রাত ১১:০৯ ; রবিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৮  

এসকাইলাসের প্রমিথিউস বাউন্ড

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[এসকাইলাসের প্রমিথিউস বাউন্ড  বিশ্ব নাটকের ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছে সমহিমায়। বলা যায়, এই নাটকের মাধ্যমেই দেবতা-স্তুতির বাইরে মর্তের মানুষই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যার প্রভাব শেলী, বায়রন, গ্যাটেও এড়াতে পারেননি। আনুমানিক ৪৩০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে এর প্রথম মঞ্চায়ন হলেও সাহিত্যে এর প্রাসঙ্গিকতা আজও উজ্জ্বল। এই নাটক ও নাট্যকার সম্পর্কে লিখেছেন মুম রহমান
 

চরিত্র 
শক্তির দেবতা। হিফাস্টাস (অগ্নির দেবতা)। প্রমিথিউস। ওসিয়ানাসের কন্যারা ও কোরাসদল। ওসিনিয়াস। আইও। হার্মিস। 


কাহিনী
এই নাটকের মূল ঘটনা গড়ে উঠেছে প্রমিথিউসকে কেন্দ্র করে। কাহিনী ও ভাবনার দিক থেকে এ নাটক সরল, একরৈখিক কিন্তু শক্তিশালী। দেবতা হয়েও প্রমিথিউস দেবরাজ জিউসের ভাণ্ডার থেকে আগুন চুরি করে আনে এবং মানুষকে সেই আগুনের ব্যবহার শেখায়। এই অপরাধে তাকে সমুদ্রের ধারে এক পাহাড়ে শৃঙ্খলিত রাখা হয়। পাতালের নির্জন এই কোণে সাধারণ কোন মানুষ বা প্রাণী আসতে পারে না। দেবরাজ জিউসের প্রেমের শিকার সুন্দরী আইও এখানে আসে বিলাপ করতে। জিউস পত্নীর ক্ষোভের কারণে সেও আজ শাস্তিভোগ করছে। কিন্তু বন্দী প্রমিথিউস কিছুতেই নতি স্বীকার করে না। সে ভবিষ্যত দেখতে পায়। সে ঘোষণা দেয়, অত্যাচারী জিউসের পতন হবে জিউসেরই এক পুত্রের হাতে। কিন্তু কোন পুত্রের হাতে তা বলে না। জিউস এই তথ্য জানতে হার্মিসকে পাঠায়। কিন্তু প্রমিথিউস তাকে কিছুতেই সহায়তা করে না। ক্ষুব্ধ হার্মিস জানিয়ে দেয়, এতে প্রমিথিউসের শাস্তি আরও বাড়বে। প্রতিদিন জিউসের পাঠানো ঈগল-শকুন এসে বন্দী প্রমিথিউসের যকৃৎ ছিঁড়ে খাবে, এইভাবে অত্যাচার চলবে সারাদিন। আবার রাতের বেলা প্রমিথিউস সুস্থ হয়ে উঠবে, পরের দিনের অত্যাচার সহ্য করার জন্যে। এইভাবেই চলবে দিনের পর দিন। কিন্তু প্রমিথিউস তবুও হার মানে না, সে সব শাস্তির জন্যে তৈরি আছে বলে। হার্মিস কোরাস দলকে চলে যেতে বলে, প্রমিথিউসের প্রতি সহানুভূতি তাদেরও বিপদ ফেলতে পারে। কিন্তু কোরাস দল প্রমিথিউসের দুঃখের সঙ্গী হতে চায়। জিউসের আদেশে বর্জ্র-বিদ্যুৎ নেমে আসে। ছিন্নভিন্ন পাথর আঘাত হানতে থাকে প্রমিথিউসকে। বন্দী প্রমিথিউস তবুও তার প্রতিবাদী সিদ্ধান্তে অটল।

নাট্যকার 
ইউফোরিয়নের পুত্র স্কাইলাস ৫২৫ খ্রীস্ট-পূর্বাব্দে এলুইসিসে জন্মগ্রহণ করেন। অভিজাত পরিবারের সন্তান এসকাইলাসের নাট্যকার হওয়ার গল্পটি বেশ আকর্ষণীয়। ট্র্যাজেডির জনক বলে পরিচিত এসকাইলাল যৌবনে একটি আঙুরবাগানে কাজ নেন। গ্রীক পুরাণমতে আঙুরের রস ও সুরার দেবতা দিওনিসাসকে ঘিরে গ্রীক ট্র্যাজেডি উৎসবের আয়োজন করা হয়। এসকাইলাসের নিজ ভাষ্যমতে এক দুপুরে আঙুর বাগান দেখতে দেখতে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন, আর তখুনি স্বয়ং দেবতা দিওনিসাস তার সামনে এসে হাজির হন এবং আদেশ করেন ট্র্যাজিডি রচনায় আত্ম-নিয়োগ করতে। তারপর থেকেই তিনি নাট্যকার হন। ২৬ বছর বয়সে প্রথম তিনি দিওনিসাস উৎসবে ট্র্যাজেডি রচনা করে জমা দেন, কিন্তু এরও ১৫ বছর পরে এসে তিনি প্রথম পুরস্কার পান। নাট্য রচনার পাশাপাশি তিনি একজন যোদ্ধাও ছিলেন। ম্যারাথন, আর্তেমেসিয়াম, সালামিস এবং প্লাতা’র যুদ্ধে তিনি অংশ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু নিজেকে নাট্যকার হিসাবে পরিচয় দিতেই তিনি ভালোবাসতেন। তার নাটকে অবশ্য সামরিক শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। 
গ্রীক নাটকের সামগ্রিক উন্নতিতে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তিনি গ্রীক নাটকের কোরাসের অংশকে আকারে ছোট করেন এবং নাটকে দ্বিতীয় অভিনেতার সংযোজন করেন, এতে করে নাটকে সংলাপের প্রাধান্য ও নাটকীয়তা বেড়ে যায়। দর্শক সম্মুখে রক্তপাত বা নৃশংস কোন দৃশ্যায়ন দেখানো বন্ধ করেন তিনি। তিনি অভিনেতার পোশাক এবং মুখোশের উন্নতি ঘটান। কথুরনার্স নামে এক ধরণের জুতা আবিষ্কার করেন যা অভিনেতার উচ্চতাকে বাড়িয়ে দেয়। তিনি প্রতিযোগিতার জন্যে ট্রিলোজির অবস্থানও প্রতিষ্ঠিত করেন। ট্রিলোজি হলো আলাদা করে তিনটি নাটক, যে তিনটি নাটক সম্মিলিতভাবে আবার একটি সামগ্রিক ঘটনা বা ভাবনার প্রকাশ ঘটায়। কিন্তু এই মহান কবি-নাট্যকারের শেষদিনগুলি খুব একটা ভালো কাটেনি। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি প্রিয় এথেন্স থেকে দূরে সিসিলিতে কাটিয়েছেন। সেখানে অবশ্য তার পার্সিয়া, উইম্যান অব এথেনা নাটকগুলো একাধিকবার রাজ সভায় বিশেষ অনুরোধে মঞ্চস্থ হয়েছে। তার জীবনের অন্যতম সেরা ট্রিলোজি অরেস্টিয়ান ট্রিলোজি (এগামেনন, দ্য খিয়োফেরাই, দ্য ইউমেনেদাইস) রচনা করে তিনি এথেন্সে ফিরে আসেন। কিন্তু এই ট্রিলোজির শেষ খণ্ড ইউমেনেদাইস নাটকে আভিজাত্যের তীব্র প্রকাশ এথেন্সের দর্শকদের ক্ষুব্ধ করে। এমনকি দর্শকরা তাকে হত্যার হুমকিও দেয়। এ নাটকে ধর্ম সম্পর্কে তার মতামতের কারণেও তিনি সমালোচিত হন। ব্যথিত ইসকাইলাস সিসিলিতে ফিরে আসেন এবং সেখানেই মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যু নিয়েও অনেক আজগুবি গল্প প্রচলিত আছে। যেমন একটি গল্পে বলা আছে, একটি ঈগল মুখে করে একটি কচ্ছপ নিয়ে যাচ্ছিলো, নিচে এসকাইলাসের টাক মাথা দেখে সেটিকে পাথর ভাবে এবং কচ্ছপের খোলটি তার মাথায় ফেললে তার মৃত্যু হয়। এই ধরণের আজগুবি গল্প সমালোচকদের মতে স্রেফ জনরোষের প্রকাশ আর ট্র্যাজিডির রাজার এই ট্র্যাজিক পরিণতিও যেন নেমেসিসের খেলা। গ্রীক ট্র্যাজেডির শেকসপিয়র বলে পরিচিত এই নাট্যকারের কথা আমরা পাই এরিস্টোফানিসের ফ্রগস নাটকে। এই নাটকে এসকাইলসকে গর্বিত, জেদি, উদ্ধত, আবেগী, প্রতিভাবান, মহান যোদ্ধা এবং উচ্চ ভাষা ক্ষমতা সম্পন্ন কবি হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। 

শকুন খুবলে খাচ্ছে প্রমিথিউসকে

প্রেক্ষাপট, প্রযোজনা ও অন্যান্য
প্রমিথিউস বাউন্ডকে একটা ট্রিলোজির দ্বিতীয় নাটক বলে ধারণা করা হয়। ট্রিলোজির প্রথমটির নাম ছিলো প্রমিথিউস দ্য ফায়ার-ব্রিঙ্গার এবং শেষটির নাম প্রমিথিউস আনবাউন্ড। উল্লেখ্য এই দুটি নাটকই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। প্রমিথিউস নাটকের রচনাকাল সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক সমালোচক এর রচনারীতি লক্ষ্য করে একে সেপ্টেম বা সেভেন এগেইনস্ট দ্য থেবাই এর পরবর্তী রচনা বলেছেন। 
গ্রীক নাটকের ইতিহাসে প্রমিথিউস বাউন্ড  বিস্ময়কর এক প্রতিবাদ। এই নাটকেই প্রথম মানবতার জয়গান গাওয়া হয়। মানুষকে সভ্য করতে দেবতা প্রমিথিউস আগুন চুরি করে আনে, মানুষের প্রতি দরদের কারণেই সে ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করে— এমন কাহিনী, চিন্তা-ধারা ইতোপূর্বে গ্রীক নাটকে দেখা যায়নি। এসকাইলাস যখন এ নাটক রচনা করেন তখন সব নাট্যকাররাই দেবতা বন্দনায় মগ্ন। সেখানে এসকাইলস স্বয়ং দেবরাজ জিউসকে স্বৈরাচারী, অত্যাচারী দেবতা হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। সমালোচকদের ধারণা এই নাটকে দেবতার এমন চরিত্রায়ণ নিশ্চয়ই এথেন্সবাসীকে ক্ষুব্ধ করেছিলো, এবং হয়তো ট্রিলোজির বাকী দুটি নাটকে জিউসের চরিত্রকে যৌক্তিক ও যথার্থভাবে দেখানো হয়েছে। গ্রীক ধর্ম মতে, দেবতা জিউস সব কিছুর উর্ধ্বে এবং দেব-দেবীতে বিশ্বাসী গ্রীকদের জন্যে এ নাটক এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম। শুধু গ্রীক নাটকেই নয়, বিশ্ব নাটকে এমন মানবতাবাদী মহৎ নাটকের উদাহরণ দূর্লভ। মানুষের জন্যে দেবতার কষ্টভোগের এই ধারণাকে পরবর্তীতে যিশুর বেদনাভারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আধুনিক যুগে প্রমিথিউসের এই গল্প ভীষণভাবে জনপ্রিয়। ইংরেজ কবি শেলি এই গল্প দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রচনা করেন প্রমিথিউস আনবাউন্ড । আরেক ইংরেজ কবি বায়রন প্রমিথিউসকে নিয়ে একাধিক গীতিকবিতা লিখেছেন, শুধু তাই নয়, তিনি দাবী করেছেন প্রমিথিউস বাউন্ড  তার সকল লেখার প্রেরণার মূল উৎস। মহাকবি গ্যাটেও এসকাইলাসের প্রমিথিউস নিয়ে নাটক রচনা শুরু করেছিলেন। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।