রাত ১১:১৩ ; শুক্রবার ;  ২২ জুন, ২০১৮  

সালমা বাণীর ‘ইমিগ্রেশন’ নিয়ে দেবেশ রায়

প্রকাশিত:

বিশ শতক ফুরুবার আগেই ঢাক-ঢোল শহরৎ দুটো উলটো কথা বেশ রটেছিল যে অতপর ইতিহাস বলে কোনো ধারণা আর সক্রিয় থাকবে না আর আধুনিকতার উত্তরপর্ব শুরু হয়ে গেল। যদিও ওই একই সময়ে ভারতীয় ও আফ্রিকেয় কিছু বিদ্বজ্জন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে বসেই ওই পর্বকে উত্তর-উপনিবেশ অভিহিত করায় মুক্তচিন্তার দেশে যার-পর-নেই তিরস্কৃত হয়েছিলেন ও ফরাসি দেশে ফার্নান্দ ব্রদেল রচিত বিদ্যালয়পাঠ্য বিশ্ব-ইতিহাস পুস্তক চেপে দেয়া হয়েছিল এই কারণে যে ব্রদেল একটি পরিচ্ছেদের নাম দিয়েছিলেন, ‘অন্যান্য সভ্যতা’। এখনও ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চায় ‘সিভিলাইজেশন’ শব্দটি একবচন ও একার্থক অর্থাৎ ‘সিভিলাইজেশন’ মানেই ইউরোপীয় সিভিলাইজেশন। শব্দটি একমাত্র অতীত কালেই বহুবচন। যখন থেকেই যে যার আধুনিকতা দাগাক না কেন, সেটা হতেই হবে ইউরোপীয়। আর ঠিক এই সময় জুড়েই, মোটামুটি ১৯৯০ থেকেই, ডেভেলাপমেন্ট বা উন্নয়ন শব্দটির অর্থের কী ব্যাপকতাই না দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময় ‘প্রোডাকশন’ শব্দটি যেমন এক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া বোঝাত এখন ‘ডেভেলাপমেন্ট’ শব্দটি তেমন বোঝাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আই-এম-এফ, জি-৮, জি-২০, ইত্যাদি নানা ধরনের আর্থিক সংগঠন ও গোষ্ঠী। যদিও পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান দেশ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে আপাতদৃষ্টিতে যথাক্রমে তাত্ত্বিক প্রতিপাদ্য ও বাস্তবিক কর্মসূচির ভিতর কোনো মিল থাকার কথা নয় তবু ১৯২৮ সালের পর সামাজবিকাশ ও অর্থনীতির এমন কোনো তত্ত্ব কি আমেরিকার কোনো বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানে আলোচিত হয়েছে, যার সঙ্গে আমেরিকার রাষ্ট্রীয় রাজনীতির কোনো বৈরিতা ঘটেছে?

এই আপাত অসংলগ্ন ঘটনাগুলিকে জোড়া লাগালে মনে হতে পারে, এমন একটা উদ্ভট তাত্ত্বিক জগতে আমরা বসবাস করছি, যখন ইতিহাস আর তৈরি হচ্ছে না বটে অথচ পৃথিবীব্যাপী ইতিহাসহীন উন্নয়ন ঘটেই চলেছে, অথচ সে-উন্নয়নে প্রগতি ঘটতেই পারে না। কারণ, প্রগতি বা ইতিহাস যা হওয়ার তা তো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময়ই হয়েছে। এখন সেই ঐতিহ্য অনুযায়ীই উন্নয়ন ঘটানো হচ্ছে। ইউরোপের জাতীয় ইতিহাসে সাম্রাজ্যবিস্তার ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার মূল তাৎপর্য ছিল সভ্যতার প্রসার আর সে-সভ্যতা তো অদ্বিতীয় পাশ্চাত্য সভ্যতা।
এ কথা তো কার্ল মার্কস-ই বলে গেছেন যে পাশ্চাত্য সভ্যতা ছিল ইতিহাসের অচেতন বাহন। যদিও সেকথা বলার পর পঞ্চাশ বছর পেরনোর আগেই তাঁর প্রধানতম শিষ্যদের অন্যতম উলিয়ানভ লেনিন বলে দিয়েছিলেন, সাম্রাজ্যবিস্তার ধনতন্ত্রের নিয়ম মোতাবেক শীর্ষ স্তর। ধনতন্ত্র সাম্রাজ্যবিস্তারের পর্বান্তরে এখন ধনতন্ত্রেরই নিয়ম মোতাবেক যে সাম্রাজ্যহীন, সুতরাং প্রগতিহীন উন্নয়ন বেচার স্তরে ঢুকে পড়েছে সেটা বোঝা ও বোঝানোর যোগ্য মার্কস-লেনিনবাদীর কিছু অভাব পড়েছে।
ধনতন্ত্রের একটি সংকট মার্কসবাদ আমাদের শিখিয়ে ছিল। ধনতন্ত্র তার বিকাশের নিয়মেই সংকট থেকে সংকটের ভিতর পড়ে। আর একটি নিয়ম আমাদের শেখা হয়নি যে ধনতন্ত্র সংকট থেকে উত্তরণও ঘটাতে পারে অবিশ্বাস্য সব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায়। এখন, এই সময়ে, সে সচতন হয়ে উন্নয়ন ঘটাচ্ছে— ইতিহাসকে অর্থাৎ প্রগতিকে স্থগিত রেখে।
নইলে তো সাম্রাজ্যকে মেনে নিতে হত যে যখন তারা সভ্যতা বিস্তার করছিল তখনও ঢাকার তাঁতিদের বুড়ো আঙুল কাটা হয়েছিল সচেতন সভ্য আচরণ হিসেবেই। মধ্যসমুদ্রপথে জাহাজের খোলে ভর্তি করে হাজারে-হাজারে আফ্রিকেয় ক্রীতদাস এনে আমেরিকা উপনিবেশে শিল্পবিপ্লব ঘটানো হয়েছিল সচেতন সভ্যতার নিয়মেই। কেনিয়ার আখপ্রান্তরগুলিতে কাল মানুষের রক্তে ও ঘামে এখনও পাউন্ড ফলানো হচ্ছে সভ্য সচেতনতার সঙ্গেই। নাৎসিদের পর তাদের সমতুল্য সচেতন জাতিদ্বেষের সভ্য সচেতনতায় দক্ষিণ আফ্রিকায় এই সেদিনও ছিল এমন রাষ্ট্র যার ঘোষিত নীতি ছিল আপার্থাইড।
সাম্রাজ্যই দুনিয়া আবিষ্কার করেছিল, দুনিয়াকে সভ্য করেছিল ও এখনও সেই সাম্রাজ্যমুক্ত দুনিয়ার উন্নয়ন ঘটিয়ে চলছে— এমন একটা কাহিনিকে, পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে, সাম্রাজ্য-উত্তর বলা অনুমোদিত হতে পারে। কিন্তু তাকে কখনোই পোস্ট-কলোনিয়্যাল বা উত্তর-ঔপনিবেশিক বলা অনুমোদিত হবে না। তেমন বললে তো বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকেও স্বীকার করে নিতে হয়। তেমন বললে তো সেই জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মানবশক্তিকে সাম্রাজ্যশক্তির চাইতে বলবত্তর স্বীকার করে নিতে হয়। তেমন বললে তো এও স্বীকার করে নিতে হয়, কথা বলে-বলে, তত্ত্ব আউড়ে-আউড়ে দুনিয়ার হাল-হকিকৎ বোঝানো কোনো কাজই নয়—  কাজটা হচ্ছে দুনিয়াটাকে পালটে দেয়া।
শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে যে সেখানেই প্রথম আভাস মেলে দুনিয়াটা বদলে যাচ্ছে। যে মিড্ল্পাসাজ আমেরিকার ইতিহাসচর্চায় বিষয়ে হিসেবে স্বীকৃত নয়, সেই মিড্লপাসাজই টনি মরিসন-এর উপন্যাসের প্রধান ভিত, যেমন এক সময় ফকনার আমেরিকার উপন্যাসে টেক্সাসকে করে তুলেছিলেন আত্মজিজ্ঞাসার তখনও অজ্ঞাত অবলম্বন। যেমন এক সময় দীনবন্ধু মিত্র সাহেবদের বাংলা শেখার কর্মসূচিকে (নীলদর্পণ) করে তুলেছিলেন মেকলের শিক্ষানীতির ফলিত প্রয়োগ, ‘তোর ছেলিয়ার বাবা হইব।’
ডায়াস্পোরিয়া নিয়ে উপন্যাস বলতে চিরকালই বোঝাত— কোনো বহির্দেশ থেকে ইয়োরোপ বা আমেরিকায় চলে আসার কাহিনি। ভারত উপমহাদেশ থেকে পূর্ব আফ্রিকায় বা পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে প্রধানত ব্রিটিশ স্বার্থেই ও ব্রিটিশদের প্ররোচনায় দলে-দলে ভারতীয়রা এসে স্থায়ীভাবে থেকে গিয়েছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের অভিবাসন নিয়ে ব্রিটিশদের আপত্তিই ছিল। ফলে, দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে উঠল গান্ধীজির নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পাঠশালা আর পূর্ব আফ্রিকা ও পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপ হয়ে উঠল ব্রিটিশ আদিপত্যমান্যতার নির্বিরোধ পাঠশালা। আরো পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত পূর্ব ইউরোপ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত সাহিত্যিকদের রচনার প্রধান আবেগ ও চিন্তা ছিল নির্বাসনের বেদনা ও বাধ্যতা।
আমাদের খুব কাছের সময়ে আর এক ধরনের দেশত্যাগী সাহিত্য তৈরি হচ্ছে যাকে অনেক সময় কমনওয়েলথ বা দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যও বলা হয়ে থাকে। নানা রকমের দামি পুরস্কারের সুবাদে, ও বড়ো-বড়ো প্রকাশকদের উদ্যোগে ইংরেজি ভাষায় লেখা এই গল্পগুলিও এক ধরনের দেশত্যাগী সাহিত্য, যেহেতু এই গল্পগুলির প্রায় ব্যতিক্রমহীন কাহিনি পূর্ব-বাসভূমির স্মৃতি বা সেই স্মৃতিকে বর্তমান ধরে নিয়ে একটি ঔপন্যাসিক বিবৃতি।
এই দেশত্যাগী উপন্যাসের আধুনিক একটা ধরনই তৈরি করে তুলেছেন নায়পল ও সালমান রুশদি। আরো অনেক লেখকই আছেন। অনাবাসিতার ভিত্তিতে ও ইংরেজি ভাষার সৌজন্যে তাঁরা বৃহত্তর এক পাঠকসমাজের কাছে ভারত উপমহাদেশ নিয়ে ঔপন্যাসিক বিবৃতিকে তাঁদের লেখার প্রায় একমাত্র বিষয় করে তুলেছেন। একটু বেশি পেছনে তাকিয়ে দেখলে এঁদের লেখার গোত্র সেই পশ্চিমি ডায়াস্পোরিক সাহিত্য বা অনেকটাই লালিত হয়েছিল সাম্রাজ্যের সাহিত্যের অনুপূরক হিসেবে।
এই দেশান্তরী সাহিত্যের সংজ্ঞাতেই এক যুগান্তরী বদল ঘটিয়ে ফেলেছেন বাংলাদেশের লেখিকা সালমা বাণী তাঁর সাম্প্রতিক একটি বাংলা উপন্যাস, ইমিগ্রেশন লিখে। লেখার গুণে ও তাৎপর্যে এ উপন্যাসটি টনি মরিসন-এর মধ্যসমুদ্রপথের পুনর্নির্মাণের মতোই। তৃতীয় বিশ্বের বর্তমান ডায়াস্পোরার বা দেশান্তরণের এমন প্রবল, আত্মবিশ্বাসী ও সমর্থ উপন্যাসে নায়পল-রুশদি ও তাঁদের অনুগামীদের উপহাস্যমুখর স্মৃতিতাড়না অবান্তর হয়ে যায় বাস্তবের নৈসর্গিক অভিঘাতে। উন্নয়ন ও প্রগতির বেদিশ ও বিভ্রান্ত আপাত সংঘাতের এমন উপন্যাসন তৃতীয় বিশ্বের কোনো ভাষাতেই যেন হওয়ার কথা ছিল আর আমাদের বিশেষ রকম গৌরব যে তা বাংলাভাষাতেই ঘটল।
একটা ঘটনা ঘটে গেলে, তার অনেক ব্যাখ্যা মাথায় খেলে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কালের গল্প-উপন্যাসের বৈচিত্র্য, সাহস ও উদ্যম আমাকে খুবই আশান্বিত করে রেখেছিল যে নতুন, আধুনিক ও বিশ্বায়ত উপন্যাস হয়তো তৈরি হয়ে উঠছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের সম্পর্কও অনেক ঘনিষ্ঠ ও জটিল হয়ে উঠছে। উপন্যাস-শিল্পে শেষ পর্যন্ত শারীরিক বাস্তবের ওপর নির্মিত কল্পনাই পরম সিদ্ধি এনে দেয়, যদিও বাস্তবের শারীরিকতায় আর কল্পনার উদ্দীপিত সাহসের ভিতর কত অপঘাতই না ঘটে যেতে পারে। এই উপন্যাসটিতে আমাদের ভাষার এক লেখক বিশ্বকাহিনি রচনা করে ফেললেন।

দুই
সালমা বাণী সাড়ে ছশো পৃষ্ঠার উপন্যাস ইমিগ্রেশন লিখেছেন। পৃষ্ঠা সংখ্যার সঙ্গে এটাও বলে রাখা সংগত যে বইটি ছাপা হয়েছে রয়্যাল সাইজে। এই সাইজে একটি পাতার শব্দসংখ্যা বেশি। ফলে উপন্যাসটি হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে তিন লক্ষ শব্দের একটি উপন্যাস। বাংলা ভাষায় প্রচলিত উপন্যাসের মাপের তুলনায় সালমা বাণীর এই উপন্যাসের শব্দসংখ্যা অনেক অনেক বেশি।
আকারের কথাটিই প্রথমে এল যে, তার কারণ— সালমা বাণী তাঁর উপন্যাসের আকার দিয়েই বাংলার প্রচলিত আখ্যান-অবয়বের ঘেরটা টপকে গেছেন। অথবা, বলা যায়, সেই প্রচলিত ঘেরটা তাঁর এই উপন্যাসের জন্য ভেঙে নিয়েছেন। এর আগে তিনি, ভাংগারি, গোলাপি মঞ্জিল, পরিসরের মাপজোখ ও টিপছাপ, এমন চারটি উপন্যাস লিখেছেন। সেই উপন্যাসগুলি বাংলা উপন্যাসের প্রচলিত মাপেই লেখা— ডিমাই সাইজের দেড়শো পাতার মতো।
সেই উপন্যাসগুলিতেও কিন্তু, এটা বোঝা গিয়েছিল— উপন্যাসের আকার ও উপন্যাসের গল্পের পরিপূরকতা তৈরি বা এই দুটিকে খাপে খাপে মিলিয়ে দেয়ার দায় নিয়ে তাঁর সৃষ্টিময় উদ্বেগ আছে ও তাঁর এই লেখাগুলির প্রধান তাৎপর্যই ছিল সেই নিহিত উদ্বেগের আয়তন। ওই চারটি উপন্যাসের মধ্যে একমাত্র টিপছাপ-ই একটিমাত্র গল্পকে আকার দিয়েছে। বাকি তিনটিতেই, এমনকী সম্ভবত তাঁর প্রথম উপন্যাস, পরিসরের মাপজোখ-এও, তাঁর প্রধান গল্পটির সঙ্গে আরো অনেক কাহিনি জুড়ে যায়, বেশির ভাগ সময়ই সেই প্রধান গল্পের অনিবার্য যুক্তিতে।
একটু সহজ করে দেখলে মনে হতে পারে এগুলো সব উপকাহিনি আর এই উপকাহিনিগুলোই উপন্যাসটিকে তৈরি করে তুলেছে।
এমন উপকাহিনি দিয়েই উপন্যাস তৈরি করে তোলা, উপন্যাস-লেখার একটা স্বীকৃত প্রক্রিয়া। কিন্তু এটাকেই একমাত্র প্রক্রিয়া বলে ধরে নিলে, প্রধান গল্প আর অপ্রধান গল্পের ভিতরের সংযোগের জটিলতাগুলি, চোখে নাও পড়তে পারে। কিন্তু অনেক সময় আপাত-প্রধান সেই সব গল্প মূল গল্পটির চাইতেও প্রধান হয়ে উঠতে পারে। শরৎচন্দ্র-এর শ্রীকান্ত উপন্যাসটির তো চারটি খণ্ড। প্রথম খণ্ডের ইন্দ্রনাথ ও অন্নদা দিদির গল্প আর  চতুর্থ খণ্ডের টগর বোষ্টমী ও অভয়ার গল্পের কৃতি ও গুরুত্ব প্রধান গল্পের চাইতে বেশি। বস্তুত, শরৎচন্দ্র বোধ হয় বাংলায় এমন একজন প্রধান ঔপন্যাসিক, যাঁর বেশির ভাগ লেখায় আসল গল্পের চাইতে পার্শ্ব গল্পের গুরুত্ব ও টান অনেক জোরালো। এটাই একটা কারণও হয়তো যে শরৎচন্দ্রের একটি উপন্যাস থেকেই অনেক রকম নাটক ও সিনেমা তৈরি হয়েছে।
সালমা বাণীর যে উপন্যাসগুলির নাম করা হয়েছে তার কোনোটিতেই কিন্তু মূল গল্পের বাইরে কোনো গল্পের কোনো শিকড় নেই। স্বতন্ত্র নিজস্ব শিকড় থেকে গজিয়ে বা লতিয়ে বাইরের গল্পটি এসে তাঁর আসল গল্পে জুড়ে যাচ্ছে না। আমার কলমে এমন একটা বাক্য চলে আসছিল প্রায়, যে তাঁর সব নভেলের সব গল্পই বহুমূল, বটগাছের মতো। এমন একটা উপমা হয়তো পাঠকের কাছে আমার কথাটাকে একটু স্পষ্টতাও দিত। এই উপমাটা যে আমি ব্যবহার করলাম না, তার একমাত্র কারণ, তাঁর ওই উপন্যাস-তিনটিই, টিপছাপ তো বটেই, একেবারেই একমূলীয়— সিধে বর্শার মতো সেঁদিয়ে গেছে মাটির তলায় ও সাঁই-সাঁই করে বেড়ে উঠেছে রোদে-হাওয়ায়, তার ভিতরে পাকিয়ে তুলেছে আলোক-সংশ্লেষ। ওক, পাইন, সেগুনের শিকড়ের মতো।
উপন্যাস শিল্পকর্ম হিসেবে একটা অখ-তা তৈরি করে তোলে। সেই অখণ্ডতা সৃষ্টিতে উপন্যাসের আকার খুবই প্রাসঙ্গিক। সম্ভবত সেই অখ-তাই উপন্যাসকে শিল্প হিসেবে অন্যান্য আখ্যান-শিল্প থেকে আলাদা করেছে। ছোটো গল্প, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি, পত্রসাহিত্য— এমন অনেক অনেক কিছুই তো আখ্যান। যখনই সেই আখ্যান একটা স্বনির্ভর অখণ্ডতা সৃষ্টি করে তোলে, শুধুমাত্র শব্দের ওপর নির্ভর করে, তখনই তা উপন্যাস হয়ে ওঠে। ‘শব্দের ওপর নির্ভর করে’— এই শর্তটা খুব জরুরি। নাটক এমন তুলনীয় অখণ্ডতা তৈরি করে তোলে মঞ্চ, অভিনেতা, মঞ্চের ঘটনা ও কথাবার্তা দিয়ে। সিনেমাও পারে এই অখণ্ডতা তৈরি করতে সেলুলয়েড, ক্যামেরা, অভিনেতা, চিত্রনাট্য, চিত্রকল্প ও কথাবার্তা দিয়ে। ভরতনাট্যম বা কথাকলিও পারে অঙ্গন, শিল্পী, নাচের ঘটনা ও গল্প, মুদ্রার অর্থ, শিল্পীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার দিয়ে। উপন্যাসের শব্দ ছাড়া কোনো অবলম্বন নেই। তাই, শব্দসংখ্যা, আকার ইত্যাদি উপন্যাসের শিল্পকর্মের পক্ষে এতই জরুরি। এই শব্দসম্পর্কিত বিন্যাসগুলি সেই অখ-তাকে অনুস্যূত করে দেয়। রবিনসন ক্রুশো, বা গালিভার্স ট্র্যাভেলস, বা কমলাকান্তের দপ্তর— রচয়িতাদের জ্ঞাতসারে নেহাতই এক অ্যাডভেঞ্চার বা ভ্রমণকাহিনি বা খবরের কাগজের পাতা ভরানোর লেখাই ছিল যখন লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো এক স্বয়ংসম্পূর্ণ অখণ্ডতা তৈরি করে ফেলল পাঠকের কাছে। বা, পড়তে-পড়তেই এগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠল। শিল্পবস্তুর এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা বোধগম্য হতে একশো বছরও কেটে যেতে পারে। ইমপ্রেশনিস্ট-দের ছবি তাঁদের জীবৎকালে একটিও বিক্রি হয়নি। কমলাকান্তের দপ্তর উপন্যাস বলে পড়া কি হয়, এখনও? ঢোঁড়াই চরিত মানস বই হয়ে ছাপার বিশ বছরের মধ্যে কেউ তার মহৎ অখ-তা চিনে নিতে পেরেছে?

তিন
সালমা বাণী তাঁর এই ইমিগ্রেশন উপন্যাসটিতে সেই অখণ্ডতা তৈরি করে তুলেছেন এমন অভ্রান্ত নিশ্চয়তায়, অন্তত আমি তেমনই পড়েছি, যে বাংলা উপন্যাসের নিরিখ বদলে যাবে। তাঁর উপন্যাসটি আয়তনবান হয়েছে তাঁর গল্পের মহাদেশ অন্তর বাস্তবের প্রসারিত ব্যাপ্তিতে। তাঁর উপন্যাসের লোকজন সেই মহাদেশান্তরের ঘূর্ণিতে পাক খাচ্ছে। অজস্র সম্পর্কের অনিবার্য গেরোতে বাঁধা পড়ছে। স্বদেশের চেনা নিজস্ব জীবন্ত সংসার তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে এক প্রত্নজীবন। অথচ সেই প্রত্নজীবনই তাদের এই নতুন জীবন তৈরির শিকড় আর ডানা। যার শিকড় আর যার ডানা সেই মানুষ আর মানুষগুলি এক আন্তর্জাতিক ঘূর্ণিপাকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
সালমা বাণীর উপন্যাসটি ‘ডায়াসপোরা’ নিয়ে লেখা। ‘ডায়াসপোরা’ শব্দটি এখন নামপদ হয়ে গেছে। ইমিগ্রেশন-ও তাই। অভিবাসন বা অনাবাসন বললে এই পদগুলির নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অর্থটা হারিয়ে যাবে।
সালমা বাণীর গল্পটি হচ্ছে সাদাসিধে, সোজাসুজি, সরল, আমাদের রোজকার জীবনের মতো, সেখানে একের সঙ্গে অন্যের মন নিয়ে কোনো অনুচ্চারিত ভুল বোঝাবুঝির আড় নেই। এটা অভাবিত ও সত্যিই অবাক করে দেয়ার মতো ঘটনা যে এই প্রায় পৌনে তিন লক্ষ শব্দে তৈরি বিরাট উপন্যাসের কোথাও মনের কোনো জায়গা নেই, মনের সঙ্গে মনের সম্পর্কেরও কোনো জায়গা নেই। এ-রকম একটা কথা রটিত আছে যে পশ্চিম ইউরোপের ধনতন্ত্র পুরোপুরি কায়েম ও তার সাহিত্যিক সহযোগী আকারগুলো সুসংহত হওয়ার আগে মানুষের মন ছিল না। এই উদ্ভট রটনা কিম্ভুত আকার নিয়েছে আরো পরবর্তী এমন ঘটনায় যে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি সাম্রাজ্যবিস্তার করে তাদের নতুনতর মারণক্ষম বন্দুক, কামান দিয়ে নানা মহাদেশ দখল করার ও দখলে রাখার আগে এই অধিকৃত দেশ-মহাদেশগুলির মানুষজনেরও ‘মন’ বলে কিছু ছিল না। হায়, কামান-বন্দুক, পরে বাষ্পচালিত সমুদ্রযানও, আরো পরে, বোমারু বিমানের জোরে প্রতিষ্ঠিত মূর্খতার পরাক্রমশালী কিম্ভূতের কোনো ক্ষয় নেই। সেই একই মূর্খতায় পশ্চিম ইউরোপীয় ও আমেরিকার ধনতন্ত্র নতুন সংকট পরিত্রাণের বিশল্যকরণী আবিষ্কার করে এই দার্শনিক তত্ত্ব দিয়ে যে ধনতন্ত্র যে আধুনিকতা তৈরি করেছিল তার আয়ু ফুরিয়েছে বিশ শতকের সঙ্গেই ও সেখানে একুশ শতকে এসে গেছে উত্তর-আধুনিকতা। উত্তর-আধুনিকতা কী তা আমরা কেউ জানি না, কিন্তু এটুকু সার জেনেছি আধুনিকতায় যে-সব সংকটের মীমাংসা হয়নি, উত্তর-আধুনিকতা সেইসব সংকটের মোকাবিলা করবে। স্বকাম বা হোমো-সেক্সুয়ালিটি আধুনিকতায় ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ আর উত্তর-আধুনিকতায় একই লিঙ্গের প্রতি বাধ্যতা এক কুসংস্কারমাত্র।
এ-কথাটায় এলাম কেন সুতো ধরে। আমি ঠিক এর আগের প্যারাগ্রাফের শুরুতেই সালমা বাণী-র এই উপন্যাসটির গল্পটিকে বলেছি রোজকার জীবনের গল্প, কোনো মারপ্যাঁচ নেই, কোনো গোলমাল নেই, কোনো মনকষাকষি নেই। বস্তুত, মনের কোনো ব্যাপারই নেই, সবটাই বেঁচে থাকার ব্যাপার, অদ্য ভক্ষ্য ধমর্গুণ : বেঁচে-থাকা।
এমন বলার পরই ভয় হল যেকোনো পাঠক এই উপন্যাসটির গল্পের এই বৈশিষ্ট্যটিকে ‘উত্তর আধুনিকতা’ বলে চিহ্ন দিয়ে দিতে পারেন। তেমন নানা চিহ্ন দেয়ার অধিকার নানা রুচির পাঠকেরই আছে। তেমন চিহ্নগুলোতে হয়তো গল্পটির নতুন অনেক ভাঁজ তৈরি হবে বা খুলেও যাবে। এমন সব আলোচনায় বরং খুশিই হব।
কিন্তু আমি তার নিমিত্ত হতে চাই না। আমি গল্পের সারল্যের কথাটি বলতে চেয়েছি, নেহাতই শাবেকি অর্থে।
সেই শাবেকি অর্থে কি একটু সাহস করে একান্তে বলা যায়— নভেলের ইতিহাসে নিশ্চিত-মহৎ নভেলগুলির গল্পটা অনেক সময় সরলই থাকে বোধ হয়। গোগোল-এর ‘ডেড সোলস’-এর গল্পটা কী? এক ধড়িবাজ পাইকার রাশিয়ার গ্রামে-গ্রামে ঘুরে জোতদারদের কাছ থেকে তাদের মরে যাওয়া খতবন্দি দাসদের নাম কিনছে— নামমাত্র দামে বা বিনে পয়সায়। একটাও জ্যান্ত দাসের মালিক না হয়েও সে হয়ে যাচ্ছে এক কেউকেটা দাসদার (জমিদার)। দস্তয়েভ্স্কির বেশির ভাগ নভেলের গল্প কি এক লাইনে বলে দেয়া যায় না। এক গরিব ছাত্র এক সুদখোর বুড়িকে খুন করে কিছু টাকা উপায় করতে গিয়ে সেই বুড়ির বোনকেও খুন করতে বাধ্য হয়। বা, এক এপিলেপসির রোগী ও কেন, তা সে নিজেও জানে না এমন এক প্রিন্স, ইউরোপে চিকিৎসার সুবাদে জীবন কাটিয়ে রাশিয়ায় ফিরে আসে কপর্দকহীন। এমনি আর-এক আধাপ্রিন্স ও বাপের সন্দেহাক্রান্ত যৌবনের পুত্র বেজুকোও ইউরোপ থেকে রাশিয়ায় ফিরে এসে নেপোলিয়নের রুশযুদ্ধের গোলমালে জড়িয়ে পড়ে। বা, এক ছেলের মা, বড়ো আমলার বৌ, সমাজে বেশ কায়েমি প্রতিষ্ঠা আছে, মহিলা কেমন করে যেন প্রেমে পড়ে গেলেন এক যুবকের, গ্রামে তার জোতদারি আছে। এই তো তলস্তয়-এর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ ও ‘আনা কারেনিনা’-র গল্প। এক তুতো-ভাইয়ের টি-বি হওয়ায় তাকে স্যানাটোরিয়ামে দেখাশোনা করতে মাঝমধ্যে আসতে হয়— এই তো টমাস মান-এর ‘ম্যাজিক মাউনটেন’-এর গল্প। বা, এই গল্পের বছর সাত পরে লেখা এক উপন্যাসে এক গ্রামের ডাক্তার কিছুতেই তার গ্রাম ছাড়তে পারে না। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ থেকে ফরাসি অস্তিবাদ তখনও অন্তত সাত-আট বছর দূরে।

চার
আমার এমন কথায় যে কত আপত্তির যুক্তি আছে— তা আমি এতই বেশি জানি যে এই আপত্তিগুলি সম্পর্কে লিখতেই আমি সুবিধে বোধ করতে পারি।
কিন্তু তেমন সহজ সুবিদে সত্ত্বেও আমি এই দুর্বল কথাটাকেই এখন আঁকড়ে ধরছি শুধু এই কথাটি দাগাতে যে সালমা বাণীর ইমিগ্রেশন উপন্যাসটির আয়তন এত বড়ো হওয়া সত্ত্বেও তার গল্পটা খুবই সরল। বাংলাদেশ থেকে কানাডায় চলে আসা লোকজনের এই নতুন দেশে আসার ও থাকার নানা আইনি ও সামাজিক গোলমাল, ঝামেলা, ফেকড়া ইত্যাদি।
কাহিনির এই সরলতা ও আকারের এই বৃহত্ত্বের ভিতরের সম্বন্ধটা কী?
বোধ হয় বলতে চাইছি— ছিপছিপে উপন্যাস হলেই যে তার গল্প সরল হবে তা একেবারেই নয়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ বাংলা সাহিত্যেই একাধিক— বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা, রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুষ্কোণ।
বোধ হয় বলতে চাইছি— বৃহদায়তন নভেলগুলোর গল্পের কাঠামোটা— যেটাকে আমি গল্পই বলেছি— ইস্পাতের মতো কঠিন, গল্পের কোনো কানছি বা গোত্তা দিয়ে সেই কাঠামোর গায়ে দাগ ফেলাও যায় না। কিন্তু সেই কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত জায়গাটির ভিতর সমুদ্রের মতো আলোড়ন ঘটতে পারে, যদি লেখক সেই আলোড়ন ঘটাতে পারেন। সেই কাঠামোবদ্ধ সমুদ্রে আণবিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, খুলে যেতে পারে পাতালের পথ। সেই কাঠামোবদ্ধ সমুদ্রে তরঙ্গ বিস্ফারিত হয়ে উঠতে পারে মঙ্গলগ্রহ পর্যন্ত। সেই কাঠামোবদ্ধ সমুদ্রে কোন অনিশ্চিত দ্বীপের পাশের খাত থেকে সুনামির কম্পন মহাদেশগুলির দিকে ছুটে যেতে পারে নক্ষত্রপাতের গতিতে।
নভেলের গড়ন নিয়ে এমন এমটা উপমার কল্পনা— কাঠামোতে বাঁধা সমুদ্র— একটা খুব কষ্টকল্পনাও নয় আজ। ইলেকট্রনিক যুগে কমপিউটারেই আণবিক-পারমাণবিক পরীক্ষাগুলি করা যাচ্ছে বলেই তো দুনিয়ার সরকারগুলি আণবিক অস্ত্রপরীক্ষা নিষিদ্ধ করার চুক্তিতে সই করতে রাজি হয়ে যাচ্ছে, বা, মঙ্গলগ্রহের আবহাওয়ার তত্ত্বতালাশ পৃথিবীতে বসেই নিতে পারছে বা সমুদ্রের তলদেশের সব সময় ঘটতে থাকা সুনামির রেখচিত্র ছকে নিতে পারছে।
কমপিউটারের দুর্ভেদ্য কাঠামোতে আটকানো সমুদ্র তৈরি করতে পারে বিজ্ঞান ও টেকনোলজির অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা। গল্পের সারল্যের দুর্ভেদ্য কাঠামোতে আটকানো সমুদ্রের বিক্ষুব্ধ ব্যাপ্তি ঘটিয়ে তুলতে পারেন একজন নভেলকার তাঁর সৃষ্টির শক্তিতে।
সালমা বাণীর ইমিগ্রেশন উপন্যাসটির নায়কচরিত্র বলে কেউ নেই। এক-একটা ঘটনাতেই নায়কত্ব ঘুচে যাচ্ছে। তবু যদি একটি কোনো লোককে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ও লোকজনের মধ্যে যাতায়াত করছে বলে চিনে নিতে হয়। আর উপন্যাসের সবচেয়ে বেশি ঘটনায় কে উপলক্ষ হয়ে আছে খুঁজতে হয়, তা হলে সে কবির।
এই নভেল শুরু হয়েছে তাকে দিয়ে। সে আর একজনের পাসপোর্টে নিজের ছবি বসিয়ে তার নাম ও পরিচয় নিয়ে ভায়া লন্ডন কানাডায় আসছে। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ শুধু এইটুকু যে সে তার বাবার ধানবিক্রির টাকা চুরি করে এই জালি পাসপোর্টের অবৈধ বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অন্তর্গত হয়েছে কারণ তার বাবার ইচ্ছেমতে ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ে পড়তে এসে সে জেনেছে যে তার মুক্তির ও পরিত্রাণের একমাত্র উপায় কোনো বিদেশে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে ক্যানাডা।
এ উপন্যাস শেষও হচ্ছে কবিরকে নিয়েই। এই দেশে থাকার অধিকারের জন্য সরকারের অনুমতিপত্র অপরিহার্য। সেই অনুমতিপত্র জোগাড়ের নানা উপায় আছে। সে-সব উপায়ে পারদর্শী বাংলাদেশেরই নানারকমের মানুষজন আছেন। মণ্টুর মতো দালাল, আবার দেশত্যাগী রাজনৈতিক হত্যাকারী সোহেল, বিদেশী ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায়ী হেনরি হিউবার্ট, সাব্বির হোসেন— এই নামের তালিকার কোনো শেষ নেই। এমন নাম শুধু বাড়তেই থাকে আর ক্যানাডায় স্থায়ীভাবে থাকার ও কাজের আইনি অনুমতিপত্র আর জোটে না। শেষ পর্যন্ত কবির ঠিক করে ফেলে ‘সে সোজা চলে যাবে পুলিশের কাছে। স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে বলবে, শেষ করো, শেষ করো আমার ইমিগ্রেশন পাওয়ার যন্ত্রণা। এবার আমাকে ফেরত পাঠাও... যে মাটিতে আমার জন্ম... যে মাটি বসতের অধিকার কেড়ে নেয় না, ... যে মাটিতে আমার মৃত্যু। আমি জন্মমৃত্যুর অধিকারে ফিরব।’
এ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদের নাম ‘নাইন পেজ’। এটা হল ক্যানাডায় প্রবেশের আবেদনপত্র। আর এ উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদ, দ্বিশততর পরিচ্ছেদের নাম, ‘নিখোঁজ’।
মাঝখানে পৌনে তিন লক্ষ শব্দ জুড়ে তৈরি হয়েছে এই উপন্যাসটির অনতিক্রম্য কাঠামোর ঘেরে এই অসংখ্য ইমিগ্রেশন-সন্ধানী মানুষ। ক্যানাডাতেই তৈরি হয়ে ওঠে এক বাংলাদেশ, এমনকী তার অসংখ্য কথ্যভাষার বৈচিত্র্যসহ। এই ইমিগ্রেশন-আকাক্সক্ষীদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা— বাংলাদেশে তাদের পারিবারিক ধরন-ধারণ আলাদার, প্রত্যেকের আসার কারণ আলাদা, আইনছুট বসবাসী হিসেবে কানাডার সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যেকের সম্বন্ধ আলাদা। খুব সহজসাধ্য ছিল সেইসব বিচিত্র ও বিবিধ ব্যক্তিগতের কাহিনিগুলির একটি রম্য সংকলন যা হয়তো একটু সহজপাঠ্যও হত।
কিন্তু সালমা বাণীর এ উপন্যাসের কাঠামো অলঙ্ঘ্য। সারা নভেলে শুধু মানুষ আর মানুষ। মানুষের শেষ নেই। কিন্তু প্রত্যেকে আলাদা। পৌনে তিন লক্ষ শব্দের পরিসর ছাড়া এই এত মানুষের জীবনের সেই অসংখ্য ঘটনা ঘটতে পারত না যে ঘটনাগুলি তারই নিজস্ব অথচ যে ঘটনাগুলি শুধুই ইমিগ্রেশনের লক্ষ্যের সঙ্গে বাঁধা। এই পরিসর ছাড়া উপন্যাসের ভিতরে আমাদের এমন অভিজ্ঞতা ঘটতে পারত না যেন মানুষের সংখ্যা হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ ব্যক্তি, যেন তারা সবাই এক ঐতিহাসিক ভবিতব্যে ইচ্ছাহীন বাঁধা।
এই অনুভবে যখন পাঠক পৌঁছে যান, সেই শ্বাসরুদ্ধতায় তিনি বইটি রেখে দিতেও পারেন। কিন্তু তাঁকে আবার বইটি তুলে নিতে হবে উপন্যাসটি থেকে পাঠকের এই বোধে পৌঁছুবার জন্য— জনবহুল গরিব একটি দেশের বেঁচে থাকার সংকট আজ ডায়াস্পোরার সংকট হয়ে উঠেছে এই গ্রহময়। বাংলাদেশের এক প্রাদেশিক কাহিনি হয়ে উঠেছে বিশ্বকাহিনি।
অথচ এই উপন্যাসের শিল্পমাহাত্ম্য এইখানেই দ্বিধাহীন : একবারের জন্যও সালমা বাণী এই রূপকের কোনো সংকেত দেননি।
প্রগাঢ় দেশজ্ঞান ও শিল্পবোধ ছাড়া এমন আত্মসংবরণ সম্ভব নয়।
সেই উপন্যাসই বিশ্বায়ত মাহাত্ম্য অর্জন করে পাঠক যার রূপকার্থ পেয়ে যান আর লেখক যে রূপকার্থ হয়তো জানেনই না।
সালমা বাণী মহৎ ঔপন্যাসিকের সেই অজ্ঞানতা আমাদের পড়ালেন।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।