সন্ধ্যা ০৬:২৮ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || তৃতীয় পর্ব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

পূর্ব প্রকাশের পর

তখনো শেষ বেলার আলো নিভে যায়নি। দেবেশ রায়কে বিশ্রামে রেখে ঢাকা ক্লাব থেকে জহর সেনমজুমদার, রবিশংকর বল, পারভেজ হোসেনসহ বেরিয়ে পড়ি। ৯ এপ্রিল দিনটাই ছিলো বড় বেয়াড়া। রাস্তায় জ্যাম, মাত্রাতিরিক্ত মানুষ, ভ্যাপসা গরম— সব মিলিয়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। ঢাকার রাস্তাঘাট সম্পর্কে রবিশংকর বলের কিছুটা ধারণা রয়েছে। যার সামান্যও নেই জহর সেনমজুমদারের। কারণ; জন্মের পর তিনি এই প্রথম বাংলাদেশে। শাহবাগ মোড়ে এসে আমি সিদ্ধান্ত পাল্টাই; আজিজ মার্কেটে যাওয়ার আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাবো। আলো নিভে গেলে ওরা কিছু বুঝতে পারবেন না। পারভেজ হোসেন আমাদের রেখে আজিজ মার্কেটে চলে যান। বারডেমের পাশ থেকে পিজি হাসপাতাল (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল) দেখিয়ে জহর সেনমজুমদারকে বললাম— ওই যে দেখছেন ভবনটি, ওই ভবনটিতে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মারা যান। আর ওই যে দেখছেন আরেকটি ভবন, ওটি আমাদের জাতীয় যাদুঘর। এসব টুকিটাকি কথা বলতে বলতে জনসমুদ্র অতিক্রম করে আমরা এগুতে থাকি। জহর সেনমজুমদারকে জিজ্ঞেস করি আমাদের আর্ট কলেজের নাম শুনেছেন কি-না! জানালেন শুনেছেন। আর্ট কলেজ দেখিয়ে বলি এটিই সেই আর্ট কলেজ। জয়নুলের আত্মার নির্মাণ। একটু থমকে দাঁড়িয়ে কি যেন ভেবে নিয়ে আবার এগুতে থাকলেন আমাদের সঙ্গে। ছবিরহাটে উপস্থিত হয়ে বললাম এখানে প্রথাবিরোধী শিল্পীদের ছবির প্রদর্শনী হয়। চমকে উঠলেন জহর সেন। কারণ, তিনি নিজেও একজন প্রথাবিরোধী লেখক। আদর্শ মেনে চলা, আদর্শকে কর্মে রূপায়ন করা তার এক জীবনের গল্প। দুপুরের আড্ডায় স্পষ্ট করেই জানিয়ে ছিলেন, এই আদর্শের কারণে কতো কতো বন্ধুকে হারাতে হয়েছে জীবন-চলার পথ থেকে! নবারুণ ভট্টাচার্য ছিলেন তার আত্মার আত্মীয়। একবার কি যেন খিটমিট লেগে দুজন একরাতের জন্য বিচ্ছেদ রচনা করেছিলেন। পরে একে অন্যকে ফোন করে একে অপরের বাড়ি গিয়ে সে অভিমান দূর করেছিলেন। নবারুণের সঙ্গে এই সম্পর্ক আমৃত্যু অটুট ছিলো। নবারুণের মৃত্যু তাকে আরেক ধাপ নিঃসঙ্গ করে দিয়ে যায়।  
রবিশংকর বল শুরু থেকেই আমার কাছে যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জানের ফাঁসির বিষয়ে জানতে চাইছিলেন। বললেন— কবির তুমি আমাকে আপগ্রেডটা জানিও। সঙ্গে জানতে চাইলেন কোন স্থানটিতে অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছে সেই স্থানটির কথাও। মনে হচ্ছিলো নতুন কোনো লেখা তৈরির জন্য তিনি উপাত্ত খুঁজছেন। কবিরা লেখায় ইঙ্গিত দিয়ে যান। ঔপন্যাসিকদের ডিটেলে লিখতে হয়। আমরা ধীরে ধীরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করি। এগিয়ে যাই শিখা অনির্বাণের দিকে। তারপর মহান নেতার ৭ মার্চের ভাষণের স্থান। পুরো এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখেন দুই লেখক। শামীম রেজার ফোন বেজে ওঠে। —তোমরা কই? স্থানের কথা বললে দ্রুত আজিজে যাওয়ার কথা বলেন। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি, রবিশংকর বল এবং জহর সেনমজুমদার প্রায় একই স্বরে বলে উঠেন, এইস্থানে শিশু পার্ক কেনো? আমার বলতে কেনো যেন বাঁধে না, ৭-ই মার্চের ভাষণের এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে মানুষের দৃষ্টির আড়াল করতেই এমন একটি স্থানে শিশুপার্ক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু যে স্থান মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায়, তাকে দৃষ্টির আড়াল করা অসম্ভব। বহুবহু বছর পর হলেও ৭-ই মার্চের ঐতিহাসিক স্থানটি স্ব-মহিমায় ফিরে এসেছে। রেজার ফোন আবার বেজে ওঠে। আমরা দ্রুত আজিজ মার্কেটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে অভিজিৎ রায়কে যেখানে হত্যা করা হয় সে স্থানটি ছুঁয়ে যাই। রবিশংকর বল এবং জহর সেনমজুমদার একই কণ্ঠে বলে উঠলেন— কি করে সম্ভব এমন প্রকাশ্য রাস্তায় মানুষ কুপিয়ে হত্যা করা? 

দুই.

বিদিত  বইয়ের দোকানে গেলে ম্যানেজার মিঠু দুই লেখককে গ্রহণ করে নেন। মিঠু তোতা পাখির মতো জহর সেনমজুমদারের সবগুলো গ্রন্থের নাম আওড়াতে থাকেন। গেল কলকাতা বই মেলায় জহর সেনমজুমদারের কাব্যগ্রন্থ— ভবচক্র; ভাঙাসন্ধ্যাকালে, অর্ডার করলে কিভাবে হাতছাড়া হয়ে যায়, সে অভিজ্ঞতাও জানিয়ে দেন। জহর সেনমজুমদার কিছু একটা মিলাতে পারছিলেন না। সম্ভবত ভাবছিলেন বাংলাদেশে তার গ্রন্থের পাঠক রয়েছে এবং এভাবে রয়েছে এটি তার কাছে অভাবনীয়। কিভাবে কিভাবে যেন সোনায় সোহাগা হয়ে গেলো। দুপুরে রবিশংকর বলকে বলছিলাম তার এক ভক্ত পাঠকের কথা। দেখি সেই পাঠক অনিন্দ্য আরিফ ওই সময়টায় বিদিততে এসে হাজির। পরিচয় করিয়ে দেই রবিশংকর বলের সঙ্গে। খুবই আপ্লুত হন রবিশংকর বল। দুই লেখক ঘুরে ঘুরে বিদিত বইয়ের দোকানটি দেখেন। শামীম রেজা এসে এরপর দায়িত্ব নেন দুই লেখকের। তক্ষশিলা, পড়ুয়া, ইত্যাদি বইয়ের দোকানগুলো ঘুরিয়ে দেখান। 
এরই ফাঁকে প্রবল সংসারী হয়ে ওঠেন জহর সেনমজুমদার। বলেন— এই তোমরা কিন্তু আমাকে জামদানি শাড়ি কিনে দিতে ভুলো না। না হয় কলকাতায় ফিরে বাড়ি যাওয়া যাবে না! শামীম রেজা অভয় দিলে তবেই তিনি শান্ত হন। এসবে রবিশংকর বলের আগ্রহ নেই। অন্যদিকে আগেই বলেছি, দিনটি প্রসন্ন ছিলো না। আজিজে যখন গেলাম; কারেন্ট নেই। ফলে শামীম রেজা সিদ্ধান্ত নিলেন, বরং ক্লাবে ফিরে আড্ডা জমানো ভালো। ব্যক্তিগত কাজে আমাকে কিছুটা সময় দলছুট হতে হবে কানে কানে রেজাকে বললাম। জহর সেনমজুমদার সেদিকেও নজর রাখলেন। হই হই করে উঠলেন, এই না; তোমার যাওয়া যাবে না। তুমি নিশ্চয়ই কেটে পড়ার মতলবে আছো! বুঝিয়ে বললাম, মোটেও সেটা নয়। দ্রুত ক্লাবে ফিরে আসবো। রেজাও তাকে নিশ্চয়তা দিলেন। 
দলছুট এই সময়টায় কিছু প্রাসঙ্গিক কথা বলা প্রয়োজন বোধ করছি। কবি শামীম রেজা এবং জহর সেনমজুমদারের সঙ্গে কথা বলে যতদূর মনে হলো, সাহিত্যরাজনীতি বাংলাদেশের চেয়ে কলকাতায় আরো বেশি। জহর সেনমজুমদার যেহেতু কবিতা এবং প্রবন্ধ লেখেন, সুতরাং ঈর্ষায় কাতর হয়ে উভয়পক্ষ যতটুকু পারা যায় তাকে কোণঠাসা করে রেখেছেন। কবিতার লোকেরা বলেন— উনিতো প্রবন্ধকার। আর প্রবন্ধের লোকেরা বলেন— উনিতো কবি। এই উভয় ঠেলা পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো করে তিনি একাই চলছেন। সমান তালে লিখছেন। লেখালেখি জগতের কেউ এখন আর তার বন্ধু নন। বিপরীতে হাজার হাজার মুটে-মুজুর-রিকশাওয়ালা-ঠেলাওয়ালা তার বন্ধু হয়ে উঠেছেন। কথায় কথায় অবাক করে দিয়ে জানালেন— জানো, যে পাড়ায় আমি থাকি; সে পাড়ায় যদি আমার সামান্য কিছু হয়; তবে হাজার হাজার মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়ে যাবে। এরাই আমার বন্ধু। এরাই আমার প্রতিদিনের স্বজন। এরাই আমার পরম আত্মীয়। আরেকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা প্রয়োজন। ৪৭-এর পর বাংলাদেশ ভূ-ভাগ থেকে যারা পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন, এখনো পর্যন্ত তাদের বিভিন্নভাবে ঠেকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। 

জহর সেনমজুমদার, শামীম রেজা এবং রবিশংকর বল। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে।

তিন.

জলেও তোমার ব্যথা আছে
সেই জল স্পর্শ করি আমি
নিকটস্থ অল্প কিছু মেঘ
চাঁদ ছিল বহু দূরগামী
সেই চাঁদ জলে নেমে এলে
মনে হয় ভরে গেল মুঠো
চেয়ে দেখি অর্ধ চরাচরে
পড়ে আছে ধূ ধূ খড়কুটো
পড়ে আছে শুধু খড়কুটো
পড়ে আছে ধূ ধূ খড়কুটো

(দূরগামী : দূরগামী দেহ যন্ত্রবীণা)

কবিই পারেন জলে স্পর্শ করে জলেও যে কারো ব্যথা রাখা আছে তা অনুভব করতে। ক্লাবে ফিরে জহর সেনমজুমদারকে কোথাও খুঁজে পাই না আর। জাহিদ সোহাগও হাওয়া। কি জানি কোথায়; কোন হাওয়ায়, কোন দৃশ্যে কার ব্যথা খুঁজে বেড়াচ্ছেন তারা! রেজার ব্যস্ততার শেষ নেই। পরের দিন অনুষ্ঠান। বিরতিহীন ফোন আসছে, বিরতিহীন ফোন করছেন। একবিন্দু বিরক্তি নেই। একজন মানুষ কতোটা পারেন; তার নমুনা কবি শামীম রেজা। দেবেশ রায়ের রুমে জলযোগে আছেন রবিশংকর বল, পারভেজ হোসেন, অনিকেত শামীম। রেজা সবদিক সামলাচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থেই দেবেশ রায়কে সামলানো অতো সহজ কর্ম নয়। তিনি বার বার বলছেন, জহরকে দেখছি না কেন? ও গেলো কই? —রেজা, দেখো না জহর কোথায়? ও পান করবে না? খাবে না? আমি মনে মনে বলি অদৃশ্য ব্যথা যারে একবার পায়, তারে খুঁজে পাওয়া বড় দায়। ব্যথা কাতর কবি কোন ব্যথার অনলে পুড়ছেন একা; তার খোঁজ ক’জন রাখেন? অবশেষে জাহিদ সোহাগ এসে দেখা দেয়। বলি; জহর দা কই? সোহাগ বলে জহর দা নেই। রেজা মিটমিট করে হাসে। বলে, তুই থামতো কবির! আমি বলি, আমি আবার করলামটা কি! দেখছিস না দেবেশ দা জহর জহর করে গলা শুকিয়ে ফেলছেন। এইতো বললেন— উপন্যাস : সময় সমাজ সংকট  গ্রন্থের নাম। বললেন জহরের অনন্য একটি কাজ। আমিতো এ গ্রন্থের নাম শুনিনি রেজা!
রেজা আমাকে টেনে নিয়ে জহর সেনমজুমদারের রুমের দিকে এগোয়। নক না করেই খোলে দরজা। ভিতরে শীতল অন্ধকার। বারান্দার কাঁচের দরজা খোলা। সেখান দিয়ে বাইরে থেকে আসা আলো ঠিকরে পড়েছে রুমে। সোফায় নিরব-নির্বাক বসে আছেন শূন্যতাহরণকারী কবি জহর সেনমজুমদার। কারো মুখে কথা নেই। দিনের বেলায় যে মুখর জহর সেনমজুমদারকে দেখলাম রাতের বেলার মানুষটির সঙ্গে তাকে মেলানো কষ্টকর। কোথাকার কোন ব্যথা কোন রূপ-রঙ নিয়ে ফের তাকে আক্রান্ত করেছে কে জানে! কিছুপর নিরবতা ভেঙে তিনিই বলে উঠেন— ‘কাগা’ তুমি ফিরে এসছো? কাগা! এই সম্বোধন শব্দটি শুনে রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। এই শব্দটি বহুদিন পর এভাবে এমন পরিবেশে এমন আঙ্গিকে শুনতে পাবো ধারণায় ছিলো না। আমি নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ। কাকাকে গ্রামাঞ্চলে এখনো আমরা কাগা বলে ডাকি। কিন্তু কলকাতার এই পরিপাটি কবি-অধ্যাপক-গবেষকের কণ্ঠে কাগা শব্দটি এলো কোত্থেকে? 

চলবে...

 

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন:

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || দ্বিতীয় পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || প্রথম পর্ব

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।