রাত ০১:১২ ; শুক্রবার ;  ২১ জুন, ২০১৯  

মেয়রের পদমর্যাদাই যথেষ্ট: আ জ ম নাছির

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ওমর ফারুক ॥

'মেয়রের পদমর্যাদাই যথেষ্ট। এর বাইরে কিছু চাওয়ার নেই। যতদিন মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করব, ততদিন সিটি করপোরেশন থেকে সম্মানী গ্রহণ কিংবা যানবাহন ব্যবহারসহ কোনও সুবিধা নেব না। সম্মানীর টাকা প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন খাতে দিয়ে দেব। এ কথা আমি সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে জানিয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর লিখিতভাবে জানাব।' মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বললেন এ কথা।

নাছির আরও বললেন, 'নির্বাচনের পর আমি সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বলে দিয়েছি- কোনও গাফিলতি সহ্য করা হবে না। যে যত বেতন পান, সেটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। বাড়তি আয়ের চিন্তাও কেউ করবেন না। নির্দিষ্ট বেতনে কারও না পোষালে চাকরি ছেড়ে চলে যান। কত টাকা বেতন হবে সেটা জেনেই তো চাকরিতে এসেছেন। তাহলে বাড়তি টাকার দরকার কী?'

চট্টগ্রামের এ নগর অভিভাবক আরও বলেন, “এখন থেকে আমি কোনও দলের নই, চট্টগ্রামের ষাট লাখ মানুষের সেবক। দলমত নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা নিয়ে চট্টগ্রামের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। এ জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে। সবাইকে নিয়ে চট্টগ্রামকে 'স্বপ্নের মেগাসিটি' গড়ে তুলতে চাই।”

ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ক্রীড়া সংগঠক আ জ ম নাছির বিসিবির সহসভাপতি। মঙ্গলবার তাকে বিসিবির কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়রা ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এই ব্যস্ততার মাঝেই টানা আধঘণ্টা সময় নিয়ে তার সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়।

নির্বাচিত হওয়ার পর কেমন লাগছে জানতে চাইলে নাছির বলেন, আমার আলাদা কোনও অনুভূতি নেই। আমি স্বাভাবিক আছি। বুধবার শপথ নেব। এরপর দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ও কাউন্সিলরদের মেয়াদ ২৫ জুলাই পর্যন্ত। এর আগে দায়িত্ব নিতে পারব কি পারব না সেটা কাল (বুধবার) নিশ্চিত হওয়া যাবে।

২৮ এপ্রিলের নির্বাচনে চট্টগ্রামে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১২ জন। এদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল সমর্থিত আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং ২০ দল সমর্থিত বর্তমান মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমের মধ্যে। ভোটের দিন দুপুরে বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলে মনজুর আলম সরে যান এবং শেষ পর্যন্ত মাঠে থেকে আ জ ম নাছির ১ লাখ ৭০ হাজার ৫২৪ ভোট বেশি পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির ব্যানারে নির্বাচন করেন তিনি।

বিএনপির নির্বাচন বর্জনের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করা হলে নাছির বলেন, কোনও প্রার্থীরই নির্বাচনের মাঝপথে সরে যাওয়ার আইনগত ভিত্তি নেই। বর্জনের পরও যদি ওই প্রার্থী ভোট বেশি পেতেন, তাহলে নির্বাচন কমিশন তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করত। তখন কি তিনি (মনজুর আলম) ফলাফল প্রত্যাখ্যান করতেন? নিশ্চয়ই করতেন না।

আরও বলেন, 'বিএনপির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা বরং আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমার পক্ষে যারা কাজ করছিলেন, তাদের মধ্যে গা ছাড়া ভাব চলে আসে। কেউ কেউ বাসায় চলে যান। এতে আমার ভোট কম কাস্ট হয়েছে। অন্যদিকে তিনি (মনজুর) বর্জনের ঘোষণা দিলেও তার দলীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরা মাঠেই ছিলেন। তারা ভোটের জন্য লড়েছেন। অথচ আমার কর্মীরা মাঠে থাকলে আরও বেশি ভোট পেতাম। নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাটা ছিল বিএনপির আইওয়াশ। নির্বাচনে কোনও কারচুপি হয়নি।'

চট্টগ্রাম শহরেই আদি নিবাস আ জ ম নাছিরের। তার বাবা মরহুম সৈয়দ মঈনুদ্দিন হোসাইন ও দাদা মরহুম হাফেজ মৌলভী মোহাম্মদ শামসুদ্দিন ঐতিহ্যবাহী আন্দরকিল্লাহ শাহী জামে মসজিদের অবৈতনিক পেশ ইমাম ও খতিব ছিলেন। দাদা মরহুম মওলানা মোহাম্মদ হোসাইন ছিলেন সরকারি ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের (বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারি মহসিন কলেজ) অধ্যক্ষ। এ হিসেবে শহরের আদি বাসিন্দা নাছিরের শৈশব, কৈশোর ও পরবর্তী দিনগুলো চট্টগ্রামেই কেটেছে।

নগরীর করুণদশায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, নির্বাচনে না দাঁড়ালে চট্টগ্রামের এত সমস্যার চিত্র আমার চোখে পড়ত না। অনেক কিছু জানতেও পারতাম না। কারণ অনেক ওয়ার্ডে রাস্তা পর্যন্ত নেই। কিছু ওয়ার্ডে একবার বৃষ্টি হলে ওই পানি দশ-পনের দিনেও সরে না। বস্তি ও ঘনবসতি এলাকায় নাগরিক সুবিধা নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। ছেলে-মেয়েদের চার-পাঁচ মাইল হেঁটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। এ কারণে অনেকে লেখাপড়ার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। বিশুদ্ধ পানি ও জ্বালানি গ্যাস নেই বহু এলাকায়।

দায়িত্ব পাওয়ার পর বিএনপিসহ সমমনাদের অবস্থান কী হবে জানতে চাইলে আ জ ম নাছির বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এটা কোনও দল বা গোষ্ঠীর নয়। যেহেতু নগরবাসী আমাকে নির্বাচিত করেছে, সেহেতু আমি এখন শুধু একটি দলের নই। আমি চট্টগ্রাম নগরীর ৬০ লাখ মানুষের সেবক। নগরীর উন্নয়নে যারা কাজ করতে চান তাদের সবাইকে নিয়ে আমি এগুতে চাই। তিনি যে দলেরই হোন, আমার আপত্তি নেই।

নগরবাসীকে সেবার পদ্ধতি সম্পর্কে নবনির্বাচিত এই মেয়র বলেন, একশ' দিন বা এ ধরনের কোনও টার্গেট নির্ধারণ করব না। সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার মানসিকতা আমার নেই।

কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, প্রথমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের গণমান্য ব্যক্তি, সমাজসেবক ও ব্যবসায়ীসহ সবার সঙ্গে আলোচনা করব। তাদের কাছ থেকে জানব কোন ওয়ার্ডের কী সমস্যা। সব ওয়ার্ডের সমস্যা এক নয়। এরপর ঐকমত্যের ভিত্তিতে ওয়ার্ডের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেব।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কারণ জলাবদ্ধতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হবে। এটা সমাধানে সময় লাগবে। কারণ বর্ষা এসে গেছে। এ ছাড়া দায়িত্ব গ্রহণে যদি দেরি হয় তাহলে হয়ত এবার কাঙ্ক্ষিত কিছু করতে পারব না। আরএস রেকর্ড অনুযায়ী শহরের নালা-নর্দমাগুলো খনন ও প্রশস্ততা বাড়াতে হবে। কিছু খাল থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে। এ জন্য একটা প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে ২০ বছর মেয়াদী ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান রয়েছে। অতীতে রহস্যজনক কারণে এই মাস্টার প্ল্যানে কেউ হাত দেয়নি। এবার এটাকে যুগোপযোগী করে বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে আমি যতগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার সবগুলো বাস্তবায়ন করব। জানা গেছে, নির্বাচনের আগে তিনি চট্টগ্রামের উন্নয়নে ৩৬টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আ জ ম নাছির ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামের সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন। শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবন এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পদার্পণ তার। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সহসভাপতি এবং চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও চট্টগ্রাম কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করছেন। গত ২৮ এপ্রিলের আগে তিনি কখনও কোনও নির্বাচনে অংশ নেননি।

এবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হাতি মার্কার প্রার্থী আ জ ম নাছির পান ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ ভোট এবং কমলালেবু মার্কায় মোহাম্মদ মনজুর আলম পান ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭ ভোট। সর্বমোট ভোট পড়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৩টি। এর মধ্যে সরকারি হিসাবে বৈধ ভোট ছিল ৮ লাখ ২১ হাজার ৩৭১টি এবং বাতিল হয়েছে ৪৭ হাজার ২৯২টি।

 

/ওএফ/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।