বিকাল ০৪:৫২ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

প্রতিবাদহীনতার জন্য অাজকের পতন

প্রকাশিত:

লীনা পারভিন॥

দেশে এখন প্রগতিশীল রাজনীতির চর্চা নেই বললেই চলে। যেসব দল প্রগতির কথা বলে, সেসব দলের কার্যক্রম এখন কোন পর্যায়ে আছে, তা কি কেউ বলতে পারে? বছরে কয়জন নতুন ছেলে-মেয়ে তাদের দলে যোগ দিচ্ছে? কিংবা নতুনদের যুক্ত করার দলীয় তাগিদ কি লক্ষ করা যায়?

মনে আছে, আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতাম, তখন ছোট-বড় সব বাম রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলো মিলে একটা ছাত্রজোট গড়ে উঠেছিল, যার নাম ছিল 'গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য'। এই ধারা ছিল জাতীয় রাজনীতিতেও (বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট)। আমি বলছি আমার সময়ের কথা (১৯৯৩-২০০১)।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসার জায়গা ছিল এই ছাত্র ঐক্য। ক্যাম্পাসে সব সময়ই সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের প্রতিপত্তি ছিল, তবে গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য ছিল সেখানে তাদের মূল প্রতিপক্ষ। তাই সরকারি ছাত্রসংগঠনও সামলে চলত এই ঐক্যকে। ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে ছিল তাদের অনন্য ভূমিকা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেও কোনও সিদ্ধান্ত একা নিতে পারত না বা সরকারি অঙ্গসংগঠনের চোখ দেখেও কেঁপে উঠত না। ডাকসু না থাকায় তখন সব ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে গড়ে উঠেছিল একটি সর্বদলীয় ফোরাম (পরিবেশ রক্ষা কমিটি)। যারা প্রশাসনের সঙ্গে অালোচনার এজেন্ট হিসেবে কাজ করত। এই চর্চা প্রচলিত ছিল হলগুলোয়ও। সব হলে গড়ে তোলা হলো এই কমিটি। আমি নিজেও যুক্ত ছিলাম এর সঙ্গে এবং সাধ্যমতো ভূমিকা রাখার চেষ্টা করতাম।

ক্যাম্পাসে বা হলে পরিবেশ নষ্ট হয় এমন যেকোনও বিষয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিতে হলে ডাক পড়ত সেই পরিবেশ কমিটির নেতাদের। একবার ক্যাম্পাসে প্রথম প্রকাশ্যে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহেদুজ্জামানের বিরুদ্ধে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছিল কয়েকজন ছাত্রী। উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। প্রথমে তা রাজনৈতিক মিছিলের মধ্যে থাকলেও ধীরে-ধীরে তা রূপ নেয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে, ছড়িয়ে পড়ে সারা ক্যাম্পাসে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রশাসন পারেনি সে অভিযোগ উপেক্ষা করতে, বাধ্য হলো অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। যার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালার দাবি জোরালো হলো এবং পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের রুলের বিষয়টি অামাদের সবার জানা।

সেই সময়ের প্রগিতশীল সংগঠনগুলোর সামর্থ্য ছিল সাধারণ ছাত্রদের সামিল করার, কারণ তারা সরকারি দলের হুমকিতে অতিষ্ঠ ছিল। কিন্তু এখন কি সেই সামর্থ্য আছে তাদের? নিজেদের মধ্যে কোন্দল, বিভাজন, সুবিধাবাদিতা সবকিছু মিলে আজ তাদের সেই শক্তি দৃশ্যমান নয়। যদি দৃশ্যমান হতো, তবে ছাত্ররাজনীতির চেহারা অন্যরকম হতো। মিছিলে-মিছিলে সরগরম হয়ে উঠত ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ। প্রশাসন সাহস পেত না এই ঘটনাকে অবহেলা করার।

বড় বুক ভঙ্গা অবস্থায় আমি এই কথাগুলো বলছি। ছাত্র ইউনিয়নের ডাকে সংহতি সমাবেশে আমি খুঁজে পাইনি ক্যাম্পাসের কোনও প্রাণকে, নেই সাধারণ ছাত্রদের কোনও সংযোগ কিংবা সম্পৃক্ততা। সেখানে বহিরাগতরা প্রতিবাদ করছে, বিচ্ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ব্যানারে এ যেন কারও সঙ্গে কেউ গেলেই তার জাত যায় অবস্থা। কে কতটা প্রতিবাদী তা দেখানোটাই যেন মূল উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে।

ক্রমে বিলীন হয়ে যাওয়া প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির এই জীর্ণদশা আজকের ঘটনাকে সাহস দিয়েছে। প্রতিবাদহীন করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর সেই শূন্যতা পূরণ করেছে সুবিধাবাদী প্রগতিবিরোধী শক্তি। যারা নারীর যৌন হয়রানির সঙ্গে জড়িত থেকেও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর প্রতিবাদকারীরা হুমকিতে থাকে।

লেখক: এইচঅার স্পেশালিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।