রাত ১১:১৩ ; শুক্রবার ;  ২২ জুন, ২০১৮  

খালেদার গাড়িবহরে হামলায় বদলেছে দক্ষিণের হাওয়া

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মিজানুর রহমান॥

সিটি নির্বাচনে প্রচারাভিযান চালানোর সময় বিএনপি চেয়ারপারন খালেদা জিয়ার গাড়িতে টানা তিন দিন হামলা চালানোর ঘটনায় ভীষণ চটেছেন ঢাকা দক্ষিণের ভোটাররা। রাজধানীর এই অংশের ভোটারদের অনেকেই এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য বেছে নেবেন। খালেদা জিয়ার ওপর হামলার আগে ও পরে অনলাইন সংবাদ মাধ্যম বাংলা ট্রিবিউন এর করা দুটি জরিপ থেকে পাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষে ঢাকার ভোটারদের ওপর প্রথম ধাপে জনমত জরিপ পরিচালনা শুরু হয় এপ্রিলের ১৪ তারিখ থেকে এপ্রিল ২১ তারিখ পর্যন্ত। এ জরিপে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের ভোটারদের মতামত নেওয়া হয়। তবে এ জরিপ চলাকালেই নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে গিয়ে ২০ এপ্রিল রাজধানীর কাওরান বাজারে হামলার শিকার হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এসময় তার গাড়িবহরে হামলা হয়। এরপর ২১ ও ২২ এপ্রিল আবারও নির্বাচনি প্রচারণায় বের হলে একইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। এসব ঘটনা নির্বাচনি ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে কিনা তা অনুসন্ধানে আবারও জরিপ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলা ট্রিবিউন। ২২ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত এজন্য ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে আবারও ভোটারদের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়।

হামলার আগে ও পরের দুটি জরিপে পাওয়া উপাত্তের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ ঘটনা ভোটারদের মনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। এতে দেখা যায়, হামলার আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনি জরিপে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকন এগিয়ে থাকলেও পরে মির্জা আব্বাস অনেকখানি এগিয়ে গেছেন।

খালেদার গাড়িবহরে হামলার আগে ভোটারদের বেশিরভাগই মনে করতেন সাঈদ খোকন মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হবেন। জরিপের প্রথম পর্যায়ে ৪৪.৩৩ শতাংশ মনে করতেন সাঈদ খোকনই মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হবেন। যেখানে মির্জা আব্বাসের বিষয়ে ধারণা করেছেন ৪০ শতাংশ। হামলার পর জনমত একেবারেই উল্টে যায়।

হামলার পরের জরিপে দেখা যায়, মির্জা আব্বাসই মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হবেন এমনটা মনে করেন ৪৭.৮৩ শতাংশ। যেখানে সাঈদ খোকনকে মেয়র হিসেবে ধারণা করেন ৩৭.১৭ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে ভোটারদের প্রত্যক্ষ সমর্থন যাচাইয়ের জন্য নির্বাচিত প্রশ্ন 'আপনি কাকে ভোট দেবেন' এর জবাবেও মির্জা আব্বাসই এগিয়ে থাকেন। আব্বাসকে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন ৩৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী, যেখানে সাঈদ খোকনের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ২৯.৩৩ শতাংশ।


তবে উত্তরে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার আগে ও পরে ভোটারদের ধারণার তেমন কোনও পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। ভোটারদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এই দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান ১০ শতাংশ। আনিসুল হককে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন জরিপে অংশ নেওয়া ২৭ শতাংশ ভোটার, অন্যদিকে তাবিথ আউয়ালকে দেবেন ১৭ শতাংশ। উল্লেখ্য, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে 'কাকে ভোট দেবেন' এমন প্রশ্নের জবাবে নীরব থেকেছেন প্রায় ৩৪ শতাংশ ভোটার। ধারণা করা হচ্ছে, এই নীরব ভোটাররাই উত্তরের সিটি নির্বাচনে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন।

জরিপ প্রক্রিয়া:

অাসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউন ঢাকার ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে একটি জরিপ করে। প্রথম জরিপটি দুই ধাপে করা হয়। প্রথমত এপ্রিলের ১৪ তারিখ থেকে এপ্রিল ২১ তারিখ পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের ভোটারদের মতামত নেওয়া হয়। এরপর নির্বাচনী প্রচারণা করার সময় কয়েকবার বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা হয়। ফলে ধারণা করা হয় এই হামলার ফলে সিমপ্যাথি ভোটের কারণে জরিপের ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে। এই ধারণা যাচাইয়ের লক্ষ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের জরিপ পরিচালনা করা হয়। সুতরাং দ্বিতীয় পর্যায়ে এপ্রিল ২২-২৪ তারিখ ঢাকার বিভিন্ন জোনে সাধারণ জনগণের মতামত নেওয়া হয়।

জরিপের উদ্দেশ্য: আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থীদের অবস্থান যাচাই।

জরিপের প্রশ্ন:

জরিপের প্রশ্নপত্রকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমভাগে ভোটারের ধারণামতে বিজয়ী ও ভোটার কাকে ভোট দেবেন এই দুটি প্রশ্ন করা হয়। এর জবাব উত্তর- ৬ এবং দক্ষিণ-৫ জন প্রার্থীর নাম সরাসরি দেওয়া হয়। সঙ্গে অন্য কোনও প্রার্থীর নাম দেওয়ার সুযোগও দেওয়া অাছে।

দ্বিতীয় ভাগে পাঁচটি প্রশ্ন রাখা হয়। এই প্রশ্নগুলোর জবাব 'হ্যাঁ' ও 'না'তে নেওয়া হয়।

জরিপের প্রথম পর্যায়ে প্রশ্নপত্রে শুধু ভোটারদের কাছ থেকে 'কে জয়ী হবে বলে মনে করেন' শীর্ষক মতামত নেওয়া হয়। এতে ভোটারদের সঠিক মতামত যাচাইয়ে বেগ পেতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ভোটার মনে করেন ক্ষমতাসীন দলের সমর্থীত প্রার্থীই নির্বাচিত হবেন তবে তার সমর্থন অন্য কাউকে। এই কারণে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রথম প্রশ্নের পাশাপাশি 'আপনি কাকে ভোট দেবেন' এই প্রশ্নটি যোগ করা হয়ে।

প্রশ্ন ১: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র হিসেবে কে বিজয়ী হবে বলে মনে করেন?

প্রশ্ন ২: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আপনি কাকে ভোট দেবেন?

প্রশ্ন ৩: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র হিসেবে কে বিজয়ী হবে বলে মনে করেন?

প্রশ্ন ৪: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আপনি কাকে ভোট দেবেন?

প্রশ্ন ৫: আপনি কি মনে করেন আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়ে ফলাফল নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করবে?

প্রশ্ন ৬: আপনি কি মনে করেন আওয়ামী লীগের কর্মীরা নির্বাচনী আইন মেনে চলবে?

প্রশ্ন ৭: আপনি কি মনে করেন পরাজিত হলে বিএনপি এ নির্বাচনের ফল মেনে নেবে?

প্রশ্ন ৮: আপনি কি মনে করেন নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী তার ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো পূরণ করবে?

প্রশ্ন ৯: প্রার্থীর অঙ্গীকারে আস্থা না থাকলে কিসের ভিত্তিতে ভোট দিচ্ছেন? (ইশতেহারে আস্থা না থাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)

৯ নম্বর প্রশ্নে ইশতেহারে আস্থা না থাকলে কেন ভোট দেবেন এই মতামত নেওয়া হয়। এক্ষেত্র উত্তরের সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়।

নমুনা (Sample) সংগ্রহের প্রক্রিয়া:

ক. প্রথম পর্যায় (১৪ এপ্রিল-২১ এপ্রিল): ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণকে কয়েকটি জোনে ভাগ করা হয়।

প্রতিটি জোনে বিভিন্ন পয়েন্ট তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন করে নমুনা সংগ্রহের কাজ করা হয়। দৈবচয়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। যেমন, ধানমণ্ডির আবাহনী মাঠের সামনে একটি পয়েন্ট, আবার সিটি কলেজের সামনে আরেকটি পয়েন্ট।

এসব পয়েন্টে জরিপকারীরা রাস্তায় মানুষের সঙ্গে কথা বলে মতামত নিয়েছে। ওয়ার্ড নির্ধারিত ছিল না। নমুনা সংগ্রহের সময় উত্তরকারীর ওয়ার্ড নম্বরটি তুলে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে যারা নিজ ওয়ার্ডের নাম বলতে পেরেছেন সেই নমুনা নেওয়া হয়েছে অাবার যারা বলতে পারেননি তাদেরও নমুনা নেওয়া হয়েছে (এসব ক্ষেত্রে ভোটাররা জানেন তিনি উত্তর নাকি দক্ষিণের ভোটার)। এজন্য নমুনা সংখ্যা প্রতিটা জায়গায় যেন কমপক্ষে ১০ জন অতিক্রম না করে সে বিষয়ে সচেতনতা অবলম্বন করা হয়েছে।

খ. দ্বিতীয় পর্যায় (২২ এপ্রিল-২৪ এপ্রিল):

প্রথম পর্যায়ের মতো এখানেও ঢাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে জরিপকারীরা নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহের ধরণে কিছুটা পরিবর্তন নিয়ে অাসা হয়। যেমন, প্রথম পর্যায়ে উত্তরের কোনও ভোটারকে যদি দক্ষিণে পাওয়া যায় তবে তার নমুনা উত্তরের ভোটার হিসেবেই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে অধিক সচেতনতা অবলম্বন করা হয়। উত্তরে যদি দক্ষিণের ভোটার পাওয়া যায় তবে তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি। অর্থাৎ দক্ষিণে জরিপকারীরা শুধুমাত্র দক্ষিণের ভোটারদেরই নমুনা নিয়েছে এবং উত্তরের জরিপকারীরা শুধুমাত্র উত্তরের ভোটারদেরই নমুনা সংগ্রহ করেছে।

অারও একটি পরিবর্তন দ্বিতীয় পর্যায়ে নিয়ে অাসা হয়। প্রথম পর্যায়ের জরিপে প্রতিটি পয়েন্ট থেকে সর্বোচ্চ ২০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, পেশার (Profession) ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য তৈরি হয় (অর্থাৎ একই পেশারই বেশিরভাগ নমুনা পাওয়া যায়)। এই বিষয়টি নজরে নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রতি পয়েন্টে ১০ জনের অধিক নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি।

দ্বিতীয় পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সমান-সমান পুরুষ ও নারীর মতামত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রতি স্পটে ১০ জন ভোটারের মতামত নেওয়া হয়। পেশাগত ভাবেও সমান সংখ্যক নমুনা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। জরিপে বয়সের পর্যায়কেও বিবেচনায় আনা হয়েছে। ভোটারদের তরুণ, যুবা ও বয়োজ্যোষ্ঠ্ এই তিন ভাগে ভাগ করে পর্যালোচনা করা হয়।

প্রথম পর্যায়ে দুই সিটি করপোরেশনে ৬০০ জন করে ১২০০ জনের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়। একইভাবে দ্বিতীয় পর্যায়েও ৬০০ জন করে ১২০০ জনের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকার প্রথম পর্যায়ের অনুরূপ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে। চট্টগ্রামে জরিপ পরিচালনা করা হয় ১‌৯ এপ্রিল - ২২ এপ্রিল। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ৬০০ জন ভোটারের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়।

জরিপ পরিচালনা: বাংলা ট্রিবিউন

জরিপে সহযোগিতা: Innovation Research Consultancy Limited (IRC)

/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।