রাত ১০:২৮ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ এপ্রিল, ২০১৯  

ইস্ক্রা'র আলো ছড়াবার কারখানা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট॥

ইস্ক্রা...বিচ্ছুরিত আলোর এক মুন্তাজ। তিনি সেই মুন্তাজ, যিনি প্রতিনিয়ত ছড়াচ্ছেন জ্ঞানের আলো। মূলত, বাংলাভাষার মূল্যবান বইগুলোকে আধুনিকভাবে সংরক্ষণ করে তার ডিজিটাল লাইব্রেরিতে পড়ার সুযোগ করে দিয়ে সেই দায়িত্বশীলের ভূমিকাটি পালন করছেন ইয়ামিন রহমান ইস্ক্রা নামের এই উদ্যমী তরুণ।

মূলত, বাংলা ভাষায় লেখা বিভিন্ন বইয়ের সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়েই কাজের শুরু। নিজ উদ্যোগে ২০১৩ সালের শেষের দিকে শুরু হয় পথচলার। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো বিভিন্ন বিভাগের বইগুলো অনলাইনে পাবার সুযোগ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই শুরু তার কাজের। লক্ষ্য একটাই, অনলাইনে বিভিন্ন বিষয়ের বইগুলো পাবার সুযোগ এবং একই সময়ে স্থায়ীভাবে দুর্লভ অনেক বইয়ের সংরক্ষণ।

ওই বছরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন আইন বিভাগে। ভর্তির পরপরই একদিন ফেসবুকে লিখে ফেলেন নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা স্বপ্নটির কথা। মুহূর্তেই সঙ্গ পেয়ে যান কাছের কিছু বন্ধু আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের।

পথচলার শুরু...

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কিংবা কোনও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নয়, পছন্দের বইটি কাছে পেতে ইস্ক্রা চাচ্ছিলেন আরও সহজ কোনও পথ। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন, অনলাইন নির্ভর ডিজিটাল লাইব্রেরি গড়ে তোলার। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসলো DevelopIT নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর সভাপতি ধীরাজ দাশ স্বপ্রণোদিত হয়ে ইস্ক্রার জন্য তৈরি করেন দিলেন একটি ওয়েবসাইট। কৃতজ্ঞতা হিসেবে ইস্ক্রা জানান, ‘ধীরাজদা নিজে থেকেই ডোমেইন কেনা থেকে শুরু করে সাইট ডিজাইন এবং সংরক্ষণ সার্ভারের ব্যবস্থা করে দেন।’ এছাড়া, বইগুলো সংরক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ বিভাগের বড় ভাইয়ের সহায়তায় কিনে ফেলেন স্ক্যানার। আরেক কাছের মানুষ বা বন্ধু রাদ করে দেন সাইটটির লোগো। স্ক্যানার হাতে পাবার পরপরই শুর করে দিলেন নিজের বইগুলো স্ক্যানিং। শুরু সাইটে বই আপলোড করা। এভাবেই, ২০১৪ সালে ১লা জানুয়ারি থেকে ৫০টি বইদিয়ে শুরু ইস্ক্রার ডিজিটাল লাইব্রেরির যা সবার জন্য ‘গ্রন্থ ডটকম’।

সার্বিক কার্যক্রম...

গ্রন্থ লেখার কৃতিত্ব যদি লেখকের হয়, তবে তা মূদ্রণ থেকে শুরু করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্ব আরও অনেকের। একইভাবে, ইস্ক্রার এই আলো ছড়াবার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার কিছু কাছের বন্ধু, যারা একই আদর্শে অণুপ্রাণিত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন একাগ্র চিত্তে। তারা মূলত বই সংগ্রহ, স্ক্যান করা থেকে আপলোড করে থাকেন। ইস্ক্রা কৃতজ্ঞভরে তার এই কার্যক্রমের সমান দাবিদার হিসেবে উল্লেখ করেন রোকন রকি, সাঈদ আহমেদ, রকিব হাসান, সাব্বির ইসলামের নাম। এছাড়া, কারিগরি সহায়তাসহ ওয়েবসাইটটি পরিচালনায় মাসিক যে ২৫ হাজার টাকার ব্যায় হয়, তা বহন করে থাকেনDevelopIT । তবে, নতুন বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে থাকেন তারা।

অবাণিজ্যিক চেতনা

ছাত্র হিসেবে গ্রন্থডটকম পরিচালনা কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও এই আলো ছড়াবার কার্যক্রমটি পুরোপুরি অবাণিজ্যিক রাখতে চান ইস্ক্রারা। যে কারণে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অংকের বিজ্ঞাপন প্রচারের প্রস্তাব পেলেও হাসি মুখে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

গ্রন্থডটকমের গ্রন্থ গল্প

গ্রন্থডটমে মূলত সন্নিবেশ করা হয়েছে সৃজনশীল আর একাডেমিক বই দিয়ে। কিন্তু একাডেমিক বইয়ের ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞান, ভাষা, ফোকলোর, বাংলা এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ক পড়াশুনার বইগুলোই কেবল রয়েছে। কারণ হিসেবে ইস্ক্রা জানান , 'রাবির শিক্ষকদের সহায়তায় এই ঘরানার বইগুলো সংরক্ষণ সংখ্যা বেড়েছে। তবে, লক্ষ্য যেহেতু গ্রন্থডটকমকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডিজিটাল রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করা, তাই আরও নতুন নতুন বিষয় অর্ন্তভূক্ত করা হবে।'

পাঠকের জন্য আলাদাভাবে ক্যাটাগরি তৈরী করা হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে ইস্ক্রা জানান, বই যদি হয় সবার জন্য উন্মুক্ত জ্ঞান ভাণ্ডার, তাহলে ক্যাটাগরি তৈরী করার কোনও যুক্তি তিনি দেখেন না। তবে, পাঠকদের সুবিধার্থে লেখকের নাম দিয়ে একটি সার্চ (অনুসন্ধান) অপশন শিগগিরই যুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

গ্রন্থযাত্রার প্রতিবন্ধকতা

জ্ঞানের আলো ছাড়াবার মতো প্রশংসনীয় কাজ খুবই কমই আছে। কিন্তু তা ছড়াতে গিয়ে যদি সৃষ্টির স্রষ্টার অসম্মান হয়ে গেলে তো বিপত্তি! গ্রন্থডটকমের যাত্রার পরপরই শুরু হয়েছিল সাইটে আপলোড করা বইগুলোর কপিরাইট আইন নিয়ে সংশয়। প্রশ্ন রয়েই যায়, পাঠক যদি অর্থ ব্যয় না করেই বই পড়তে পারেন, তাহলে লেখকের ন্যূনতম সম্মানীর কী হবে?

বিষয়টি যখন অর্থ সংশ্লিষ্ট তখন তা একটু গুরতর বলেই বিবেচ্য। তাই, সিদ্ধান্ত হয় সাইটে আপলোড করা বইগুলো যে কেউ বিনামূল্যে পড়তে পারলেও ডাউনলোড করবার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ চেয়ে নেবেন লেখকের অনুমতি। এক্ষেত্রে লেখকেরা তাদের নিরাশ করেননি বলেই জানন ইস্ক্রা। তিনি জানালেন, লেখকরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই তাদের বই দিয়ে থাকেন। তবে, দেশের ভেতরে যে বইগুলোর লেখকের অনুমতি নেওয়াটা সম্ভব হয়ে ওঠে না, সেগুলো কেবলমাত্র অনলাইনে পড়ার (রিডিং) ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ, বইটি কেবলামত্র পড়া যাবে কিন্তু ডাউনলোড করা ও বিতরণ করা যাবে না। তবে, তারা কপিরাইট উত্তীর্ণ বই আপলোড করে থাকেন গ্রন্থডটকম-এ। ফলে ‍প্রতিবন্ধকতা কিভাবে দূরে ঠেলে এগিয়ে যাওয়া সে বিষয়টি ভালোমতই প্রমাণ করেছেন ইস্ক্রারা। এছাড়া, আরও বেশ কয়েকটি গ্রন্থ বিষয়ক সাইটের সঙ্গে বই লেনদনের মাধ্যমেই বেড়েই চলছে বই সংরক্ষণের কাজ।

আগামীর পথচলা

লক্ষ্যহীন স্বপ্ন নাকি অবাস্তব হয়। তবে ইস্ক্রাদের স্বপ্ন দেখবার ও দেখাবার পথটি একটু ভিন্ন। জানালেন, 'স্বপ্ন দেখার চেয়ে বিশ্বাস করা উচিৎ বাস্তব পর্যালোচনায়। আর এ কারণেই তারা কোনও প্রতিযোগিতায় না নেমে প্রয়োজনের তাগিদে সাইটটিকে একাডেমিক গঠনমূলক সাইট হিসেবে গড়ে তোলা। যা হবে কেবল আলো ছড়াবার কারখানা। আর প্রতিযোগিতা থাকবে কেবলই সঠিক পদ্ধতিতে আরও বেশি পাঠকের বই পৌঁছে দেওয়া।

গড়ে উঠছে সংরক্ষণ

পথচলার এক বছর চার মাসের মাথায় ডিজিটাল এই লাইব্রেরিতে আপলোড করা বইয়ের সংখ্যা সাড়ে ছয়শ'। এর মধ্যে অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ফরহাদ মজহার, অদিতি ফাল্গুনী, গোলাম হোসেন হাবীব, প্রফেসর হেলাল মহিউদ্দীন, সেলিম রেজা নিউটনের মতো লেখকরা তাদের প্রকাশিত সব বই গ্রন্থডট কমে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। ইস্ক্রা জানান, বাণিজ্যিক প্রকাশকরা তাদের উদ্দেশ্যটা বোঝেন বলেই তারাও কখনও কোনও বইয়ের ব্যাপারে আপত্তি জানায়নি। ইস্ক্রাদের স্বপ্ন, একটু সময় লাগলেও একাডেমিক রেফারেন্সের একটা সমৃদ্ধ জায়গা হবে গ্রন্থডটকম।

আর এই সমৃদ্ধ আলো ছড়াবার জায়গাটি আরও একটু সমৃদ্ধ করতে অবদান রাখতে পারেন আপনিও। নিজের লিখা বইটি উন্মুক্ত করতে ইমেইল করুন: grontho.com@gmail.com এই ঠিকানায় ।

এছাড়া, ফেসবুকের একটু বেশি সরব পাঠকেরা grontho.com পেজটিতে লাইক দিয়ে পেয়ে যাবেন কাঙ্ক্ষিত বইয়ের খবরটি।

/এআই/এএ/এফএএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।