দুপুর ০৩:২৬ ; সোমবার ;  ২০ মে, ২০১৯  

অতিরিক্ত উৎপাদনে ঝুঁকিতে বিবিয়ানা, ব্ল্যাকআউটের আশঙ্কা!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আমিনুর রহমান রাসেল ও আসিফ ইসলাম॥

দেশের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহকৃত গ্যাসের সিংহভাগই আসে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় গ্যাস উত্তোলনের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। দ্রুত নিঃশেষ হওয়ার দিকে যাচ্ছে গ্যাসক্ষেত্রটি। আর এতে কোনও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেই গ্যাসের ব্ল্যাকআউটে পড়তে পারে গোটা দেশ।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ১২ নম্বর ব্লকে অবস্থিত গ্যাসক্ষেত্রটি পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শেভরন করপোরেশন।

এখন বিবিয়ানায় গ্যাসের গড় চাপ ১০৫০ পিএসআই (পাউন্ড প্রতি বর্গ ইঞ্চি) থেকে ১৪০০ পিএসআই এর মধ্যে। কিন্তু চালু হওয়ার সময় এই গ্যাসক্ষেত্রের গড় চাপ ছিল তিন হাজার পিএসআই।

বিশেষজ্ঞরা জানান, অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে গ্যাসক্ষেত্রটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এটি অকালেই নিঃশেষিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যেমনটা ঘটেছিল সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শেভরনের গ্যাস উত্তোলন সংক্রান্ত চুক্তি বা প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) অনুযায়ী, এক বছরে একটি কোম্পানি গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাব্য মোট মজুদের ৭.৫ শতাংশের বেশি উত্তোলন করতে পারবে না। সাধারণত ৬.৫ শতাংশ উত্তোলন করা উচিত এবং সবাই তা-ই করে থাকে। ৭.৫ শতাংশের বেশি উত্তোলন করলে ওই ক্ষেত্রটি ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়।

তথ্য অনুযায়ী বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে এখন ৩.৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুদ আছে। সেই অনুযায়ী সেখান থেকে কোনও অবস্থাতেই বার্ষিক উত্তোলন ২৬১ বিলিয়ন কিউবিক ফুট (বিসিএফ), দিনে ৭১৫ মিলিয়ন কিউবিক ফুট (এমএমসিএফডি) অতিক্রম করা উচিত নয়।

কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শেভরন জানায়, প্রতিদিন তারা এক হাজার ২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্তোলন করবে। তবে মাঝেমধ্যে উত্তোলনের পরিমাণ এর চেয়েও বেড়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, শেভরন যদি বর্তমান হারে গ্যাস উত্তোলন করতে থাকে তবে এ বছর তারা চুক্তি নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় ৬০.৫৩ শতাংশ বেশি গ্যাস উত্তোলন করবে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা শেভরনকে প্রতিদিন এক হাজার ২০০ এমএমসিএফডির বেশি গ্যাস উত্তোলনে নিষেধ করেছি। তবে এরপরও তারা নির্দেশ মানছে না।'

তিনি আরও বলেন, “বিবিয়ানায় ‌কোনও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে পুরো দেশে গ্যাসের 'ব্ল্যাক আউট' তৈরি হবে। তাই শেভরনকে অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন বন্ধে বাধ্য করা উচিত।”

এদিকে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর জন্য বিবিয়ানায় একটি কম্প্রেসার কেন্দ্র স্থাপনে পেট্রোবাংলাকে তাগিদ দিচ্ছে শেভরন। তারা দাবি করছে কম্প্রেসার স্থাপন করলে বিবিয়ানার আয়ুষ্কাল বেড়ে যাবে।

পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, 'বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, 'আমি মনে করি বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্র থেকে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে গ্যাস উত্তোলিত হচ্ছে। ফলে ক্ষেত্রটির ওপর বেশি চাপ পড়ে যাওয়ায় তার প্রাকৃতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আরেকটি সাঙ্গু পরিস্থিতির দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।'

গ্যাস নিয়ে দেশ ইতোমধ্যেই সংকটময় পরিস্থিতিতে আছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৮ সাল থেকে বিবিয়ানাসহ দেশের অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রে সরবরাহ কমে যাবে। অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, গত পাঁচ মাসে শেভরন গ্যাস উত্তোলনের হার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ৩৫০ এমএমসিএফডি বাড়িয়েছে। বেশি গ্যাস উত্তোলনের জন্য তারা তাদের প্রতিবেদনেও পরিবর্তন এনেছে।

শেভরনের ২০০০ সালে দাখিলকৃত প্রথম মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জানিয়েছিলো, বিবিয়ানায় ২.৪ টিসিএফের বেশি মজুদ রয়েছে। ২০০৮ সালে এসে তারা আরেকটি পুনঃমূল্যায়ন প্রতিবেদনে জানায় গ্যাসের মজুদ রয়েছে ৫.৭ টিসিএফের বেশি।

সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে শেভরন আরও জানায়, চলতি বছরের শেষের দিকে তারা গ্যাস সরবরাহ এক হাজার ২৫০ এমএমসিএফডি থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি করতে পারবে।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে বিবিয়ানার গ্যাসের সঙ্গে বালু আসা শুরু হয়েছে।

এছাড়া গত বছরের শেষের দিকে ও চলতি বছরের শুরুর দিকে চারবার গ্যাস উত্তোলনে বিঘ্ন ঘটেছে।

শেভরন বাংলাদেশের কমিউনিকেশন ম্যানেজার শেখ জাহিদুর রহমান গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উত্তোলনে বিঘ্ন ঘটার বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার সঙ্গে উত্তোলন বন্ধ হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, 'পিএসসি ও আমাদের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী জনসম্মুখে আমরা গ্যাসের মজুদ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানাতে পারি না।'

উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনাকারী কেয়ার্ন এনার্জিও একই কাজ করেছিল। তারাও গ্যাসের মজুদ এক টিসিএফ বেড়ে যাওয়ার কথা বলে ১৯৯৯ সালে দৈনিক উত্তোলনের হার ৬০ এমএমসিএফডি থেকে বাড়িয়ে ২০০২ সালে ২২০ এমএমসিএফডি করেছিল। ফলে ২০১৩ সালে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় দেশের প্রথম সমুদ্র তীরবর্তী ওই গ্যাসক্ষেত্র।

/এসএ/এফএস/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।