বিকাল ০৫:৪৬ ; বুধবার ;  ১৬ অক্টোবর, ২০১৯  

নদী ভাঙনে জমি হারাচ্ছে ছিটমহল বাত্রিগাছের বাসিন্দারা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

দিগন্ত রায়,ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশি ছিটমহল থেকে ফিরে

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের জেলা কোচবিহারের দিনহাটা শহর থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে বড় শৌলমারী গ্রাম পঞ্চায়েতের পাশে বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার অন্তর্গত বাত্রিগাছ ছিটমহল। এর আয়তন ৫৭৭ দশমিক৩৭ একর। মোটরবাইকে সওয়ার হয়ে মাত্র ৩০ মিনিট গেলে চারদিকে ভারত ঘেরা বাংলাদেশি এই ভূখণ্ড।

অতীতে এই ছিটের মালিক ছিলেন রংপুর রাজার জোতদার অমিয়বালা চৌধুরানী। এই ছিটের বাসিন্দারা মূলত কৃষিজীবী। তিন ফসলি জমি। চাষ হয় ধান, পাট আর তামাক। মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন। অনেকেই কাজের খোঁজে চলে যাচ্ছেন কলকাতা, দিল্লি আর মুম্বাইতে। এই শহরগুলোতে রাজমিস্ত্রির কাজের জন্য ছিটের বাইরের শ্রমিকদের সঙ্গে নিজের পরিচয় গোপন করে, ভারতীয় ভূখণ্ডের ভুয়া ঠিকানা দিয়ে তারা চলে যাচ্ছেন বেঁচে থাকার তাগিদে। ছিটের একপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সিঙ্গিমারী নদী। ভারতের অভ্যন্তরের তিস্তা নদী থেকে বয়ে আসছে এই নদীটি। নেই বিদ্যুৎ, নেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, নেই স্কুল। এই ছিটের ভেতরেই আবার ভারতের ছিটমহল ‘ছিট মদনা কুড়া’। এই ছিটে বসবাস করেন সাড়ে তিনশোটি পরিবার।

ছিটের বাসিন্দা নজরুল হোসেন ব্যাপারী জানালেন,‘তাদের ভারতের রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড সবই আছে। ইন্দিরা আবাস কর্মসূচিতে এখানে অনেকই সরকারি সাহায্যে পাকা ঘর বানিয়েছেন।’ ভারতীয় ছিটের এই বাসিন্দাদের কোনও সমস্যা নেই। এই ছিটে আছে একটি সরকারি প্রাথমিক স্কুল ‘বানী নিকেতন শিশু শিক্ষা মন্দির’। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৫ জন। শিক্ষিকা আছেন ২জন। বাত্রিগাছ ছিটের ওপর দিয়ে এই ছিটে এসেছে বিদ্যুতের তার। ‘আমাদের জমি ওপর পোল বসিয়ে দিয়ে তার টেনে নিয়ে ওদের আলো জ্বলে। আমরা থাকি অন্ধকারে’-বললেন ছিটের বাসিন্দা আবু হোসেন। কাঠ চেরাই কল চালান ছিটের সীমানায়। হতাশ আবু বলেন, ‘ওই যে স্কুল দেখলেন, ওখানে আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়তে পারে না। ভর্তি হতে গেলে পরিচয়পত্র চায়। অথচ, ওরা আমাদের রাস্তা ব্যবহার না করলে ইন্ডিয়াতে যেতে পারবে না।’

ছিটের প্রবীন বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঠিক আগে ১৯৭০ সালে ২৬ ডিসেম্বর রাতে এই ছিটের বাসিন্দাদের তাড়ানোর জন্য আগুন দিয়ে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কেটে নেওয়া হয় জমির ফসল। ভয়ে বাসিন্দারা পালিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে আশ্রয় নেন। এই ঘটনায় জীবন্ত পুড়ে মারা যান বাংড় মিঞা ও ছালেহা খাতুন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পালিয়ে যাওয়ারা আবারও ফিরে আসেন ছিটে। কিন্তু এখন তো কাঁটাতারের বেড়া। যদি আবার এই ঘটনা ঘটে তাহলে কী হবে? এই আতঙ্ক নিয়েই তারা এখন দিন কাটাচ্ছেন।

এই ছিটমহলের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন নদী ভাঙনের। সিঙ্গিমারি নদী প্রতিদিন একটু একটু করে এই ছিটের জমিকে গ্রাস করছে। বদলে যাচ্ছে জমির মানচিত্র। ভাঙনের কবলে পরে ৪০০ একর জমি ইতিমধ্যেই নদী গর্ভে, যা এই ছিটমহলের সমগ্র আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ। গত কয়েক বছরে চলে গেছে চাষের জমি, বসত ভিটা আর ছিটের একমাত্র মসজিদটি। এই নদীটির ভারতীয় অংশে ভাঙন রোধে বোল্ডার ফেলে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, বাংলাদেশি অংশ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। এর ফলে ৩০০টি পরিবার তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। ছিটের বাইরে ভারতীয় ভূখণ্ডে অন্যের পরিচয়ে দ্বিগুণ দামে জমি কিনে বাসস্থান বানিয়েছেন। জমির মালিকানা না পেয়েও তারা ভারতীয় ভূখণ্ডের জমির দালালদের হাতে সব জেনেশুনেও জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এইভাবেই বদলে যাচ্ছে ছিটের মানচিত্র আর জনসংখ্যার বিন্যাস।

/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।