রাত ১০:৫৬ ; শনিবার ;  ২০ এপ্রিল, ২০১৯  

বিদ্যুৎ ঠিকই বাংলাদেশে যাবে : বাংলা ট্রিবিউনকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ও বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ত্রিপুরাতে গত ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রীর পদে আছেন মানিক সরকার। সাদাসিধে জীবনযাপনের জন্য পরিচিত ভারতের মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির এই অভিজ্ঞ নেতাকে অনেকেই দেশের সবচেয়ে সজ্জন ও সৎ রাজনীতিবিদ বলে চিহ্নিত করে থাকেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকারও তাকে স্বাধীনতা পদকে সম্মানিত করেছে। বাংলা ট্রিবিউনের প্রথম বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে মানিক সরকার এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে কথা বলেছেন ভারতে আমাদের প্রতিনিধি রঞ্জন বসুর সঙ্গে।

 

বাংলা ট্রিবিউন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার স্থল সীমান্ত বিল অবশেষে ভারতের পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয়েছে। আপনার প্রতিক্রিয়া?

মানিক সরকার : অনেক দেরিতে হলেও আমাদের পার্লামেন্টে যে বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে তা খুব ভাল ব্যাপার। এতে ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। তা ছাড়া এতোদিন বিলটি আটকে থাকায় দুদেশেই হাজার হাজার ছিটমহলের মানুষ ভীষণ অসুবিধার মধ্যে ছিলেন, তাদেরও সুবিধে হবে। আশা করা যায়, দুদেশের মধ্যে সীমান্ত-সংক্রান্ত আরও নানা অমীমাংসিত বিষয়েরও এবার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।

 

বাংলা ট্রিবিউন: এই বিল পাস হওয়ার পর নির্দিষ্টভাবে ত্রিপুরার জন্য কোনও সুবিধা হতে পারে বলে আপনারা আশা করছেন?

মানিক সরকার: ত্রিপুরার ছিটমহলজনিত সমস্যা তো মিটবেই। তা ছাড়া আমরা এই বিল পাস হওয়ার আগেই বিধানসভায় সব দলকে নিয়ে সর্বদলীয় সভা ডেকে সেই মতামত কেন্দ্রকে পাঠিয়েছিলাম, সেটাই হয়তো এই বিলে ঠাঁই পেয়েছে। ফলে সেদিক থেকে ত্রিপুরার কোনও সমস্যা নই। তবে এখন আমরা যেটা চাইছি, তা হল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্র-বন্দর ব্যবহার করে ত্রিপুরাতে মালামাল আনা নেওয়ার সুযোগ। এতে লাভ হবে দুদেশেরই, আর আমরা চাইব ভারত সরকার বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে উত্থাপন করুন। আমি যতোদূর জানি, বাংলাদেশও এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করেনি, বিষয়টি তাদেরও বিবেচনায় আছে। এখন স্থল সীমান্ত বিল পাস হওয়ার পর সেই চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের পথও উন্মুক্ত হতে পারে।

 

বাংলা ট্রিবিউন: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তো এই বিলটি পাস হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা–এই চারটি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেই কথা বলেছেন। ঠিক কী কথা হল আপনাদের মধ্যে?

মানিক সরকার: আসলে এই যে একচল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর পর বিলটি পাস হল, তাতে প্রধানমন্ত্রী খুবই সন্তুষ্ট। তিনি সেই সন্তুষ্টির কথাই জানালেন, বললেন তোমাদের ধন্যবাদ, কারণ তোমাদের সরকার খুব ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল। আমিও তাঁকে বললাম, ‘গুড জব ডান’। এই বিলটা দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে সাহায্য করবে, এবং এখন অন্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো ‘টেক আপ’করা উচিত, সেটাও বললাম।

 

বাংলা ট্রিবিউন: এ বছরের শেষ দিকেই তো ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে বলে কথা রয়েছে। তো সে কাজে কতদূর অগ্রগতি হয়েছে?

মানিক সরকার: আসলে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমাদের পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রাথমিকভাবে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পাঠানো হবে। এই পালাটানায় যেসব ভারি সরঞ্জাম বসানো হয়েছে, তার সবই কিন্তু এসেছে বাংলাদেশের নদীপথ দিয়ে। তাদের আশুগঞ্জ নদীবন্দর ব্যবহার করে। তখনই বাংলাদেশ আমাদের বলেছিল, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রোডাকশনের কিছুটা তোমরা আমাদের দাও না? আমরা প্রথম থেকেই রাজি ছিলাম, তবে ভারত সরকারই সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা দেরি করেছে। তবে বিদ্যুৎ ঠিকই বাংলাদেশে যাবে।

 

বাংলা ট্রিবিউন: অর্থাৎ, প্রোডাকশনের যে অংশটা ত্রিপুরার ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত হবে...

মানিক সরকার: হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। এই উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎটাই আমরা পাঠাব, এবং তার জন্য দুই দেশের তরফেই প্রস্তুতি চলছে। বিদ্যুৎ পাঠানোর জন্য দুদেশের মধ্যে লাইন পাততে হবে। এর জন্য সার্ভে বা সমীক্ষার কাজ ইতোমধ্যেই শেষ, এখন চলছে ঠিকাদার সংস্থাকে বরাত দেওয়ার পালা। যারা লাইন পাতবেন, বাংলাদেশ বোধহয় সেই সংস্থাকে ইতোমধ্যেই বরাত দিয়ে দিয়েছে–আর আমাদেরও বরাত দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে। ফলে কাজ অনেক দূরই এগিয়ে গেছে।

 

প্রশ্ন: ঢাকা-আগরতলা বাস পরিষেবাটা ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা মাধ্যম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য এ বছরের গোড়ায় তাতে সাময়িকভাবে ছেদ পড়েছিল, সেই পরিস্থিতি কি এখন আবার স্বাভাবিক হয়েছে?

মানিক সরকার : (হাসতে হাসতে) এটা সময় সময় চলে, আবার সময় সময় থমকে যায়–এভাবেই চলছে আর কি! আমরা যেটা চাইছি, তা হল সরাসরি আগরতলা থেকে ঢাকা হয়ে আমাদের বাসটাকে একেবারে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত অবধি যাওয়ার অননুমতি দেওয়া হোক। এটা এখনও হয়নি, ফলে ত্রিপুরার মানুষ এখন প্রথমে ঢাকা যাচ্ছেন–সেখানে বাস পরিবর্তন করে আবার কলকাতার দিকে যাচ্ছেন, এভাবেই আপাতত চলছে।

আর এটা তো বুঝতেই পারেন, গাড়িঘোড়া যে পথ দিয়ে চলবে সেখানকার পরিস্থিতি যদি ঠিকঠাক না-হয় তাহলে তো মাঝে মাঝে কিছুটা অসুবিধা হতেই পারে। বাংলাদেশ একটা সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তারা সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণেরও চেষ্টা করছে–ফলে সময়ে সময়ে পরিষেবায় কিছু অসুবিধা দেখা যাচ্ছে ঠিকই। তবে হ্যাঁ, পরিষেবা চালু আছে।

 

প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খুব সম্ভবত জুন মাসেই বাংলাদেশ সফরে যাবেন। তো আপনিও নিশ্চয় তার সফরসঙ্গী হবেন ধরে নিতে পারি?

মানিক সরকার: সেটা তো আমি এখনও জানি না। তবে প্রধানমন্ত্রী যে বাংলাদেশ যাচ্ছেন, সেটা একটা দারুণ ব্যাপার। নরেন্দ্র মোদি যখন গত বছর প্রধানমন্ত্রী হন, তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে আপনার সেখানে যাওয়া উচিত এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকেও ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানানো দরকার। দুদেশের মধ্যে কথাবার্তা হলে, যাতায়াত বাড়লেই সমস্যা মিটবে। আপনি বলছেন প্রধানমন্ত্রী জুনে যাবেন, তা হলে তো সেটা খুবই ভাল ব্যাপার।

 

প্রশ্ন: আপনার কথা থেকে বুঝতে পারছি, সফরে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেলে আপনি তা ফিরিয়ে দেবেন না।

মানিক সরকার: (হেসে) আগে তো জানাক, এখনও তো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানি না। তবে ওদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আমার সম্প্রতি কথা হয়েছে। স্থল সীমান্ত বিল পাস হওয়ার পর দিনই শেখ হাসিনা আমাকে ফোন করেছিলেন, নিমন্ত্রণ করে বললেন আপনাকে কিন্তু বাংলাদেশে আসতে হবে–আর খুব তাড়াতাড়ি। আমিও ওনাকে জানালাম, ত্রিপুরাতে ভারত-বাংলাদেশ যে ‘ফ্রেন্ডশিপ পার্ক’ তৈরি হচ্ছে তারও কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে; সেটার উদ্বোধনের সময় আপনাকেও কিন্তু ত্রিপুরা এসে ঘুরে যেতে হবে। উনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ত্রিপুরার কথা তো আলাদা। ত্রিপুরার ডাক পেলে আমি সব সময় সাড়া দিতে চাইব!

 

প্রশ্ন: এই ফ্রেন্ডশিপ পার্কটা কোথায় হচ্ছে?

মানিক সরকার: জায়গাটা আগরতলা থেকে কিছুটা দূরে, বিলোনিয়াতে বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যোদ্ধারা ত্রিপুরার যে সব জায়গায় শিবির স্থাপন করে শত্রুসেনার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন, এই জায়গাটাও ছিল তারই মধ্যে একটা। জায়গাটা একেবারে সীমান্তের ওপারেই বলা যায়, জিরো লাইন থেকে একটু আমাদের দিক ঘেঁষে। পাশেই রয়েছে একটা খুব প্রাচীন মসজিদ–কেউ বলেন চারশো বছরের, কেউ বলেন আরও পুরনো। তার পাশে একটা বিশাল জায়গা নিয়ে আমরা গড়ে তুলছি এই ফ্রেন্ডশিপ পার্ক বা মৈত্রী পার্ক, বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এসে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন। এটার কাজ শেষ হলে এই পার্কটা একটা দারুণ ‘ইন্টারন্যাশনাল মনুমেন্ট’ বা আন্তর্জাতিক স্মারকের মতো হবে বলেই আমরা আশা করছি।

 

বাংলা ট্রিবিউন : মানিকবাবু, আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ।

মানিক সরকার : ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা আপনাদের বাংলা ট্রিবিউনকেও। ভালো থাকবেন।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।