দুপুর ০৩:৩১ ; রবিবার ;  ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮  

নভেরা : অন্তরালবর্তী জীবনের শেষ মৃত্যুতে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জামান শরীফ || 

রবীন্দ্রনাথের ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের কাদম্বিনী ‘মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই।’ শিল্পী নভেরা আহমেদের মৃত্যুর ভিতর দিয়েও মিথ্যে প্রমাণ হলো তাকে নিয়ে গড়ে ওঠা মৃত্যু-পুরাণ। নিজেকে তিনি এতটাই লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন যে তার নিকটজনেরাও ঠিক জানতেন না তিনি বেঁচে আছেন কি-না। তার মৃত্যু সম্পর্কে একপ্রকার নিশ্চিত হয়েই ১৯৯৮ সালে ‘বাংলাদেশের নারী চরিতাভিধান’-এ সাঈদা জামান ‘১৯৮৯ সালে তার মৃত্যু হয়েছে’ মর্মে একটি তথ্য সন্নিবেশ করেছেন। কিন্তু কেনো তিনি এই অন্তরালবর্তী জীবন বেছে নিয়েছিলেন সে বিষয়ে খুব সুস্পষ্ট করে কিছু জানা যায় না। তিনি নিজেও কারো কাছে কিছু বলেছেন এমন উল্লেখ দেখতে পাই না। তবে তার মনে নিশ্চয়ই কোনো ক্ষোভ বা বেদনা ছিল। হতে পারে শহীদ মিনারের স্থাপত্য নকশার পরিকল্পনাকারী হিসেবে হামিদুর রহমানের পাশাপাশি তার অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা যথেষ্ট সংখ্যক কাজের ফরমায়েশ না পাওয়া কিংবা ভাস্কর হিসেবে এখানে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে না পারার হতাশা। মেহবুব আহমেদ তার একটি লেখনীতে জানাচ্ছেন যে ১৯৫৬ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত নভেরা ঢাকায় ছিলেন। ১৯৫৭ সালে আব্দুর রাজ্জাক ভাস্কর্যের ওপর আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ঢাকায় ফিরে আর্ট কলেজে যোগদান করেন। নভেরাও এইরকম কোনো সুযোগ পেলে হয়তো ঢাকায় থিতু হতে পারতেন। সেই না পারাটাও তার ছুটে বেড়ানোর একটা কারণ। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাকে কিছু কাজ জুটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাহোর যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি গিয়েছিলেন, সেখানে কাজও করেছিলেন এবং All Pakistan Painting and Sculpture Exhibition-এ তার Child Philosopher ছবিটি প্রথম পুরস্কার লাভ করেছিল। PIA তার একটা কাজ কিনেছিল, কিন্তু তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু করা হয়ে ওঠেনি। এরপর সেখান থেকে ভরত নট্যম শিখতে মুম্বাই গিয়ে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য প্রথমে লন্ডন এবং সেখানে অস্ত্রোপচারের পর প্যারিস চলে যান। এরপর বন্ধু এস এম আলীর সহযোগিতায় ব্যাংককে একটি প্রদর্শনী করেছিলেন ১৯৬৮ সালে, আর স্বেচ্ছানির্বাসনের আগে ১৯৭৩ সালে প্যারিসে হয়েছিল তার শেষ প্রদর্শনী।

শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়টি তাকে অবশ্যই হতাশ করেছিল, তবে তার চেয়ে বেশি হতাশ করেছিল বোধহয় বন্ধু হামিদুর রহমানের আচরণ। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি যে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের একটি প্রামাণ্যচিত্রে হামিদুর রহমান তার প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে শহীদ মিনারের সহশিল্পী হিসেবে নভেরার নাম উল্লেখ করেননি। শিল্পী হয়ে আরেক শিল্পীর কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এই কুণ্ঠা আমাদের বিস্মিত করে। আরো অবাক লাগে যে আজ মৃত্যুর পর এ নিয়ে যত হইচই হচ্ছে তার কিঞ্চিতও কি হয়েছে যখন আমরা জানতে পারলাম যে তিনি বেঁচে আছেন? বিশেষ করে যারা এই ঘটনার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী তারা কি তার স্বীকৃতির জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন? তবে এ নিশ্চয়ই তার অভিমানের একমাত্র কারণ নয়। প্রকৃত কারণটি হয়তো তিনিই বলতে পারতেন। আমরা জানি না তা তিনি কাউকে এ সম্পর্কে কিছু জানিয়ে গেছেন কি-না। তবে পরবর্তী সময়ে আবার এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়ার আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। 

নভেরা আহমেদকে নিয়ে যারা লেখালেখি করেছেন তাদের অনেকই তার জন্মসাল হিসেবে আনুমানিক ১৯৩০ সালকে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু গত বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত তার রেট্রোস্পেকটিভের ব্রোশারের উদ্ধৃতি দিয়ে ১৭ জানুয়ারি ২০১৪ সালে ‘প্রথম আলো’য় লিখিত নিবন্ধে আনা ইসলাম জানাচ্ছেন যে শিল্পীর জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৯ মার্চ। একই নিবন্ধে উল্লেখ করা হচ্ছে, ‘বাবা মেয়েকে আইনশাস্ত্র পড়তে পাঠিয়ে দেন লন্ডনে, ১৯৫১ সালে’। তথ্যটি বিভ্রান্তিকর। সরল গাণিতিক হিসেব মেনে জিজ্ঞাসা করতে হয় যে মাত্র ১২ বছরে কি কেউ আইনশাস্ত্র পড়ার মতো শিক্ষায়তনিক যোগ্যতা অর্জন করেন? এই হিসেব মেনেই নিবন্ধের শেষে বলা হচ্ছে, ‘আমাদের সময়ের জীবন্ত কিংবদন্তি নভেরার বয়স এখন ৭৫ বছর।’ কিন্তু মৃত্যুর পর বিভিন্ন মাধ্যমে যখন বলা হচ্ছে যে শিল্পী ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন তখন সেটাকেই সঠিক বলে মনে হয়। সেই হিসেবে ১৯৩০ বা তার এক-আধবছর আগেপিছেই নভেরা আহমেদের জন্ম। তবে এই লেখাতে আনা ইসলাম তার ব্যক্তিজীবনের চর্চা ছেড়ে শিল্পকর্মের মূল্যায়নের বিষয়টিকে জোর দেওয়ার যে দাবী জানিয়েছেন তার সাথে সহমত পোষণ করতেই হয়। তবে একথাও সত্য যে ব্যক্তিজীবনের এই রহস্যের স্রষ্টা তার অনেক দুর্বোধ্য শিল্পকর্মের মতো তিনি নিজেও। 

১৯৫১ সালে ‘ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস এন্ড ক্রাফটস’-এ ভর্তি হয়ে ১৯৫৫ সালে তিনি ডিপ্লোমা লাভ করেন। সেখানে চেক প্রজাতন্ত্রের অধিবাসী ড. ক্যারোল ফোগেলের ছাত্রী ছিলেন তিনি। তার সনদে লিখেছিলেন, ‘...আমি নিশ্চিত, এখানে তার বিকশিত ব্যক্তিত্ব প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে একজন দক্ষ শিল্পী ও প্রেরণা জোগানো শিক্ষক হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।’ ইংল্যান্ড ছাড়াও তিনি ইতালি ও ফ্রান্স গিয়ে আধুনিক ভাস্কর্যের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। ইতালিতে ভেন্তুরিনো ভেন্তুরি নামে একজন ভাস্করের কাছে নভেরা দু মাস কাজ শেখেন। ১৯৫৬ সালে দেশে ফিরে তিনি স্থপতি মাজহারুল ইসলামের আধুনিক স্থাপত্য পরিকল্পনায় নির্মিত পাবলিক লাইব্রেরির প্রবেশপথে একটি Bas-relief করেছিলেন। এখানেই ১৯৫৭ সালে নভেরা ও হামিদুর রহমানের যৌথ প্রদর্শনী হয়েছিল। এর ৩ বছর পর ১৯৬০ সালে এশিয়া ফাউন্ডেশন ও পাকিস্তান ইউনাইটেড নেশনস-এর উদ্যোগে তার একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়। দেশে ফেরার পর ৫ বছর বা তার বেশি কিছু সময় তিনি অবস্থান করেছিলেন যে সময়টা তার শিল্পচর্চার প্রারম্ভিক কাল, কিন্তু নভেরা এই সময়ে যে কাজ করেছেন তাতে নবিসের কোনো ছাপ ছিল না, বরং এই কাজগুলো দিয়েই তিনি আমাদের কাছে সুপরিচিত। তার কাজের তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক আলোচনা অন্য পরিসরের জন্য তুলে রেখে বলতে চাই যে তার মূল্যায়নে রাষ্ট্রের অবহেলা ছিল। একুশে পদকের জন্য তার নাম যথেষ্ট দেরিতে বিবেচনা করা হয়েছে। শহীদ মিনার নির্মাণের ৩৭ বছর পর তাকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে যার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো মুশকিল। 

তাকে নিয়ে হাসনাত আব্দুল হাই একটি জীবনভিত্তিক উপন্যাস রচনা করেছেন। নাম দিয়েছেন ‘নভেরা’। বইটি অনেকের কাছে প্রশংসিত হয়েছে বটে, কিন্তু যতদূর মনে পড়ে আনা ইসলামের একটি লেখাতে পড়েছিলাম যে নভেরা বইটি হাতে নিয়ে অবহেলায় বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। তা কি গ্রন্থটির সঠিক তথ্যঘাটতি, নাকি খ্যাতি থেকে নিজেকে দূরে রাখার প্রবল ঔদাসিন্যের কারণে? নাকি এমন কোনো অভিমান যা আমাদের অজানা? নভেরার শারীরিক অস্তিত্ব প্রকৃতির নিয়মে হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সকলের। সে দায়িত্ব পালনে সকলে এগিয়ে আসবেন এখন তা শিল্পপ্রেমীদের একমাত্র প্রত্যাশা।      

     

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।