সকাল ১০:৪১ ; রবিবার ;  ২১ এপ্রিল, ২০১৯  

হিমু পরিবহন: গন্তব্য ক্যান্সার হাসপাতাল

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এহতেশাম ইমাম॥

'মানব জাতির সমস্যা হচ্ছে তাকে কোনও না কোনও সন্ধানে জীবন কাটাতে হয়। অর্থের সন্ধান, বিত্তের সন্ধান, সুখের সন্ধান, ভালবাসার সন্ধান, ঈশ্বরের সন্ধান।' হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদের এই ভাবনার সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন। এই ভাবনার সঙ্গে একত্মতা প্রকাশ করে সেই কথার বাস্তব প্রতিফলন দেখাতে শুরু করেছেন তার অনবদ্য সৃষ্টি হিমুর প্রকৃত ধারণকারীরা।

আমাদের চারপাশে হিমু চরিত্র ধারণকারীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। নিজ জীবদ্দশায় হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদ ছিলেন তাদের চেতনার স্রষ্টা। আর তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে করে গেছেন তার সৃষ্টির একচ্ছত্র মিলন।

পথচলার শুরু

সৃষ্টির জন্যই যাদের জন্ম তারা অবিনশ্বর। তাইতো, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদ তৈরি করে গেছেন তার বড় সৃষ্টি। ২০১২ এর ১৩ নভেম্বর নিউইর্য়কে দূরারোগ্য ক্যান্সারের কাছে হার মেনেছিলেন হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদ। তবে বাস্তবের হিমুদের একত্র হবার গল্প শুরু তার এক বছরের মাথায়। লেখকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য নুহাশ পল্লীতে যাবার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন আসলাম, জুবায়েরসহ বেশ কয়েকজন হিমু। মুহূর্তেই পেয়ে যান অন্যান্য হিমুদের আগ্রহের প্রকাশ। ফলে, কয়েকশ হিমুর একযোগে নুহাশ পল্লী যাত্রা। সেই থেকে শুরু একসঙ্গে পথচলা। সিদ্ধান্ত হয় এই যাত্রাকে সমুন্নত রাখতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পেজ খোলার। সেই লক্ষ্যে ১৯ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় হিমুদের 'হিমু পরিবহন'।

স্বপ্ন দেখাচ্ছে হিমুরা

গল্পের হিমু বিভিন্ন চিন্তায় হারিয়ে থাকলেও, এ কালের হিমুরা কিন্তু একটু বেশিই বাস্তববাদী। কারণ তারা এরই মধ্যে স্বপ্ন দেখছেন, যে কোনও মূল্যে গড়ে তুলবেন হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের একটি পরিপূর্ণ ক্যান্সার হাসপাতাল।

২০১১ সালে ২ নভেম্বর নিউইয়র্কে হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, 'আমি কেন জানি আমেরিকায় আসার পর থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, বাংলাদেশ হবে এশিয়ার ক্যান্সার চিকিৎসার পীঠস্থান। যদি বেঁচে দেশে ফিরি আমি এ চেষ্টা শুরু করব। হাত পাতব সাধারণ মানুষের কাছে।'

বাংলা ট্রিবিউনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিমু পরিবহনের একজন সমন্বয়ক আসলাম হোসেন জানান, ”লেখকের নন্দিত এ স্বপ্নকে স্থির করেই শুরু হয় হিমু পরিবহনের যাত্রা। সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রমের মূলে রয়েছে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যই।”

চলছে স্বপ্ন ছোঁয়া প্রাথমিক প্রস্তুতি

হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদ চেয়েছিলেন, ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরিতে প্রথম অর্থ দিবেন তিনজন ভিক্ষুক, তারপর তিনজন শীর্ষ ধনী, এরপর দিবেন তিনজন রাজনীতিবিদ। যেই সাধারণ মানুষদের জন্য লেখক দেখেছিলেন এই স্বপ্ন, তাদরে কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়াই সবার আগে প্রয়োজন পৌছে দেয়া।তাই, দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা হিমু পরিবহনের সদস্যরা প্রতি বছরের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি পালন করছেন ক্যান্সার সচতেনতা মূলক দিসব। এছাড়া, পাঁচ হাজার সদস্যের ব্লাড ব্যাংক গ্রুপ তৈরি করেছে তারা।যেখান থেকে যে কেউ যে কোন সময় সহায়তা পেয়ে থাকেন রক্তের প্রয়োজনে। 

রাজপথে চলছে পরিবহন

হিমু পরিবহনের হেল্পার জুবায়ের কবীর তুষার জানান, ক্যান্সার বিষয়ক প্রচারণা ছাড়াও অনেক বিষয়েই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তারা।এর মধ্যে আছে সারা দেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে বই পৌঁছে দেবার পরিকল্পনা। এরই মধ্যে হিমু পরিবহন ৪০টি জেলায় প্রাথমিকভাবে লাইব্রেরি তৈরির প্রস্তুতি চালাছে। যার প্রধান লক্ষ্যই হবে প্রজন্মকে হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদের চেতনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া। এ লক্ষ্যে প্রায়ই তারা আয়োজন করছেন হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি বিভিন্ন নাটক আর চলচ্চিত্র প্রদশর্নীর। গতবছরের  ১৩ নভেম্বর সারা বাংলাদেশে একই সাথে ৪০ জেলায় হিমু পরিবহনের উদ্যোগে প্রায় দশ হাজার মানুষ হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন পালন করেছে। ছিল শীতবস্ত্র বিতরণ, হ‌‌‌ুমায়ূন পাঠক উৎসবসহ ভিন্ন মাত্রার আয়োজনও। 

পরিবহনের যাত্রী হ‌‌‌ুমায়ূন পরিবার

লেখকের অনুপস্থিতির অভাব অনেক সময়েই একাকীত্ব ভোগায় হিমুদের। তাইতো সেই অস্তিত্বের জায়গাটি পূরণে মাঝেমাঝে পরিবহনের যাত্রী হন হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদের সহধর্মিনী মেহের আফরোজ শা্ওন।সময় কাটান হিমুদের সঙ্গে।এছাড়া, পরিবহনের দিক নির্দেশনায় থাকেন হ‌‌‌ুমায়ূন আহমেদের বড়ভাই ড. জাফর  ইকবাল ও ছোটভাই আহসান হাবীব।  

চলছে ভিন্ন মাত্রার প্রচারণা

দেশব্যাপী হিমুপরিবহন অব্যাহত রয়েছে ১০ হাজারের বেশি সদস্যের হাতধরে।এরমধ্যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে আছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়।যারা অব্যাহত রেখেছেন হ‌‌‌ুমায়ূন পাঠ থেকে শুর করে চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন কার্যক্রম।এছাড়া, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শুর হবে পরিবহনের দেশব্যাপী প্রচারণা। এর মধ্যে আছে ক্যান্সার বিষয়ক সচেতনতা নির্বাচীত সদস্যদের পায়ে হেঁটে দেশভ্রমন।এছাড়া, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের কার্জন হল থেকে নুহাশ পল্লী পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে লেখকের কবর জিয়ারত করে এসেছেন পরিবহনের সদস্যরা। এছাড়া, সামনে আসছে তাদের ঢাকা থেকে উয়েরী বটেশ্বর পর্যন্ত যাত্রার পরিকল্পনা্। এর বাইরে প্রতি শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনে মিলন মেলার আয়োজন করে হিমুরা। চাইলে ঢু-মেরে আসতে পারেন আপনিও।এছাড়া, হিমু পরিবহনের ফেসবুক পাতায় এই তরুণদের সঙ্গ দিতে ঘুরে আসতে পারেন   www.facebook.com/HimuParibahan এই ঠিকানায়। 

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন ও সংগৃহীত। 

/এআই/ এফএএন/


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।