রাত ০৯:২২ ; মঙ্গলবার ;  ১৮ জুন, ২০১৯  

'স্বপ্ন দেখতে হবে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার'

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট॥

বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশি তরুণরা সংগ্রাম করছে দেশকে তুলে ধরতে। ভবিষ্যতের পথচলাকে সুসংহত করতে। স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে। দেশকে দেওয়ার এখনও আছে অনেক কিছু- বিষয়টা ভাবায় উদ্যমী তরুণদের। আছে মুদ্রার উল্টো পিঠও। দুঃখজনক হলেও সত্য, মানবিক মূল্যবোধের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাশীল না থেকে, নিজেদের দূরে সরিয়ে বিকৃত রুচির পরিচর্যা করে যাচ্ছে আরেক দল তরুণ।

সম্প্রতি পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে নারীদের ওপর প্রকাশ্যে যৌন হয়রানির ঘটনা যার সর্বশেষ প্রকাশ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এ ঘটনাকে অনেকেই বলছেন রমনা বটমূলে বোমাহামলার ঘটনার পর বাঙালি ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় উৎসব পহেলা বৈশাখের কলঙ্ক হিসেবে।

১৪২২ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন ১লা বৈশাখ। টিএসসি চত্বরে যৌন হয়রানির ঘটনাটি বহুল আলোচিত একই সঙ্গে তার চেয়ে অনেক বেশি সমালোচিত। আশঙ্কার কথা হচ্ছে সেদিনের ন্যাক্কারজনক ঘটনাটির সময় সাহস করে প্রতিরোধে হাত না বাড়িয়ে না দিয়ে অনেকেই দর্শক হয়ে উপভোগ করেছেন তা! প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, একদল তরুণ সংঘবদ্ধভাবে এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে। আরেক দল তরুণ হাজারও মানুষের ভিড়ে নীরব দর্শক না থেকে যৌন হয়রানির শিকার নারীদের রক্ষায় এগিয়ে আসে। ওই তরুণরা দেখিয়েছে সাহসের সঙ্গে প্রশংনীয় কাজও করতে পারে তারা। ওই তরুণরা বিশ্বাস করে, 'সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নয়।'

বাংলা ট্রিবিউনকে সেই বিশ্বাসের কথাই আবার পুনরাবৃত্তি করলেন সেই তরুণদের একজন। 'মানুষ, মনুষত্ব্, মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা আর সামাজিকীকরণ-কোনও মানুষ এই গুণগুলো ধারণ করলে সম্পূর্ণ বিলোপ না হলেও কমে যাবে সামাজিক অসঙ্গতি। একই সঙ্গে সমাজের নেতৃত্ব দেওয়া নতুন প্রজন্ম হয়ে উঠবে আরও দায়িত্ববোধ সম্পন্ন।' এভাবেই সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে নিজের ভাবনাগুলো বলে দিলেন সে দিনের প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ লিটন নন্দী। তিনি আরও বললেন, 'বিশ্বাস করি, কোনও মানুষ সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে, অচিরেই কমে যাবে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক ব্যাধি।'

বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেলেও ফের পুনরাবৃত্তি করেন লিটন। নিজেই জানান, কি ঘটেছিল সেদিন। বললেন, 'ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সিপিবি (কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ) এবং বাসদ (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল) সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচরণা শেষে টিএসসি চত্বরে আসি। এখানে আসার পরপরই দেখি সেহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের সামনে একদল তরুণ ভিড় করে কয়েকজন তরুণীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছে। এসময় আমি আর আমার দুই বন্ধু, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মেট্রোপলিটন শাখার সাধারণ সম্পাদক সুমন সেনগুপ্ত আর বাংলাদেশ ছাত্রঐক্যের কার্জন হল শাখার জয়েন্ট সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান এক সঙ্গে এরকম আরও কয়েকটি ঘটনা দেখতে পাই। আমরা এদের সবাইকে রক্ষার চেষ্টা করি।'

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি লিটন নন্দী জানান, ছোটবেলা থেকেই শিখেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট থানার বেতাগী ইউনিয়নের সন্তান লিটন ছোটবেলা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছেন একটি শব্দকে ঘিরে। আর সেটি হচ্ছে মানবতা। লিটন জানান, ছোটবেলায় প্রিয় শিক্ষক অঞ্জন চক্রবর্তী অনুপ্রেরণা জানাতেন মানুষ হতে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে বেতাগী হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন। বেতাগী শহীদ স্মৃতি ডিগ্রী কলেজ থেকে পাস করেন এইচএসসি। সে সময় থেকেই হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ুন আহমেদ, আহমদ ছফার মতো সৃষ্টিশীল লেখকদের লেখায় অণুপ্রাণিত হয়েছেন।

২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন ঢ‌াকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগে। বর্তমানে মাস্টার্স করছেন একই বিষয়ে। তবে, মানবতাই যার জীবনের লক্ষ্য শুধু শিক্ষা আর গবেষণা কার্যক্রম করেই তার শান্তি পাবার কথা নয়। পাননি লিটনও। তাইতো, ২০০৮ সালেই যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নে। সেই রাজনৈতিক অধ্যাবসায়ে ২০১৩ সালে হন দলটির সম্পাদক আর ২০১৪'র ডিসেম্বরে নির্বাচিত হন সভাপতি।

লিটনের লক্ষ্য সবাইকে নিয়ে সমাজ পরিবর্তনের। তিনি বিশ্বাস করেন ভালকাজে প্রয়োজন সবার অংশগ্রহণ। তাইতো, বাংলা ট্রিবিউনের মাধ্যমে আহ্বান জানিয়েছেন, সমাজে বিশৃঙ্খলা আর খারাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে সবাইকে। তাহলেই সম্ভব স্বপ্নের দেশ গড়া। এ ক্ষেত্রে অন্যায়কারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার মধ্যদিয়ে উদাহরণ তৈরি করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পহেলা বৈশাখের ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেন, 'এ ধরনের ঘটনা শেষ হয়ে যায়নি। একই সঙ্গে পুনরাবৃত্তি হতে পারে যে কোনও সময়। আর এ কারণে প্রয়োজন অন্যায়কারীদের গ্রেফতার করে যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া।'

এ ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বাড়ানোর পক্ষেও মত দেন লিটন নন্দী। ব্লগার অভিজিৎ হত্যার উদাহরণ টেনে বলেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাত্র দু'মাস আগে অভিজিৎ রায়কে প্রকাশ্যে পুলিশের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।'

সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোপুরি কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন দেশকে নিয়ে ভাল কিছু করার স্বপ্ন দেখা এই তরুণ।

সুস্থ রাজনৈতিক পরিচর্যার অভাবে বর্তমানে তরুণদের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে রাজনীতি বিমুখতা। যে কারণে ভবিষ্যতে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো নেতা গড়ে উঠছে না বলেও মনে করেন তিনি। উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবজনক ইতিহাস। তাই, দেশ গড়তে সবার আগে চাই ছাত্র রাজনীতির উন্নয়ন। ছাত্র রাজনীতি বর্তমানে সম্পূর্ণ মিশে গেছে অপহরণ, গুম, খুনের মতো সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মধ্যে।'

তিনি মনে করেন, দেশকে নিয়ে সুন্দর স্বপ্ন দেখতে আর ভবিষ্যত প্রজন্মকে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন যথোপযুক্ত উদ্যমী মানুষ।

লিটন নন্দী স্বপ্ন দেখেন, এমন একদিন আসবে যেদিন হত্যা-গুমের মধ্য দিয়ে নয় সঠিক যুক্তি-তর্কের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা সমাধান করবেন যে কোনও পরিস্থিতির। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে উন্নয়নের পথ আরও সুদৃঢ় করতে হরতাল, হত্যা, মানুষ পোড়ানো আর অগণতান্ত্রিক চর্চার পরিবর্তে গুরুত্ব দেওয়া হবে আলোচনা আর মতামতকে।

/এআই/এএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।