রাত ০১:৪৫ ; শুক্রবার ;  ২১ জুন, ২০১৯  

রাজনীতির ইচ্ছা নেই : আনিসুল হক

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এমরান হোসাইন শেখ॥

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে মেয়র পদে বিজয়ী হলেও সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন না আনিসুল হক। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেই তিনি নগরবাসীর সেবা করে যেতে চান। দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম কাজ হবে ঢাকাকে 'ক্লিন' করা অার রাজধানীর মশকনিধন ও জলাবদ্ধতার সমাধান করা।

প্রতিদ্বন্দ্বীকে বি‌‌পুল ভোটে পরাজিত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নগরপিতা নির্ব‌‌‌াচিত হলেও এ নিয়ে শেষ সময় সৃষ্ট ঘটনায় অস্বস্তি বোধ করছেন তিনি। ‌‌নির্বাচন নিয়ে ওই প্রশ্নটা না উঠলে তার কা‌‌‌ছ আরও ভালো লাগত বলে জানিয়েছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

শনিবার রাজধানীর নিকুঞ্জস্থ ব্যবসায়িক কার্যালয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় আনিসুল হক এসব কথা বলেন। অার জানিয়েছেন রাজধানীর চলমান নানামুখী সমস্যার সমাধ‌‌‌নে তার আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা। এসময় আনিসুল হকের স্ত্রী ও তার প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট রুবানা হক উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচনে বিজয়ের অনূভূতি কী, জবাবে বলেন, জয়লাভের বিষয়ে আমার আগেই একটা আত্মবিশ্বাস ছিলো। সবসময় ভেবেছি আমি জিতব। তবে নির্বাচনটাকে আমি কোনও অংশেই কম গুরুত্ব দেয়নি, বরং অন্যদের চেয়ে আমি বেশি খেটেছি। নির্বাচনের সময় এক বিন্দু রিলাক্স করিনি। যেখানে যতটুকু প্রয়োজন তা করেছি। আমি এমনভাবে কাজ করেছি যেন মানুষ ভাবতে না পারে- সরকারি দলের সমর্থন আছে বলেই রিলাক্স মুডে কাজ করছি। সুন্দর ও কার্যকরভাবে প্রচারণা চালাতে পেরেছি বলেই এখন আমি সন্তুষ্ট।'

নির্বাচন পুরোটাই দলভিত্তিক হয়েছে এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনটা ব্যক্তি কেন্দ্রীকই হবে। কিন্তু না, এতে রাজনীতিকরণ বেশি হয়েছে। নির্বাচন এতটা রাজনৈতিক পর্যায়ে চলে যাবে এটা আমি ভাবতে পরিনি।'

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে উঠা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি আগেই বলেছি আমার জয়ের ব্যাপারে একটা আত্মবিশ্বাস ছিলো। তবে, শেষ সময়ের ওই ঘটনা আমাকে খুবই 'অ্যাফেক্ট' করেছে। ওই ঘটনা না হলে আমি আরও বেশি স্বস্তিবোধ করতাম। ওই বিজয়টার জন্য আমার আরও বেশি ভালো লাগতো। কারণ, তখন নির্বাচন নিয়ে কোনও ধরনের প্রশ্ন থাকত না।'

ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন নিয়ে মেয়র হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন, আগামীতে আপনাকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে দেখতে পাব কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'রাজনীতি করার ইচ্ছা আমার নেই। রাজনীতি করার কোনও ইচ্ছাই নেই।

'প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন পেয়ে মেয়র হিসেবে নির্বাচন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী যদি আপনাকে রাজনীতিতে আসার জন্য অনুরোধ করেন?' জবাবে আনিসুল হক কিছুটা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আল্লাহ বলেছেন ভবিষ্যতের কথা একমাত্র আল্লাহ বলতে পারবেন। এটা বান্দা বললে গুনাহ হবে।'

তবে প্রধানমন্ত্রী কেন তাকে মেয়র পদে পছন্দ করেছেন, তা তিনিই বলতে পারবেন বলে জানালেন আনিসুল হক। তার মতে- সুশীল সমাজকে পরীক্ষা করার কারণেই প্রধানমন্ত্রী আমাকে পছন্দ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়তো ভাবছেন, আমি সুশীল সমাজের পার্ট, দেখি- তাকে দিয়ে সুশীল সমাজ কী বলে, তারা কতটুকু তাকে সহযোগিতা করেন।'

গত ক‌‌‌য়েক বছর জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে আমলারাদের দিয়ে সিটি করপোরেশন পরিচালিত হওয়ায় ধারাবাহিকতার ব্যত্যয় হয়েছে- এক্ষেত্রে আপনি কোনও সমস্যায় পরবেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা শূন্যের কোটায়। কাজেই আমি এখনও জানি না সিটি করপোরেশনে কাজ করতে গিয়ে কী কী সমস্যা ফেজ করতে হবে। তবে, আমি সেবা দিয়ে নগরবাসীর চিন্তায় পরিবর্তন আনতে চাই। আর জোর করে কোনও লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। এজন্য টিমওয়ার্ক দরকার।'

জনগণের জন্য কাজ করার ইচ্ছার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হওয়ার আগেই সিটি করপোরেশনকে বলেছি, আমি হই বা আর অন্যকেউ হোক মেয়র একজন হবেন। আমি সেইভাবে তাদের কাজ করতে বলেছি। বর্তমানে আমি প্রত্যেকদিন কয়েকবার পরিচ্ছন্ন বিভাগের সঙ্গে যোগোযোগ করছি। ইতোমধ্যে পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়ে গেছে। গত তিনদিনে ঢাকা শহরের ৯০ ভাগ পরিষ্কার হয়ে গেছে। তবে, এটা কতদূর রাখা যাবে সেটা জানি না।

'নগরীর বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে আপনার আগামী ১০০ দিনের কর্মসূচি কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি ব‌‌‌লেন- আমি ১০০ বা ৫০ দিনের কোনও কর্মসূচি করার কথা ভাবছি না। আমি কিছু কাজ স্বল্প সময়ের মধ্যে করতে চাই। আমার প্রথম কাজ ক্লিনিং ঢাকা অার রাজধানীর মশার সমস্যার সমাধান করা। পাশাপাশি দূর করতে চাই জলাবদ্ধতা। বর্ষার মৌসুম আসছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে এ কাজটি আমাদের আগে করতে হবে। বস্তুত দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে চূড়ান্ত করতে হবে- কোন কোন কাজকে আমার অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগামী ৩/৪ মাসের মধ্যে তার এই কার্যক্রমগুলো নগরবাসীর কাছে দৃশ্যমান হবে বলে জানান তিনি।

নির্বাচনি ইশতেহারের ছয়টি অগ্রাধিকার খাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন- স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদীর সব পরিকল্পনার কার্যক্রম সমানভাবেই চালিয়ে যাবেন। ইশতেহারে কিছু বিষয় রয়েছে যেটা এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। কিছু রয়েছে ধীরে নিতে হবে। এক্ষেত্রে যেগুলোর ক্ষেত্রে এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সেগুলোকেই আমরা অগ্রা‌‌‌ধিকার দেব। পর্যায়ক্রমে অন্যগুলোতে আমরা হাত দেব। কোনওটাই বসে থাকবে না।

কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের বাধা আসার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি সবার সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে চাই। আশা করি সবার সহযোগিতায় স্বচ্ছতা আর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে পারবো।

ঢাকাকে গ্রিন করতে ইতোমধ্যে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজও আমি একটি সংগঠনের সঙ্গে বসবো। আমরা মনে করি ঢাকাকে গ্রিন করা সম্ভব। নগরীর প্রতিটি ভবনের ছাদ হবে একটি ক‌‌‌রে বাগান। আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করবো একটি হলেও গাছ লাগান।

রাজধানীবাসীর সেবার সঙ্গে সিটি করপোরেশন ছাড়া সরকারের আরও ৫৬টি সংস্থা সম্পৃক্ত রয়েছে- এর মধ্যে কী করে সেবার মান উন্নতি করা সম্ভব? জবাবে বলেন, 'এ বিষয়ে আমাদের বিকল্প কোনও চয়েজ নেই। সরকারের ওই বডির সঙ্গে সমন্বয় করেই আমাদের কাজ করতে হবে। শুধু ডি‌‌‌সিসির বিষয় আসছে কেন- আপনাকে আমাকে যেকোনও কাজ করতে গেলে কারও না কারও সঙ্গে সমন্বয় করতেই হয়।'

সাক্ষাতকালে আসিনুল হক বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এই মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন সম্পর্কে এই মুহূর্তে আপনার আর আমার অভিজ্ঞতা সমান। তবে আমার দায়িত্ব নেওয়ার ১৫ দিন পরে এলে আমি সব বিষয়ে বিস্তা‌‌‌রিত জানাতে পারব।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে ব্যক্তিগত উদ্যোগের অভিজ্ঞতা ত‌‌‌ুলে ধরে তিনি বলেন, কিছু কাজ আমার হাতে আছে যেটা আমি করতে চাই। যেমন- একান্ত নিজস্ব উদ্যোগে আমি কর্মসংস্থান করতে চাই। গার্মেন্ট মালিকসহ সব ব্যবসায়ীকে চিঠি লিখব- প্রত্যেকে অনন্ত একজন লোকের চাকরির ব্যবস্থা করতে। এতে কমপক্ষে ২০ হাজার লোকের চাকরি দেওয়া সম্ভব হবে। ব্যবসায়ী ও প্রতিটি ফেডারেশনকে একটা প্রি-স্কুল করার জন্য প্রজেক্ট পাঠাবো। এটা যে ঢাকা শহরেই হতে হবে তা নয়, দেশের যেকোনও জায়গায় হতে পারে। আর প্রত্যেকটা স্কুলের পেছনে মাসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা খরচ হবে। দেখবেন দুই শ' স্কুল হয়ে যাবে। আমি এটা ব্ক্তৃতা দেওয়ার জন্য বলছি না। আমার এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেই বলছি। স্কুল করার জন্য চিঠির খসড়া আমি ইতোমধ্যে করে ফেলেছি। আমি চেম্বারকে চিঠি দিয়ে বলব- আপনারা একটা করে ক্লিনিক করেন, একটা করে স্কুল করেন।

ঢাকা শহরকে সিটি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে নবনির্বাচিত এই মেয়র বলেন, আমি প্রকৌশলীদের একটি ইয়ংগ্রুপকে বলে দিয়েছি, গুগল আর্থের সাহায্য নিয়ে ঢাকার ম্যাপিং করতে। তাদের ম্যাপিং সম্পন্ন হলে আমরা পুরো ঢাকাকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নেবো। এক্ষেত্রে করপোরেশনের অর্থায়নে যদি সম্ভব না হয় আমরা বিকল্প চিন্তা করব।

দায়িত্ব পালনে মেয়র গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে দায়িত্ব পালন অনেক সহজ হয়ে যাবে। সাক্ষাৎকারে আনিসুল হক নগরভবনের দুর্নীতি ব‌‌‌ন্ধে ই-টেন্ডারিংসহ যাবতীয় কার্যক্রম ডিজিটালাইড করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


 

/ইএইচএস/এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।