সকাল ০৮:৪৩ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

'ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আমাদের অধিকার'

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

রেজা সেলিম, 'আমাদের গ্রাম- উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি' প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্প্রসারণে তার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। প্রযুক্তি শিক্ষায় গ্রামাঞ্চলের স্বল্প শিক্ষিত তরুণ সমাজের উপযোগী বেশ কিছু কারিকুলাম তিনি তৈরি করেছেন যা পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার কোস্টারিকা ও আফ্রিকার ইথিপিওয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের তৃণমূল পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়ে বিশেষ সমাদৃত হয়েছে। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম 'মাইক্রোসফটের আনলিমিটেড পোটেনশিয়াল শিক্ষা কর্মসূচি' কারিকুলামের বাংলা ভাষায় স্থানীয়করণ করেন।

আমাদের গ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে রেজা সেলিম কম্পিউটার জনপ্রিয়করনে 'সবার জন্যে কম্পিউটার শিক্ষা' কর্মসূচির সূচনা করেন ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রযুক্তি শিক্ষার জন্য বিশেষ কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে গ্রামে গ্রামে 'জ্ঞান কেন্দ্র' স্থাপন, গ্রামের তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলা ও বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলাকে তথ্যপ্রযুক্তি আন্দোলনের আদর্শ ধরে বার্ষিক 'জ্ঞানমেলা'র নিয়মিত আয়োজন করে চলেছেন।

রেজা সেলিম বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে 'উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি' ধারণা বাস্তবায়নের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন এবং এখনও করছেন। উন্নয়নের জন্য জ্ঞান ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তাঁর বেশ কিছু গবেষণা ও প্রকাশনা রয়েছে।

কর্মক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকার জন্যে তিনি কানাডার বেলানেট প্রবর্তিত 'সেরা নেটওয়ার্কার' পুরস্কার পান ২০০১ সালে। একই বছর তিনি ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহানের নেতৃত্বাধীন সংস্থা টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ট্রাস্ট থেকে একুশ শতকের 'লিডারশিপ পুরস্কার' পান। ২০০৩ সালে সুইস সরকার ও জিকেপি-র আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট লিডার অ্যাওয়ার্ড, একই সালে আইটিইউ 'সেরা প্রকল্প ফেলো' ও ২০০৫ সালে আইটিইউ-র 'সাইবার সিকিউরিটি ফেলো' নির্বাচিত হন।

বিশ্বব্যাংক ও সুইডিশ সরকার যৌথভাবে তাঁকে ২০০৮ সালে স্টকহোমে 'পরিসংখ্যান ও উদ্ভাবনের জ্ঞানকর্মী' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। এছাড়া জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন সোসাইটি শীর্ষ সম্মেলনের (জেনেভা-২০০৩ ও তিউনিস-২০০৫) বাংলাদেশের সরকারি কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। এ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক সংস্থা আইটিইউ'র সিভিল সোসাইটি ব্যুরোতে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ফোকাল পয়েন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আঙ্কটাড পরিচালিত সিএসটিডি (কমিশন ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফর ডেভেলপমেন্ট) -এর পক্ষে শীর্ষ সম্মেলন ফলো আপ সভাগুলোর বিশেষ প্রতিবেদক ছিলেন (২০০৭-২০১১)।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাগেরহাটের রামপালে বিশ্বমানের একটি তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ক্যান্সার সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হিটলার এ. হালিম

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বলে থাকেন উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি। এর পটভুমি যদি একটু ব্যাখ্যা করে বলতেন।

রেজা সেলিম: উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি এটা একসময় একটা কনসেপ্ট ছিল। প্রযুক্তি ব্যাপক সম্প্রসারিত হতে শুরু করল ১৯৯০-এর দশক থেকে। তখন ইউরোপ, আমেরিকার উন্নত দেশগুলো বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। কারণ পশ্চিমা দেশগুলো ছিল সংখ্যায় অল্প আর দরিদ্র দেশগুলো সংখ্যায় বেশি। এখন তো আর রাজা দিয়ে আর রাজ্য শাসন হয় না।

মূলত গত অর্ধ শতক ধরে তিনটি বিষয় দিয়ে বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, অস্ত্র আর পুঁজি। ধনী দেশগুলো বুঝতে পারল যদি গরিব দেশগুলোকে শাসন করতে হয় তাহলে এই তিনটি বিষয়কে তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যখন প্রযুক্তি উন্মুক্ত হতে শুরু করল তখন এটি উন্নত দেশগুলোর জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াল। তারা ভাবতে লাগল এসব কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ওই সময়ে বিশ্বে কিছু সচেতন মানুষ ছিলেন যারা প্রযুক্তিকে গোটা দুনিয়ার সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে লাগলেন। তখন দারিদ্র্য বিমোচন একটা বড় ইস্যু ছিল এবং প্রযুক্তিকে দারিদ্র বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানো যায় কি না এই নিয়ে ভাবা হচ্ছিল।

প্রথম দিকে বাংলাদেশে এই বিষয়ের অন্যতম মুখপাত্র ছিলেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ১৯৯৭ সালে বুয়েটের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, "পথের বাধা সরিয়ে নিন, সামনে এগোতে দিন।" ওই বক্তব্যে তিনি প্রযুক্তির সর্বগ্রাসী ক্ষমতা ও ব্যবহার নিয়ে বিস্তর স্বপ্নমুখী কথা বলেছিলেন।

১৯৯০ সালের পরে আমাদের দেশে নতুন করে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় যখন সবাই দেশ গঠনে চিন্তা-ভাবনা শুরু করলেন তখন অনেকের মাথার মধ্যে একটা বিষয় কাজ করেছিল যে, কী করে প্রযুক্তিকে গরিববান্ধব করা যায়। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় বাংলাদেশে এর পথিকৃৎ হলেন, মাসিক কমপিউটার জগৎ ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা জনাব আবদুল কাদের। উনি এই ব্যাপারে খুবই সোচ্চার ছিলেন। একই সময়ে মুদ্রণ শিল্পে ফটো কম্পোজ থেকে অমরা যখন অফসেটে শিফট করলাম তখন এটি দেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। তখন রাজধানীর নীলক্ষেত, আরামবাগসহ বিভিন্ন স্থানে শত শত কম্পিউটার অপারেটর দোকান খুলে কম্পোজ, ফটোশপ দিয়ে কারিগরি নানান কাজ করতে শুরু করেন। এটাও একটা বড় বিষয়।

দেশে তখন একটা বিষয় পরীক্ষিত হয়েছে যে, কম্পিউটার ব্যবহার করতে হলে অনেক বেশি ইংরেজি জানতে হয় না, কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়তে হয় না। দেশে যখন এরকম ছোট ছোট প্র্যাকটিস হলো তখন কাদের ভাইয়ের মতো লোক পত্রিকায় কাভার স্টোরি করে ফেললেন 'গরিবের জন্য কমপিউটার'। এই চিন্তায় আমাদের গুরু ছিলেন সাংবাদিক নাজিম উদ্দিন মোস্তান। ইত্তেফাকে কাজ করতেন। তিনিই মূলত আমাদেরকে উৎসাহ দিতেন। আমাদের বোঝাতেন প্রযুক্তির সমস্যা-সম্ভাবনার দিকগুলো।

সারা দুনিয়াতেই ব্যবসা-বাণিজ্যের মানুষগুলো একটু রক্ষণশীল হন। নতুন মোটিভেশন তারা সহজে গ্রহণ করতে চান না। তাদের মুনাফা অর্জন ভাবনা এর একটা বড় কারণ। ১৯৯০-'৯৫ সালের দিকে যারা দেশে কম্পিউটার বিক্রি করতেন তারা সাধারণ মানুষের কম্পিউটার ব্যবহার নিয়ে চিন্তা করতেন না। যেহেতু আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে তারা ভাবতেন না তাই তখন কম্পিউটার বিক্রির সময় ক্রেতাদের একটি 'স্ট্যাবিলাইজার' দিতেন। করণ হিসেবে বলা হতো, বিদ্যুৎ চলে গেলে কম্পিউটারের ক্ষতি হবে। কম্পিউটার নিতে হলে এসি রুম লাগবে, আলাদা ঘর লাগবে, কার্পেট দিয়ে রুম সাজাতে হবে, জুতো পায়ে ঘরে ঢোকা যাবে না ইত্যাদি। এই যে একটা অদ্ভুত চেষ্টা করা শুরু হলো যে, কম্পিউটার হলো বড়লোক, বিশেষ অভিজাত শ্রেণির জন্য এবং এখানে এই দিয়ে সাধারণ মানুষের কিছু করার নেই একে আমরা ডিজিটাল ডিভাইড বা বৈষম্য তৈরির চেষ্টা বলতাম।

ওই সময় বলা হত কম্পিউটার চালাতে হলে ইংরেজি জানতে হবে, উচ্চশিক্ষিত হতে হবে ইত্যাদি নানা বিষয়। দেখা গেছে, আমার অফিসে যেই ছেলেটি কম্পিউটারে ওয়ার্ড প্রসেসিংয়ের কাজ শুরু করে, পরে সে ধীরে ধীরে পেজ মেকার, ইলাস্ট্রেটর, কোয়ার্ক এক্সপ্রেস, ফটোশপ ইত্যাদি পর্যায়ক্রমে শিখে ফেলল। যখন দেখল আমার অফিসে সব বিষয় কাজে লাগে না তখন সে বাইরে বিভিন্ন প্রেস ও পাবলিশিং হাউজে পার্ট টাইম কাজ করা শুরু করল। এভাবে এসএসসি, এইচএসসি পাশ অসংখ্য ছেলে মেয়ে কম্পিউটারের নানা অ্যাপ্লিকেশন শিখে চাকরি করা শুরু করল। দেখা যায়, এসব কাজ করার জন্য উচ্চশিক্ষার দরকার হয় না। এখনও পল্টন, আরামবাগসহ অন্যান্য জায়গায় গেলে দেখা যাবে কম্পিউটার কম্পোজ, গ্রাফিক ডিজাইন, পেজ মেকআপসহ নানা কাজ যারা করছেন তাদের কেউই কিন্তু বুয়েট, কুয়েট, এমআইটি বা নামি দামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পাস করা গ্র্যাজুয়েট নন। বেশিরভাগই এসএসসি, এইচএসসি পাস। তারা আমাদের অর্থনীতির একটা শক্তি।

ব্যবসায়ীরা সমাজ সেবা বা জনকল্যাণ নিয়ে কম ভেবে মুনাফা নিয়ে বেশি ভাবেন। এজন্য দেশে সিএসআর (সামাজিক দায়বদ্ধতা) আইন করে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামাজিক, সেবামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যেন দান করে মানুষের উপকার করতে পারে সেই জন্য আইন করতে হয়েছে।

যা হোক- ১৯৯৬ সালে দেশে ডায়ল আপ ইন্টারনেট চালু হয়। তখন ৮-১০ টাকা মিনিটে ইন্টারনেট ব্যবহার করে জ্ঞান আহরণ করা খুবই কঠিন ছিল। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল, এই একটা দশক গেছে টানাপোড়েনে। তারপর গণমাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। এক সময় ছিল অ্যাপল ম্যাকিনটোশ ও পিসির সমন্বয়হীনতা। পরে তাদের মধ্যে ইন্টারঅপারেবিলিটি চালু হয়। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে কম্পিউটার ব্যবহারের প্রসার ঘটার সম্ভাবনা দেখা যায়। এটি নিয়ে যখন লেখালেখি শুরু হয়ে গেল তখন উন্নত দেশগুলোতে দ্বন্দ্ব দেখা দিল যে, প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ বাড়াবেন নাকি এই খাতে নির্ভরতা তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ করবেন। তখন বিশ্বের শাসক শ্রেণিও এই নিয়ে ভাবতে লাগলেন।

এটি নিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বেশ চিন্তা ভাবনা করলেন। ২০০০ সালের মে মাসে জাপানের ওকিনাওয়ায় জি-৮ এর সামিট হয়। এই সামিটে ক্লিনটন সাহেব একটা প্রস্তাব দেন। এটি হলো ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বগ্রাসী ব্যবহার নিয়ে জি-৮ -এর ভূমিকা কী হবে এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকা কী হবে। গরিব দেশগুলো কি করে প্রযুক্তি ব্যবহার করবে এবং কীভাবে তাদের সুবিধা দেওয়া যায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।

সারা পৃথিবীতে ওই সময় দাবি ওঠে, 'আর নতুন করে বৈষম্য না করতে।' যেটাকে ডিজিটাল ডিভাইড বলা হয়। তখন এসব বিষয়ে এক বছর স্টাডি করা এবং ২০০১ সালে ইতালির রেনোয়ায় পরবর্তী সামিটে এই বিষয়ে রিপোর্ট প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। সম্মেলনে একটা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির নাম হলো- ডিজিটাল অপুরচুনিটি টাস্ক ফোর্স (ডিওটি বা ডট ফোর্স নামে পরিচিত)। এর সচিবালয় করা হয় বিশ্বব্যাংক ওয়াশিংটন কার্যালয়ে। একে সহায়তা করে কানাডিয়ান সরকারের সংস্থা সিডা। ২০০০ সালের মার্চ মাসে আরেকটা বড় ঘটনা ঘটে। সেটি হলো মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স ডাকেন। যেটি গ্লোবাল নলেজ-২ (জিকে-২) নামে পরিচিত। গ্লোবাল নলেজ -এর প্রথম কনফারেন্সটি হয় ১৯৯৭ সালে কানাডায়। জিকে-২ সম্মেলনে আমি অংশ নিয়েছিলাম। তার পরে এটির আর ফলোআপ হয়নি। জিকে-২ কনফারেন্সে বলা হয় ডট ফোর্সকে ফ্যাসিলেট করবে জিকে-২ এর একটি কমিটি। জিকে-২-এর প্রধান বার্তাটি ছিল প্রযুক্তিকে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং এতে কোনও প্রতিবন্ধকতা থাকবে না এবং সাধারণ মানুষ যেন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। নলেজ হবে গ্লোবাল। সব দেশের মানুষ এই নলেজ ব্যবহার করবে। কোনও ভাবেই এটি এক জায়গায় আবদ্ধ হতে পারবে না। এই দায়িত্বটি দেওয়া হলো বিশ্বব্যাংককে। ডট ফোর্সের সচিবালয় তখন হোস্ট করে দেওয়া হয় জিকে-২ সম্মেলনেই। এটার নাম দেওয়া হলো গ্লোবাল নলেজ পার্টনারশিপ। ঘটনাচক্রে প্রথম থেকেই আমি জিকেপির এই কার্যক্রমে যুক্ত হই।

যেহেতু কাদের ভাই, মোস্তান ভাই ও আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতাম, লিখতাম আমি এই কাজে যুক্ত থেকে খুবই উৎসাহী হলাম। ওই সময় আমার গুরুত্বপূর্ণ একটা লেখা ছাপা হয়েছিল ডেইলি স্টারে 'আইসিটি ফর পুওর' এই শিরোনামে। এটি ছিল আমার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট। এই লেখার মাধ্যমে আমি বিদেশে অনেকের সঙ্গে পরিচিত হই। বিশ্বব্যাংক জুনে ২০০১ সালে সিঙ্গাপুরে ও মে ২০০২ সালে মালেশিয়ায় এডিবি তাদের আইসিটি কৌশল নিরূপণ সভাগুলোতে আমাকে ডেকে নিল।

জিকেপির মাধ্যমে যখন ডট ফোর্স রিপোর্টটি দেওয়া হবে তার আগে ২০০১ সালের মার্চের ২১-২৩ তারিখ জেনেভায় ছিল জিকেপির বার্ষিক সভা। যেহেতু আমি দক্ষিণ এশিয়ায় ডট ফোর্স কো-অর্ডিনেট করি ও জিকেপির সদস্য সেই সুবাদে আমি মিটিংয়ে গেলাম। তখন জেনেভায় দেখলাম পৃথিবীটা আসলেই ভাগ হয়ে গেছে। একভাগ বিশ্বব্যাংকের নেতেৃত্বে। সাধারণ মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিলো বিশ্ব ব্যাংকসহ বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান। আর এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়ালো সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু করে অনেক সংস্থা।

আমরা দেখলাম সাধারণ মানুষের মাঝে প্রযুক্তিকে ছড়িয়ে দিতে যে সুপারিশমালা দরকার তা আমলে নিচ্ছে না বিশ্বব্যাংক। এই প্রেক্ষাপটে ডট ফোর্সের সচিবালয় বিশ্বব্যাংক থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত হয়। মালয়েশিয়া সরকার তখন এটি হোস্ট করতে চায়। ফলে বিশ্বব্যাংকের থেকে এটি বেরিয়ে আসে। 'আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট' যে ধরণা মানুষের কাছে প্রযুক্তি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, এটির নেতৃত্ব চলে আসে জিকেপিতে। ওই সময় আমি একটা চ্যালেঞ্জ করেছিলাম যে, প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণে এনজিও ও প্রাইভেট সেক্টরের ভূমিকা থাকা দরকার। আমাকে বাংলাদেশ থেকে সমর্থন করেছিলেন সিডিএল -এর হারুন ভাই (এখন কানাডা প্রবাসী)। মাইক্রোসফট, বিশ্বব্যাংক, সিসকো এর বিরোধিতা করে। জিকেপির বার্ষিক মিটিংয়ে আমার প্রস্তাবটি ভোটে যায় এবং এক ভোট বেশি পেয়ে পাস হয়। তখন আমাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রযুক্তি সেবায় সেবরকারি খাত, সিভিল সোসাইটির যে ভূমিকা আছে তা আমাকে প্রমাণ করতে হবে। ওই চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে আমি ঢাকায় একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন করি। এটির নাম ছিল 'বিল্ডিং নলেজ সোসাইটি রোল অব এনজিও।' তিন দিনের সম্মেলন ছিল এটি। যেটির আর্থিক সহায়তা দেয় বিশ্বব্যাংক, জিকেপি এবং অন্যান্য সংস্থা। বিশ্বব্যংকের ধারণা ছিল আমার ধারণা ভুল প্রমাণ হবে।

সম্মেলনে দেশের বুদ্ধিজীবী, প্রাইভেট সেক্টর, চেম্বারসহ অনেককে আমি একসঙ্গে করেছিলাম। পৃথিবীর ৫২টি দেশের প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশ নেয়। এখানে একটা 'স্পস্ট রিকমেনডেশন' হয় যে প্রাইভেট সেক্টর, এনজিওদের একটা ভূমিকা আছে প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণে। কারণ এনজিও কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের কাজ করে। আমাদের সুপারিশ, জিকেপির সুপারিশ, ডট ফোর্সের রিপোর্ট সব কম্পাইল করে জি-৮ এর কাছে দেওয়া হয় ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে এবং সিদ্ধান্ত হয় এটি জাতিসংঘে নিষ্পত্তি হবে। এই বিষয়ে আইটিইউ -এর একটা উদ্যোগ ছিল আগে থেকেই। ওরা ২০০০ সাল থেকে চেষ্টা করছিল বিষয়টি জাতিসংঘে তোলার। যখন বিশ্বব্যাংকসহ কিছু বড় দেশের চাপে পড়ে তারা সরে আসে। আইটিইউ এর সুপারিশে যে ওয়ার্ল্ড সামিটের চিন্তা করা হচ্ছিল 'ওয়ার্ল্ড সামিট অন দি ইনফরমেশন সোসাইটি' -এর হোস্ট ছিল সুইজারল্যান্ড। এই সামিটের আগে পুরো প্রসেসটা মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার শুধুমাত্র ল্যাব বা কারিগরি কাজের জন্য না। তথ্যপ্রযুক্তির সুফল মানুষ যে কোনও দেশে, যে কোনও স্থানে পেতে পারে। মানুষের জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি কীভাবে উপকারে লাগবে তা গবেষণা করে বের করে আনাই হচ্ছে বড় কাজ। আর এই কাজটি করতে গিয়ে 'আমাদের গ্রাম'- উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয় তৃণমূলে।

গ্লোবাল ভিলেজ আপনি এক অর্থে বলতে পারেন। এই নামকরণের পেছনে একটা ইমোশন কাজ করেছে। আমি শুরুতে শিশুদের নিয়ে কাজ করতাম। প্রত্যাশা ছিল ওরা বড় হবে, জ্ঞান অর্জন করবে পরে প্রযুক্তি ব্যবহার করবে তরপরে পরিবর্তন আসবে। আইডিয়াটা ছিল, আমরা নিজেরা নিজেদের গ্রামে কাজ করব। আমাদের সবার একটা করে গ্রাম আছে। আমরা শহরে থাকলেও গ্রাম সবারই আছে। আমরা যদি নিজেদের গ্রামে কাজ করি তাহলে ওই গ্রামে কোনও দারিদ্র্য, দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটন, অশিক্ষা, কুসংস্কার, অন্যায়-অবিচার থাকার কথা না। একটা আদর্শ সুন্দর স্বপ্নের গ্রামের কথা চিন্তা করে 'আমাদের গ্রাম' নাম রাখা হয়েছে। গ্লোবাল ভিলেজ অর্থে 'আমাদের গ্রাম একটা গ্রাম' তারপরে সবার গ্রাম। একটু বড় করে দেখলে পুরো বাংলাদেশটাই একটা গ্রাম।

বাংলা ট্রিবিউন: 'আমাদের গ্রাম' কি গ্লোবাল ভিলেজ অর্থে?

রেজা সেলিম: গ্লোবাল ভিলেজ আপনি এক অর্থে বলতে পারেন। এই নামকরণের পেছনে একটা ইমোশন কাজ করেছে। আমি শুরুতে শিশুদের নিয়ে কাজ করতাম। প্রত্যাশা ছিল ওরা বড় হবে, জ্ঞান অর্জন করবে পরে প্রযুক্তি ব্যবহার করবে তরপরে পরিবর্তন আসবে। আইডিয়াটা ছিল, আমরা নিজেরা নিজেদের গ্রামে কাজ করব। আমাদের সবার একটা করে গ্রাম আছে। আমরা শহরে থাকলেও গ্রাম সবারই আছে। আমরা যদি নিজেদের গ্রামে কাজ করি তাহলে ওই গ্রামে কোনও দারিদ্র্য, দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটন, অশিক্ষা, কুসংস্কার, অন্যায়-অবিচার থাকার কথা না। একটা আদর্শ সুন্দর স্বপ্নের গ্রামের কথা চিন্তা করে 'আমাদের গ্রাম' নাম রাখা হয়েছে। গ্লোবাল ভিলেজ অর্থে 'আমাদের গ্রাম একটা গ্রাম' তারপরে সবার গ্রাম। একটু বড় করে দেখলে পুরো বাংলাদেশটাই একটা গ্রাম।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি প্রায়ই বলে থাকেন মোবাইলের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব, কীভাবে?

রেজা সেলিম: প্রযুক্তির ব্যবহার দুই রকমের। একটা হচ্ছে জ্ঞান অন্যটি প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিক। মোবাইল ফোন যখন প্রথম শুরু হলো তখনই আমরা বলতাম এটি একটি কম্পিউটার। তবে শুরুর দিকে আমরা হয়তো কল্পনাই করতে পারিনি মোবাইল দিয়ে কত কী করা সম্ভব। যখন গ্রামীণ ব্যাংক দেশে প্রথম নারীদেরকে পল্লীফোন দেয় তখন আমিও একটা সার্ভিস নিয়ে আসি। ওই সময় আমি রামপালে একটা ফিক্সিড জিএসএম টার্মিনাল ফোন নিয়ে আসি। এটি ছিল কোরিয়ার তৈরি বিশেষ এক ধরনের টেলিফোন সেট। এর মেধ্যে সিম কার্ড দিয়ে কানে লাগালে ডায়াল কল শোনা যেত। আমি এটি এনেছিলাম এই যুক্তিতে যে, যদি টোন হয় তাহলে এটিকে ফ্যাক্স মেশিনের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে। কারণ ফ্যাক্স মেশিন টোনটা আইডেন্টিফাই করে। ফলে ফ্যাক্স পাঠানো সম্ভব হয়। আমি ওই সময় রামপালের প্রত্যন্ত গ্রাম শ্রীফলতলা থেকে এই সেট দিয়ে ঢাকায় প্রশিকার ডায়াল আপে ইন্টারনেট ব্যবহারে সফল হই। তখন একটা সিম কার্ডের দাম ছিল তিন থেকে চার হাজার টাকা। ফোনসেট ও সিম কার্ড মিলিয়ে দাম পড়তো ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা।

এই ফোনগুলো দিয়ে কথা বলা, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট ব্যবহার করার ফলে এটি বেশ কার্যকরী ছিল। আমি প্রথমে এই ফোনগুলো ওষুধের দোকানে দিতাম। প্রথম দিকে বাগেরহাটের রামপাল, খুলনার পাইকগাছাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিয়েছিলাম। গ্রামের বেকার যুবকদের কোনও ওষুধের দোকানের সঙ্গে লিংকড করে ফোনসেটগুলো দিই। মোবাইল ফোন দিলে সে হয় তো সেটা পকেটে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, কোনও একটি স্থায়ী ঠিকানায় থাকবে না সেজন্য আমি টেলিফোন সেট দিয়েছিলাম।

এতে করে মানুষের অনেক উপকার হয়। দোকানে বসে কেউ ফোন করে ওষুধ নেয় বা জরুরি কোনও বার্তা আদান-প্রদান হয়। দেখা গেল এতে ভালো একটা ব্যবসা হচ্ছে। এর পরে তারা রামপালে আমাদের কাছে এলো এসএমএস কীভাবে করা যায় তা জানতে। তখন আমরা পাঁচ টাকা করে (প্রতিকী অর্থে) নিয়ে এসএমএসসহ ফোন সেটের ব্যবহারিক ট্রেনিং দিতাম।

ফোন দিয়ে কী হয়, কীভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করা যায় ওই সময় আমরা বলতে পারতাম না। এখন আমরা অনেক কিছু বলতে পারি। ফোনে শুধু কথা বলা নয় এটি এখন ডিভাইস, একটি কম্পিউটার। এর সাহায্যে সব কাজ করতে পারি। আমরা এখন ডাটা ব্যবহার করি মোবাইল ফোনে, মোবাইল ফোনে রোগীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিই। আমাদের সব অ্যাপ মোবাইলের উপযোগী করা আছে। গ্রামের ডাটাবেজ করার কাজে জিপিএস দরকার হয় এটি মোবাইল ফোনে সহজ হয়।

ধরুন, আপনি গবেষণার কাজে শিক্ষার্থীদের কাছে স্মার্টফোন দিয়ে সুন্দরবনে পাঠালেন বুনো ফুলের ছবি তুলতে এবং বোটানির প্রফেসরদের সঙ্গে বসে সেই ছবি যদি ফুলের ক্যাটাগরির কাজে বা গবেষণায় লাগান তাহলে কিন্ত এটি একটি কাজ।

আবার মোবাইল ফোনে চর্ম রোগের ছবি তুলে চিকিৎসার জন্য মৃদুল চৌধুরী একবার চিন্তা করলেন ক্লিক ডায়াগনস্টিকের। ডাক্তার ছবি দেখে চিকিৎসা দেবেন। মিসরে এই সেবার ট্রায়াল হয়েছে এবং পরে দেশে ফিরে তিনি আমাদের সঙ্গে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে কাজ করেছেন। আপনি কী কাজে কীভাবে মোবাইল ফোনকে ব্যবহার করবেন তার ওপর নির্ভর করবে আয় রোজগার। এখন তো মোবাইল ফোন সর্বগ্রাসী। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে মোবাইল ফোনে ডাটাসহ বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে কোনও ওরিয়েন্টেশন নেই। আমাদের দেশে বেশিরভাগই ফোন ব্যবহার করেন কথা বলার কাজে। এমনকি আমাদের মোবাইল অপারেটরদেরও এই বিষয়ে জোরালো ভূমিকা নেই। স্মার্টফোনে মানুষের ব্যবহারিক সেবা নিয়ে যেসব অ্যাপ তৈরি হয়েছে সেগুলো নিয়ে যে কেউ ব্যবসা করতে পারেন। বিদেশে ট্যাক্সি চালকরা বিল নেন মোবাইলে যুক্ত পজের মাধ্যমে। কার্ড থেকে ভাড়া নিয়ে বিলের কপি ই-মেইলও করেন। আসলে মোবাইলফোনের সর্বগ্রাসী ব্যবহার না শিখলে আপনি কী করবেন তা ফোকাস করা যাবে না।

ব্রডব্যান্ড ব্যবহার এখন অধিকার। ব্রডব্যান্ড হবে না কেন, অবশ্যই হবে। কিন্ত একটা গোষ্ঠী হতে দিতে চায় না। আমাদের যে অবকাঠামো তৈরি করা আছে এই মুহূর্তে দেশের সব উপজেলায় ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেয়া সম্ভব এবং এই সক্ষমতা বিটিসিএলেরই আছে। এটি বাস্তবায়নের প্রধান বাধা দেশের মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো। কারণ তারা ইন্টারনেট ব্যবসা করবে, সমাজ উন্নয়ন এদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। আমাদের দেশে যারা এসব নীতিমালা তৈরি করেন তারা খুবই সংকীর্ণ দৃষ্টি নিয়ে ব্যাপারটা দেখেন এবং বৈশ্বিক পটভূমিতে ওনাদের জ্ঞানের জগৎ খুবই সীমিত। যে কারণে ওনারা ভাবছেন মোবাইলে থ্রিজি, ফোরজি আমাদের দেশে একটা যুগান্তকারী কাজ। এটা খুবই ভুল ধারণাপ্রসূত চিন্তা।

বাংলা ট্রিবিউন: সবার জন্য ব্রডব্যান্ড কী আদৌ হবে?

রেজা সেলিম: না হলেও ধরে-টরে এটা করাতে হবে। ব্রডব্যান্ড ব্যবহার এখন অধিকার। ব্রডব্যান্ড হবে না কেন, অবশ্যই হবে। কিন্ত একটা গোষ্ঠী হতে দিতে চায় না। আমাদের যে অবকাঠামো তৈরি করা আছে এই মুহূর্তে দেশের সব উপজেলায় ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেয়া সম্ভব এবং এই সক্ষমতা বিটিসিএলেরই আছে। এটি বাস্তবায়নের প্রধান বাধা দেশের মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো। কারণ তারা ইন্টারনেট ব্যবসা করবে, সমাজ উন্নয়ন এদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। আমাদের দেশে যারা এসব নীতিমালা তৈরি করেন তারা খুবই সংকীর্ণ দৃষ্টি নিয়ে ব্যাপারটা দেখেন এবং বৈশ্বিক পটভূমিতে ওনাদের জ্ঞানের জগৎ খুবই সীমিত। যে কারণে ওনারা ভাবছেন মোবাইলে থ্রিজি, ফোরজি আমাদের দেশে একটা যুগান্তকারী কাজ। এটা খুবই ভুল ধারণাপ্রসূত চিন্তা।

থ্রিজি এই দেশে খুব বড় পরিবর্তন ঘটাবে না। থ্রিজি মানে একটা স্মার্টফোন লাগবে এবং এক্ষেত্রে স্মার্টফোনের ব্যবসা বাড়ছে। স্মার্টফোনে থ্রিজি, ফোরজি ব্যবহার করবেন আপনি সিটিজেন সার্ভিস পাওয়ার জন্য। আপনি কোথাও গিয়ে কোনও স্থান, স্থাপনা, রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাচ্ছেন না তা দেখতে দ্রুত স্মার্টফোন থেকে সেবা নিতে পারেন। নিত্যদিন ব্যক্তিগত কাজের জন্য আসলে থ্রিজি, ফোরজি। যে কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় এই সেবা অনেক জনপ্রিয়। এসব উন্নত দেশে যারা থ্রিজি-ফোরজি ব্যবহার করেন তাদের প্রত্যেকের অফিসে বা বাসায় ব্রডব্যান্ড সংযোগ আছে। এই থ্রিজি অফিসেও কোনও কাজে লাগে না। কারণ অফিসে বা ঘরে এসে কাজ করার জন্য তারা ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করেন।

থ্রিজি ব্যবহার করে বড় কাজ করা যায় না। বড় কাজ করার জন্য অবকাঠামো দরকার। এর জন্য ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটি দরকার। আমি খোঁজ-খবর করে যথেষ্ট দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো তৈরিতে আমাদের বিটিসিএলের সক্ষমতা আছে। আমি বিটিসিএলকে কনভিন্স করে খুলনা, বাগেরহাট, রামপাল ও কুমিল্লায় হাইস্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করি। এই সক্ষমতা তাদের আছে। শুধু পলিসির অভাবে এটি হচ্ছে না। আবার পলিসি থাকলেও বাস্তবায়নের সদিচ্ছা না থাকলেও কাজ হয় না। ব্রডব্যান্ড মানেই ক্যাবল টেনে সংযোগ দিতে হবে এমন নয়। আপনাকে হাইস্পিড (উচ্চগতি) নিশ্চিত করতে হবে। এখন আমাদের দেশে ইন্টারনেটের যে অবকাঠামো আছে উপজেলা পর্যন্ত সেখান থেকে শুরু করতে হবে। কিছুদিন আগে খবরের কাগজে দেখলাম, ইউনিয়ন পর্যায় ও গ্রাম পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার লাইন টানা হবে এবং এই কাজ ২০১৬ সালে শেষ হবে। দেশের যে কোনও সচেতন মানুষের এটা বাধা দেয়া দরকার। গ্রামে গ্রামে গর্ত খুঁড়ে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল টানা হবে এই শতাব্দীতে এসে। এর চেয়ে হাস্যকর প্রকল্প আর কিছু হতে পারে না। যে পর্যন্ত লাইন করা আছে তারপর যেই অংশ নেই সেখানে ওয়্যারলেস বা ওয়াইফাই ইন্টারনেট স্থাপন করা উচিত। এটিকেই বিশ্বে বলা হচ্ছে নেক্সট জেনারেশন প্রকল্প। গ্রামে বরং ওয়্যারলেস বা ওয়াইফাই ভালো কাজ করবে। কারণ বড় দালান-কোঠা নেই। ব্রডব্যান্ড হবে না কেন? হবে, তবে হওয়াতে হবে এবং এর জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ব্রডব্যান্ড নিয়ে নীতি নির্ধারণে যারা আছেন তারা 'বায়াসড' এবং 'মোবাইল অপারেটরদের দ্বারা প্রভাবিত।' এর থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।

বাংলা ট্রিবিউন: ইন্টারনেট ব্যবহার এখন সুযোগ নয়, অধিকার। সবার জন্য ব্রডব্যান্ড নিশ্চিত করা না গেলে কি অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে?

রেজা সেলিম: অবশ্যই সবার জন্য ব্রডব্যান্ড নিশ্চিত করা না গেলে 'অধিকার' প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। সরকার বা এর সঙ্গে জড়িত যারা ব্রডব্যান্ড অধিকার নিশ্চিত করবেন তারা যতদিন এই বিষয়টি না বুঝবেন ততদিন পর্যন্ত এটি নিশ্চিত হবে না। দেশে যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তারা নিজেরাও এই অধিকার প্রাপ্তির অংশ। সরকার মানে কিন্তু বড় কোনও পাহাড় নয়, আমাদের মতো কিছু মানুষের প্রতিনিধিত্বের সমন্বয়ে গঠিত। ওনারাও এই অধিকারের অংশ। সেই অধিকাররের অংশ হিসেবে দেশ-বিদেশে চুক্তি করা হয়। কারণ এটা আমাদেরও অধিকার। পৃথিবীর ৫০টি দেশ মিলে একদিন মিটিং করে বলতে পারবে না যে বাংলাদেশকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেব না। তার মানে এটা বাংলাদেশের অধিকার। বাংলাদেশের যদি এটা অধিকার হয় তাহলে দেশের প্রতিটা নাগরিকের অধিকার আছে এতে। এজন্য দেশের সর্বশেষ পর্যায় পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড পৌঁছানো সরকারের দায়িত্ব। এইখানে কোন আপস নেই।


থ্রিজি এই দেশে খুব বড় পরিবর্তন ঘটাবে না। থ্রিজি মানে একটা স্মার্টফোন লাগবে এবং এক্ষেত্রে স্মার্টফোনের ব্যবসা বাড়ছে। স্মার্টফোনে থ্রিজি, ফোরজি ব্যবহার করবেন আপনি সিটিজেন সার্ভিস পাওয়ার জন্য। আপনি কোথাও গিয়ে কোনও স্থান, স্থাপনা, রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাচ্ছেন না তা দেখতে দ্রুত স্মার্টফোন থেকে সেবা নিতে পারেন। নিত্যদিন ব্যক্তিগত কাজের জন্য আসলে থ্রিজি, ফোরজি। যে কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় এই সেবা অনেক জনপ্রিয়। এসব উন্নত দেশে যারা থ্রিজি-ফোরজি ব্যবহার করেন তাদের প্রত্যেকের অফিসে বা বাসায় ব্রডব্যান্ড সংযোগ আছে। এই থ্রিজি অফিসেও কোনও কাজে লাগে না। কারণ অফিসে বা ঘরে এসে কাজ করার জন্য তারা ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করেন

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি টেলিমেডিসিনের প্রতি এতো আগ্রহী হলেন কেন?

রেজা সেলিম: আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট (আইসিটি ফর ডি) যেহেতু আমার মূল অনুপ্রেরণা ফলে আইটিকে হাতে রেখে আমি চিন্তা করেছি আইটি এনাবল সার্ভিস দেওয়ার। মানে আইটি ব্যবহার করে কী কী সার্ভিস আমরা দিতে পারি। এসব সার্ভিসের মধ্যে একটি হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া এবং যেহেতু হেলথ কমিউনিকেশনে আমার পড়াশুনা এবং কাজের অভিজ্ঞতা আছে সেজন্য এই ইস্যুটাকে গুরুত্ব দিই বিশেষ করে 'নন কমিউনিকেবল ডিজিজ'। কারণ আমাদের প্রইমারি হেলথ কেয়ার নিশ্চিত হওয়ার ফলে গড় আয়ু বেড়েছে। যখন গড় আয়ু বাড়বে তখন 'নন কমিউনিকেবল ডিজিজ' বেশি হবে যেমন- হার্ট, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, কিডনি সমস্যা ইত্যাদি। এজন্য এই জায়গাটিকে আমরা ফোকাস করতে চেয়েছি। দেশে এসব রোগের যেহেতু বড় ইনস্টিটিউট, গবেষণা ও পড়াশনা নেই এজন্য এই সেক্টরে কিভাবে দ্রুত উপকার করা যায় ও সাপোর্ট দেওয়া যায় সেটি আমাদের বিবেচনায় ছিল।

টেলিমেডিসিন বিষয়ে দেশে এক সময় হুজুগ তোলা হয় যে কম্পিউটার ট্রেনিং দিয়ে ডাটা এন্ট্রি কাজে অনেক মানুষকে বিদেশ পাঠিয়ে দেব। এগুলো আসলে অবাস্তব কথাবার্তা। আমরা সবসময় এসবের প্রতিবাদ করেছি। এই প্রতিবাদের সঙ্গে সবসময় কাদের ভাই ও মোস্তান ভাইদের পাশে পেয়েছি। আমি তাদের দু'জনের কাছে কৃতজ্ঞ। কোন সেবাটা আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সঠিকভাবে দিতে পারব এসব না জেনেই কিন্ত আমরা শুরু করে দিই, এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে মোবাইল অপারেটররা। তারা এমন এমন সব সেবা গ্রাহকদের সামনে হাজির করে তা প্রতারণার সামিল। যেমন গ্রামীণ ফোন '৭৮৯ নম্বরে' স্বাস্থ্য সেবা চালু করে। এতে ডায়াল করলে ২৫ টাকা কাটা হয় কিন্ত এখন তার কোনও খবর আছে? সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যগত ত্রুটির সরলতার সুযোগ নিয়ে এটি করা হয়েছে শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের জন্য আর কিছু নয়।

সরকার একবার ঘোষণা দিল যে, ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেবে যদিও তার কোনও নীতি তৈরিই হয়নি। দেশে ই-হেলথ পলিসি বলে কিছু নেই। ডাক্তার যখন রোগী দেখে তখন তার নাড়ি ও রক্তচাপ পরীক্ষা করে। এটি হচ্ছে একটা ইথিক্যাল ইস্যু। কিন্ত যখন বলা হয় আমরা ঢাকা থেকে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেব, টেলিমেডিসিন চালু করব তখন এই ইথিক্যাল ইস্যুটা কীভাবে সমাধান করবেন তা আগে ঠিক করতে হবে। তাহলে আগে প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক লাগবে যে রিমোট এলাকায় বসে ডাক্তারের কাজটি নিশ্চিত করবে। এজন্য সরকারের আইন বানাতে হবে। আবার রোগীর প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট যখন অনলাইনে ডাক্তারের কাছে পাঠানো হবে এবং এসব দেখে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে তখন এর প্রাইভেসি কীভাবে রক্ষা হবে এই বিষয়ে কোন আইন বা পলিসি আমাদের নেই। আমরা কী পারব আমেরিকা, সিঙ্গাপুর বা উন্নত দেশের কোনও হাসপাতাল থেকে রোগীর কোনও ব্যক্তিগত তথ্য বা ইমেজ আনতে? কখনোই পারব না। তাহলে আপনার ডাটা কেন আরেকজনের কাছে পাঠাবেন। যতক্ষণ প্রাইভেসি নিশ্চিত না হবে ততক্ষণ আপনি এই সেবা দিতে পারবেন না। ই-হেলথ সেক্টরে এরকম অনেকগুলো ইস্যু আছে। যেগুলোর আগে আরঅ্যান্ডডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) করতে হয়। আমরা যদি সেগুলো আগে করতাম তাহলে বিষয়গুলো জানতাম এবং জেনে কথা বলতাম। টেলিমেডিসিনে আসার পেছনে আমার এই বিষয়গুলো কাজ করেছে। কোন কোন সাইডে আমাদের দুর্বলতা ও সমস্যা আছে তা বের করা এবং কত দ্রুত আমরা স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারি তা বের করা আমাদের বিবেচনায় ছিল।

বাংলা ট্রিবিউন: শহর বাদ দিয়ে বিশেষ করে গ্রামের মানুষের জন্য স্তন ক্যান্সার নিয়ে কাজ করছেন। সাড়া কেমন পাচ্ছেন যেখানে গ্রামের নারীরা এখনও পর্দার আড়ালে বা অন্তঃপুরের বাসিন্দা?

রেজা সেলিম: এটা ঠিক যে, কাজটা কিছুটা কঠিন। তবে এই সেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কমিউনিকেশন স্কিল। আমাদের সুবিধা হলো- আমাদের গ্রামে যারা কাজ করে তারা ওদের গ্রামের জন্যই কাজ করে। ফলে কর্মীদের ওই গ্রামের মা-বোনদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে। মা-বোনেরা মনে করেন নিজের গ্রামের এইসব ছেলে-মেয়ে আমাদের কোনও ক্ষতি করবে না, খারাপ পরামর্শ দেবে না, ভুল শিক্ষা দেবে না। আমাদের মোবাইল অ্যাপ আছে। মানুষের কাছে যাওয়ার সময় আমরা একটা অ্যাপ নিয়ে যাই, রোগীর কাছে অনেক প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয়, কিছু মোটিভেশনাল ভিডিও দেখানো হয়। মহিলারা নিজেরাই তখন উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের পরীক্ষা কেন্দ্রে আসে। ফলে এই বাধাগুলো কেটে গেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে একেবারে ব্যতিক্রম একটি মেলা 'জ্ঞানমেলা'। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর। জ্ঞানমেলা নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

রেজা সেলিম: 'আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট' এটিই ছিল আমাদের প্রধান মোটিভেশন। অনেক মানুষকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে প্রথমে আমরা রামপালকে (বাগেরহাটের একটি উপজেলা) বেছে নিয়েছিলাম কাজের জন্য। এখানকার স্কুলগুলোতে কম্পিউার দিয়েছি, ল্যাব তৈরি এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও দিয়েছি। শিক্ষার্থীসহ গ্রামের মানুষদের আমরা কম্পিউটারের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছি। আমরা আইসিটিতে সামাজিক গণজাগরণ তৈরি করেছিলাম।

২০০১-০২ সালের দিকে আমাদের কর্মীরা ভ্যানে কম্পিউটার নিয়ে গ্রামের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মাইকিং করে সাধারণ মানুষদের দেখাত। আবার কম্পিউটার ভ্যান স্কুলের পাশে আচার বা ঝালমুড়ির দোকানের পাশে থাকতো। ফলে উৎসুক শিক্ষার্থীরা এসে কম্পিউটার দেখতো কিন্তু ভয়ে হাত দিত না। আমরা একটা কর্মসূচি করি, 'সবার জন্য কম্পিউটার'। কেউই কম্পিউটারের বাইরে থাকবে না, সবাই কম্পিউটার ব্যবহার করবে। আমাদের প্রধান উদ্যেশ্য ছিল 'ই-রেডিনেস'। আমরা যখন বুঝতে পারছি যে- আগামী ৫০ বছর পর দুনিয়া এমন থাকবে না আর তার জন্য যদি জনসাধারণকে এর জন্য প্রস্তুত না করা হয় তাহলে আমরা পিছিয়ে পড়ব। আরেকটা চিন্তা ছিল আমাদের, যারা প্রবাসে আছেন তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি এগিয়ে থাকেন। তাদেরকে আমরা অনুরোধ করতাম, আপনারা বলেন আপনাদের অভিজ্ঞতার কথা। আবার গ্রামের মানুষ যা জানেন তাদের চেয়ে অনেক বেশি জানেন শহরের মানুষ এমন দাবি করা হয়। আমরা শহরের মানুষদের বললাম আপনারা কী বেশি জানেন, কতটা জানেন তা গ্রামের মানুষের কাছে বলেন আর গ্রামের মানুষ কী জানে তা শোনেন। এই রকম একটা চিন্তা থেকে আমরা মেলার আয়োজন করলাম।

২০০৪ সালে এই মেলা সোশ্যাল মবিলাইজেশনের উদেশ্যে কোনও রকম প্রচার ছাড়াই আমরা আয়োজন করি। গ্রামের মানুষ, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গায়ক, শিল্পী, লেখক-কবিসহ সব ধরনের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় জ্ঞানমেলা।

মেলা মানে বাঙালির প্রাণের উৎসব। এখানে মুড়ি-মুড়কি, মিষ্টি-মোয়া থেকে শুরু করে নাগরদোলা সবই থাকে। পার্থক্য হলো জ্ঞানমেলায় নাগরদোলায় চড়ার সময় আমাদের কর্মীরা আগতদের নাগরদোলার ইতিহাস বর্ণনা করে। মেলায় রামপালের স্কুলগুলো অংশ নেয়। প্রতিটি স্কুলের ওয়েবসাইট আছে। এসব সাইটে স্কুলের ইতিহাস, প্রতিষ্ঠাতা, দাতা, সাবেক শিক্ষার্থীসহ নানা তথ্য পাওয়া যায়। এসব করার মানে হচ্ছে জ্ঞানটাকে উৎসাহিত করা। মেলায় রচনা লেখা, ছবি আঁকা, আন্তঃগ্রাম দাবা-ক্যারাম প্রতিযোগিতা হয়। আমরা মেলায় ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। ঢাকা থেকে অনেক মানুষ জ্ঞানমেলায় গেছেন এমন কি বহু দেশের রাষ্ট্রদূতরাও মেলায় গেছেন। আমরা অষ্টমবারের মতো মেলা করেছি। রাজনৈতিক অস্থিরতায় গত বছর করতে পারিনি। আশা করি অচিরেই মেলা হবে। এখন ঈদের সময় যাতায়াত ব্যবস্থার সমস্যার জন্য অনেকে যারা বাড়ি যান না তারা জ্ঞানমেলার সময় যায়। ওই এলাকার অনেক মেয়েরা বাপের বাড়ি যায় জ্ঞানমেলার সময়।

আমি তো মনে করি ডিজিটাল বৈষম্য কালকেই দূর হয়ে যেতে পারে যদি আমরা সবাই কাজ করি। আমাদের উদেশ্য ছিল একটা গ্রামে ডিজিটাল বৈষম্য দূর হলে আরেকটা গ্রাম উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করবে। এভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে গেলে কোন বৈষম্য থাকবে না। এটি খুবই কম খরচে এবং সহজে করা যায়। ওয়াই-ফাই দিতে খুব বেশি টাকা খরচ হয় না। গ্রামে আমরা টাওয়ারে সোলার প্যানেল ব্যবহার করি। আপনি যদি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন তাহলে গ্রামের মানুষই খরচ করবে এই খাতে। আমরা যেসব স্থানে ওয়াই-ফাই দিয়েছি সেখানে মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। অনেক ভালো গতির ইন্টারনেট পাচ্ছে তারা।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি ডিজিটাল বৈষম্য নিরসনেও কাজ করছেন। রামপালের গ্রামে গ্রামে ওয়াই-ফাই সংযোগ চালু করেছেন। সবাই এভাবে চেষ্টা করলে কবে নাগাদ এই বৈষম্য দূর হবে?

রেজা সেলিম: আমি তো মনে করি ডিজিটাল বৈষম্য কালকেই দূর হয়ে যেতে পারে যদি আমরা সবাই কাজ করি। আমাদের উদেশ্য ছিল একটা গ্রামে ডিজিটাল বৈষম্য দূর হলে আরেকটা গ্রাম উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করবে। এভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে গেলে কোন বৈষম্য থাকবে না। এটি খুবই কম খরচে এবং সহজে করা যায়। ওয়াই-ফাই দিতে খুব বেশি টাকা খরচ হয় না। গ্রামে আমরা টাওয়ারে সোলার প্যানেল ব্যবহার করি। আপনি যদি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন তাহলে গ্রামের মানুষই খরচ করবে এই খাতে। আমরা যেসব স্থানে ওয়াই-ফাই দিয়েছি সেখানে মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। অনেক ভালো গতির ইন্টারনেট পাচ্ছে তারা।

বাংলা ট্রিবিউন: কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন আপনি?

রেজা সেলিম: দূরের কোনও স্বপ্ন আমি দেখি না। আমি সব সময় বর্তমানের স্বপ্নের মধ্যেই থাকি। এখনও আমার স্বপ্নটা বিদ্যমান আছে। পৃথিবীর প্রায় ৪০-৫০টি দেশে আমি গিয়েছি এবং ১০টির মত দেশে আমি কাজ করেছি। বাংলাদেশের মতো এত ভালো দেশ পৃথিবীর আর কোথাও নেই।

এখন আমি আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশের সঙ্গে কাজ করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই দেশের মতো ভালো দেশ আর কোথাও নেই। বাংলাদেশের মানুষের মতো ভালো মানুষ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এই দেশের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর কোথাও নেই। এই দেশের মানুষের যে প্রাণ প্রাচুর্য ও সঙ্গীতময় মনোভাব তা পৃথিবীর আর কোথাও এতো সমৃদ্ধ নয়। আমাদের শুধু অল্প কিছু মানুষ খারাপ আছে কিন্ত বেশিরভাগ মানুষই ভালো। এই অল্প কিছু মানুষ খারাপ হলেও এরা বেশি দিন খারাপ থাকতে পারবে না।

আমার স্বপ্ন ওই বাংলাদেশটাই, যে দেশটা সব সময় সুন্দর, প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রেম ইত্যাদি নিয়েই চিরকালের বাংলাদেশ হয়ে থাকবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

রেজা সেলিম: বাংলা ট্রিবিউনকেও অনেক ধন্যবাদ।

শ্রুতিলিখন: সোহেল রানা

ছবি সাজ্জাদ হোসেন

/এইচএএইচ/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।