সকাল ০৮:১০ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৪ নভেম্বর, ২০১৯  

ধর্ষণ ক্রমে অপ্রতিরোধ্য: প্রতিরোধে নেই কর্মসূচি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম॥

মাদারীপুরের শিবচরে গত রবিবার রাতে ধর্ষণের শিকার হয় এক ভ্যানচালকের শিশুসন্তান। প্রথম শ্রেণির ছাত্রী সে। বাসায় ঢুকে তাকে ধর্ষণ করে একই এলাকার ২৮ বছর বয়সী শওকত। মেয়েটির চিৎকারে পরিবারের সদস্যরা ও এলাকাবাসী এগিয়ে এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আশপাশের মানুষজন ধর্ষককে আটকও করে। কিন্তু সহযোগীরা হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যায় শওকতকে।

দেশে হঠাৎ ধর্ষণের ভয়াবহতা বেড়েছে। বেড়েছে প্রতিশোধ হিসেবে ধর্ষণের ভয়াবহ ব্যবহারও। ধর্ষণের চিত্র মুঠোফোনে ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়ানো, হুমকি ধামকির শিকার হচ্ছে চারবছরের শিশুসহ চল্লিশোর্ধ নারীও।

সমাজবিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাড়ে ধর্ষণ। কঠোরভাবে সামাজিক ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে তাদের শঙ্কা। দৃশ্যত গত একবছরে ধর্ষণের প্রতিরোধে কার্যকর কোনও আন্দোলন কর্মসূচিও দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, ২০১৫ সালের শুধু ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে মোট ৩৩৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৬৩টি। এরমধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১২ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৮ নারীকে। এ ছাড়া গত জানুয়ারিতে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৫৫টি। ধর্ষণের ঘটনা ৫৫টি। আর গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯ জন নারী।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিন হাজার ৯২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন পত্রিকা, মামলা ও অভিযোগের ভিত্তিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র নিবন্ধিত তথ্য বলছে, গতবছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার ৪৫৫ জন। শিশু ধর্ষণ ১৩৫টি।

বিভিন্ন পত্রিকা, মামলা ও অভিযোগের ভিত্তিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রে নিবন্ধিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার ৪৫৫ জন। শিশু ধর্ষণ ১৩৫। এর মধ্যে ৬ বছরের নিচে রয়েছে ২৩, ১২ বছরের নিচে ৭১ জন, গণধর্ষণের শিকার ১৬৬ জন। ধর্ষণের শিকার হয়ে লজ্জায় আত্মহত্যা করেছে ১১ জন। এছাড়া ৬ বছরের নিচে শিশুসহ ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭২ জনকে।

গত একমাসে ঢাকা এবং ঢাকার আশেপাশে বেশকিছু জায়গায় কমপক্ষে ১৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যাকে ভয়াবহ উল্লেখ করে নারীনেত্রী খুশি কবীর বলেন, আমাদের সমাজে যে অস্থিরতা চলছে সেই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ধর্ষণকে হাতিয়ার করছে। আইন যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ না করা হয়, যদি ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি বিচার না পান সেক্ষেত্রে ধর্ষণ কমবে না।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সমন্বয়কারী চিকিৎসক বিলকিস বেগম বলেন, মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বেশিরভাগ মামলা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রূপ নেয় না। ধর্ষণের সাক্ষ্যগ্রহণ পদ্ধতির কারণেও অনেকে মামলায় জড়াতে চায় না। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, ভয়ভীতির মধ্যেই অভিভাবক এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ধর্ষণ সবসময়ই ভয়াবহ তবে বর্তমানে সংখ্যার দিক দিয়ে তা আগের তুলনায় হঠাৎ বেড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ধর্ষণ হঠাৎ বেড়ে গেছে। ইদানিং পত্রিকা খুললে ধর্ষণের সংবাদ দেখি। ধর্ষণ প্রতিরোধ বিষয়ে তিনি বলেন, ধর্ষণ নিয়ে কথা বলা জরুরি এবং একইসাথে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে ধর্ষণ প্রতিরোধে লাগাতার কর্মসূচিও জরুরি।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি প্রধান সালমা আলী বলেন ধর্ষণ আগেও ছিল এখনও আছে। আগে গণমাধ্যমে প্রকাশ কম হতো। এখন বেশি হচ্ছে। লুকানোর প্রবণতা থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক হিসাবটা পাচ্ছি না। তিনি বলেন, কেন জানি না এতো বেশি ধর্ষণের ঘটনাও পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। এখনকার এই যুগেও মামলা নিতে অস্বীকার করে তারা।

ধর্ষণ প্রতিরোধে আন্দোলন কর্মসূচি নেই স্বীকার করে সালমা আলী বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে, তবে আলাদা করে ধর্ষণকে উল্লেখ করে কোনও কার্যকর কর্মসূচি নেই।
 

/ইউআই/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।