বিকাল ০৫:০৮ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

আয়েশাকে হারিয়ে || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন || পর্ব-১

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জীবনের প্রথম দুঃখটা পেয়েছিলাম সাত বছর বয়সে। দুঃখ মানে সেই দুঃখ যা নামলে পৃথিবীর সব আলো মুছে যায় এবং মনে হয় এই অন্ধকার আর কোনোদিন কাটবে না। ঘটনাটা শুনতে অবশ্য যথেষ্ট কিঞ্চিৎকর এবং হাস্যকরও মনে হতে পারে। সময়টা ছিল শীতের এক বিকাল। লাঞ্চের পর আমাকে বলা হয়েছিল শুতে যেতে। ঘুম থেকে ওঠার পর সামনের লনে খেলা। প্রায় মার্শাল-ল সিস্টেমে আমাদের বাসায় নিয়ম কানুন ছিল খুবই কড়া। সকাল সাতটায় ঘুম থেকে ওঠা, এরপর ডিম-টোস্ট ও এক মগ ওভালটিনের নাস্তা, বিকাল সাড়ে চারটায় সামনের লনে খেলা, আর রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে মাত্র আধঘণ্টার জন্য টিভি দেখা— এই ছিল মোটামুটি দিনের রুটিন। রুটিনের এক আইটেমের শেষ আর পরের আইটেমের শুরুর মাঝের সময়টায় আমার মা অব্যর্থভাবে উপস্থিত থেকে নিশ্চিত করতেন সময়মতো প্রতি আইটেম শুরু শেষ হচ্ছে কিনা। 
আমরা সে সময় থাকতাম বনানীতে একটা একতলা লাল ইটের বাড়িতে। এলাকাটি তখনো প্রকৃত চেহারা হারায়নি। বেশিরভাগ প্লটে তখনো বাড়িঘর ওঠেনি। রাতে নিকটতম গোরস্তান থেকে খেকশিয়ালের চিৎকার নিয়মিত শোনা যেত। আমাদের বাড়িটার সামনে পিছনে দুইদিকেই লন ছিল। পিছনের লনে অনেক ফলের গাছ ছিল। সেই লনে কলাগাছ-সহ অন্যান্যসব ফলের গাছের মাঝে আমার বাবা একটা দোলনা ও একটি ‘সি-স’ স্থাপন করেছিলেন। আমার সাত বছরের মনের কল্পনার কল্যাণে সন্ধ্যার ছায়াময় অন্ধকারে সে লনে সাপ আর পেত্নী এসে ভরে যেত। এমনকি দিনের আলোতেও সেগুলো সব চলে যেত বলে আমার মনে হত না, আর তাই আমি সেখানে কখনো একা যেতাম না। 
ফলে সামনের লনটাই ছিল মূলত আমার জায়গা। তখন মনে হত সে এক বিশাল খেলার মাঠ, যদিও অনেক বছর পরে একদিন গিয়ে মনে হয়েছিল দম ফেলতে না-পারার মতো এক চিলতে জমি। তখন সেই লনে ৩ নম্বর একটি ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে পারাই দিনের বাকি সময়টুকু বেঁচে থাকার লক্ষ্য বলে মনে হত। আমার একমাত্র এবং শ্রেষ্ঠ বন্ধু রাকিব একটা গায়ে-না-লাগা লিভারপুল জার্সি গায়ে দিয়ে ঠিক বিকাল সাড়ে চারটায় চলে আসত। আমরা সেই লনে ইটের আধলা দিয়ে একটি গোল পোস্ট চিহ্নিত করতাম। আমরা শীতকালেও অন্য ছেলেপেলেদের মতো ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেটে ঝুঁকতাম না। সবকিছুতে কথাশোনা আমাদের মুটকু বাবুর্চি মোতি মামাকে গোলপোস্টে গোলকিপার হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিতাম। পুরা লন জুড়ে আমরা দৌড়াতাম। পাশের ফুলগাছের সারিগুলোও মাঝে মাঝে মাড়িয়ে যেতাম। ছোট্ট ঝোপগুলোয় পা আচড়ে যেত খেয়ালই করতাম না। মাঝে মাঝে একজন আরেক জনের পায়ে লাথি দিতাম এবং ফাউল ফাউল বলে চেঁচিয়ে মোতি মামার দৃষ্টি আকর্ষণ করতাম। সে শুধু আমাদের গোলকিপার থাকত না, খেলার রেফারিও থাকত সে-ই। আমাদের ছোট্টবুকটুকুতে যতটুকু বাতাস থাকত সেটুকুর পুরো দম নিয়ে আমরা প্রাণান্তকর দৌড়াতাম এবং চেষ্টা করতাম বলটা মোতি মামার হাত এড়িয়ে গোলে ঢুকানোর জন্য। জয়-পরাজয়ের ব্যাপারে আমরা এতই সিরিয়াস ছিলাম যে, আমাদের খেলায় কোনো ড্র থাকত না। সময়ের মধ্যে দুজনেই গোল দিতে ব্যর্থ হলে প্রতিদিনই খেলাটি পেনাল্টি শটের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত করা হত। সুতরাং বোঝাই যায় প্রতিদিনের খেলাটিই আমাদের কাছে কত মরণপণ এক লড়াই ছিল। সে লড়াই আরো বড় হয়ে উঠত তার জন্য যে আগের দিন হেরেছে। পরের দিন খেলা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সারাদিনের ভাবনাই থাকত গতদিন কী ভুলে হেরেছি সেই ভুলের বিষয়টি। পরের দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যটিই হত আগের দিনের ভুলটা সংশোধন করা।  
আমি ঠিক মনে করতে পারছি না যে-বিকেলের গল্পটি করছি সে বিকেলটিতে অমন কোনো ভুল সংশোধনের পালা ছিল কিনা। যেটুকু মনে পড়ছে তা হলো মা আমাকে দুপুরের খাওয়ার পরে ঘুমুতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ঘড়ির এলার্মের চেয়েও পারফেক্ট সময়জ্ঞানওয়ালা আমার মা সেদিন রুটিন অনুযায়ী সাড়ে চারটায় খেলতে যাওয়ার জন্য আমাকে ঘুম থেকে তুলতে ভুলে গিয়েছিলেন। আমি যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন বাইরে সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার সূর্যের বেগুনি আলো পশ্চিম আকাশে তখন দিনকে বিদায় জানাচ্ছে এবং বলছে— এই বিকালটি তুমি বৎস্য আর কোনোদিন ফেরত পাবে না। আমি এইটুকুই বুঝছিলাম এবং বুঝছিলাম জীবনের একটি বড় পাওনা থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হল। 
কেন মা আমাকে জাগালেন না? কেন মোতি আমাকে জাগাল না? এমনকি কেন রাকিবও না? এদের সকলের সম্মিলিত এই বিশ্বাসঘাতকতার উদ্দেশ্য কী? আপাতভাবে দেখা যাচ্ছিল মা উঠতে পারেননি এবং তাঁর নিজেরই অনেক কাজকর্ম বিঘ্নিত হয়েছে। মোতি মামা মনে করেছিল ঘুমটা আমার শরীরের জন্য দরকার এবং এ কারণে সে রাকিববে আমাকে উঠাতে বারণ করেছে। রাকিব একাই কতক্ষণ প্রাকটিস করে চলে গেছে। তারপরও আমাকে উঠানোর বিষয়টি তাদের প্রত্যেকের কাছে এমন গুরুত্বহীন মনে হওয়ায় আমি ভিতরে ভিতরে ভয়ঙ্করভাবে জ্বলছিলাম। 
বিষয়টি নিয়ে আমি যখন রীতিমত তাদেরকে চার্জ করলাম তখন মোতি মামা প্রস্তাব দিল সে এই অন্ধকারেই আমার সাথে খেলতে নামবে। আমরা তখন আমাদের বৈঠকঘরে দাঁড়ানো। সেখান থেকে লনের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল আসমানের কোনো চৌবাচ্চা উপচিয়ে অন্ধকার নেমে নেমে লনটাকে প্রায় কানায় কানায় ভরে তুলেছে। মা কথা দিলেন পরের দিন পুরো এক ঘণ্টা বেশি খেলতে দিবেন। আমি চিৎকার করে বললাম— তাতে তো আজকের বিকাল ফেরত হবে না! যে ঘণ্টাটা চলে যায় সেটা কোনো পরের ঘণ্টা দিয়ে আর পূরণ করা যায় না! আমার এমন দার্শনিক চিৎকারে তারা পুরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন এবং একটু মায়ার সাথেই হাসলেন।
আমি রাগে ক্ষোভে মাকে এবং মোতি মামাকে যা মুখে আসে বললাম এবং বলতে বলতে কান্নায় আর চোখের পানিতে একাকার হলাম। যা যায় তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। এইটুকু বোঝার বয়স তাদের এখনো হলো না? আমি রাগের চোটে বলটায় লাথি মারলাম। সাথে সাথে বলটি আমাদের বৈঠকঘরের দরজা দিয়ে সোজা লনের অন্ধকারে হারিয়ে গেল। আমার এমন ব্যবহারে মা প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন। সোজা আমাকে আমার রুমে পাঠিয়ে দিলেন এবং বললেন এই ঘ্যানঘ্যান না থামালে সেদিনের রাতের টিভি দেখা বন্ধ। যেন টেলিভিশন আমার কাছে অনেক কিছু! যেন যা আমি হারিয়েছি তার বাইরেও এমন কিছু আছে যা আমি বড় মনে করি!  
অনড় দুখানা পা নিয়ে আমি আস্তে আস্তে আমার অন্ধকার রুমটিতে ঢুকলাম। বিকালের খেলা হারানোর ব্যথার জায়গায় একটি অন্য অনুভব ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠতে শুরু করল। আমি অনুভব করতে শুরু করলাম জীবন থেকে এভাবে যে-কোনোকিছু এমনভাবে হারিয়ে যেতে পারে যে তাকে আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না। আমি হঠাৎই দেখতে পেলাম আমাদের রুটিন সে যতই কঠিন ও কড়া হোক তার বজ্র আঁটুনিতে ফস্কা গেরো। রুটিন খালি একটি ঘটানোর পৌনপুনিকতা। শুধু একটি ভাব নেয়া যে সব আছে এবং চলছে। আসলে সব হারাচ্ছে। আমি যে হারানোর বোধ ও অনুভবে পৌঁছলাম তা প্রকাশের প্রয়োজনীয় শব্দ তখন আমার জ্ঞানে ছিল না। আমি অনুভব করছিলাম আমার মায়ের পক্ষেও এই হারানো থেকে আমাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। আমার তখন আর রাগ নেই। বরং আমার তখন দুঃখ হচ্ছে আমার জন্য আর মায়া হচ্ছে আমার মায়ের জন্য। একটি শীতের বিকাল হারিয়ে ফেলে সেইদিন এভাবে আমি প্রথম অনুভব করেছিলাম দুঃখ কী। 

জানি না আমি সাত বছর বয়সে যে বিষয়টি অনুভব করেছিলাম প্রত্যেকের জীবনেই এমন অনুভবের মুহূর্ত আসে কিনা। হয়তো প্রত্যেকের জীবনেই আসে, তবে পরিণত বয়সে। হয়তো কারো কারো কখনো আসে না। তবে আমার মনে হয় পরিণত বয়সের বেশির ভাগ সময়টায় আমাদের একটা প্রচেষ্টা থাকে যাতে এমন মুহূর্তগুলো আসতে না পারে সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার। আমাদের সুখ এবং সুস্থতা অনেকটা নির্ভর করে এই বেড়া বা প্রতিরোধের শক্তির ওপর। গত মঙ্গলবার ইবিদ স্টোরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার ভাবনা ছিল আমার এই বেড়াটা বেশ শক্তপোক্ত। আমি এই স্টোরটা পছন্দ করতাম কারণ এর দর্শন কর্নারটি এই শহরের যে কোনোটির চেয়ে সমৃদ্ধ। আবার এটি আমার অফিস থেকে ছিল বেশ কাছে। একটি ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে হত। সেখানে দার্শনিকরা এলোমেলো এক জনের কাঁধ ছুঁয়ে আরেকজন পড়ে আছে। কোনো অজ্ঞাত কারণে শেলফটিতে জার্মানদেরই আধিপত্য ছিল। ধুলোমলিন শপেনহাওয়ার এবং হেগেল অনেকটা যেন নীৎশে ও হাইডেগারের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে শেলফ অধিকার করে আছে। আমি যে কোনো একটা কপি নিয়ে গিয়ে লোহার রেলিংটার পাশে রাখা বেঞ্চটিতে বসে যেতাম। পাশে এয়ারকন্ডিশনারের চুইয়ে পড়া ফোটাফোটা পানির শব্দে নিচের মূল প্রদর্শনী অংশের চতুষ্পার্শ্বের মহিলাদের গল্পের আওয়াজ বাঁধা পেত। আমি যেখান থেকে খুশি পড়তে শুরু করতাম। আমি এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে পড়তাম। কর্মচারীরা সবাই আমাকে চিনত এবং কোনো সমস্যা করত না। আমি বইটি যেখান থেকেই পড়তে শুরু করতাম সমস্যা হত না। সব জায়গায়ই কথাগুলো আপন মনে হত, বারবার শুনেছি বলে মনে হত। দূরদেশের সাদা মানুষগুলোর চমৎকার অসংসারী কথাগুলো আমার বেসামাল অভ্যন্তরটার জন্য অনেকখানি শান্তির মনে হত। 
আমি ঢাকায় কারোর সাথে কথা বলতে পারছিলাম না। এখানে মানুষের জানাশোনার কৌতুহলের শেষ মাথা ছিল নতুন মডেলের গাড়ি কিংবা কোনো নতুন ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র। বড় জোর রাজনীতি কিংবা কোন বড় কোম্পানিগুলো একটির সাথে আরেকটি মিশে গেছে সেই খবর। অথবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ কোনটি কিংবা শহরের কোনো নতুন রেস্টুরেন্টের খবর। মহিলারাও আলাদা কিছু না। শুধু আগ্রহের বস্তু আলাদা। আমরা যখন কারো সাথে কথা বলি তখন একটি ভিন্ন চেতনার রাজ্যে ডুব দেই। ভাগ্য ভালো হলে আমরা সেখানে চেতনাসলিলের এক নতুন গভীরতার সন্ধান পাই। সেই চেতনা স্রোতে নতুন বাঁক থাকে, কোথাও কোনো অপ্রত্যাশিত ঘূর্ণি থাকে, আশ্চর্য হওয়ার উপাদান থাকে, এবং কখনো কখনো সমর্থনযোগ্য নতুন ভাবনাও থাকে। আমি চাইতাম আমার কথা বলার লোকদের মাঝে আমি পাবো চেতনার এমন নদী বা সাগরের মত গভীরতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার বার বার খালি জুটত কাঁদার ডোবা। ফলে আমি শেষ পর্যন্ত এ সন্ধানই বন্ধ করে দিলাম। আয়েশাকে হারানোর পরে ভেবেছিলাম ভালো করে খুঁজলে আরো পরিপূর্ণ কাউকে হয়তো পেয়ে যাব। কিন্তু পঁচিশ বছর হয়ে গেল কাউকে পেলাম না। এখন বুঝতে শিখেছি আমাদের মানসজগতের এই চাহিদাগুলোর পূরণ অপূরণ দৈবের ওপরই অনেকটা নির্ভর করে।
বয়স হওয়ার পর থেকে আমি ব্যবহারিক জীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করতেই আমার শক্তিগুলোকে নিয়োগ করেছি এবং এ কাজে আমি খুব খারাপও করিনি। আবার সেই বনানীতে এক সুরম্য এ্যাপার্টমেন্টে আমি এখন একা থাকি। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা এখন আমার নিজের। এটি শহরের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান নয় ঠিক, তবে এখান থেকে যা আসে তাতে আমার জীবনটি যথেষ্ট শোভনভাবেই চলে যায় এবং আমার প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা ভিন্নতায় ও ব্যতিক্রমে বিজ্ঞাপনের কাজটি করে বিধায় কাজটি আমাকে বেশ আনন্দও দেয়। আমি বছরে দুবার ছুটি নেই এবং দূর বিভূঁইয়ে চলে যাই। গতবছর গিয়েছিলাম আয়ারল্যান্ডে এবং মরিশাসে। এর চেয়েও বেশি উপভোগ করি আমার প্রতিদিনের স্বাধীনতা এবং বিশেষ করে ইবিদ স্টোরে সময় কাটানো। গত মঙ্গলবার আমি ইবিদে গেলাম। ম্যানেজারের চোখে চোখে কথা হল অনেকটা গোপন যোগাযোগের মতো। ম্যানেজার লোকটার হলুদ চোখ এবং মুখে বড় বড় দাঁত। দর্শন কর্নারে জার্মান আধিপত্যের পিছনে এই লোকটিরই দায় বলে আমার ভাবনা। স্টোরটি লোকে গিজগিজ করছে। তবে ভাগ্যের দয়া যে, আমার বসার জায়গাটা রীতিমত খালিই আছে। আমার অফিস থেকে এইটুক পথ হেঁটেই আমি বেশ ঘামিয়ে গিয়েছি। আমার ভালো লাগল এসিটা শব্দ করে হলেও চলছে। আমি ঠাণ্ডা হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎটাও থাকল। 
আমি শেলফ হাতড়াতে লাগলাম। একটা বেশ পুরনো বই বের করলাম। নাম Beyond Good and Evil. নীৎশের সব বইয়ের মধ্যে এটি আমার সবচেয়ে প্রিয়। ভাববাদিতার ওপর এ বইয়ের সরাসরি এবং যন্ত্রণাকর আক্রমণটা আমি বেশ উপভোগ করি। এই আক্রমণের সামনে ভাববাদ এবং ভাববাদীদের খুব অসহায় মনে হয়। এই বইয়ের মানুষটির রাগের সাথে আমার খুব মিল হচ্ছিল। তবে তার সমস্যার অনেকগুলোই আমার নয়, যেমন সিফিলিস, পাগল পরিচয়, অল্প বয়সে মৃত্যু ইত্যাদি। বেচারার কী ভীষণ দহন ও যন্ত্রণা যে ছিল! আমার ভাল লাগল তার বাক্যগুলোর অস্থিমজ্জায় মিশে যাওয়া অভিব্যক্তির প্রচণ্ডতা ও তীব্রতা। তিনি বলেন— দার্শনিককে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে নির্দয়ভাবে। তাঁর খোড়াখুড়ির আঙ্গুলে থাকবে তেজ ও দ্রোহ। তাঁর দাঁত ও পেটের থাকবে সেই তেজ যা দিয়ে সে জঘন্যতম অখাদ্যকে পর্যন্ত চিবোতে ও হজম করতে পারে। ছোটবেলায় আমার খুব সাধ হত আমি একজন দার্শনিক হব, নিদেনপক্ষে একজন লেখক। শেষ পর্যন্ত আমি লেখকের ধারেকাছেও পৌঁছাইনি। আমার আছে বড় জোর একখানা খাতা যা দিয়ে আমার নিঃসঙ্গতার চড়াইটুকু আমি ধরে রাখি। তবে আমার মনে হয় সেই ধড়িবাজ লোকগুলো যারা প্রতি বছর এক একখানা খাতাকে বই বানিয়ে লেখকের নাম বাগায় তাদের চেয়ে আমার জীবনটি অনেক যোগ্যতরভাবে একজন লেখকের জীবন। নীৎশের গালিখাওয়া ঐ দার্শনিকদের চেয়ে তারা অনেক নিচের। দার্শনিকদেরকে একটু ট্যারা চোখে দেখা এবং একটু ঠাট্টার চোখে দেখার ব্যাপারটা যথেষ্ট মজার শুধু এ কারণে নয় যে... তারা ভ্রান্তিটি ঘটিয়ে উধাও হয়ে যায়... ...বরং একারণেও যে তারা আদতে সৎ না... তারা যে সব যুক্তির বেড়া দিয়ে নিজেদেরক রক্ষা করে সে সব যুক্তি তারা খুঁজে আনে ভাবজগৎ আর ‘ওহী’র জগৎ থেকে। অনেকদিন আগে এই লাইনগুলো আমি একবার পড়েছিলাম। আজ আবার পড়ার সময় একটি পুরনো প্রিয় গান অনেকদিন ভুলে যাওয়ার পরে আবার মনে পড়লে যেমন আনন্দ হয় তেমন আনন্দ হচ্ছিল। আমি বেঞ্চটাকে একটু টেনে একটা শেলফের সাথে মিলিয়ে দিলাম যাতে শেলফের গায়ে হেলান দিয়ে বসা যায়। শরীরটাকে এই সাপোর্ট দিলাম যাতে আরো গভীর মনোযোগের পৃষ্ঠায় পৌঁছে শরীর নিয়ে ভাবতে না হয় এবং গভীরতর মনোযোগের সাথে বইয়ের মধ্যে ডুব দেয়া যায়। 
আমি বইয়ের বর্ণনার ধারা থেকে বুঝতে পারছিলাম লেখক প্রস্তত হচ্ছেন তার নেমেসিসের ওপর আরো একটি মোক্ষম আক্রমণের জন্য। কিন্তু সেখানে পৌঁছার আগেই বিদ্যুৎটা হঠাৎ চলে গেল। বাইরে তখন আলো খুবই কম। যেটুকু আছে সেটুকু থেকে আমি যেখানে বসা সেখানে কিছুই আসে না। আমি বইটি বন্ধ করলাম এবং দোকানের এক কর্মচারীকে বললাম আমার জন্য একটি হ্যালোজেন ল্যাম্প আনতে।
ম্যানেজার এক কাঁধ নামিয়ে হেঁটে হেঁটে দোকানের সামনের দিকে গেল যাতে এই সুযোগে কেউ কিছু চুরি করে নিতে না পারে। ক্রেতারা দোকানের মধ্যে যে যেখানে হাঁটছিল সেখানেই অনেকটা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল। একটা ছোট্ট কর্নারে দেখলাম তিনজন মহিলা দাঁড়ানো। এদের একজনকে দেখা যাচ্ছিল পেছন থেকে এবং আরেকজনের মুখমণ্ডল একটি ফ্যাশনেবল স্কার্ফের পাশ দিয়ে ঢাকা। চুলখাটো বারগেন্ডি শাড়ি পরা তৃতীয় জনের সাথে আমার চোখাচোখি হল। আমি তার মুখের এক পাশ দেখেছি এবং তা থেকেই আমার ভিতরে এক ভয়ঙ্কর ওলটপালট হয়ে গেল এবং আমি টের পেলাম এটি আয়েশা। চেহারায় বয়সের সূক্ষ্ম ছাপ পড়েছে। তবে সে ছাপ সত্ত্বেও তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, একপায়ে ভর দেয়া এবং মাথাটা একদিকে একটু দোলানো, শ্যামলা ত্বক সব মিলিয়ে এটা আয়েশা না হয়ে কোনো উপায় ছিল না। আমার চাহনি টের পেয়েই যেন সে উপরের দিকে তাকাল। এমন একটি দেখা হওয়ার দৃশ্য আমি অনেক বছর ধরে কল্পনা করে এসেও প্রথম ধাক্কায় আমি পিছিয়ে গেলাম। মুহূর্তের জন্য একটি ইতস্তততার বোধ থেকে আমার দৃষ্টিটি সরে গেল। কয়েক সেকেন্ড পরে যখন আবার তাকালাম ততক্ষণে সে আর নেই।  
আমি দৌড়ে নিচে নামলাম। কিন্তু তিন মহিলার কাউকেই আর দেখা গেল না। আমি অবশ্য জানি না তিনজন একত্রে এসেছিল নাকি দৈবক্রমে তারা একত্রে দাঁড়িয়েছিল। ম্যানেজারকে জিগ্যেস করলাম এঁদেরকে উনি চেনেন কিনা। একটু আমতা আমতা করে বললেন— ‘না স্যার, ওনাদেরকে খুব একটা দেখেছি বলে মনে হয় না’। আমি কিছুক্ষণ কোনো কথাবার্তা ছাড়া দোকানে পায়চারি করলাম। মনে হচ্ছিল আয়েশা ঘুরেফিরে আবার একবার এখানে ঢুকবে। 
ইবিদের গলিটি দোকান, ক্যাফে আর অফিসে ঠাসা বলে মানুষ আর গাড়িরও এখানে ঢল নামে। ঐ ভিড়ে যারা হারিয়ে যায় তাদেরকে খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব। তারপরও আমি বের হয়ে এলাম এবং ডানে বায়ে অনেক দূর পর্যন্ত তাকালাম। আয়েশার বন্ধু সার্কেলের মধ্যে আমার সার্কেলের কেউ ছিল না। ফলে ওর সম্পর্কে খুব একটা খবরাখবর জানা যেত না। একমাত্র রাকিব মাঝে মাঝে কিছু বলত তবে রাকিবের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে খবরের অবিশ্বাসযোগ্যতাও বেড়ে যাচ্ছিল। শুধু মূল তথ্যটুকু হয়তো বিশ্বাসযোগ্য : দুই বাচ্চা-সহ আয়েশা আবার বিয়ে করেছে এবং অনেকদিন বিদেশে কাটিয়ে সে এখন ঢাকায় থাকে। তাকে খুঁজে পেতে চাইলে সেটি এখন আর খুব কঠিন হবে না। কিন্তু ওর সাথে দেখা হওয়ার বিষয়টি আমি যেহেতু সাহসে আনতে পারছিলাম না সেহেতু বিষয়টি অনেক বছর ধরে দৈবের উপরই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আয়েশার গল্পটা বলতে গেলে অবশ্য আমাকে একটু পিছনে সেই সময়টায় যেতে হবে যখন আমরা বনানী থেকে উত্তরায় বাসা শিফট করেছিলাম। (চলবে)


এই গল্পটি কাজী আনিস আহমেদের গুড নাইট মিস্টার কিসিঞ্জার এন্ড আদার স্টোরিজ  গ্রন্থের Losing AYESHA-এর বঙ্গানুবাদ।  

অলঙ্করণ : মোস্তাফিজ কারিগর

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।