রাত ১২:১২ ; মঙ্গলবার ;  ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

উত্তরাধুনিক পঠনপাঠনে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

শরীফ আতিক-উজ-জামান ||

বিংশ শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী মনীষী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি সংস্কৃতি, ভারতীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিরল প্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতার অধিকারী এই মানুষটির লেখনী বর্তমান সময়ে নতুন প্রসঙ্গসূত্রে নতুন মাত্রা লাভ করছে। তাঁর দর্শনে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মূল ধারণার যোগসূত্র স্বীকৃত একটি বিষয়। একদিকে বেদ ও উপনিষদের মর্মবাণী যেমন তিনি সযত্নে ধারণ করেছেন অন্যদিকে অষ্টাদশ শতকের ইয়োরোপীয় ‘এনলাইটেনমেন্ট’―এর মূল চেতনা যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশ দ্বারা তিনি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। সব ধরনের দার্শনিক অন্বেষণের সূচনা হলো আত্মসচেতনতা। মানুষের মাঝে যে দ্বান্দ্বিক সত্তা রয়েছে তা থেকে সে সত্যের সন্ধানে নিমগ্ন হয়। মানুষ একইসাথে সসীম ও অসীম। নিজের মাঝে সে সত্তা ও প্রকৃতির যোগসূত্র আবিষ্কার করে। একদিকে প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী সে প্রয়োজনের বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য হয় আবার আধ্যাত্মিক বা অন্তর্জাগতিক ক্ষেত্রে সে স্বাধীন। এই দ্বান্দ্বিকতা শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, নৈতিকতার সবক্ষেত্রেই বিদ্যমান। মানুষের ব্যক্তিসত্তা খোঁজে পূর্ণ সত্য, নিখুঁত সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধ সদগুণ। রবীন্দ্রনাথ মানুষের ব্যক্তিস্বাতত্র্যে যেমন আস্থাশীল ছিলেন তেমনি অতিপ্রাকৃত মতবাদ ও ঐশী প্রত্যাদেশকে অগ্রাহ্য করে প্রাকৃতিক কারণ ও নিয়মাবলীকে সকল প্রসঙ্গ ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট মনে করেছেন। সব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি মানুষের সংহতি কামনা করতেন। একজন ব্রা‏‏হ্ম হিসেবে তিনি প্রকৃতিকে স্রষ্টার প্রকাশ বলে মনে করতেন। প্রকৃতির নানা রং, রূপ ও বৈশিষ্ট্যের মাঝে তাঁর প্রকাশ থাকে। প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় যোগাযোগকে তিনি বিশুদ্ধ, নির্মল ও প্রাণশক্তির এক অফুরন্ত উৎস হিসেবে দেখেছেন। মানুষে-মানুষে আধ্যাত্মিক যোগাযোগের বিষয়টিও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। তাঁর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধারণা সামাজিক গোষ্ঠীর বিকাশের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি ব্যক্তির আধ্যাত্মিক সদগুণের ভিত্তিতে সামাজিক গোষ্ঠীগুলো চিনতে উৎসাহ যুগিয়েছেন। একে তিনি সংকীর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে বোঝান নি। একটি বৈশ্বিক সংহতির আকাঙ্ক্ষা ছিল তার। আন্তর্জাতিকতাবাদের পক্ষে তিনি কথা বলেছেন তবে তা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়। সমস্ত বিশ্ব একটি অন্তর্জাগতিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে―এমন প্রত্যাশা ছিল তার। মানুষের মৌলিক সংহতিতে আস্থাশীল রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধে বিশ্বাসী ছিলেন। 

উত্তরাধুনিক দর্শন মনে করে যে সত্যের কোনো অস্তিত্ব নেই অথবা তা জানা অসম্ভব। সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে সত্য একটি আপেক্ষিক বিষয়। উত্তরাধুনিকরা বিশ্বাস করেন যে সত্য ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি কর্তৃক ভিন্ন ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত হয়ে থাকে। সত্য আপেক্ষিক, সর্বজনীন নয়। সনাতন ধারণা হলো, সত্য প্রকৃতিগতভাবেই সর্বজনীন ও অবিমিশ্র, আপেক্ষিক সত্য বলে কিছু নেই। কিন্তু উত্তরাধুনিকদের দ্বারা ’সত্য’ শব্দটি ‘পরিপ্রেক্ষিত’, ’দৃষ্টিভঙ্গি’ ইত্যাদি শব্দ দ্বারা স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। তারা তাদের বিশ্বাস থেকে প্রচার করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে যে বিশ্বের বিভিন্ন গোষ্ঠী মতামত প্রকাশ করেছে যে সত্যের জ্ঞান অনুমানসিদ্ধ। আধুনিকতা থেকে উত্তরাধুনিকতায় উত্তরণের কালে স্থানিক বা আঞ্চলিক ভাষা বা কথনসূত্র এবং মানুষের বৈচিত্র্যমণ্ডিত অভিজ্ঞতা বৃহৎ আখ্যানের (Meta Narrative) জায়গা নিয়েছিল। আধুনিকতাবাদের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের মাঝে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

জীবন-বীক্ষণ ও ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ তার সময়ের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। তিনি তার সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা গভীর অভিনিবেশে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার নতুন ধরনের চিত্রকলা দীর্ঘকাল পরে বোদ্ধাদের মনযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। তার লেখনীর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা সারা বিশ্বে সাড়া ফেলেছে। তার ভবিষ্যৎ বাণী ও ভাবনা তাকে আজো সর্বত্র গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধিবিদ্যক জগতে মানুষ প্রতিদিন যে সংকটের মোকাবেলা করছে তার লেখনী সেই বিষয়ে মানুষকে নতুন ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। একটি উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। সব ধরনের কূপমূণ্ডকতা, সংকীর্ণতা, জাত-পাত ভেদ, নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তার সচেতন প্রতিবাদ আমাদের ঋদ্ধ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষ সবসময় দুইটি জগতে বিচরণ করে। একটি তার নিজের ভিতরের জগৎ, অন্যটি বাহ্যিক জগৎ। মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিক, ধর্মীয় ইত্যাদি সব জীবনই এই দুই জগৎকে আবিষ্কারের পদক্ষেপ হিসেবে তিনি দেখতেন।

উত্তরাধুনিক মতবাদ হচ্ছে যে কোনো মানুষেরই বাস্তবতার গভীরে সহজে প্রবেশের ক্ষমতা নেই। বাস্তবতার যে কোনো অবয়বের ব্যাখ্যা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত। বাস্তবতার  যে কোনো সংজ্ঞা বা কোনো কিছু চিনতে পারা একটি কল্পিত অবস্থা ছাড়া আর কিছু নয়। সত্যের একমাত্র প্রকৃতি বা জ্ঞানের একমাত্র ধরন থাকতে পারে না। মানুষের ব্যক্তিসত্তা তার আত্মার সাথে তাকে সম্পৃক্ত করে বিশেষ অর্থ তৈরি করতে পারে। রবীন্দ্রনাথের ‘সম্পূর্ণ মানুষের ধারণা’ এই উত্তরাধুনিক চেতনার সাথে সম্পর্কিত। তার সমাজ ও রাষ্ট্রের ধারণা এবং সব ধরনের বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যসহ সমাজকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি উত্তরাধুনিক ধারণার সমর্থক। একটি সুশীল সমাজের বহুমুখিনতা ও বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের কথা তিনি বারংবার তার লেখনীতে উল্লেখ করেছেন এবং নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে এই বিশ্বাসকে লালন করার পাশাপাশি একটি সুশীল সমাজের উপরিকাঠােেমা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে চেয়েছেন। তার কাছে মানুষের গুরুত্ব অনেক বেশি। মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে এবং সেই মতো কাজ করবে। রাজনীতি, শিল্প, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা সম্পর্কিত তার ভাবনাকে এই বিশ্বাসের আলোকে দেখতে হবে। 

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি রবীন্দ্রনাথের আস্থা ছিল না। শিক্ষা নিয়ে তার নিজস্ব ভাবনা ছিল যার কথা বারংবার বলেছেন এবং যে ভাবনার ফসল ছিল শান্তিনিকেতন। সমগ্র বিশ্বের সাথে নিজের যোগসূত্র ঘটাতে, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির নতুন আলোয় বিশ্বকে পাল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। উত্তরাধুনিক শিক্ষাভাবনায় জ্ঞানকে শুধু একগুচ্ছ প্রস্তাবনা হিসেবে ভাবা হয়নি, বরং তা বেঁচে থাকার ও শেখার একটি উপায়। শিক্ষা বাস্তবতা উপলব্ধির সাথে সাথে নিজের অধিকার অর্জনের একটি উপায়ও বটে। উত্তরাধুনিক শিক্ষার উদ্দেশ্য একটি বিশেষ অধিকার বা বিশেষ প্রতর্কের ওপর নির্ভর করা নয়,একটি বহুত্ববাদী, অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা পরিবেশ যা নতুন এক ধরনের ভাষার অনুসন্ধানে নিয়োজিত আছে। রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষা হলো ব্যক্তির পরিপূর্ণ উন্নয়নের একটি মাধ্যম। শিক্ষা নতুন এক ধরনের জীবনধারা গড়ে তুলতে সক্ষম, বৈশ্বিক মানবের পূর্ণ ধারণা লাভ করবে যে মানবই জগতের চূড়ান্ত বাস্তবতা। বিশ্বমানবের সাথে নিজের সম্পৃক্ততা বিষয়ে শিক্ষা এককভাবে মানুষের মনে উপলব্ধি জাগাতে পারে যা মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশে ভূমিকা রাখে। প্রায় একশ বছর আগে শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যা ভেবেছিলেন উত্তরাধুনিক যুগেও তার প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণিত হয়েছে। ‘আশ্রমের শিক্ষা’ প্রবন্ধে তিনি সেই বিশ্বমানবের কথা বারংবার বলেছেন, ‘আর-একটা কথা আছে। ছেলেরা বিশ্বপ্রকৃতির অত্যন্ত কাছের। আরামকেদারায় তারা আরাম চায় না, সুযোগ পেলেই গাছের ডালে তারা চায় ছুটি। বিরাট প্রকৃতির নাড়ীতে নাড়ীতে প্রথম প্রাণের বেগ নিগূঢ়ভাবে চঞ্চল। শিশুর প্রাণে সেই বেগ গতিসঞ্চার করে। বয়স্কদের শাসনে অভ্যাসের দ্বারা যে-পর্যন্ত তারা অভিভূত না হয়েছে সে পর্যন্ত কৃত্রিমতার জাল থেকে মুক্তি পাবার জন্যে তারা ছটফট করে। আরণ্য ঋষিদের মনের মধ্যে ছিল চিরকালের অমর ছেলে। তাই কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অপেক্ষা না রেখে তাঁরা বলেছিলেন, এই যা-কিছু সমস্তই প্রাণ হতে নিঃসৃত হয়ে প্রাণেই কম্পিত হচ্ছে। এ কি বের্গ্‌সঁ'এর বচন! এ মহান্‌ শিশুর বাণী। বিশ্বপ্রাণের স্পন্দন লাগতে দাও ছেলেদের দেহে মনে, শহরের বোবা কালা মরা দেয়ালগুলোর বাইরে।’

উত্তরাধুনিক পাঠ্যক্রম পদ্ধতি-নির্ভর আর তা উচ্চ শৃঙ্খলার ভাবনা-দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতার ওপর জোর দিয়ে থাকে। শিক্ষাক্রম কৌশলে শিক্ষার্থীর ভিন্নতার বিষয়টিও গুরুত্ব লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ কর্ম ও জীবনের অভিজ্ঞতা নির্ভর পাঠ্যক্রমের পক্ষে আজীবন ওকালতি করে গেছেন যা পরিপূর্ণ মানব গঠনের সহায়ক। এই ধারণার সাথে উত্তরাধুনিক ভাবনার ঐক্য আছে। শিক্ষাপদ্ধতির ক্ষেত্রে উত্তরাধুনিকতার পক্ষপাতিত্ব কর্ম ও প্রকল্প-ভিত্তিক শিক্ষায় যার ফলে জ্ঞানার্জন সৃষ্টিশীলতায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের কর্ম, বিতর্ক, আলোচনা ও আবিষ্কার নির্ভর শিক্ষাপদ্ধতিও এই মতবাদের সমর্থক যা ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতাকে পূর্ণতা দেয়। উত্তরাধুনিকরা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা এবং দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে বেছে নিয়েছেন যে কথা রবীন্দ্রনাথও বলেছিলেন। ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে তিনি এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, 

‘আমাদের ভীরুতা কি চিরদিনই থাকিয়া যাইবে? ভরসা করিয়া এটুকু কোনোদিন বলিতে পারিব না যে, উচ্চশিক্ষাকে আমাদের দেশের ভাষায় দেশের জিনিস করিয়া লইতে হইবে? পশ্চিম হইতে যা কিছু শিখিবার আছে জাপান তা দেখিতে দেখিতে সমস্ত দেশে ছড়াইয়া দিল, তার প্রধান কারণ, এই শিক্ষাকে তারা দেশী ভাষার আধারে বাঁধাই করিতে পারিয়াছে।... এমনি করিয়া বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি এবং বাংলা ভাষার ধারা যদি গঙ্গাযমুনার মতো মিলিয়া যায় তবে বাঙালি শিক্ষার্থীর পক্ষে এটা একটা তীর্থস্থান হইবে। দুই স্রোতের সাদা এবং কালো রেখার বিভাগ থাকিবে বটে কিন্তু তারা এক সঙ্গে বহিয়া চলিবে। ইহাতেই দেশের শিক্ষা যথার্থ বিস্তীর্ণ হইবে, গভীর হইবে, সত্য হইয়া উঠিবে।’

উত্তরাধুনিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর যে আদল রবীন্দ্রনাথও সেই আদলের কথা বলে গেছেন। উত্তরাধুনিক শিক্ষক হবেন ‘ফ্যাসিলিটেটর’ যিনি শিক্ষার্থীর নিজস্ব ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহ যোগানোর পাশাপাশি নিজস্ব মত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাকে পরিহার করবেন। ‘আশ্রমের শিক্ষা’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, 

‘দেখেছি মনে মনে তপোবনের কেন্দ্রস্থলে গুরুকে। তিনি যন্ত্র নন, তিনি মানুষ--নিষ্ক্রিয়ভাবে মানুষ নন, সক্রিয়ভাবে; কেননা মনুষ্যত্বের লক্ষ্য-সাধনেই তিনি প্রবৃত্ত। এই তপস্যার গতিমান ধারায় শিষ্যের চিত্তকে গতিশীল করে তোলা তাঁর আপন সাধনারই অঙ্গ। শিষ্যের জীবন প্রেরণা পায় তাঁর অব্যবহিত সঙ্গ থেকে।’

প্রকৃতির কোলে উন্মুক্ত পরিবেশে শিক্ষা প্রদানের যে ধারণা তিনি শান্তিনিকেতনে প্রবর্তন করেছিলেন তার সাথে উত্তরাধুনিক শিক্ষালয়ের আদর্শিক মিল খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে নতুন উপলব্ধির সাথে মিলিয়ে দেখতে পারবে অর্থাৎ শিক্ষালাভের স্থানটি শিক্ষার্থীর চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। 

রবীন্দ্রনাথ রেনেসাঁ পুরুষ। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর শিক্ষার ভিত নির্মাণ করতে চাইলেও বৈশ্বিক সংস্কৃতির সাথে যোগসূত্র তৈরির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। নিজস্ব ঐহিত্যের কৌলিণ্য বজায় রেখেই পাশ্চাত্য মূল্যবোধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জ্ঞান ইত্যাদির চর্চাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বৈচিত্র্যমণ্ডিত পরিবেশে ব্যক্তির সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রেখে চলার যোগ্যতা অর্জনে তিনি উৎসাহ যুগিয়েছেন। একজন শিক্ষক বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও মতামতকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের ক্ষমতা অর্জনে তার শিক্ষার্থীকে সহায়তা করবেন এবং অন্ধভাবে সেগুলো বিশ্বাস করার পরিবর্তে যুক্তি দিয়ে বিবেচনার মাধ্যমে উপসংহারে পৌঁছানোর ব্যাপারে উৎসাহ যোগাবেন। শিক্ষা তিনি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার মনে করতেন, আর তাই তরুণদের যুক্তিবাদী ও স্বাধীন চিন্তাক্ষমতার অধিকারী হতে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা আচার ও ঐতিহ্যের অন্ধ অনুসরণকারী হোক তা তিনি কোনোভাবেই চাইতেন না।
উত্তরাধুনিকতার আবির্ভাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। বলা হয়ে থাকে আধুনিকতা এই পর্যায়ে এসে খানিকটা গুরুত্ব হারিয়েছিল এবং সমগ্রতাবাদের সাথে তার বিশেষ এক যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল। উত্তরাধুনিকতার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা চল্লিশের দশকে বিশেষ করে হোর্হে লুই বোর্হেসের রচনায় লক্ষ করি। তবে বেশিরভাগ সমালোচক মনে করেন উত্তরাধুনিকতার জন্ম আধুনিকতার সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য এবং পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে ষাটের দশকে এসে এই ধারাটি আধুনিকতাবাদ থেকেও প্রবল হয়ে ওঠে। তখন থেকে উত্তরাধুনিকতা বিতর্কশূন্য না হলেও শিল্পসাহিত্য, সঙ্গীত, দর্শনের একটি প্রবল প্রভাববিস্তারী ধারা হিসেবে চলে আসছে। 
বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে উনিশ শতকের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির হতাশা চরম উদ্বেগে পরিণত হয়। আর শিল্পীরা এমন এক শিল্পনির্মাণ ধারার প্রতি সাড়া দেন যেখানে যুক্তি, শৃঙ্খলা, মর্যাদা, আশাবাদ, নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো উধাও হয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীতে পিকাসো তাঁর ক্যানভাসে এক বিচূর্ণিত পৃথিবী তুলে ধরলেন যেখানে শূন্যদৃষ্টির নিঃসঙ্গ ও হতাশ মানুষেরা ভিড় জমাতে লাগল। অনাকর্ষণীয় ছেঁড়াখোঁড়া পরিবেশে আবেগহীন নারী-পুরুষদের দেখা গেল এডওয়ার্ড হুপারের ক্যানভাসে। উইলেম দ্য কুনিংয়ের ‘নারী’ সিরিজের ছবিতে সব হারানোর ভীতি এবং দালির পরাবাস্তববাদী জগতে স্বপ্ন ও বাস্তবের অদ্ভুত দ্বৈরথ লক্ষ করা গেল। অ্যান্ডি ওয়ারহোলের অকিঞ্চিত বা লঘুকরণ পদ্ধতি কিংবা এদুয়ার্দ মুঙ্খ কর্তৃক গভীর শূন্যতার দিকে ধাবমান পৃথিবীতে গুরুত্বহীন হয়ে ওঠার ভীতি মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখাল তার অস্তিত্বের প্রহেলিকা। এ রকম কিছু ভয়ার্ত মুখ রবীন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন যার সাথে উত্তরাধুনিক চিত্রকলার মিল রয়েছে। এই মতবাদের আবির্ভাবের পূর্বেই রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু যে ব্যক্তি তার সময়ের অনেক আগে বিচরণ করতেন তার কর্মের সাথে এর ঐক্য খুঁজে পাওয়া খুব অসম্ভব নয়।
উত্তরাধুনিক পঠনপাঠনে রবীন্দ্র-দর্শন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু এই বিষয়ে তেমনভাবে আলো পড়েনি। এই রচনা একেবারেই প্রাথমিক আলো ফেলার প্রচেষ্টা। আগামীতে আরো গবেষণা এর একটি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব তুলে আনবে বলে বিশ্বাস করতে মন সায় দেয়। 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।