দুপুর ০২:৩৫ ; রবিবার ;  ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮  

বব মার্লি বেঁচে আছেন || শারমিনুর নাহার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সুরে সুরে ঝংকার তোলে। মন নাচে, দেহ দোলে। ঝংকারে উন্মাদ আত্মমগ্ন। নিজের ভেতরের আমিকে নতুন করে অনুভব করা। সুর ভাসিয়ে নিয়ে যায় মনগহিনে। একান্তে অবগাহন, ডুব সাঁতার, যেন পানকৌড়ি, গলা নামিয়ে টুপ করে একটি জলপোকা ঠোঁটে নিয়েই আবার গলা তোলে। দেখে, আবার ডোবে। নাচে, আত্মমগ্ন হয়। সুরের ফেনায় চিরচেনা আমি’র একটি নতুন পথ খুলে যায়। গলা বাড়িয়ে চিৎকার ছোড়ে, মাথা, চুল, হাত দুলে উঠে, সারা দেহ নেচে চলে তালে তালে। কখনও উন্মাদনায় দেহ কুচকে উর্ধ্বস্বরে বলে ওঠে ‘গেট আপ স্ট্যান্ড আপ’। প্রতিদিনের আমি ঘুরে দাঁড়ায়। নিজেকে জয় করবার প্রাণ নিয়ে ফিরে আসে আলয়ে। হৃদয়ে নতুন অনুভব, নব প্রাণশক্তি। ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প। 
সুরের শক্তি ব্যক্তিকে নয়, গোষ্ঠিকে নয়, কখনও কখনও সমগ্র জাতিতে ঐক্যবদ্ধ। আনন্দ, বিষাদ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ কি নেই তাতে। মন, দেহ, হৃদয়ের ঐক্যতানের সম্মেলন ঘটলে কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে সমগ্র জাতির বিবেক। শ্রেণী, বর্ণ, ধর্ম, শোষণ বঞ্চনায় সব কিছুর উর্ধ্বে সুর একটা বিন্দুতে  মেলে। বিন্দুর ফল্গুধারা ব্যক্তিকে সতেজ করে, প্রাণ জাগায়।  গানের শক্তি বারাবারই প্রমাণ করেছে মানুষের বিবেক, মুনষ্যত্ব কখনও পরাজিত হয় না। সময়, বাস্তবতা, বর্ণ তাকে রোধ করলেও সে এক সময় ঠিকই বের হয়, একাত্ব হয় মানুষে মানুষে, জাতিতে, নীপিড়নের পীড়ায়। গানের ভূবনে এমন প্রতিবাদী কণ্ঠ বব মার্লি। জ্যামাইকার বিবেক বলে পরিচতি মার্লি তার সমাজের বর্ণ বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় শোষণ আর নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিলেন সত্তর দশকে। ‘গেট আপ স্ট্যান্ড আপ, স্ট্যান্ড আপ ফর ইউর রাইটস’, ‘নো ওমেন নো ক্রাই’ কিংবা ‘বাফেলো সোলজার’ গানগুলোর মাধ্যমে। যতদিন বিশ্বে শোষণ, বঞ্চণা, বর্ণ বৈষম্য থাকবে ততদিন ‘আমি ঘোষণা দিলাম যুদ্ধ, জেনো, অবিরাম জারি যুদ্ধ’ এমনই সব গান মার্লির। 
সত্তর দশকে মার্লির সেই গানযুদ্ধ আজও স্বগর্বে গরিয়ান। আজো নিউইয়র্কে যখন পুলিশ কৃষ্ণাঙ্গ ফাগুয়েশেন উপর শ্বেতাঙ্গ পুলিশ নির্যাতন চালায়, যখন ওয়াল স্ট্রিটে ওকুপাই মুভমেন্ট চলে, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা দুুনিয়ার যেখানে নিপীড়িত মানুষ প্রতিবাদে সরব হয় সেখানেই নির্যাতনকারীর ভাষা বব মার্লি। পোস্টারে, দেয়ালে, লিফলেটে, প্লাকাডে, শ্লোগানে মার্লির গানের কোনো বাক্য, মার্লির উক্তি, পঙক্তি পত্ পত্ উড়তে থাকে। মার্লি মিশে আছে চেতনার সেই অনুরণনে যেখানে বিবেক, মনুষত্ব, চেতনা সবার উর্ধ্ধে। সেখানে নেই জাতিসংঘ, নেই কোনো থিম সং হবার যাতনা। সুরের দেহ ঝংঙ্কারে যেখানে ব্যক্তি অনুভব করে ‘আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়’।
ইংরেজ বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ মেরিন ক্যাপ্টেন ‘নরভ্যাল সিনক্লেয়ার মার্লি’ চাকরির প্রয়োজনে জ্যামাইকা আসেন। প্রেমে পড়ের সপ্তদশী কৃষ্ণাঙ্গ সেডেলা’র। ভালো গাইতে পারতেন বলে সমাজে সুনাম ছিল সেডেলার। নরভ্যালের পরিবারের সায় ছিল না বিয়েতে। কিন্তু প্রেম, অন্তর্দ্বন্দ্ব বা অনাগত সন্তানের কথা ভেবে বিয়ে করেন তিনি। যদিও সন্তানের মুখ দেখবার প্রত্যাশা না করেই পরদিন এলাকা ত্যাগ করেন। জীবনে একবার দেখা হয়েছিল মার্লির বাবার সঙ্গে। কিছুদিন মাসোহারা পাঠিয়ে এক সময় ইতি টানেন সম্পর্কে। ১৯৪৫-এর ৬ ফেব্রুয়ারি জন্মান রবার্ট নেস্তা মার্লি, যাকে আমরা পরবর্তীতে বব মার্লি নামেই চিনি। নাইন মাইল (বিগ হাইজ) যৌথ পরিবারের ব্যক্তিরা মার্লিকে কখনও বাবার অভাব বুঝতে দেয়নি, আদরের বব যেনো কখনও বাবার কারণে আত্মগ্লানিতে না ভোগেন সেই চেষ্টাও ছিল গায়ক মা আর নানা-নানীর। কিন্তু ছোট বব ঠিকই বুঝতেন। বুঝতেন এক অসম সম্পর্ক, এক অন্যায় হয়েছে তাঁর সঙ্গে। বাবার প্রতি ক্ষোভ সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে তাঁকে। পারিবারিক আবহে উষ্ণতা থাকলেও ছিল না স্বচ্ছলতা। কারণ তখন গোটা জ্যামাইকাই ছিল অশান্ত। একদিকে রাজনৈতিক আন্দোলন অন্যদিনে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য। জুয়া, গাঁজা আর মদের নেশায় চূর। শেকড়ছিন্ন দাসরা উঠে দাঁড়াতে চাইলেও সাম্রাজ্যবাদ তাদের সেই অন্ধ কানা-গলির ফুটোর আলো বন্ধ করতেও নানা অপচেষ্টায় লিপ্ত। সারা দিনের চাবুকের আঘাতে ছিন্ন মানুষগুলো কাছে একটু সুরই ছিল ঘুমোবার প্রেরণা।
পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকে কৃষির প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে, বাড়ে অর্থনৈতিক দৈনতা। কাজের আশায় গ্রামের মানুষ শহরমুখী হয়। সেডেলা ছেলেকে নিয়ে চলে আসেন শহরে। আমাদের ঢাকা শহরের বস্তির মতোই ঘনবসতিপূর্ণ ট্রেঞ্চটইনের কিংস্টন বস্তি। শুরু হয় সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। বস্তির নারীদের নিয়ে লেখাই মার্লির সেই বিখ্যাাত ‘নো, ওমেন, নো ক্রাই’। এই গানে প্রচ্ছন্নভাবে যেন মাকেই প্রেরণা দিচ্ছেন মার্লি। 
আফ্রিকার সুপ্রাচীন আন্দোলন রাস্তাফারাইয়া। ইথিওপিয়ান মিথ, বাইবেলের বরাত দিয়ে রাস্তাফারাইয়া দর্শনের শক্তিশালী ভিত মানুষে মানুষে বৈষম্য, সমাজকাঠামো, রাষ্ট্রশৃংঙ্খলার বিরোধীতা। তারা পশ্চিমা সংস্কৃতির বিরোধীতা করে, ক্ষোভ প্রকাশ করে কাঠামোর (সিস্টেমের)। ‘নিজের দিকে দেখো, আমি কে?’ এই প্রশ্ন হাজির করেই রাস্তাফারাইয়াদের প্রথম গণআন্দোলন হয় ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। বব মার্লির চিন্তার ক্ষেত্রে রাস্তাফারাইয়া দর্শন বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মার্লি স্কুলে আনন্দ পাননি, উপনিবেশিক শিক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলেছেন, ‘আমি শিক্ষিত হইনি, অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। শিক্ষিত হলে তো হতাম একটা গবেট।’ 
রাজনীতির প্রতি ক্ষোভ, কাঠামো বিরোধীতা মুক্তিকামী তরুণদের ঐক্যবদ্ধ করে গানে। তাদের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে সুর। মার্লি বলতেন ‘কংক্রিটের জঙ্গলে স্বপ্ন খোঁজা হতো গানে’। জ্যামাইকার সঙ্গীতেও তখন নানা পালাবদল চলছিল। পঞ্চাশের দশকে তাদের গানে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন ঘটতে থাকে। ডিজে পার্টি শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। মার্কিন রেকড কোম্পানিগুলো বাড়ির উঠানে গানের অয়োজন করতেন, রেকড বাজাতেন, গানের প্রতিযোগিতা করতেন, নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটাতেন। এসব ব্যবসায়ীক উপাদানের মধ্যে রাস্তাফারাইয়া দর্শন নিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেন ‘রেগে’ শিল্পীরা। এদের রিদম প্যাটান আলাদা। রেগেকে মূলত বলা হয় জ্যামাইকার গণসঙ্গীত। পুরানো হুবহু সেই গণসঙ্গীত নয়, এর সঙ্গে কিছুটা মিশল রক। বলা হয় রক থেকে রেগে। তারা শুরু করতেই তারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৬৩-এ বানি লিভিংস্টন, পেটার টোশ ও আরো কয়েকজন মিলে মার্লি গড়ে তোলেন ‘দ্য ওয়েলার্স’ দল। তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘ক্যাচ এ ফায়ার’, খুবই জনপ্রিয়তা পায়। এর পরে একে একে তারা ইউরোপে, আমেরিকায় কনসাট করতে থাকে। মার্লির রকস্টার বা মার্লির স্টাইলে তিন ধরণের বৈশিষ্ট দেখা যায়: অপরকে দেখানো, মানে কিছুটা রহস্যময় আদিম ভাব; সিস্টেমের বিরোধীতা এবং নিজেকে সম্মান করা বা নিজের ভেতরে আত্মমগ্ন থাকা। মঞ্চে যেমন ছিলেন মার্লি- অনবদ্য, উদ্দাম কিন্তু ধ্যানী। মার্লির কনসাটের পরদিন পত্রিকার শিরোনাম হতো, ‘ঝড়ের মতো জয় করলেন’, ‘প্রোফেট’, ‘রেগের গড ফাদার’, ‘হিস্টিরিয়াগ্রস্ত শ্রোত’, ‘হিপনটিক’ ইত্যদি। 
৭৩- এ তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘বানিন’ বাজারে আসে, ৭৫ এ বের হয় ‘Natty Dread’ এর পর Live, পরে Rastaman Vibration’। ১৯৯৯ সালে ‘বব মার্লে এন্ড দ্য ওয়েলার্স’-কে বিশ শতকের সেরা অ্যালবাম নির্বাচিত করে টাইম ম্যগাজিন। ব্যাপক জনপ্রিয়তা আর আয় হু হু করে বাড়তে থাকে ওয়েলার্সের। তৃতীয় বিশ্বের কোনো শিল্পীর গান সারা বিশ্বে এই প্রথম এত জনপ্রিয়তা পায়। 
’৭৭ সালে ফুটবল খেলতে গিয়ে মার্লি পায়ে আঘাত পান, ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ডাক্তার পা কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। কিন্তু রাস্তাফারাইয়া দর্শনে ভক্তদের কাছে শরীর মূল্যবান, এর অঙ্গহানি করা পাপ। গড়িমশি করতে থাকেন মার্লি, ক্ষতিটি ক্যান্সারের রূপ নেয়। এটি কাল হয় জীবনের। মাত্র আঠারো বছরের সঙ্গীত জীবন আর ৩৬ বছর বয়সেই জীবনের বর্ণিল ইতি টানেন মার্লি। ১৯৮১ সালের আজকের এই দিনে বিদায় নেন ধূলার ধরণী থেকে। 
রাস্তাফারাইয়াদের কাছে গাঁজা আধ্যাত্মিক অনুসঙ্গ আর জটাধারী চুল ঈশ্বরের অবদান। মার্লির আত্মমগ্ন, ধ্যানী স্টাইলের সঙ্গে এগুলো মিশে আছে। নিজের আত্মোপলব্ধি, ঐতিহ্যের অনুসন্ধান পাশাপাশি প্রতিবাদ, বিদ্রোহ আর দীর্ঘ জটা চুলে মার্লি বিশ্বে রেগে আইকন। নিজের সন্তানদের পাশাপাশি তার অসংখ্য ভক্ত, গ্রুপের মাঝেই শুধু নয় প্রতিবাদ আর বিদ্রোহেও মার্লি বেঁচে আছেন। মৃত্যুকালে পুত্রের উদ্দেশে বলে গিয়েছিলেন, ‘মানি ক্যান নট বাই লাইফ’, বব মার্লির ভক্তদের উদ্দেশেও এই বাণীটি অমর হয়ে থাক।            

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।