রাত ০২:৪০ ; বুধবার ;  ১৭ জুলাই, ২০১৯  

মা দিবসে মায়ের জন্য কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তসলিমা নাসরিন॥

আজ ১০ মে। মা দিবস। আমার মা’কে নিয়ে লেখা কটি কবিতা পড়ুন আজ।

১. মা কষ্ট পেলে আমাদের কিছু যেতো আসতো না

   আমার একটি মা ছিল

   চমৎকার দেখতে একটি মা,

   একটি মা আমার ছিল

   মা আমাদের খাওয়াতো শোয়াতো ঘুম পাড়াতো

   গায়ে কোনও ধুলো লাগতে দিত না, পিঁপড়ে উঠতে না,

   মনে কোনও আঁচড় পড়তে দিত না,

   মাথায় কোনও চোট পেতে না।

   অথচ

   মা’কে লোকেরা কালো পেঁচি বলতো,

   আমরাও।

   বোকা বুদ্ধু বলে গাল দিতাম মা’কে।

   মা কষ্ট পেতো

   মা কষ্ট পেলে আমাদের কিছু যেতো আসতো না।

   আমাদের কিছুতেই কিছু যেতো আসতো না,

   মা জ্বরে ভুগলেও না,

   মা জলে পড়লেও না,

   মা না খেয়ে শুকিয়ে কাঁটা হয়ে গেলেও না,

   পরনের শাড়ি ছিঁড়ে ত্যানা হয়ে গেলেও না,

   মা’কে মা বলে মনে হতো, মানুষ বলে না।

   মা মানে সংসারের ঘানি টানে যে

   মা মানে সবচেয়ে ভালো রাঁধে যে, বাড়ে যে,

   কাপড় চোপড় ধুয়ে রাখে গুছিয়ে রাখে যে

   মা মানে হাড় মাংস কালি করে সকাল সন্ধে খাটে যে

   যার খেতে নেই, শুতে নেই, ঘুমোতে নেই

   যার হাসতে নেই

   যাকে কেবল কাঁদলে মানায়

   শোকের নদীতে যার নাক অবধি ডুবে থাকা মানায়

   মা মানে যার নিজের কোনও জীবন থাকে না।

   মা’দের নিজের কোনও জীবন থাকতে নেই!

   মা ব্যাথায় চেঁচাতে থাকলে বলি,

   ও কিছু না, খামোকা আহলাদ।

   মরে গেলে মা’কে পুঁতে রাখি মাটির তলায়,

   ভাবি যে বিষম এক কর্তব্য পালন হলো

   মা নেই।

   আমাদের এতেও কিছু যায় আসে না।

২. একটি অকবিতা

আমার মা যখন মারা যাচ্ছিলেন, সকালবেলা স্নান করে জামাজুতো পরে ঘরবার হলেন বাবা, চিরকালের অভ্যেস। বড়দা সকালের নাস্তায় ছ’টা ঘিয়ে ভাজা পরোটা নিলেন, সঙ্গে কষা মাংস, এ না হলে নাকি মুখে রোচে না তাঁর। ছোড়দা এক মেয়েকে বুকে মুখে হাত বুলিয়ে বিছানার দিকে টানছিলেন। সারা গায়ে হলুদ মেখে বসেছিলেন বড়বৌদি, ফর্সা হবেন, গুনগুন করে হিন্দি ছবির গান গাইছিলেন, চাকরবাকরদের বলে দিয়েছেন ইলিশ ভাজতে, সঙ্গে ভুনা খিচুড়ি। ভাইয়ের ছেলেগুলো মাঠে ক্রিকেট খেলছিলো, ছক্কা মেরে পাড়া ফাটিয়ে হাসছিল। মন ঢেলে সংসার করা বোন আমার স্বামী আর সন্তান নিয়ে বেড়াতে বেরোলো শিশুপার্কে। মামারা ইতিউতি তাকিয়ে মা’র বালিশের তলায় হাত দিচ্ছিল সোনার চুড়ি আর পাঁচশ টাকার নোট পেতে। খালি ঘরে টেলিভিশন চলছিল, যেতে আসতে যে কেউ দেখে নেয় তিব্বত টুথপেস্ট নয়তো পাকিজা শাড়ির বিজ্ঞাপন। আমি ছাদে বসে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে নারীবাদ নিয়ে চমৎকার একটি কবিতা লিখবো বলে শক্ত শক্ত শব্দ খুঁজছিলাম।

মা মারা গেলেন।

বাবা ঘরে ফিরে জামাকাপড় ছাড়লেন। বড়দা খেয়ে দেয়ে ঢেঁকুর তুললেন। ছোড়দা রতিকর্ম শেষ করে বিছানা থেকে নামলেন। বড়বৌদি স্নান সেরে মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে ইলিশ ভাজা দিয়ে গোগ্রাসে কিছু খিচুড়ি গিলে মুখ মুছলেন। ভাইয়ের ছেলেগুলো ব্যাটবল হাতে নিয়ে মাঠ ছাড়লো। স্বামী কন্যা নিয়ে বোনটি শিশুপার্ক থেকে ফিরলো। মামারা হাত গুটিয়ে রাখলেন। আমি ছাদ থেকে নেমে এলাম। ছোটরা মেঝেয় আসন পেতে বসে গেলো, টেলিভিশনে নাটক শুরু হয়েছে। বড়দের এক চোখ মায়ের দিকে, আরেক চোখ টেলিভিশনে। মায়ের দিকে তাকানো চোখটি শুকনো। নাটকের বিয়োগান্তক দৃশ্য দেখে অন্য চোখে জল।

৩. দুঃখবতী মা

মা’র দুঃখগুলোর ওপর গোলাপ-জল ছিটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল,

যেন দুঃখগুলো সুগন্ধ পেতে পেতে ঘুমিয়ে পড়ে কোথাও

ঘুমটি ঘরের বারান্দায়, কুয়োর পাড়ে, কিংবা কড়ই তলায়।

সন্ধেবেলায় আলতো করে তুলে বাড়ির ছাদে রেখে এলে

দুঃখগুলো দুঃখ ভুলে চাঁদের সঙ্গে খেলতো হয়তো বুড়িছোঁয়া খেলা।

দুঃখরা মা’কে ছেড়ে কলতলা অবধি যায়নি কোনওদিন।

যেন এরা পরম আত্মীয়, খানিকটা আড়াল হলে বিষম একা পড়ে যাবেন মা,

কাদায় পিছলে পড়বেন, বাঘে ভালুকে খাবে, দুষ্ট জ্বিনেরা গাছের মগডালে

বসিয়ে রাখবে মা’কে----

দুঃখগুলো মা’র সঙ্গে নিভৃতে কী সব কথা বলতো..

কে জানে কী সব কথা

মা’কে দুঃখের হাতে সঁপে বাড়ির মানুষগুলো অসম্ভব স্বস্তি পেতো

দুঃখগুলোকে পিঁড়ি দিতো বসতে,

লেবুর শরবত দিত, বাটায় পান দিত,

দুঃখগুলোর আঙুলের ডগায় চুন লেগে থাকতো...

ওভাবেই পাতা বিছানায় দুঃখগুলো দুপুরের দিকে গড়িয়ে নিয়ে

বিকেলেই আবার আড়মোড়া ভেঙে অযুর পানি চাইতো,

জায়নামাজও বিছিয়ে দেওয়া হতো ঘরের মধ্যিখানে।

দুঃখগুলো মা’র কাছ থেকে একসুতো সরেনি কোনওদিন।

ইচ্ছে ছিল লোহার সিন্দুরে উই আর

তেলাপোকার সঙ্গে তেলাপোকা আর

নেপথলিনের সঙ্গে ওদের পুরে রাখি।

ইচ্ছে ছিল বেড়াতে নিয়ে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রের জলে, কেউ জানবে না,

ভাসিয়ে দেবো একদিন

কচুরিপানার মতো, খড়কুটোর মতো, মরা সাপের মতো ভাসতে ভাসতে

দুঃখরা চলে যাবে কুচবিহারের দিকে

ইচ্ছে ছিল

দুঃখগুলো মা’র সঙ্গে শেষ অবধি কবর অবধি গেছে।

তুলে নিয়ে কোথাও যে পুঁতে রাখবো অথবা ছেঁড়া পুঁতির মালার মতো ছুড়বো

রেললাইনে, বাঁশঝাড়ে, পচা পুকুরে। হলো কই!

মা ঘুমিয়ে আছেন, মা’র শিথানের কাছে মা’র দুঃখগুলোও আছে,

নিশুত রাতেও জেগে আছে একা একা।

৪. দেশ বলতে এখন

দেশ এখন আমার কাছে আস্ত একটা শ্মশান,

শ্মশানে দাঁড়িয়ে প্রতিরাতে একটি কুকুর কাঁদে,

আর এক কোণে নেশাগ্রস্ত পড়ে থাকে চিতা জ্বালানোর ক’জন লোক।

দেশ এখন আমার কাছে আর শস্যের সবুজ ক্ষেত নয়,

স্রোতস্বিনী নদী নয়, রোদে ঝিলমিল দীঘি নয়,

ঘাস নয়, ঘাসফুল নয়...

দেশ ছিল মা’র ধনেখালি শাড়ির আঁচল

যে আঁচলে ঘাম মুছে, চোখের জল মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন মা, দরজায়।

দেশ ছিল মা’র গভীর কালো চোখ,

যে চোখ ডানা মেলে উড়ে যেতো রোদ্দুরে, রাত্তিরে,

যেখানেই ভাসি, ডুবি, পাড় পাই—খুঁজতো আমাকে।

দেশ ছিল মা’র এলো চুলের হাতখোঁপা,

ভেঙে পড়তো, হেলে পড়তো, রাজ্যির শরম ঢাকতো আমার।

দেশ ছিল মা’র হাতে সর্ষের তেলে মাখা মুড়ি

মেঘলা দিনে ভাজা ইলিশ, ভুনো খিচুড়ি

দেশ ছিল মা’র হাতের ছ’জোড়া রঙিন চুড়ি।

দেশ ছিল বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে মা মা বলে ডাকার আনন্দ

কনকনে শীতে মা’র কাঁথার তলায় গুটিশুটি শুয়ে পড়া,

ভোরবেলায় শিউলি ছাওয়া মাঠে বসে ঝাল পিঠে খাওয়া।

অন্ধকারে মুড়ে,

দূরে,

নৈঃশব্দের তলায় মাটি খুঁড়ে

দেশটিকে পুরে,

পালিয়েছে কারা যেন,

দেশ বলে কেউ নেই এখন, কিছু নেই আমার।

খা খা একটি শ্মশান সামনে, একটি কুকুর, আর ক’জন নেশাগ্রস্ত লোক।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।