রাত ১০:২০ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

সংবাদ কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তারই একটি প্রস্তাবনা এই উপন্যাস : রুবাইয়াৎ আহমেদ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[রুবাইয়াৎ আহমেদ এ বছর জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার-২০১৫ পেয়েছেন তার ‘একজন সাব-এডিটরের কতিপয় ছেঁড়াখোঁড়া দিন’ পাণ্ডুলিপির জন্য। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি, নেত্রকোণায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নারী : শিল্প ও সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য লাভ করেছেন পিএইচ.ডি ডিগ্রি। সম্পৃক্ত রয়েছেন ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে। বর্তমানে ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এ জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
লন্ডনের শেক্সপিয়রস গ্লোব থিয়েটারে প্রথম বারের মতো বাংলা ভাষায় মঞ্চায়িত নাটক ‘দ্য টেম্পেস্ট’র  অনুবাদ ও রূপান্তর করেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১০। নির্বাচিত কবিতা (হ্যারল্ড পিন্টার ও ইসমাইল কাদারে); বর্ণনাত্মক নাটক : ‘বর্ণদূত’; অনুবাদ নাটক সংকলন : ‘পঞ্চস্বর’; গল্পগ্রন্থ : ‘আত্মহনন কিংবা স্বপ্নপোড়ানো আখ্যান’; ছোটদের গল্প : ‘আলসেকুঁড়ে’, সীমানা ছাড়িয়ে; গবেষণা : তারেক মাসুদ; বর্ণনাত্মক নাটক : জিয়ন্তকাল, হিড়িম্বা এবং রঙমহাল। পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ তরুণ লেখক হিসেবে কমাশ্রী পদক-২০১২। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদ সোহাগ]  

 

জিজ্ঞাসা : আপনার লেখালেখির শুরুর দিককার কথা জানতে চাই।
উত্তর : স্কুলে পড়ার সময় থেকেই লেখালেখির শুরু। আমার বড়বোন ইভানা ইলিয়াস ছড়া লিখত আর সবাই বেশ প্রশংসা করত। তো, আমার মাঝেও ওই প্রশংসা পাওয়ার বাসনা জাগে। আমিও চেষ্টা করি লিখতে, লিখিও। দেখতে পাই, আমার কপালেও প্রশংসা জুটছে। এভাবেই শুরু। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে এক পর্যায়ে মনে হল, লেখক হওয়ার ছাড়া এই জীবনে আমার আসলে আর কোন লক্ষ্য নেই। সেই চেষ্টাই করছি এখন।
    
জিজ্ঞাসা : ‘একজন সাব-এডিটরের কতিপয় ছেঁড়াখোঁড়া দিন’ লেখার পেক্ষাপট জানতে চাই।
উত্তর : আমি একজন সাব-এডিটর। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে এই পেশাতেই প্রথম প্রবেশ করি এবং আজ অবধি এতেই নিয়োজিত। আমি খুব কাছ থেকে এই পেশার মানুষদের দেখেছি। এটি একাধারে অনেক সৃজনশীল মানুষকে এই কঠিন শহরে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে, ঠিক তেমনি তাঁরা প্রায় সবাই কমবেশি বৈষম্যের শিকারও হয়েছেন। তো, সাব-এডিটর হওয়ার কারণে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা ধরনের বিচিত্র সংবাদ আমার জানা হত। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, বিনষ্টির সংবাদের চাহিদা বেশি। সেই চাহিদা সংবাদমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিদের মাঝে যেমন, পাঠকের মাঝেও সমানভাবেই ক্রিয়াশীল। এইসব সংবাদ একজন মানুষের মনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা নিয়ে হয়ত সতর্কতা রয়েছে, গবেষণা হয়েছে। কিন্তু যিনি এরমধ্যেই বসবাস করেন, এইসব বারোয়াড়ি সংবাদ নিয়ে রাতদিন কাটান তাঁর মানসিক অবস্থাটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে কেউ কি ভাবেন? তো, একজন সংবেদনশীল সাব-এডিটরের মনের ভেতরে এসব সংবাদ কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তারই একটি প্রস্তাবনা এই উপন্যাস। সেই সঙ্গে আধিপত্যবাদী, পুঁজিবাদী, একনায়কতান্ত্রিক, নিপীড়নমুখী রাষ্ট্র ও কর্পোরেট দুনিয়ায় মানুষের অসহায়ত্বও আমাকে পীড়া দেয় প্রতিনিয়ত। মানুষের মানবিক আচরণবিমুখিতাও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই মনে হল বিষয়গুলো নিয়ে লেখা দরকার। এটি খানিকাংশে আত্মজৈবনিক আখ্যানও বটে। কিংবা হয়তো সংবেদনশীল যেকোন সাব-এডিটর এমন কি যেকোন মানুষের গল্পই হয়তো এটি। তবে তা সরাসরি নয়, অন্তর্গত সত্যের নিরিখে নিঃসন্দেহে। 

জিজ্ঞাসা : আপনার এই উপন্যাসে চেখভের ‘কেরানির মৃত্যু’র কথা মনে করিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সাব-এডিটরের ব্যক্তিগত জীবন ততখানি গুরুত্ব পায়নি। এ বিষয়ে কিছু বলুন।
উত্তর : সাব-এডিটরের ব্যক্তিগত জীবনের বিস্তার ইচ্ছে করেই উহ্য রাখা হয়েছে। তাঁকে কেন্দ্র করে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত আঁকার প্রয়াস ছিল। তাতে গণমাধ্যম এবং সাব-এডিটর অবলম্বন ছিলেন মাত্র। তাঁকে কেন্দ্র করে তাঁর কাজের বিস্তার ঘটানো হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তি মানুষটি সম্পর্কে তেমন কিছু বলা হয়নি কারণ, আমি সাব-এডিটরের কোন ব্যক্তিপ্রতিমা আঁকতে চাইনি। তাঁর কয়েকটি দিনের অনুভূতি প্রকাশ করতে চেয়েছি। প্রশ্ন রাখতে চেয়েছি। তা না হলে, তাঁর গ্রামের বাড়ি, বাবা-মাসহ পরিবার, বেড়ে ওঠা ইত্যাদি তো তুলে আনা যেতোই। কিন্তু ওই যে, সেটা লক্ষ্য ছিল না। তবে এরপরও সাব-এডিটরের ব্যক্তিজীবনের নানা দ্বন্দ্ব, বৈষম্য, বিষণ্ণতা, মানবিক নানা জিজ্ঞাসার আভাস কিন্তু রয়েছে এতে। একটু খুঁজে নিতে হয় আর কী।
 
জিজ্ঞাসা : হিসেব করলে দেখা যাবে এই উপন্যাসের চারভাগের তিনভাগই নিউজ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীতে ঠাসা— এভাবে নিউজ ব্যবহার করলেন কেন?
উত্তর : হা হা হা। না, এতটা হবে না। তবে অকৃপণভাবে নিউজকে আমার মত করে ব্যবহার করেছি। ওই যে বললাম, সাব-এডিটর আমার অবলম্বন। আর একজন সাব-এডিটরের জীবনতো সংবাদময়। ফলে তাঁর পেশা এবং কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখতে গেলে ‘নিউজ’ চলে আসবে, এটা খুব স্বাভাবিক। আর আমার চিত্রিত সাব-এডিটর একজন সংবেদনশীল মানুষ, কবি স্বভাবের। ফলে তাঁর ভেতরে এই বিষয়গুলো ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। আর করলে কেমন হতে পারে তাই দেখার চেষ্টা করেছি। আর একটি বিষয়, প্রতিটি নিউজই কিন্তু এক একটি গল্প। কিন্তু আমরা সেগুলোকে গল্পের মর্যাদা দেই না বা মনেও করি না। আমি দেখতে চেয়েছি, সৃজনশীল লেখায় এই সংবাদকাঠামোকে ব্যবহার করা সম্ভবপর কিনা। এখানে সত্য সংবাদ যেমন আছে, কল্পনাও আছে, মতামত এবং প্রশ্নও আছে। তো এই ফিউশনটির সম্ভাবনা যাচাই করারও একটা চেষ্টা এটি। এ কারণেই নিউজের ব্যবহার হয়েছে বেশ। আর সবাই তো একই ধারায় বা একই নিয়ম মান্য করে লিখেন না। আমি এমন করেই প্রকাশ করতে চেয়েছি।

জিজ্ঞাসা : পাঠক সাধারণত মানুষের (কেন্দ্রীয় চরিত্র) জীবনের চৌহদ্দির কথাই জানতে চায়— কিন্তু আপনার সাব-এডিটরের ব্যক্তিগত জীবন বলতে আছে সামান্যই। পাঠকে কি শেষ পর্যন্ত তথ্যের সাগরে পড়লো কিনা?
উত্তর : পাঠক এভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে বলে এমনটা মনে হচ্ছে। যদি ভিন্নস্বাদ বা উদাহরণ সৃষ্টি করা যায় তবে এটাও পাঠকের খারাপ লাগবে না বলে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে আগেই বলেছি, সাব-এডিটরের প্রতিমা নির্মাণ আমার লক্ষ্য ছিল না। চেয়েছি একটু ভিন্নভাবে উপন্যাসটিকে সাজাতে। আর সেটা করেছি কনটেন্ট দিয়েই। তথ্য তো আমি দিতেই চেয়েছি। বলতে চেয়েছি এতো খুন, এতো ধ্বংস পৃথিবীজুড়ে, এই নাও পরিসংখ্যান। পাঠককে একটু ভাবনার সাগরে বিচার-বিবেচনার জন্য তলিয়ে দিতে চেয়েছি। এতে করে পাঠকের ভেতরে যদি অভিঘাতের সৃষ্টি হয়, তার মধ্যে যদি বিনষ্টির বিরুদ্ধে ঘৃণার সঞ্চার হয়, তবে গন্তব্য সেটাই। 

জিজ্ঞাসা : ধারণা করা যায় উপন্যাসটি ইরাক যুদ্ধের সময়কালে লেখা। এরপর আর কি কি লিখেছেন?
উত্তর : এটি তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়ার সাম্প্রতিক আন্দোলন যাকে ‘আরব বসন্ত’ বলে প্রচার করা হচ্ছে সেই সময়ে লেখা। তবে ইরাকযুদ্ধের প্রসঙ্গ একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। সুযোগ পেলে উপন্যাসটির পরিসর বর্তমান সময় পর্যন্ত টেনে আনব। এরপর বেশ কয়েকটি আখ্যান লিখেছি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘জিয়ন্তকাল’, মহাভারতের ছোট্ট কাহিনি নিয়ে ‘হিড়িম্বা’, নেত্রকোণার আঞ্চলিকভাষায় ‘রঙমহাল’। এ ছাড়াও শেক্সপিয়রের ‘দ্য টেম্পেস্ট’ এবং আলব্যের ক্যামুর ‘আউটসাইডার’ অনুবাদ ও রূপান্তর করেছি। এ দুটোই এখন মঞ্চে অভিনীত হচ্ছে।  

জিজ্ঞাসা : সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে কার কার লেখা আপনার মনোযোগ কেড়েছে?
উত্তর : বাংলাদেশে সমকালের বেশ কয়েকজন লেখকের লেখা আমার খুব পছন্দের। তাঁরা প্রায় সবাই আমার সমসাময়িক। অতিঅগ্রজদের নাম উহ্য রাখছি। আমার কালপর্বে যাঁদের লেখা আগ্রহের সঙ্গে পাঠ করি তাঁদের মাঝে— আহমাদ মোস্তফা কামাল, জাকির তালুকদার, শাহাদুজ্জামান, জয় প্রকাশ, প্রশান্ত মৃধা, শামীম রেজা, মির্জা তাহের জামিল, হামীম কামরুল হক, সাগুফতা শারমীন তানিয়া, শুভাশিষ সিনহা উল্লেখযোগ্য।

জিজ্ঞাসা : আপনার গদ্যে লক্ষ্য করি নিউজের মেদহীন গতিময়তা আছে— এ সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : গুরু ও শিক্ষক সেলিম আল দীনের মতো শিল্পে আমিও দ্বৈতাদ্বৈতবাদী। আমার রচনা সব লেখ্যমাধ্যমের গণ্ডি ছাড়িয়ে অথবা আত্মীকরণ করে বিকশিত হোক এটিই প্রকৃত চাওয়া। আমার চেষ্টাও তাই। বিষয়টিকে এভাবে দেখা যেতে পারে ইন্সটেলেশন আর্ট নামে একটি ফর্ম এ সময়ে বেশ আলোচিত হচ্ছে। আমাদের দেশে এই আর্টফর্মের চর্চা খুব বেশিদিনের নয়। ইদানিং থিয়েটারেও এটি ব্যবহার হচ্ছে ব্যাপকমাত্রায়। মাল্টিমিডিয়া, স্থাপনাশিল্প, লাইট, ত্রিমাত্রিক প্রজেকশন, সাউন্ড ইত্যাদির মিথষ্ক্রিয়ায় এটি প্রকাশিত। আমি দেখতে চেয়েছি লেখ্যমাধ্যমে একে ধরা সম্ভবপর কিনা। তাতে কোন বাড়তিমাত্রার খোঁজ পাওয়া আমার জন্যে আনন্দের। আর গতিময়তা লেখাকে পাঠে বাধ্য করে। সেটা যদি ঘটে থাকে তবে নিজেকে সফল মনে করব। 

জিজ্ঞাসা : পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি জানতে চাই। 
উত্তর : এই জীবনে ট্রাফিকপুলিশ, পাইলট, মেজর, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, ক্রিকেটার, দাবাড়ু কতকিছুই না হতে চেয়েছি। কিন্তু পরিণত বয়সে লেখক ছাড়া আর কিছুই হতে চাইনি, চাইও না। আমি ভাগ্যবান, লেখক হতে চেয়ে আমার মা-বোন অর্থাৎ যাঁদের নিয়ে আমার একান্ত পরিবার তাদের বিরাগভাজন হইনি। কিন্তু বাকি অধিকাংশের কাছেই লেখা একটি অর্থসম্পর্করহিত ‘অকাজ’ কিংবা শখের ব্যাপার। এটি সবার কাছে অন্যান্য পেশার মতো কোন পেশা নয়, হতে চাওয়ার মতো কোনকিছু নয়। এই সমাজে শুধু লিখে জীবনধারণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি এখনো (দু’একজন ব্যতিক্রম রয়েছেন)। এ কারণে এটি কারো জীবনের লক্ষ্য হয় না, কারণ বৃহৎঅর্থে এর কোন অর্থকরী আবেদন নেই। কিন্তু একটি পুরস্কার, একটি স্বীকৃতি সবার কাছে একধরনের গ্রহণযোগ্যতা বা হতে চাওয়ার মত খানিক আবেদন সৃষ্টিতে সহায়তা করে। এই পুরস্কার অর্জনের আগেও আমি লেখক হওয়ার চেষ্টা করেছি, এরপরও করে যাবো। মাঝখান দিয়ে এটি এক ঝলক ভালোলাগার পরশ ছুঁইয়ে দিল। আজ যাঁরা এদেশের কথাসাহিত্যে অগ্রগণ্য, নিরন্তর বিস্ময় উপহার দিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের লেখার মাধ্যমে, তাঁদের অনেকেই ইতোপূর্বে এই পুরস্কারটি অর্জন করেছেন। ফলে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং যাচাইয়ের মানদণ্ড উন্নত। আমার একটি সৃষ্টিকে গ্রহণ করার জন্য, স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আমি আনন্দিত এবং কৃতজ্ঞ জেমকন পরিবারের কাছে। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।