রাত ০৩:৫৯ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

রাজনীতিতে কে আগে : কওমি না জামায়াত

শিবির সভাপতির ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে তোলপাড়

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সালমান তারেক শাকিল॥

বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক রাজনীতি ও সংযুক্ত আলেমদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন বিতর্কিত তাত্ত্বিক আবুল আলা মওদুদী প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন ছাত্র শিবিরের সভাপতি আবদুল জব্বার। রাজনীতিতে বাংলাদেশের আলেমদের সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযমের চেষ্টায়, এছাড়া ইসলামী ঐক্যও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন বলে শিবির সভাপতির দাবি। তার এ দাবিকে ‘মুর্খের আস্ফালন ও বিভ্রান্তিকর’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক রাজনীতিকরা। বলছেন, ‘ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক পাঠ নিতে পারেননি আবদুল জব্বার। শুধু অন্ধের মতো  একমুখী পুস্তক পড়াশোনা করেছেন বলেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে তার বেহাল দশা।

মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুকে দেওয়া ‘ইসলাম বিদ্বেষীদের ৫ মে গণহত্যার উল্লাস অতঃপর ইসলাম পন্থীদের ভাবনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে এ তথ্যগুলো প্রচার করেন তিনি। তার মতে, ‘১৯৮১ সালের আগপর্যন্ত ইসলামে যে রাজনীতি আছে তা স্বীকার করতেন না বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম। ইসলামী রাজনীতির প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলে আসছিল শুধু জামায়াতে ইসলামী। ইসলামে রাজনীতি আছে এবং সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য ইসলামী রাজনীতির বিকল্প নেই তা পীর সাহেব বা খানকার খাদেমরা জানলেও অস্বীকার করার মূল কারণ হলো-ওনারা পীর দরবার ও খানকায়ের আয়েশি জিন্দেগি থেকে বের হয়ে আসতে নারাজ ছিলেন।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘ইসলামী রাজনীতির পক্ষে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় সে সময়ে অনেক আলেম জামায়াতে ইসলামী সম্পৃক্তদের ফিরকাবাজ, নতুন ইসলামের প্রবর্তক ইত্যাদি বলে ফতোয়া দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীণ আমির গোলাম আযম আশির দশকে আলেমদেরকে ইসলামী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে এবং ১৯৯৪ সালের দিকে এ দেশের সর্বস্তরের হাক্কানি আলেম ওলামাদের সঙ্গে নিয়ে ইসলামী ঐক্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এর কার্যক্রম অনেকদূর পর্যন্ত আগালেও কিছু আলেম ওলামাদের চরম একগুঁয়েমি ও নির্বোধ আচরণের কারণে সব প্রচেষ্ঠা ভেস্তে যায়।’

তার এ লেখার বিষয়ে  ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়ামের সদস্য মাওলানা সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন, গোলাম আযম কে? তার জন্ম কবে? ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন কারা করেছে? ছাত্র শিবিরের সভাপতির এ সম্পর্কে কোনও ধারণা আছে?

ফয়জুল করীম বলেন, ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন করেছে ওলামায়ে দেওবন্দ। এর আগে হাজী শরিয়ত উল্লাহর ‌‌‌আন্দোলন। এরপর পাকিস্তান আমলে নেজামে ইসলাম পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, এসব দলগুলো কী গোলামের আযমের মাধ্যমে রাজনীতি করেছে। একমুখী শিক্ষা ও বই পাঠ করলে যা হয়। এরা তো কোরআন হাদিস পড়ে না। এরা তো মওদুদীর বই পড়ে। তাহলে কীভাবে জানবে।

এ ব্যাপারে তীব্র সমালোচনা করেন গহরডাঙ্গা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশনের সদস্য সচিব আল্লামা রুহুল আমিন। তিনি বলেন, এদের কথার জবাব দিয়ে কি হবে। জামায়াতে ইসলাম ফিরকাবাজ, ফেতনাবাজ এবং মওদুদী ইসলামের প্রেতাত্মা, এসব ফতোয়া নিয়ে আমাদের অবস্থান আগের মতো। আগেও যেমন বলেছি, তেমন এখনও বলছি। সোজা কথায় ইসলাম নিয়ে তামাশা করেছিলেন মওদুদী। আর তার শিষ্যরা তো বলবেই যে, রাজনীতি গোলাম আযম শিখিয়েছেন।

জানা গেছে, ১৯৮১ সালে তওবার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসার আলেমদের মধ্যে সাড়া ফেলেন আল্লামা মুহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর রহ.। ওই সময় তিনি জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে বটবৃক্ষ মার্কা নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এরপর থেকে সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের আলেমরা রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। গঠিত হয় খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন।

জানা যায়, ১৯৮১ সালে খেলাফত আন্দোলন গঠিত হয় মুহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জির হাতে। তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এর কয়েক বছর পর শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকসহ কয়েকজন নেতা বেরিয়ে যান। ৯০ এ দশকে শুরুর দিকে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন নামে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক জোট হলে সেই জোটে জামায়াত ঘরানার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীও শরিক হন। যদিও পরবর্তীতে এটিও ভেঙে যায়।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অভিভাবক পরিষদের সভাপতি শায়খুল হাদীস আল্লামা আশরাফ আলী বলেন, ওই এলায়েন্স কোনওভাবে জামায়াত বা গোলাম আযমের প্ররোচনায় ছিল না। কেউ বলে থাকলেও সে জানে না।

শিবির সভাপতির তখন জন্ম হয়েছিল কিনা, এ প্রশ্ন তুলেছেন হাফেজ্জি প্রতিষ্ঠিত খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান। তিনি বলেন, ওর তো মনে হয় তখন জন্ম হয়নি। সঠিক তথ্য জানেন না। 

আবদুল জব্বারের লেখার বিষয়ে মাসিক আল আশরাফের যুগ্ম সম্পাদক, লেখক ও ইসলামীচিন্তক মুফতি এনায়েত উল্লাহ বলেন, গোলাম আযম তো ওই সময়ে বাংলাদেশেই ছিলেন না। তিনি কীভাবে আলেমদের রাজনীতি শেখাবেন। এটি কি উলুবনে জ্ঞান বিস্তার? গোলাম আযমসহ জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে কওমি আলেমদের মধ্যে বিবদমান দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিক। এই দ্বন্দ্ব মিটে যাবার নয়। ইসলাম,হযরত মুহাম্মদ সা. ও সাহাবায়ে কেরামগণ এর সম্মান নিয়ে মওদুদীর যে চর্চা, যে বেয়াদবি, সেগুলোতো তারা এখনও বিশ্বাস করে। তাহলে তাদের নেতা গোলাম আযম কবে, কখন রাজনীতি শেখাল আলেমদের? তাহলে হাফেজ্জি হুজুরের ভূমিকা কি।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের এমন একটা গলি দেখাতে পারবে যেখানে কওমি আলেমরা জামায়াতকে ওউন করে বা তাদের দল করে।

শিবির সভাপতি আবদুল জব্বার তার লেখায় আরও দাবি করেন, ‘আশির দশকের সময় তিনি জামায়াতের বিরুদ্ধে বইও রচনা করেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ! আলেম-ওলামাদের চিন্তার রাজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। যারা জামায়াত শিবির বা ইসলামী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের রেখা টেনে দিতেন তারাই এখন দ্বীন এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মূখ্য ভুমিকা পালন করছেন। এখন ইসলামের জন্য যারা কাজ করছে সবাই একযোগে একসঙ্গে কাজ করা জরুরি বলে মনে করেন। এই অনুভূতি অনেক আগে জাগ্রত হওয়ার কথা থাকলেও অনেকদিন পরে তা হল।’

তার বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন তরুণ লেখক ও কলামিস্ট মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, আবদুল জব্বার সম্ভবত উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাস মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখেননি। উপমহাদেশে রাজনীতি শুরুই হয়েছে কওমি আলেমদের হাত ধরে। সিপাহি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে খেলাফত আন্দোলন, ইংরেজ খেদাও আন্দোলন, রেশমি রুমাল আন্দোলন, গান্ধিজির অসহযোগ আন্দোলন, দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং সর্বশেষ দেশভাগ; সব আন্দোলনে কওমি আলেমরাই দিশা দিয়েছেন এ দেশের আপামর জনসাধারণকে। তার স্মরণ রাখা প্রয়োজন, দেশ ভাগের পর অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম পতাকা উড্ডীন করেছিলেন একজন কওমি আলেম- মাওলানা জাফর আহমদ উসমানি।

সালাহউদ্দীন আরও বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইসলামের নামে গোলাম আযম এবং তদীয় দোসরদের অনৈসলামিক দালালির কারণেই অনেক নির্দোষ কওমি আলেম নিগৃহীত হন। শুধু গোলাম আযমরা ইসলামী বেশ ধরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার কারণে আলেমদের রাজাকার বলে গালি দেওয়া হয়। অথচ সবাই জানে,বাংলাদেশের কওমি আলেমরা সবসময়ই স্বাধীনতার স্বপক্ষে ছিলেন। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১০০ বছরের পুরনো কওমিধারার রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। তারা সে সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে হারাম বলে ঘোষণা দেন।

আবদুল জব্বার তার লেখায় এও দাবি করেন, ‘অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে হেফাজতে ইসলামী চট্টগ্রামের হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা থেকে আল্লামা শফীর নেতৃত্বে শুরু হলেও সরকারের নাস্তিকতাবাদীদের পৃষ্টপোষকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর এ সংগঠন অনেকটা রাজনৈতিক রূপ লাভ করে।’

তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, আল্লামা শফীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম অবশ্যই অরাজনৈতিক।

/এসটিএস/এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।