সন্ধ্যা ০৭:১৫ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

হামলা দখলে কলুষিত তিন সিটি নির্বাচন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট॥

এতদিন অবচেতনে খানিকটা হলেও উৎসবের যে আমেজটা সবাই লালন করে আসছিলেন, তাতে যে শেষ মুহূর্তে এভাবে 'পানি' ঢালা হবে তা বোধহয় ঘোরতর অনেক সরকার সমর্থকও ভাবেননি। বর্জন, সহিংসতা, সংঘর্ষ, অনিয়ম; তিন সিটির নির্বাচনের সঙ্গে উটকো বিশেষণগুলো জুড়ে গেছে অমোচনীয় কালির মতোই। ১২ বছর পর যে স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচনের স্বপ্নটা মানুষ এক ঝলক দেখতে শুরু করেছিল, সেটা ভেঙে গেল দিনের অ‌‌‌র্ধেক না পেরোতেই।

 

বর্জনের নির্বাচন

তিন সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ ছিল যেমন তেমনই ছিল শঙ্কা। ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়েও দ্বিধা ছিল। সকালেই বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত হওয়ার খবর পেয়ে সেই দ্বিধা বাড়তে থাকে জ্যামিতিক হারে। যার পরিণতিতে ভোটকেন্দ্রে কমতে থাকে ভোটারের উপস্থিতি।

মঙ্গলবার ভোটের মাঝপথে বেলা ১২টার দিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। বিএনপির বাইরে এরপর বেলা তিনটায় বর্জন করেন আরেক মেয়র প্রার্থী জোনায়েদ সাকি এবং এর পরপরই সংবাদ সম্মেলন করে সিপিবি-বাসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। নির্বাচন বর্জন করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলটি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্রগ্রাম সিটি নির্বাচনে তিন মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছিল।

সবার অভিযোগ- কেন্দ্রে এজেন্টদের থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। কর্মী সমর্থকদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। জাল-ভোট আর ব্যালট বাক্স দখলের অভিযোগও করেন তারা।

নয়াপল্টনের সংবাদ সম্মেলনে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস বলেন, 'শুধু ভোট কারচুপি নয়, সাংবাদিকদের ক্যামেরাও ভেঙে ফেলা হয়েছে। এছাড়া আমার দলের নারীকর্মী, সমর্থক ও পোলিং এজেন্টদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে।'

তাবিথ বলেন, 'অনেক আশা নিয়ে অংশ নিয়েছিলাম। সেই আশা পূরণ হলো না। সরকার এমন কারচুপি করেছে তা ভাষায় বর্ণনা দেওয়া যায় না।'

এর আগে কারচুপি, অনিয়মের অভিযোগ এনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। দলটির নেতা আমির খসরু মাহমুদ এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন। বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম রাজনীতি থেকে অবসরে যাওয়ার ঘোষণাও দেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১ ওয়ার্ডের ১২টি কেন্দ্র সকাল ৯টার মধ্যে দখল করে নেওয়ার অভিযোগও আনেন তিনি।

 

নির্বাচন নাকি যুদ্ধ?

হামলায় আহত ৩৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পোলিং এজেন্ট

সারা দিনই বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ আর সহিংসতায় উত্তাল ছিল রাজধানীর বেশ কিছু কেন্দ্র। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিক ও কাউন্সিলর প্রার্থীসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ জন। আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

দক্ষিণের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসাবো বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাসুম হাসান শামীমের কর্মীদের ওপর চড়াও হয় একই দলের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী গোলাম মোস্তফার সমর্থকরা। সংঘর্ষে বেশক'টি ককটেলের বিস্ফোরণ ছাড়াও কয়েক রাউন্ড গুলি বিনিময় হয় দুই পক্ষের।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ছররা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। দায়িত্বরত রাইজিং বিডির ক্রীড়া প্রতিবেদক ইয়াসিন রাব্বীর (২৪) ডান পায়ের গোড়ালিতে একটি গুলিবিদ্ধ হয়।

বাসাবোতে দুই পক্ষের সংঘর্ষের মাঝে পড়ে ইটের আঘাতে আহত হয় ৪ বছরের আরাফাত

বেলা ১১টার দিকে উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেশ কিছু লোক কেন্দ্রটি দখল করে জাল ভোট দিতে থাকে। এ সময় তারা কয়েকটি ব্যালট বাক্স ভেঙে ফেলে। পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের প্রায় আধা ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। খবর পেয়ে র‌্যাব ও বিজিবি লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ১২টার দিকে ওই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়। সংঘর্ষে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মাজহারুল ইসলাম চোখে আঘাত পান।

আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাহমুদা বেগম ও মতিউর রহমান মোল্লা এ হামলা ও ভাংচুরের জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করেন। পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে।

এ ছাড়া দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কবি নজরুল ইসলাম কেন্দ্রে দুপুর পৌনে ১২টার সময় আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থক স্থানীয় ছাত্রলীগের দু'গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে উভয়পক্ষ ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় নিউএজ-এর ফটো সাংবাদিক ইন্দ্রজিত রায়সহ বেশ ক'জন ভোটার ও পথচারী আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল আটটায় ভোট শুরুর এক ঘণ্টা পর সকাল ৯টার দিকে সুরিটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে হঠাৎ বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। ব্যালট পেপার ছিনতাই ও জালভোটের অভিযোগ এনে একটি পক্ষ ব্যালট বাক্স ও চেয়ার টেবিল ভাংচুর শুরু করে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি'র সদস্যরা গিয়ে টিয়ার সেল নিক্ষেপ ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। বেলা সাড়ে ১১টার সময় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন নির্বাচনের ঘোষণা অনুযায়ী ওই বিদ্যালয়ের তিনটি কেন্দ্রের একটির ভোট স্থগিত ঘোষণা করেন। একই সময়ে সবুজবাগের আহমেদবাগ আদর্শ বিদ্যালয় কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানেও বেশ ক'জন আহত হন।

দুপুর ১টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের 'জরিনা শিকদার স্কুল' হাজারীবাগের একটি কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থী মো. সেলিম ও ইলিয়াস রহমানের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। পরে পুলিশ টিয়ার শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। সংঘর্ষে বেশ ক'জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩০ নম্বার ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিকেল তিনটার দিকে কয়েকটি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আরিফুর রহমান ও বিদ্রোহী প্রার্থী আবুল হাশেমের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় উভয়পক্ষ।

দক্ষিণ সিটির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বদরুন্নেছা কলেজ কেন্দ্রে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বেশ ক'জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

বিভিন্নস্থানে সংঘর্ষে আহত সাংবাদিক রাব্বী ও ইন্দ্রজিত ছাড়াও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্যরা হচ্ছেন, বোরহান উদ্দিন (২৮), আরাফাত (৪০), কালু চন্দ্র শীল (৩২), আব্বাস (৪৫), মকবুল (৩৫), সাইদুল ইসলাম (৩৫), সুমন (২৮), সাব্বির আহমেদ (৩৫), মো. খালেদ (২২), সাদ্দাম (২২), লুৎফর (৫৫), মহসিন (৪৫), সাহেব আলী (৬০), মোমেন বাবু (৩০), সারোয়ার (৩২), রফিকুল ইসলাম (৩৫), দেলোয়ার হোসেন (৪৫), পারভেজ (৪৫), মামুনুর রশিদ (৪৫) ও কাউন্সিলর প্রার্থী আসমত আরা জাহান চৌধুরী (৪৫)।

দু'একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। মঙ্গলবার ভিকারুন্নিসা, সিদ্বেশ্বরী ও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। সকালে বিভিন্ন নির্বাচন কেন্দ্র পরিদর্শনকালে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

ফটোসাংবাদিক সাজ্জাদকে ছবি তুলতে বাধা দিচ্ছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা


জালভোটে কালভোট

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে দুই ঘণ্টায় ৫০০ কেন্দ্র দখল করে ক্ষমতাসীন দল, এ অভিযোগ করে বিএনপি। দক্ষিণের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের ব্যালট পেপার নিয়ে যায় ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। প্রিসাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার ও ভোটার তালিকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় কয়েকটি বুথে একাধিক ব্যক্তিকে জালভোট দিতে দেখা যায়।

নিয়ামানুযায়ী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সকাল আটটায় ভোট শুরু হয়ে চলে বিকেল চারটা পর্যন্ত। চারটার মধ্যে কেউ কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারলেই ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু এসব নিয়মের ধার ধারেনি বেশকিছু কেন্দ্র। এ সময়ের 'কেন্দ্র দখল হয়ে গেছে' ঘোষণা দিয়ে সরকার-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিতে দেখা গেছে। ইচ্ছেমতো ব্যালটে সিল মারা 'উৎসব' চলেছে নওয়াব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও উত্তরা হাইস্কুল কেন্দ্রে। এসময় ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ও বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। আর এসব কেন্দ্রের কোনও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে চাননি।

ঢাকা দক্ষিণে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস অভিযোগ করেছেন, প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট ডাকাতি হচ্ছে। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তাঁদের এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেওয়া হচ্ছে। বেলা ১১টার আগে রাজধানীর শাজাহানপুর এলাকায় নিজের বাসার সামনে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এসব অভিযোগ করেন।

এদিকে ভোট কেন্দ্রে জালভোট দেওয়া হচ্ছে এমনটা জানার পর ছবি তুলতে গেলে বাংলা ট্রিবিউনের স্টাফ ফটোগ্রাফার সাজ্জাদ হোসেনের ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। মঙ্গলবার ভোট চলাকালে শেরে ব‌‌াংলানগরস্থ রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলেও ওই পুলিশ তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। সাজ্জাদ এ সময় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারের সহযোগিতা কামনা করলে তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন।

/এফএ/ইউআই/জেইউ/


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।