সন্ধ্যা ০৭:০৩ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ জুলাই, ২০১৯  

আয়েশাকে হারিয়ে || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন || পর্ব-৩

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

পূর্ব প্রকাশের পর

এ কথা বললে অবশ্য মিথ্যা হবে যে, আমি তখনো কল্পনায় আয়েশাকে বন্ধুর চেয়ে ঘনিষ্ঠ কোনো রূপে ভাবিনি। ওর দেহ-সৌন্দর্যের প্রতি আমার একটু আকর্ষণও তখন তৈরি হয়েছে। ওর আচরণের বিশেষ কিছু ঘটনা তখন আমি ভালোবাসার চেয়েও বেশি উপভোগ করি। যেমন, মায়ের কাছে নির্দোষ কোনো মিথ্যা কথা বলার সময় ওর হাতের চুড়ি বা বালাটাকে ঘুরানো, প্লেটে খাবার কাটার সময় ছুরির পরিবর্তে কাঁটা চামচের ব্যবহার ইত্যাদি। নববর্ষের ঐ কাহিনির আগ পর্যন্ত আমার মনেই হত আয়েশা আমার, যদিও এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কোনো কথা বিনিময় তখনো ছিল না। আমি ভাবতাম এ কথা বলার জন্য অফুরন্ত সময় আমার হাতে। কিন্তু আমার সেই ভাবনা ধাক্কা খেল। আমি আশঙ্কিত বোধ করলাম। 
রাকিব বলল- ‘আগেই বলেছিলাম। অত বকবক আর বকবক করতে নেই। কেউ একজন এসে তোমার সোগা মারা দিয়ে তাকে নিয়ে যাবে আর তুমি তাকিয়ে থাকবে।’ রাকিব— জীবনে যার কোনো একটি রুচিশীল মেয়ের সাথে বলতে গেলে— কখনো কথা বলার সৌভাগ্য হয়নি, সেও তখন আমাকে উপদেশ দেয়।
‘বসে বসে ঝিমাইয়ো না। কিছু একটা কর। যাও, ওর সাথে গিয়ে কথা বল। সাথে কিছু ফুল নিয়ে যাও। আমি একটি ক্যাসেট বানিয়ে দেই, সেটা নাও। ফুল, ক্যাসেট আর সাথে ছোট্ট একটি চিঠি। চিঠিটা লেখার ক্ষেত্রেও আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। কাগজটা কিন্তু সুগন্ধিমাখা হতে হবে। আমি জানি এই কাগজ কোথায় পাওয়া যায়।’ উপদেশ শুরু করলে রাকিবের আর ক্ষান্তি থাকে না। আমি এসব উপদেশ যতটা পারি এপ্রিশিয়েট করি কিন্তু আমার মধ্য দিয়ে তার এই রোমান্সকে আমি বাস্তবায়িত হতে দেই না। 
নববর্ষের অনুষ্ঠান গেল দুসপ্তাহ প্রায়। ঐ রাতের পর থেকে আয়েশার সাথে আমার আর দেখা নেই। ও আমাকে আর ডাকেনি। অবশ্য ও যে আমাকে মাঝে মাঝেই ডাকত তাও না। আমাদের মাঝে টেলিফোনেও যে খুব একটা কথা হত তাও না। টেলিফোন বস্তুটার প্রতি আমার একধরনের অন্তর্গত অস্বস্তি ছিল যা আয়েশাও জানত এবং সমীহ করত। আয়েশার মতো এত কাটাকাটা কথা বলার মানুষটি এতদিন সব কথা কেটে বসে থাকবে আমি ভাবতে পারছিলাম না। মনে হল এই নিরবতার অর্থ আছে। কিন্তু কী সেই অর্থ? রাকিবের সাথে সে সম্ভাব্য অর্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখলাম সব অর্থ খুব উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বন্ধ করলাম সে বিশ্লেষণ এবং বন্ধ করলাম রাকিবের সাথে এ নিয়ে কথা বলাও। কিন্তু আর স্থির থাকতে না পেরে এক সকালে রওয়ানা হলাম ওর বাসার দিকে।
ওদের ড্রাইভার গেট খুলল। বাড়ির ভিতরে আমি যথেষ্ট পরিচিত, ফলে আমাকে কারোর এগিয়ে নেয়ার দরকার ছিল না। বৈঠকখানায় ঢুকে দেখলাম আয়েশা সোফায় শোয়া। গায়ে একটি মখমলের সোয়েটার। বুকের ওপর ম্যালোরি টাওয়ারস সিরিজের চতুর্থ বইটি। এই শিশুকাহিনির সিরিজ নিয়ে পড়ে থাকার মধ্য থেকেই আমি ওর মনের অবস্থাটি বুঝলাম। ক্লান্তি বা মন খারাপের সময় আয়েশা এই রাজ্যেই ঢুকে পড়ে। নববর্ষের আগেই গত বছর ও আমাকে এই পুরো সিরিজটা পড়িয়েছিল। ও বলেছিল এটি না পড়লে ওর চরিত্রটিই আমি বুঝব না। পড়া শেষে আমি ওরে জিগ্যেস করেছিলাম- ‘এর ভিতরের কোন চরিত্রটি তুমি’। ‘দারেল, এ্যালিসিয়া, সেলি- এদের যেকোনো কারো রূপে তুমি আমাকে ভাবতে পারো। এমনকি ম্যারি-লু অথবা আইরিনের সাথেও তুমি আমাকে মিলাতে পারো। তবে কখনোই আমি গুয়েনদোলিন অথবা বিল নই। আমি এদের কোন চরিত্রটি তা অনেকটা নির্ভর করে আমার দিনটা কেমন যাচ্ছে তার ওপর।’- আয়েশা বলল।
আমি আয়েশার পায়ের কাছে সোফায় বসতে বসতে জিগ্যেস করলাম, ‘আজকে আমরা কোন চরিত্র?’
আয়েশা উঠে বসল কিন্তু কিছু বলল না। জানালা থেকে বাতাস আসছিল এবং একটি সাদা পাতলা পর্দা পতপত শব্দে উড়ছিল। ও আবার বই পড়ায় মন দিল। তবে বোঝা যাচ্ছিল এই পড়া আমার উপস্থিতিকে উপেক্ষা করার জন্য নয়, এই পড়া বরং এই বলার জন্য যে, তোমাকে সাথে নিয়ে পড়তে পারলে এই পড়া আমার আরো আনন্দের হত। আমার আনন্দ হচ্ছিল যে, আমি ওর পাশেই বসে আছি। দেখছিলাম শীতের সাদা আলো বাতাসে ফুলে ওঠা পর্দার সাথে খেলা করছিল।
আয়েশা শেষ পর্যন্ত বই বন্ধ করল এবং আমার দিকে তাকিয়ে বলল ‘তুমি এমন একটা আজব মানুষ!’
আমি বললাম ‘আমি আজবটা অবশ্যই চেষ্টা করে হইনি’। ও একটু হাসল। 
আমি জানতাম আমরা বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু হতে যাচ্ছি। তবে ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই সম্পর্কের স্বীকৃতি আমি দাবি করলাম না। আমি আবারও সময় নিলাম। আমি সময় ও ভাগ্যের ওপর আবারও সবকিছু ছেড়ে দিলাম। আমার এই ধৈর্য কিংবা নির্লিপ্ততা রাকিবের কাছে অসহ্য লাগল। রাকিব ক্ষিপ্তভাবে বলল: তুই একটা ছাগল। তুই আসলে আয়েশার যোগ্যই না। তুই কোনো মেয়ের সান্নিধ্যেরই যোগ্য না। প্রেমের নামে এমন যন্ত্রণাই তোর প্রাপ্য। বেচারা রাকিব অবশ্য রোমান্টিক লাইনে কোনো ঘটনা নিজের জীবনে ঘটাতে পারছিল না বলেও যথেষ্ট হতাশায় ভুগছিল। আমার সে তুলনায় ভালই যাচ্ছিল। আমার খুব ভাল লাগছিল, উদ্দীপিত বোধ হচ্ছিল। আমি অনুভব করছিলাম আয়েশার সাথে অন্তরঙ্গতার এক নতুন স্তরে আমি পদার্পণ করছি। 
আয়েশা এখন আমার দিকে তাকালে আমি অনুভব করি সে তাকানোয় এক উষ্ণতা রয়েছে যা এর আগে আমি দেখিনি। এই মুহূর্তে এটিই ছিল আমার সম্পর্কের স্বীকৃতি। আমার জন্মদিনে ও আমাকে অনেক পুরনো সুন্দর গাড়ির মডেলের একটি ম্যাচবক্স উপহার দিয়ে বলল, ‘একদিন এর সত্যিকারের একটি আমি তোমাকে উপহার দেব’।
আমি বললাম ‘ততদিনে ড্রাইভিংটাও হয়তো আমার শেখা হয়ে যাবে’।
‘গাড়ি থাকার জন্য ড্রাইভিং শেখা শর্ত নয়’- ও বলল।
এক সপ্তাহ পরে আমরা একত্রে ছাদে উঠছিলাম। আমি ওর কাঁধটায় আলতো করে হাত রাখলাম। ও থামল, ঘুরল এবং হঠাৎ করেই দুহাতে আগলে আমার ঠোঁটের ওপর জোরে এক চুম্বন কেটে ফেলল। তারপর উপরে উঠতে উঠতে বলল, ‘তুমি একটু হাদাই আছ। নয় এতদিন কেউ অপেক্ষা করে?’ 

এর পরের সময়টা ছিল স্নায়ু কাঁপিয়ে দেয়ার মতো সুখের। আমার এইচএসসি পরীক্ষার তখন এক মাস বাকি। লেখাপড়ায় মন বসানো তখন আমার জন্য রীতিমত অসম্ভব। আমার মাথায় তখন আয়েশা ছাড়া আর কিছু নেই। আমি বইপত্র বেঁধে মাকে বলতাম যে, রাকিবের কাছে যাচ্ছি একত্রে পড়তে। মা আমার দিকেও তেমনি অন্ধকার দৃষ্টিতে তাকাতেন যেমনটা তাকাতেন বাবার দিকে এবং বাবার গল্পগুলোর দিকে। আমি মায়ের সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে নির্বিকার থাকতে পারতাম না। আমি অনেকদিন আগেই জেনেছিলাম মা আমাকে রক্ষা করার শক্তি রাখেন না। তবে অনুভব করছিলাম মায়ের জন্য হলেও আমার উচিত আমার নিজেকে রক্ষা করা। ফলে আমি অনেক রাত জেগে পড়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু আমি কী পড়ব! আমার দিনগুলো তখন আয়েশা গিলে ফেলেছে।     
নুমায়ের যখন ছাদে ঘুড়ি ওড়াত তখন নুমায়েরকে ছাদে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে আমার খুব খারাপ লাগত না। আর এখন আয়েশার সাথে থাকার জন্য এমন কোনো দায়িত্ব পালনই আর খারাপ লাগে না। ক্যান্ডি ফ্লস থেকে আইসক্রিম আনতেও খারাপ লাগে না, ভিডিও ম্যানিয়ায় ঘুরতে যেতেও খারাপ লাগে না। উনিশ বছর বয়সে একটি দৈহিক অন্তরঙ্গতা যে-কোনো কিছুকে সহ্য করার ক্ষমতায় এমন এক জাদুর কাহিনি ঘটিয়ে দেয়। এখন আমি বাবার গল্পগুলো এক নাগাড়ে শুনে যেতে পারি একটুও বিরক্ত হই না। আরশাদের সাথে এখন আমি হেসে হেসে কথা বলতে পারি। আয়েশা যাকে আমি দুবাহুতে জড়াতে পারি সে আমার এবং একেবারেই আমার- আমার ভাবনার এই নিশ্চয়তা আমাকে অনেক সুখী করে তুলল, অনেক শক্তিশালী করে তুলল।
পরীক্ষা শেষ হলে আমি দেখলাম আমার হাতে করার কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনেক দূরে। এমন স্বাধীন আর নিজেকে কখনো মনে হয়নি। মনে মনে ঠিক করলাম লেখক হবো। অনেক রাত জেগে পড়তে শুরু করলাম। লিখতেও শুরু করলাম। বস্তু, বাস্তবতা, চেতনা ইত্যাদি নিয়ে উন্মাদের মতো লেখা। মনে হত সেগুলো ওহির মতো আমার ভিতরে নাজিল হচ্ছে। লেখার দুয়েক সপ্তাহ পড়ে পড়তে গেলে সেগুলো আমি নিজেই বুঝতাম না। তাই বলে রাতের ওহির সেই লেখা আমার থামল না। যখন লেখা আসত না, ঐ জাতীয় লেখার বই পড়তাম কিংবা সেইসব বই থেকে অনুবাদ করতাম। সকালে উঠতে অনেক বেলা হয়ে যেত। মা প্রথম প্রথম অনেক রাগারাগি করলেও ধীরে ধীরে মেনে নিলেন।
আমার দিনগুলো তখনো আয়েশার অধিকারে। রাতে নাজিল হওয়া ভাবনাগুলো আমি দিন হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আয়েশার কানে ঢালি। আয়েশা তার ভাইয়ের ঘুড়ি ঠিক করে কিংবা বাবার গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ারটি ঠিক করে আর আমি পাশে বসে এইসব বক বক করতে থাকি। আয়েশা সব সময়ই কিছু না কিছুতে ব্যস্ত থাকে। একদিন ওর বাসায় গিয়ে দেখলাম ও রান্নাঘরে। বেকিং পাউডারে মাখামাখি হয়ে আছে। আবার হয়তো একদিন দেখতাম ও লনে নিজের সাইকেল খুলে লুব্রিকেন্ট অয়েল লাগাচ্ছে। বাবা দেশে না থাকলে ও মাঝে মাঝে বাসার দ্বিতীয় গাড়ি প্রায়-ভাঙা সবুজ ডাটসান-টা নিয়ে একটা চক্কর দিতেও বেরিয়ে পড়ত। মায়ের হালকা মানা ওর উচ্ছ্বাস আর আত্মবিশ্বাসের কাছে পাত্তাই পেত না।  
এমন এক লং ড্রাইভের সময় ও একদিন আমাকে বলল যে আমার সমস্যাটা ঠিক ঢাকা শহর নয় বরং আমার সমস্যাটা আমি নিজেই। সংসারে সত্যিই এমন মানুষ আছে যারা ওর মতো জীবনে কানাভাঙা তলাফুটা যা পায় তা নিয়েই সুখী হয়ে উঠতে পারে। আর সংসারে আমার মতোও কিছু আছে যারা শুধু জীবনে যা নেই তা নিয়েই হা-পিত্যেশ করে আর ভাবে ওই নাইটুকুর মধ্যেই সব সুখটুকু ছিল। 
আসলে আয়েশাই ঠিক ছিল। আমাদের একত্রে কাটল বেশ কয়েকটি মাস। অন্তরঙ্গতার এক একটি নতুন স্তরে পৌঁছেছিলাম আর ভয়ের ও শিহরণের এক একটি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জিত হচ্ছিল। প্রত্যেকটিই মনে হচ্ছিল ঈশ্বর কর্তৃক মঞ্জুরীকৃত জ্ঞানের এক একটি নতুন স্তর। মাত্র কয়েক মাস আগেও আমার মনে হয়নি কোনো মেয়ের একটু নরম কোনো চাহনিও আমার ভাগ্যে আছে। মাঝে মাঝে সম্ভবের অভাবই মনে হয় অনেক সম্ভাবনার চেয়ে ভাল। অপূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তি বরং প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাকে বাড়িয়ে তোলে আর অপ্রাপ্তিকে বড় করে তোলে। আর এছাড়া আমার এই অপ্রাপ্তিবোধকে বাড়িয়ে তোলার জন্য বিশিষ্ট ভূমিকায় রাকিব তো ছিলই।
রাকিব গায়ে পড়ে জিগ্যেস করত, ‘আরে কী বলিস? এখনো কিছু ঘটাইতে পারিস নাই?’
‘আরে না, ও এসব খুবই লজ্জার সাথে দেখে’- আমি বলতাম।          
সত্য বলতে আয়েশার এই রক্ষণশীলতা আমাকেও অবাক করেছিল। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল তার এই রক্ষণশীলতার পিছনে রয়েছে শুধুই ধরা খাওয়ার ভয়। প্রয়োজনীয় প্রাইভেসি পাওয়া সত্যিই বেশ কঠিন ছিল। ড্রইং রুমে বা ছাদে একত্রে ঘুরে বেড়ানোতে কোনো ঝামেলা ছিল না। কিন্তু ওর বেডরুমে ঢোকাটা মোটেই স্বাভাবিক ছিল না। আমিও স্বাভাবিকভাবেই আমার বাসায়ও ওকে কখনো আমন্ত্রণ করিনি। ফলে ওর সাথে দীর্ঘ চুমুর সুযোগ প্রচুর থাকলেও সব সময় সে সুযোগ এই ভয়ে চুপসে থাকত যে, কখন মায়ের সামনে বা কাজের মেয়ের সামনে ধরা পড়ে যাই। আমার কাছে ধীরে ধীরে আরো মনে হল যে আমিই ওর জীবনে প্রথম না। এই চুমু এবং এর জন্য পরের সুযোগ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকার ধুকপুকানি আমার কাছে যতটা নতুন ওর কাছে তত নতুন অভিজ্ঞতা বলে মনে হল না। তবে এই ভয়ঙ্কর ভাবনা বেড়ে উঠতে দিলাম না।
রাকিব বলল- ‘আমার তো মনে হয় বিদেশি মেয়েরা এসব বিষয়ে বেশ সচ্ছন্দ হয়’।
আমি বললাম, ‘আরে ও তো আর সত্যিকার বিদেশি নয়। বছর কয়েক বিদেশে থেকেছে মাত্র’।
‘বাবা, তুমি আমারে বলদ বুঝায়ো না। তুমিও জান এবং আমিও জানি যে, সে বিদেশিই। সে তোমাকে সুযোগটা দিচ্ছে না এটাই হল কথা। তোমার মনে হয় ঐ দেশে থাকা তোমার আমার বয়সের একটি মেয়ের এই অভিজ্ঞতা নেই?’
আমি বেশ রাগের সাথেই বললাম, ‘রাকিব, মনে রেখ, তুমি আমার প্রেমিকাকে নিয়ে কথা বলছ’।  
রাকিব আমার অবস্থাটি বেশ বিরক্তির সাথেই দেখছে। সে সম্প্রতি এক বারবণিতার সঙ্গে কাজটা করে ফেলেছে কারণ সে এর একটা হেস্তনেস্ত আর না করে পারছিল না। এ নিয়ে তার কোনো লজ্জা বা নীচতাবোধ নেই। বরং কাজটা করে ফেলতে পেরেছে বলে তার যথেষ্ট হালকা লাগছে এবং ভালই লাগছে। দৈহিক এই জ্ঞানে সে এখন আমার চেয়ে এক ধাপ এগিয়েও। এই প্রণয়ের সাথে যে কোনো প্রেম ছিল না বা এর জন্য যে তাকে নগদ কড়ি দিতে হয়েছে সে নিয়েও সে একটুও ভাবিত নয়। বরং তার তৃপ্তি আছে যে সে এখন জানে একটি নারী শরীর কী এবং কেমন যা আমি জানি না। এমন লোককে আমার অবস্থান বুঝিয়ে ওঠা সম্ভব নয় এবং আমি তার প্রয়োজনও বোধ করলাম না। আমি বরং ভাবছিলাম আমি যে গতিতে এগোচ্ছি সেটিই ঠিক আছে। আমার খুব লোভী হয়ে ওঠার দরকার নেই। 
দেয়ালের সাথে লাগানো হুপের মধ্য দিয়ে একটি টেনিস বল ছুঁড়ে দিতে দিতে রাকিব বলল, ‘ঐ গল্প নিজেকেই বল, মানুষকে শোনানোর দরকার নেই’।
আমি বললাম, ‘তুমি এসব বুঝবে না। এগুলো এভাবে দাবড়িয়ে ঘটানোর বিষয় নয়। এর একটা নিজস্ব গতি ও ছন্দ আছে।’
তখন রাকিবের সাথে সময়টা একটু বেশিই কাটছিল। আয়েশা লন্ডনে তার বাবার সাথে ইউনিভার্সিটি দেখে বেড়াচ্ছে। সে ‘এ’ লেভেলে অনেক ভালো করেছে এবং সহজেই অনুমেয় যে সে লন্ডনেই কোনো ইউনিভার্সিটিতে পড়বে। এ ঘটনা আমাদের দুজনের সামনেই এমন কিছু প্রশ্ন টেনে আনল যে ব্যাপারে তখন পর্যন্ত আমরা কেউই ভাবিনি। আমি অশনিসংকেত টের পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল আয়েশার কাছ থেকে আমার দূরত্ব বাড়ানোই উচিত। যে সম্পর্ক নিশ্চিত উবে যাবে সে সম্পর্ক গভীর করা দূরে থাক চালিয়ে নেয়াই তো ঠিক না।  

পিছনের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি তখন কী শক্তিধর ধৈর্যই না আমার ছিল! এখন মনে হয় আমি উল্টোভাবে বড় হচ্ছি। আমি আয়েশার সাথে তখন যেভাবে শান্ত ও সমঝে-চলা বন্ধুটি ছিলাম তা জীবনের প্রৌঢ়ত্বের শেষ ধাপের কোনো ঘটনার সাথেই ভাল মানায় কারণ তখন থাকে অনেক বেশি অভিজ্ঞতা এবং অনেক কম প্রত্যাশা। অথচ আয়েশা সংক্রান্ত ঘটনাদির পরের জীবনেই বরং আমার সম্পর্কগুলোয় অসাধুতার জায়গা হয়ে উঠল। এখন আর আমি মহিলাদের সাথে সে সম্পর্কে জড়াতে পারি না যে সম্পর্ক আমার দিকে ছুঁড়ে মারার বস্তু খুঁজতে তাদের হাতকে না ডাকে। তারা আমার দিকে ছুঁড়ে মারে ফুল, জুতা, ফুলদানি এবং এমনকি একবার একজন হিটারও ছুঁড়ে মেরেছিল। তারা আমার দিকে কী ছুঁড়ে মারেনি? আবার আমার এও স্বীকার করতে হয় আমি তাদের কী দেখিনি? আমার জওয়ানির এই বিচ্যুতিগুলোর সব দায় অবশ্যই আয়েশার সাথে আমার সম্পর্কছেদের ওপর দেয়া যায় না। জীবন এমনটা নয়। জীবনে কোনোকিছুই স্থায়ী দাগও কাটে না, স্থায়ী নির্মিতিও প্রদান করে না। আমরা যা হওয়ার তা অদৃষ্ট বরাতেই হই। শুধু অতীতের দিকে তাকিয়ে কোনো ঘটনার সাথে তার কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজি আর ভাবি ব্যাখ্যাটি পেয়ে গেছি। তবে যেভাবে হোক আর যে রকমেরই হোক আমি এখন উল্টোপাল্টার এক পরিপক্কতায় পৌঁছেছি। মাসের পর মাস যায় কোনো মহিলার সাথে আমার কিছুই করা হয় না। আয়েশাকে হারানোর পরে সাত বছর আমি কোনো মেয়ের কাছ ঘেঁষিনি। খুব ক্ষরণ অনুভব করলে ইবিদ স্টোরে গিয়ে বসি অথবা আমার নিজের পড়ার ঘরে- শব্দ সায়রে ভাসি। এ শব্দজগৎ এক চমৎকার জায়গা: বেশ বিস্তৃত, কোনো স্যাৎস্যাতানি নেই এবং সবচেয়ে বড় কথা একেবারে মনুষ্য রাজ্য থেকে মুক্ত। তবে আপনি যদি বস্তুজাগতিক সেই জায়গাটুকু দেখতে চান তাহলে হয়তো দেখবেন মরুভূমির শুকনো বাতাসের এক বাজে গন্ধ সেখানে। অবশ্য সে শব্দসায়র যেমনই হোক চিরকালিন ঠিকানা হিসেবে আমি তা ধরে রাখতে পারিনি। আমার অস্তিত্বের আরো অনেক চত্বর আছে এবং তাদের দাবিও আছে। সে চত্বর শুধু যৌনতার নয় বরং সে এক আশারও চত্বর। সে আশার মরীচিকা বলছিল এর পরের নারীটি হবে একেবারে আলাদা কিছু এবং সে বয়ে আনবে জীবনের এক পূর্ণতা। এর পরে আর পথ পাল্টানোর পথে আমার হাঁটতে হবে না।
এই ভাবনায় আমি আবার এক নতুন নারীর সাথে শুরু করি। সে হয়তো আমাকে মনে করিয়ে দেয় আয়েশার কথা। অথবা সে মোহময়ী কারণ তার মতো আর কাউকে এর আগে পাইনি। এক নতুন ঘ্রাণ, এক নতুন আত্মপ্রবঞ্চনা, বিদেশি ডিনার শেষে মোক্ষম এক গান ইত্যাদি টেনে নেয় এক নতুন আকর্ষণের দিকে যাকে মনে হয় না একটুও মেকি। নতুন ব্যক্তি চরিত্রের আজবতা, পূর্ণতার হারানো ক্ষণিকতা নতুন নতুন দৃষ্টান্তে স্মৃতিতে যোগ হতে থাকে। এক নারী হয়তো শুধু সাথে হাঁটতে চায়- যে-কোনো জায়গায় হাঁটাই তার পছন্দ। আরেকজন হয়তো শুধু গাড়িতেই চড়তে চায়- এমনকি ইবিদ স্টোরেও সে গাড়িতেই যাবে। আমার মনে পড়ে সেই সব নারীদেরকে শয্যায় যাদের ছিল অকাতর দান। কেউ ছিল যাদের শুধু চাহিদা আর চাহিদা। আবার কেউ কেউ ছিল যাদের অনেক কিছুতেই ছিল আজব খেয়ালিপনা। কেউ ছিল জোরে জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলত, কেউ জোরে চিৎকার করত, কেউ কেউ ছিল যাদের সাথে অনেক হেঁটে মজা পেতাম আবার কারো সাথে সেকেন্ড-হ্যান্ড মার্কেটে ঘুরে মজা পেতাম। তবে যে যে-চরিত্রেরই হোক সকলের সাথেই আমার শেষ কথা হত ‘বিদায়’ কারণ আমার সম্পর্কের চূড়ান্ত বিন্দুই ছিল ‘বিদায়’। একমাত্র নারী যার কাছে আমি স্থায়ী সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছিলাম সে গোছাগুছির ক্ষেত্রে ছিল যেন ফাইল বা ফোল্ডারের এক নারীরূপ। বিছানার চাদর, তোয়ালে, জামা-কাপড়, এমনকি রেস্টুরেন্টের ন্যাপকিন থেকে ডাক্তারের কাগজপত্র পর্যন্ত সব সে গুছিয়ে ফোল্ডারবদ্ধ করবে। জীবনে গোছগাছে আমারও বেশ বিশ্বাস। তারপরও তাকেও শেষ পর্যন্ত আমি বিদায়ই বলেছিলাম। অবশ্য গোছগাছের কারণে নয়। আমি অবাক হই মন কতকিছুই না ধরে রাখে! মন যেন সারা দুনিয়া থেকে তিলে তিলে জড়ো করা কণাগুলো দিয়ে কী এক মস্ত কিছু বানানোর পরিকল্পনায়ই থাকে। প্রত্যাশার মরীচিকার পিছনে ঘোরার অর্থহীনতা আমি বুঝি এবং সেই মরীচিকা ছেড়ে আসার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করি। কিন্তু পারি না। প্রত্যেক উদ্যোগের সাথেই কিছু ঝুঁকি পেঁচিয়ে যায়। আমি দেখি কিছু মহিলা আমার প্রতি টান অনুভব করে কারণ দেখে আমি বেশ দূরত্ব বজায় রেখে চলি। এই দূরত্ব তাদেরকে প্রলুব্ধ করে। এরা শুধু অল্পবয়সী এবং মনে দাগ কাটার ক্ষমতাওয়ালারাই নয়। নির্মলচিত্ত অল্পবয়সীদেরকে আমি মোটামুটি ভদ্রভাবেই এ পথ থেকে তাড়াতে পারি। এ চেষ্টায় মাঝে মাঝে বড় জোর কারো কারো কান্নায় ডুকরানো দুয়েকটি সন্ধ্যা পার করতে হয় আর প্রতিশ্রুতি দিতে হয় সূক্ষ্ম হলেও একটি বন্ধুত্ব ধরে রাখব, কাটব না। তবে অভিজ্ঞরা আলাদা। তাদের জ্ঞান অনেক। তবে তারাও হার মানে যেমন আমি নিজে মানি। আপনারা আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি ঠিক যোগ্য এক নারী বশকারী রূপে নিজেকে উপস্থাপন করতে চাচ্ছি না। আমার চেয়ে এ লাইনে অনেক অনেক যোগ্য পুরুষ ও যোগ্য নারী রয়েছে। আমার সফলতা এখানেই যে আমি নারীদেরকে বাগে আনতে পারি তাদের প্রতি দায়িত্ববোধের কোনো কলমা না গিলেই। আমি আগে ভাগেই এ কথা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে পরিষ্কার করে নেই যে আমার সাথে সম্পর্ক সাকুল্যে ঐ পর্যন্ত যাবে, এর পরে আর নয়। তারা নির্দ্বিধায় বলে, ‘আমি জানি, এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমিও ওর চেয়ে বেশি কিছু চাই না’। কাজকর্ম শেষ হলে আমি ধীরেসুস্থে সেই রাতের মধ্যযামে উঠি এবং এক গ্লাস পানি খাই। দেখি রমণীটি আমার নীল রেশমি বিছানার চাদরের ওপর প্রায় হারিয়ে গেছে যেন। তারপর সেই রাত আর সেই রমণীর প্রতি আমার টানের পরিমাণ ঠিক করে দেয় তীব্র মায়া বা গভীর দুঃখবোধ বা আত্মধিক্কারের কোনটিতে আমি ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠব। (চলবে)

অলঙ্করণ : মোস্তাফিজ কারিগর

 

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন—

আয়েশাকে হারিয়ে || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন || পর্ব-২

আয়েশাকে হারিয়ে || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন || পর্ব-১

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।