বিকাল ০৫:০৪ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || দ্বিতীয় পর্ব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

পূর্ব প্রকাশের পর

আমার ভিতরে প্রবলভাবে যে জড়তা রয়েছে তারে আমি তাড়াতে পারি না। এ নিয়ে বহু বহু বার দেবেশ রায়ের মুখোমুখি হলেও কুশল বিনিময়ের বাইরে একটিও কথা হয়নি তার সঙ্গে। কথা মানে সাহিত্যের কথা; শিল্পের কথা। পাশে বসে বার বার তার কথা শুনে গেছি। এই মানুষটির স্মৃতি-শক্তি এতটাই প্রবল; প্রায় কিছুই ভুলেন না। আমার জড়তাও এতোই প্রবল; কখনো দেবেশ রায়কে শিল্প-সাহিত্য সংক্রান্ত একটি জিজ্ঞাসায়ও যাইনি। আরেক সমস্যা; বয়সজনিত কারণে তার কানে শুনতে সমস্যা হওয়ায় প্রায় চিৎকার করে কথা বলতে হয়। এটিও আমার ভালো লাগে না। মধ্যাহ্নভোজটা দেবেশ রায়ের রুমে অর্থাৎ ঢাকা ক্লাবে সেরে নেওয়া হয়। ওই সময়টায় লক্ষ্য করছিলাম, রবিশংকর বল প্রায় কথাই বলছেন না। দেবেশ রায় বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন ইমতিয়ার শামীম, জাকির তালুকদার, প্রশান্ত মৃধা আর সালমা বাণীর কথা। জানতে চাইছিলেন; হাসান আজিজুল হক কোথায় উঠেছেন। তিনিও ঢাকা ক্লাবে উঠবেন কি-না বার বার প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন। দেবেশ রায়ের এসব প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছিলেন পারভেজ হোসেন আর শামীম রেজা। মনে হচ্ছিলো, দেবেশ রায় তখনি সবাইকে এক সঙ্গে দেখতে চাইছিলেন। পারভেজ হোসেন বলছিলেন, হাসান আজিজুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে উঠেছেন। তার দেখভাল করছেন জাকির তালুকদার। কথাটা দেবেশ রায় পছন্দ করেননি; এমনটাই মনে হলো। অর্থাৎ তিনি চাইছিলেন সবাই একসঙ্গে হলে দারুন হতো। ফলে একই কথা বার বার বলছিলেন। হাসান কেন ওখানে? প্রশান্ত এলো না যে! বাণী কোথায়? ইমতিয়ার আসবে না? এই বার বার করা প্রশ্নগুলোর জবাব যতোটা পারা যায় পারভেজ হোসেন দিয়ে যাচ্ছিলেন।
এরই ফাঁকে ফাঁকে কথা হচ্ছিলো আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, আহমদ ছফা, শহীদুল জহির প্রমুখকে নিয়ে। কথায় কথায় জানা গেলো রবিশংকর বল ইলিয়াস এবং জহির পড়েছেন। ছফা কিংবা মাহমুদুল হক পড়েননি। এরই মধ্যে তিনি জানালেন, মাহমুদুল হকের নাম তার জানা নেই। পারভেজ হোসেন তাকে জানিয়ে দিলেন মাহমুদুল হকের কোন কোন গ্রন্থটি পড়া প্রয়োজন। আরেকজন মানে জহর সেনমজুমদারকে প্রায় খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। প্রকাশ্যে মুখোমুখি তাকে দেখে আমার ভিতর ঠিক কোন ধরণের অনুভূতি হচ্ছিলো বুঝতে পারছিলাম না। তবে বয়স যতোটা ভেবে ছিলাম ততোটা নয়। অর্থাৎ আমার ধারনায় ছিলো তিনি নিশ্চয়ই রাশভারি বয়সের গম্ভীর অধ্যাপক। সেটি মোটেও না। প্রথম বাংলাদেশে এসেছেন। পূর্বপুরুষের ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে প্রায় ৫৫ বছর পর তিনি এই বাংলায় পা রাখলেন; এভেবে কিছুটা বিষ্মিত যে হইনি এমন নয়। আসবেন আসবেন করে ৫৫ বছর পার করে দেওয়া মোটেও সহজ কথা নয়। কিংবা তিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেননি বলে হয়তো তার টানটা পূর্বপুরুষদের মতো প্রবল নয়, এমনটাই ভাবছিলাম। তবে তার কবিতাতো সে কথা বলে না। কবিতায় তো বাংলা অঞ্চল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। 

জল যায় শুধু জল; জল যায় শুধু জল; এই জল স্তব্ধ এলোকেশী
তুমি যদি নুন দাও, আমি তবে দিয়ে যাব হাড় মাংস পেশি
বলো বলো মহাকাল, মাঝরাতে ঘুমঘোরে প্রতিদিন তোমারেই খুঁজে
টুপটাপ স্বপ্ন পড়ে; টুপটাপ স্বপ্ন পড়ে; বক্ষদেশে; পোড়া পিলসুজে
আমাদের দেশ নেই; আমাদের নীড় নেই; মেরুদণ্ড একেবারে ফুটো
জল শুধু জল যায়; জল শুধু জল যায়; সঙ্গে যায় ব্যর্থ খড়কুটো
শবদেহ নড়ে ওঠে; চারিপাশে পড়ে আছে নিশি পদ্ম ঢেউ
কুকুরের জন্মদিন; ওই শোনো কুকুরের ঘেউ।

 

দুই.

পরদিন অর্থাৎ ১০ এপ্রিল জেমকন সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের মূল আয়োজন। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করছেন। কিন্তু এক হাতে সবকিছু সামাল দিতে হচ্ছে কবি শামীম রেজাকে। তিনি বিরতিশূন্য সে কাজ করেও যাচ্ছেন। রেজা এক ফাঁকে জানালেন; জেমকনের পরিচালক এবং কথাশিল্পী কাজী আনিস আহমেদ তাকে জরুরি মিটিংয়ে ডেকেছেন গুলশানে। সেদিন ঢাকা শহর যে পরিমাণ ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়েছিলো তাতে আমি শিউরে উঠি, কিভাবে গুলশান গিয়ে রেজা তার দায়িত্ব শেষ করে আবার ঢাকা ক্লাবে ফিরে অতিথিদের দেখভাল করবেন? এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য পার্শ্ব আয়োজন। অতিথিদের ঢাকা শহরটা ঘুরিয়ে দেখাতে হবে। বিশেষ করে জহর সেনমজুমদার যেহেতু বাংলাদেশে এর আগে কখনো আসেননি; ফলে ঢাকা শহরও এই প্রথম তার কাছে। গ্রন্থের বাইরে প্রায় কিছুই জানেন না। এক ফাঁকে টের পেলাম; ভিতরে ভিতরে তিনি টগবগ করছেন। অবকাশ খুঁজছেন কিছু বলার। যেহেতু গ্রন্থের বাইরে আমরা কেউ পূর্বপরিচিত নই; তাই দেয়ালটাকে সরাতে একটু আড়ালতো চাই! দেবেশ রায় ফের কথা বলা শুরু করেছেন। শামীম রেজা এই আমাকে কোথায় উঠিয়েছে। এখানেতো কোনো মনুষ্যজন নেই! গ্রন্থ নেই! লেখার কাগজ নেই! হাসান নেই! প্রশান্ত, হাসান, বাণী কেউ নেই! আমি তাহলে সময়টা কাটাবো কি করে! ও রবি; ও জহর তোমাদের কাছে কি বইপত্তর কিছু আছে? আমিতো কিছু নিয়ে আসতে পারিনি। ও রবি, ও জহর তোমাদের কাছে পড়ার বই কি আছে, দাওতো!
যতোভাবে পারা যায় দেবেশ রায়কে অভয় দিয়ে যাচ্ছিলেন পারভেজ হোসেন। নিজের ব্যাগ থেকে লেখার কাগজ এবং কলম সংগ্রহ করলেন। রবিশংকর জাপানের মুরাকামির কোনো একটি গ্রন্থ দিলেন। আর জহর সেনমজুমদার মিটিমিটি করে হাসছিলেন। দেবেশ রায়ের অস্থিরতার কিছুটা অবসান হলে রবিশংকর বল আর জহর সেনমজুমদার নিজ নিজ রুমে গিয়ে একটু ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করতে চাইলেন। রেজা কানে কানে বললেন; আমি যেন জহর সেনমজুমদারকে একটু সঙ্গ দেই। কারণ, জাহিদ সোহাগকেও তার সঙ্গে মিটিংয়ে যেতে হতে পারে। পারভেজ হোসেন থাকলেন দেবেশ রায়ের রুমে; রবিশংকর বল একাই চলে গেলেন তার রুমে। আর আমি জহর সেনমজুমদারের সঙ্গে তার রুমে। তাকে বললাম একটু বিশ্রাম নিতে। হেসে তিনি বললেন, ক্লান্তি লাগছে না তো! বরং আসো আমরা কথা বলি। ইন্টারকমে কি চায়ের অর্ডার করা যায়? বলো না আমাদের চা কিংবা কফি দিতে! চা এলা। বিশ্রাম না নিয়ে জহর সেনমজুমদার আমার সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। বাংলাদেশের মানে আমাদের সময়টার কবিতার কথা জানতে চাইলেন। কথায় কথায় জানালেন, টোকন-ব্রাত্য-মজনু এদের কবিতা তিনি পড়েছেন। ব্রাত্যকে বিশেষ কারণে তার পছন্দ সে কথাও জানালেন। তবে সবচেয়ে বেশি পড়েছেন শামীম রেজার কবিতা। রেজার যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নগরে  আর হৃদয়লিপির অনেক প্রশংসাও করলেন।

 

তিন.

কলকাতার কি পরিমাণ খোঁজ-খবর রাখি আমরা জেনে বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। আড্ডায় আড্ডায় এক পর্যায়ে জানা গেলো আমার অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে তার গভীর ভাব রয়েছে। কোথায় কোথায় তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে সে কথাও জানালেন। ৯৬ সালে তার বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম পড়েছি; এ কথা জেনে রীতিমতো আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। সাহিত্যের রাজনীতির কথাও জানালেন। জানালেন; জন্ম ভারতে হওয়ার পরও যেহেতু পূর্বপুরুষেরা বাংলাদেশের সেজন্য কিভাবে কিভাবে সাহিত্য রাজনীতির শিকার হতে হচ্ছে। কথার এক ফাঁকে আমার কবিবন্ধু শাহেদ কায়েসের মায়াদ্বীপ  প্রসঙ্গ এলে তিনি বলেন, এনার সঙ্গে নিশ্চয়ই তার পরিচয় রয়েছে। পরে দেখা গেলো সত্যি শাহেদের সঙ্গে তার পরিচয় রয়েছে। শাহেদ বর্তমানে কলকাতায় অবস্থান করছে এটা জানার পর রীতিমতো কলকাতায় ফিরে ওর সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। কবিতার কথায়, ঘুরে  বেড়ানোর কথায়, পেশার কথায়, সংসারের কথায়, জীবন-আচারের কথায় বার ফিরে আসছিলো বস্তুত কবিতা। প্রসঙ্গ ধরেই জানালেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বাংলাদেশের কবিতা পড়ান। বিশেষ করে রফিক আজাদের কবিতা। সেদিন দুপুরে রফিক আজাদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলিয়ে দেওয়ায় তার অনেক আনন্দ হয়েছে। বললেন, ভাত দে হারামজাদা  কবিতা বিষয়ে রফিক আজাদকে যে লিখিত জবাব দিতে হয়েছে, রাষ্ট্রের সংরক্ষণাগার থেকে তার নমুনা সংগ্রহ করা যায় কি-না। করা গেলে অনেক নেতিবাচক প্রচারণা থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে বলছিলেন তার কর্মজীবনের বিড়ম্বনার কথা। বলছিলেন প্রাচীণ নগর, স্থান এবং স্থাপত্যকলার কাছে কিভাবে কিভাবে তিনি বার বার ফিরে যান। বলছিলেন পরিবার নিয়ে একবার ঘুরতে বেড়িয়ে নির্দিষ্ট যাত্রা বাতিল করে হাম্পি নামক শহরে গিয়ে কিভাবে ১৭ দিন কাটিয়ে এসেছিলেন। 
সেই দুপুরের আড্ডায় বার বার ফিরে আসছিলো শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর নবারুণ ভট্টাচার্যের কথা। বলছিলেন কর্মজীবনের শুরুটায় খেটেখাওয়া মানুষদের সঙ্গে কিভাবে জীবন জড়িয়ে নেন। এখনো সেই মানুষগুলোই তার বন্ধু। বলছিলেন এক একটি ঘটনা কিভাবে মানুষের জীবনের বিশ্বাসকে আমূল পাল্টে দেয়। বলছিলেন নবারুণের সঙ্গে অম্লমধুর সম্পর্কের কথা। বলছিলেন সম্প্রতি ঘুরে আসা বেনারসের তিক্ত অভিজ্ঞতা। একবারও বলেননি জীবনানন্দ দাশের কথা। আমিও সেই আড্ডায় জীবনানন্দকে টানিনি। কারণ, জীবনানন্দকে টানলে চলে আসবে তার অসাধারণ কর্ম, জীবনানন্দ : অন্ধকারের চিত্রনাট্য  গ্রন্থটির কথা। আড্ডায় আমরা সেদিকে না গিয়ে কিভাবে কিভাবে যেন নিজেদের মধ্যেই ছিলাম। উত্তেজনায় তিনি বার বার বলছিলেন; বড্ড দেরি করে আসা হলো গো! আরো আগে কেনো এলাম না বাংলাদেশে! যখন জানলেন বাংলাদেশের তরুণ কবিরা তার গ্রন্থ ফটোকপি করে পড়ে আনন্দে প্রায় কেঁদেই ফেলছিলেন। এসবের কিছুই তার জানা ছিলো না। অভিজ্ঞতায়ও ছিলো না। ভুলেননি শামীম রেজা কিভাবে কিভাবে তাকে বাংলাদেশে আসতে রাজি করিয়েছেন সে কথা বলতেও।
প্রসঙ্গক্রমে আমি খালাসিটোলায় কিভাবে শক্তি-সুনীল এবং কমলকুমারের পানের স্থানটি খুঁজে বের করেছিলাম তার অভিজ্ঞতার কথা জানালে তিনি আবেগে বার বার বলছিলেন, এরপর অবশ্যই আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। আর যতোবার বরিশালের প্রসঙ্গ আসছিলো; আনমনা হয়ে যাচ্ছিলেন। বলছিলেন, জানো বাবা এই এই কথা বলেছেন; মা ওই ওই কথা বলেছেন! জানি না সেখানে গিয়ে কি দেখতে পাবো! আমাদের আড্ডা পরস্পরকে গভীর বন্ধুত্বে জড়িয়ে নেয়। তিনি বললেন, কবির তোমার সঙ্গে অন্তত আরও পনের বছর আগে আমার পরিচয় হওয়া জরুরি ছিলো। আজকের এই আড্ডা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। এমন অসাধারণ একটি আড্ডা দেওয়ার জন্যই বোধ হয় এতোকাল পরে আমাকে বাংলাদেশে আসতে হলো। আজকের দুপুরটি অপূর্ব এক সঞ্চয় হয়ে থাকলো আমার কাছে।
দরজায় টোকা পড়লে দেখলাম দেবেশ রায় এগিয়ে আসছেন। তিনি জানতে চাইছেন রবিশংকর বল কোন রুমে। শামীম রেজা কখন ফিরবে। সঙ্গে সঙ্গেই পেছন থেকে উদয় হলেন রবিশংকর বল। বললেন, কবির আমরা কি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ দেওয়ার স্থানটি ঘুরে আসতে পারি না একটু? জহর সেনমজুমদারই মধ্যাহৃভোজের সময় ওই স্থানটি ঘুরে আসার প্রবল আগ্রহ জানিয়েছিলেন। রবিশংকর বল বললেন, তোমার বলা বিদিত  বইয়ের দোকানেও নিতে হবে কিন্তু...! (চলবে)

 

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন:

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || প্রথম পর্ব

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।