সকাল ১১:৪৭ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

‘আগে তো বাঁচা, তারপর লেখালেখি’ || রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

একটি দেশের গল্প হোক। দেশটির অবস্থান আফ্রিকায়, উত্তর আফ্রিকায়, অতলান্তিকের পাড়ে ক্যামেরুন আর গ্যাবন-এর মাঝে। ছোট দেশ। জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে সাত লাখের একটু বেশি। ইউরোপিয়দের মধ্যে পোর্তুগিজরাই প্রথম খুঁজে পায় দেশটিকে। উনবিংশ শতকের মাঝ পর্যায়ে এসে স্প্যানিশরা উপনিবেশ স্থাপন করে। সেই সূত্রে এর ভাষা প্রধানত স্প্যানিশ। আফ্রিকার একমাত্র স্প্যানিশভাষী দেশ। ক্লাসরুমে স্প্যানিশ ভাষা শেখাতে গিয়ে কোর্সের শুরুতেই বিশ্বের কোথায় কোথায় কোন কোন দেশে লোকজন এ-ভাষায় কথা বলে বা এটিই মূল বা রাষ্ট্রীয় ভাষা তা বলে আসছি প্রায় এক যুগ ধরে। এবং এ দেশটির নামও বলে আসছি। কিন্তু খুব একটি কিছুই জানা ছিল না দেশটি সম্পর্কে। এবার জানা গেলে কিছুটা, ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস্ বাংলাদেশ(ইউল্যাব)-এর উদযোগে সদ্য-আয়োজিত লিটারেরি কনক্লেভ-এর সৌজন্যে। মজার ব্যাপার গড়পড়তা মাথাপিছু আয়ের হিসেবে এটি আফ্রিকার পয়লা নাম্বার দেশ। ১৯৯৬ সালে বহুজাতিক মার্কিন তেল কোম্পানি মবিল-পেট্রলের খনন কাজ শুরু করে যার বদৌলতে দেশটির সরকার রাতারাতি ধনী বনে যায়। ধনী-গরিবের তফাত সব দেশেই কমবেশি আছে। কিন্তু এ দেশটিতে এর মাত্রা আকাশ ছাড়ানো। এর রাজধানী মালাবো, দ্বিতীয় প্রধান শহর বাতা-য় উঁচু ভবন, প্রাসাদোপম বাড়ি চোখে পড়ে। পাচিল দিয়ে ঘেরা অনেকগুলি প্রাসাদোপম ভবনের ভেতর আছে সুইমিংপুল, গলফ কোর্স। সেখানে কারও প্রবেশাধিকার নেই। সেনারা টহল দেয় চব্বিশ ঘণ্টা। এ যেন শহরের ভেতর আর এক শহর। এই দৃশ্য দেখা যাবে আনো বোঁ, কোরিসকো, মোকা, বিয়োকা ইত্যাদি ছোট ছোট দ্বীপশহরে। এই দেশটির মালিক একজনই। তিনি সর্বেসর্বা। ২০০৩ সালের জুলাই মাসে দেশটির সরকারি রেডিয়োতে এই রকম বলা হয় : ‘আমাদের প্রেসিডেন্ট হলো একজন দেবতা— যিনি সর্বক্ষমতাধর ঈশ্বরের ওহি নিয়ে এসেছেন, যাঁর সঙ্গে তাঁর সার্বক্ষণিক কথাবার্তা হয় আর আমাদের দেবতা চাইলে যে কাউকেই দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিতে পারেন। কেননা তিনিই স্বয়ং ঈশ্বর।’ স্পেনের আরাগোসা ফৌজি একডেমি থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই সেনানায়ক যিনি এ-দেশটির অধিকর্তা, আপন চাচাকে হটিয়ে দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেন ১৯৭৯ সালে। গোলপে দে লিবের্তাদ  বা স্বাধীনতা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আরোহণ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৬৮ সালে ঔপনিবেশিক শাক্তি এস্পানিয়া থেকে মুক্তি পেয়ে দেশটি যার শাসনের খপ্পড়ে পড়ে ছিল ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত, সেই চাচাও ছিলেন একজন একনায়ক। চাচাকে খুন করে নিজের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেন ভাতিজা। দেশটির ঈশ্বর এই ভদ্রলোকের প্রায় ৩০টি সন্তান। এদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ছেলেটি বর্তমান সরকারের কৃষি ও বনজসম্পদমন্ত্রী। তার ১১ টি বিলাসবহুল গাড়ি আছে নানা রঙের। নীল রঙের গাড়িটি নিয়ে যেদিন বের হন সেদিন তার পরনে থাকে নীল রঙের জুতো। অন্য দিন অন্য রঙ। জুতোর রঙের সঙ্গে মেলানো গাড়ির রঙ। তার বাবা মানে এ-দেশটির সর্বময় কর্তা, ব্রাজিলের হিউ পি জানেইরুতে হয়ে-যাওয়া এ-বছরের কার্নিভালে বিজয়ী বেইজা ফ্লোর দলের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। কার্নিভালে উপস্থিত ৭০ হাজার দর্শকের মধ্যে ভিআইপি হিসেবে ছিলেন তিনি। আর এ-খবর বিষয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া থেকে মতামত চাওয়া হয় এ-দেশের একজন গুণি লেখকের কাছে, যার কথা একটু পর আমরা বলব। দেশটির আসল ছবিটা অন্য রকম। এর ৯৯ শতাংশ মানুষই বাস করে দারিদ্র্যসীমায়। গোসল করতে করতেই হঠাৎ পানি বন্ধ হয়ে যায়। বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সঙ্কট প্রাত্যহিক ব্যাপার। বিদ্যুৎ কখন কখন থাকে সেটাই একটা প্রশ্ন। গত চল্লিশ বছরে দেশটির এক-তৃতীয়াংশ লোক পালিয়ে গেছে অন্যত্র। উন্নত বিশ্বের সরকারের সঙ্গে দোস্তি স্থাপন করা গণপ্রজাতন্ত্রী সর্বেসর্বা এর প্রেসিডেন্টের নাম তেয়োদোরো ওবিয়াং নগেমা বিইয়োগো। আর তার দেশটির নাম? নিরক্ষীয় গিনি। ইংরেজিতে ইকুয়েটোরিয়াল গিনি। 

২.
হুয়ান তোমাস আবিলা লাউরেল (জন্ম ১৯৬৬)। সমসময়ের গিনিয়ান সাহিত্যের উজ্জ্বলতম নামগুলির একটি। একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক। ২০১১ সালে স্বদেশের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে অনশন শুরু করেন। অবস্থা বেগতিক হয়ে পড়লে চাপের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সেই থেকে অভিবাসী জীবন যাপন করছেন স্পেপেন বার্সেলোনায়। মাঝে মাঝে লুকিয়ে দেশে ফেরেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর লেখালেখির মধ্যে রাজনীতির অনুপ্রবেশ রয়েছে। কবিতা দিয়েই শুরু। আনা বোঁ-এর এই লেখক তাঁর জনপদের ভাষা কা দাম্বো-য়  পোর্তুগিজ ক্রোয়োল— লিখেছেন। বুবি আর ফাঙ্গ ভাষার শব্দ-বর্ণ-গন্ধও চলে আসে তাঁর লেখনীতে। কিন্তু লেখেন এস্পানিয়োলে, ঔপনিবেশিকদের রেখে যাওয়া রাষ্ট্রের নির্ধারিত ভাষায়। ইকুয়েটোরিয়াল গিনি-তে ইংরেজি মিশ্রিত বান্টু ভাষার চর্চাও আছে। 
অধরা মাধুরী ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাঁর কলম ধরা। যে বাস্তবতাকে ধরা যায় না তার সঙ্গে তাঁর কথোপকথন চলে কবিতা বা গদ্যের ভাষায়। আর শৈলীটা মৌখিক সাহিত্যের কাছে ঋণী। তাঁর মতে সমস্ত লিখিত সাহিত্যই মূলত মৌখিক সাহিত্য-ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা। লেখেন নিজের জনপদ আর বিশ্ব মানবিকতাকে কেন্দ্রে রেখে। কিন্তু কবুল করেন নিজের দেশ আর জনপদকে নিয়ে লেখা সহজ কম্ম নয়। 
বেঙ্গল লাইটস লিটারেরি কনক্লেভে যোগ দিতেই ঢাকা এসেছিলেন হুয়ান তোমাস। ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি, কর্মকর্তাদের কাজকারবার তাঁকে স্বদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। সোনারগাঁও হোটেলের লবিতে রাখা দেশবিদেশের মান্যবর বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের ছবির চোখগুলো ফাঁকি দিয়ে আমি আর হুয়ান তোমাস বেরিয়ে পড়ি এক সকালে। ঢাকা দর্শনের অভিজ্ঞতা নেয়ার অভিপ্রায়ে বেরিয়ে হুয়ান তোমাসের দৃষ্টি এড়ায় না এখানকার মানুষের জীবন। ভিন্নতা থাকলেও দু’দেশের মানুষের ছবিটা প্রায় এক— এমনটিই তাঁর মত। তাঁর কাছে তাঁর দেশ হলো একটি বিমূর্ত সত্তার এক দরিদ্র প্রদেশ। পেট্রলের সুবাদে দেশের সরকার আর চামচারা ধনী হয়েছে, শাসককে আরও শক্তি জুগিয়েছে জনগনের ন্যায়বিচারের মুখটাকে টুটি চেপে বন্ধ করে রাখার জন্য। তাঁর দেশের মানুষ বেঁচে থাকার লড়াইটা করেই যাচ্ছে, এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। আগে তো বাঁচো, তারপর লেখালেখি। 

 

হুয়ান তোমাস আবিলা লাউরেল-এর কবিতা

গিনি

ছিন্ন জিহ্বার
কালো চুলের মানুষের মুখে
গোথিক রাজাদের
বিদ্রুপ।

নয় খ্রিস্টীয় সুসমাচার
নয় দাক্ষিণ্য 
গরীব দিশি মানুষের,
বিশ্বাস আর বর্বরতার। 

লাল রঙকে তারা ডাকে রক্ত
কারণ তারা চেনে না
ভাতা-প্রাপক যাজকের 
বেগুনি রঙ।

কালো জবানে বান্টু
আর তাদের পা ও মাংসল ঠোঁটের ডগায়
সমস্ত আদিপাপ নিয়ে। 

একথা ঠিক, মহান যীশুখ্রীস্ট আমাদের মাঝে মারা যাননি।
আর সমুদ্রসৈকত, নদী, বৃক্ষ আর গাছগাছালি যা কাছে টানে
বজ্জাতি
ফিরিঙ্গি বিভ্রমঅলা চোরদের।
একটা নাম?
অনেকেই বলে নদীর গাথার কথা। 

                
(এস্পানিয়োল থেকে তর্জমা)

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।