে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। স্কুলের মাইকে বার বার ঘোষণা করা হচ্ছিলো জহর সেনমজুমদারের নাম। সঙ্গে অভিনন্দন জানানো হচ্ছিলো আমাদের বহরকেও। কখনো ভাবেননি তিনি এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা তার জন্য অপেক্ষা করছিলো। শোলক গ্রামবাসী এবং শোলক ভিক্টোরিয়া স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা প্রাণ উজাড় করে তাদের ভালোবাসা জানালেন জহর সেনমজুমদারকে। এমন দৃশ্যে আমাদের বহরের অনেকের চোখে আনন্দ অশ্রু। রবিশংকর বল এবং শামীম রেজা সে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। আর শোলকের রাজপুত্র কবি-গবেষক-অধ্যাপক জহর সেনমজুমদার সমস্ত চেষ্টা দিয়ে সংবরণ করছিলেন তার আবেগ। তিনি যেন এমন প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসায় বাকরহিত হয়ে পড়ছিলেন। 
পূর্বপুরুষদের কাছে যে শোলক গ্রামের কথা শুনে আসছিলেন গত ৫৫ বছর, সেসব তার কাছে ছিল নিতান্তই যেন গল্প। কিন্তু বাস্তবে দেখলেন গল্পের অধিক গল্প। প্রত্যক্ষ করলেন পূর্বপুরুষদের বলা কথার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। মুহূর্মুহূ করতালির মধ্যে শোলকের জমিদারপুত্রকে নিয়ে যাওয়া হলো স্কুলের হল রুমে। সেখানে সংবর্ধনার আয়োজন। হলভর্তি স্কুলের শিক্ষার্থী এবং গ্রামের বিশিষ্ট জনরা সেদিন যে ভালোবাসা দেখালেন জহর সেনমজুমদারের প্রতি তা সচরাচর দেখা যায় না। এর নেপথ্য ভূমিকায় কাজ করেছেন অধ্যাপক মুহম্মদ মুহসিন। শোলকের জমিদারপুত্র প্রকৃতই যে জমিদারপুত্র তা বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলের শোলক গ্রামে না পৌঁছালে কোনদিনই জানা হত না জহর সেনমজুমদারের। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে অনবরত ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন কবি শামীম রেজা। এভাবে আরো আরো কতো প্রখ্যাত লেখকদের তিনি বাংলাদেশে ছেড়ে যাওয়া তাদের পূর্বপুরুষদের ভিটের সন্ধান দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। 
আগেই বলেছি, জহর সেনমজুমদার উপরে যতটা স্থির ভিতরে ততটাই ক্ষরণে বিক্ষত। তার কবিতার ছত্রে ছত্রে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। বরিশাল। এই ভূ-খণ্ডের জল-হাওয়া-ঐতিহ্য। তার ‘ভবচক্র : ভাঙাসন্ধ্যাকালে’ কাব্যগ্রন্থের পরতে পরতে সেসব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

পড়ে আছে ভাইবন্ধু; ছলাৎছল ছলাৎছল; পুরুষাঙ্গ কেন নিলে ছিঁড়ে?
আমাদেরও কৃষি আছে; আমাদেরও জমি আছে; পৃথিবীর ধানসিড়িতীরে;
হেয়ালির ভোরবেলা, হেঁয়ালির সন্ধ্যাবেলা, কোলাহল করে বেশি কেতু বৃষ মেষ
দুঃখ জ্বালা যন্ত্রণা প্রতিদিন বেড়ে যায়, শেষ হয়েও কোনোদিন হইলো না শেষ
পড়ে আছে ভাইবন্ধু; হুক্কাহুয়া হুক্কাহুয়া; শূন্য ঝাঁপি করে ঘেউ ঘেউ
তোমারে চিনেছি আমি, স্থলপথে জলপথে, চিনিয়াছে আরো কেউ কেউ

সন্ধ্যাবেলা #ভবচক্র :ভাঙাসন্ধ্যাকালে     

(চলবে)                  

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন:

 জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || চতুর্থ পর্ব

 জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || তৃতীয় পর্ব

 জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || দ্বিতীয় পর্ব

 জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || প্রথম পর্ব

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।