রাত ০৪:২৮ ; সোমবার ;  ২০ মে, ২০১৯  

মাত্র ৪ শতাংশ নারী অধিকার উপভোগ করতে পারছেন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম।।

মানবাধিকার, ন্যয়বিচার ও ভূমির ওপর নারীর অধিকার চার শতাংশ বা কোনও-কোনও ক্ষেত্রে তারও কমে ঘুরপাক খাচ্ছে। ৯৬ শতাংশ নারীই অধিকার-বঞ্চিত হয়ে জীবনযাপন করছে। নারীর ওপর নির্যাতন যেমন বাড়ছে তেমনই মামলা করে বিচার পাওয়া নারীর সংখ্যা কমছে। বাড়ছে নানা রকমের হেনস্তাও। সম্প্রতি ‘নারীর ভূমির অধিকার ও বঞ্চনা’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত।

নারীর অধিকার বিষয়ক ওই গবেষণায় দেখা গেছে দেশের জনসংখ্যার ৫০ ভাগ নারী এবং তারমধ্যে ৯৬ শতাংশ নারীই ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত। নারী-পুরুষ সমঅধিকারের কথা একাধিকবার বলা হলেও, ভূমি অধিকারের বেলায় কোনও সমন্বিত আইন নেই। ধর্মীয় আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন হচ্ছে।

এ বিষয়ে ড. আবুল বারাকাত বলেন, আমাদের দেশে মাত্র চার শতাংশ নারী তাদের ভূমি অধিকার পাচ্ছেন। অধিকার ফিরিয়ে দিতে চাইলে উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করা উচিত। তিনি আরও বলেন, দেশে হিন্দু নারীরা ভূমি অধিকার থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন।

নিজেরা করি-এর নির্বাহী পরিচালক খুশী কবির অভিন্ন পারিবারিক আইনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রগতিশীল পুরুষরা আগেও নারীদের অধিকারের বিষয়ে ইতিবাচক ছিলেন। সমন্বিত একটি পারিবারিক আইন প্রয়োজন। এজন্য সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন এই নারীনেত্রী।

বাংলাদেশে নারীর জন আইনের কোনও অভাব নেই কিন্তু তাতেও রক্ষা পায় না নারীর অধিকার। নিম্ন আদালতের সূত্র জানায় নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার ৯৬ শতাংশ মামলা নিম্ন আদালতেই খারিজ হয়ে যায়। এজন্য আদালতের বাইরে রফা করে নেওয়া, মিথ্যা মামলার কারণে সাক্ষী না পাওয়ার মতো কারণগুলোকে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। আইনজীবীরা বলছেন, এই মানসিকতার জন্য অনেক সত্য মামলাও বাধাগ্রস্ত হয়।

শরিয়তপুরের মনিরা (ছদ্মনাম) ধর্ষণের শিকার হন। গুরুতর শারীরিক ক্ষত নিয়ে ভর্তি হন ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে। মামলাও করেন  ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর তাকে পড়তে হয় নানা হেনস্তায়। ধর্ষণকারীদের পক্ষ থেকে হুমকির মাধ্যমে মামলা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। না মেনে নিলে তার কলেজপড়ুয়া অন্য বোনকেও ধর্ষণ ও হত্যার হুমকিও দেয় তারা।

পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমাদের পরিবারের সদস্যের সঙ্গে যে নিপীড়ন হয়েছে আমরা তার বিচার চাই বলেই মামলা করেছি। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি তাতে কে আমাদের নিরাপত্তা দেবে। মামলা তুলে নিলেও যে আমরা নিরাপদে বাঁচব তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

২০১৩ সালের একটি হিসাব হাজির করে মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, গত বছর নারী ও শিশু নির্যাতন (দমন) আইনে সারাদেশে ১৮ হাজার মামলা দায়ের হয়েছে। এরমধ্যে চার হাজার ধর্ষণের মামরা। পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, এসব ঘটনায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনসহ (মামলা আর পরিচালনা না করা বা অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া) প্রায় ১৩ হাজার অভিযোগপত্র আদালতে জমা হয়েছে। এতো গেল অভিযোগপত্র হওয়া মামলার পরিসংখ্যান।

পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, শতকরা ৩০ শতাংশ ধর্ষণ মামলায় অভিযোগ গঠনের আগেই মীমাংসা হওয়ায় ওই মামলাগুলো থেকে অভিযুক্তদের রেহাই দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর  পেছনে নারী ও সাক্ষীদের যে অনিরাপত্তা, সে বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

আইন ও শালিস কেন্দ্রের তথ্য বলছে কেবল জানুয়ারী থেকে মার্চ ২০১৫ এর মধ্যে ১২৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ২১জন ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। বাবা-মায়েরা এই শিশুদের ভবিষ্যতের বিষয়ে চিন্তা করে মামলা করা বা সেটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে শঙ্কা বোধ করেন।

এসব বিবেচনায় নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় যারা কাজ করছেন তারা বলছেন, নারীর অধিকার রক্ষার বিষয়টা ‘বজ্র আটুনি ফস্কা গেরো’র মতো হয়ে গেছে অনেকটা। নারীর সুরক্ষার জন্য আইন যেমন অনেক আছে, আইনের ফাঁক বের করে সেটা সঠিকপথে বাস্তবায়ন না করারও পথ বের হয়ে গেছে। আইনজীবী এলিনা খান বলেন,নারী নির্যাতনের মামলাগুলোর সঠিক পর্যবেক্ষণ না থাকায় জটিলতা তৈরি করে। তার ন্যয়বিচার পাওয়ার যে অধিকার, সেটা নিশ্চিত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নির্যাতনের মামলা বিষয়ে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক না হবে।

/এমএনএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।