সকাল ১০:৩৬ ; রবিবার ;  ২১ এপ্রিল, ২০১৯  

দুই ভাইয়ের গুগলযাত্রা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ফৌজিয়া সুলতানা॥

'কোনও কিছু পারতে হলে আগে সেটা জানতে হবে। ভালো করে বিষয়টা বা কাজটা বোঝার কোনও বিকল্প নেই। শুরুতে কঠিন মনে হলেও মনের একান্ত ইচ্ছাটার পিছু লেগে থাকতে হবে। এক সময় কঠিন কাজও সহজ মনে হবে।' সম্প্রতি গুগল পরিবারের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নগীব মেশকাত এভাবেই জানালেন তার একান্ত নীতির কথা। গুগলে তার সহযাত্রী ও সহোদর সাকিব শাফায়াতও স্বীকার করে নিলেন সাফাল্যের গোপন চাবিকাঠি এটাই। 'আগে থেকেই ঠিক করে নিতে হবে আপনি কী হতে চান, কী করতে চান। ইচ্ছাটাই আসল। তারপর ইচ্ছাটার পেছনে লেগে থাকতে হবে। কঠিন কোনও কাজ না এটা।'

এ বছর গুগলে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পাওয়া সাত বাংলাদেশির মধ্যে রয়েছেন একই পরিবারের দুই সদস্য। আপন দুই ভাই নগীব ও সাকিব। দুই বছরের বড় ছোট। কিন্তু খেলাধুলা, লেখাপড়া এবং এখন চাকরিও একসঙ্গে।

দুই ভাইয়ের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সবই এক। প্রথমে ঢাকার উদয়ন স্কুল, পরে ঢাকা কলেজ ও স্নাতক পর্যায়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। পার্থক্য শুধু এই, নগীব দুই বছর এগিয়ে আর সাকিব তার পিছু পিছু। নগীব এসএসসি পাস করেন ২০০৫ সালে, আর সাকিব ২০০৭ সালে। বুয়েটে দুজনেই পড়েছেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিষয়ে।

যেভাবে গুগলে-

নগীব জানালেন, ফোর্থ ইয়ারে ডিপার্টমেন্টের এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছিলাম গুগলে কিভাবে অ্যাপ্লাই করা যায়। এর আগে এ ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। খোঁজ নিয়ে এরপর জানতে শুরু করলাম গুগল, ফেসবুক এরকম বড় কোম্পানিগুলো কীভাবে লোক নেয়।

গুগল এর আগে বাংলাদেশে ক্যাম্পাস রিক্রুটিং পদ্ধতিতে কর্মী নিয়েছে। এই প্রথম অনলাইন কনটেস্টের মধ্য দিয়ে লোক নেওয়া হলো। যেসব প্রবলেম দেওয়া ছিল সেগুলোর সমাধান করতে হয়েছে। কোডজ্যাম নামের এই অনলাইন রাউন্ডে যারা ভালো করেছে তাদের ভাইভায় ডাকা হয়েছে।

বাংলাদেশে ভাইভাও নেওয়া হলো এবার প্রথম। এবারই প্রথম বাংলাদেশে ভাইভা নেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের ভাইভা হতো ভারত বা সুইজারল্যান্ডে।

২০১৫ সালে স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি শেষ হবে এমন শিক্ষার্থীদের এবার ফ্রেশার হিসেবে নিয়োগ দিতে চেয়েছে গুগল। প্রথমবারের মতো অ্যাপ্লাই করেই গুগলে নিয়োগ পেয়ে গেছেন সাকিব। নগীব নির্বাচিত হয়েছেন তৃতীয়বারে।

আগে থেকেই ছিল প্রস্তুতি-

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নিয়ে কাজ করার আগ্রহ অনেক আগে থেকেই ছিল বলে জানান সাকিব। তিনি বলেন, 'ছোটবেলা থেকেই ম্যাথ খুব ভালো লাগতো। খুব মজা নিয়ে অঙ্ক করতাম, অঙ্কের জটিলতাগুলো বুঝতে চাইতাম। স্কুলে অন্য বিষয়গুলোতে অত ভালো করতাম না। কিন্তু অঙ্কে অনেক নম্বর পেতাম। যে কোনও ম্যাথ ক্যাম্প বা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম।'

সাকিব বলেন, 'আমি বা ভাইয়া যখন বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দেই তখন তড়িৎ প্রকৌশলে ভর্তির চাহিদা ছিল বেশি। এই বিভাগে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় নম্বরও আমাদের ছিল। কিন্তু ভাইয়া ও আমি আমরা দুজনেরই ইচ্ছা করেই সিইসি নিয়েছি।'

সাকিব স্কুল পর্যায় থেকেই গণিত অলিম্পিয়াড ও এ ধরনের অন্য প্রতিযোগিতাগুলোয় অংশ নেন। গণিত অলিম্পিয়াডে ঢাকা বিভাগে পাঁচ বার ও জাতীয় পর্যায়ে একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সাকিব। ২০১০ সালে কানাডায় ইন্টারন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে অংশ নেন তিনি।

২০১২ সালে অংশ নিয়েছিলেন গুগল অনলাইন কনটেস্টে। স্থান হয়েছিল বিশ্বের সেরা ১০০০ জনের মধ্যে। বাংলাদেশে হয়েছিলেন প্রথম। ২০১৪ সালেও এই কনটেস্টে বিশ্বের সেরা এক হাজারের মধ্যে ছিলেন তিনি।

নগীব বলেন, 'সাকিব আমার আগে থেকেই কনটেস্টে, অলিম্পিয়াডে, বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে অংশ নিতো। ওর কাছ থেকেই আমি এ ব্যাপারে বেশি উৎসাহ পেয়েছি।'

'সবসময় ক্রিয়েটিভ কিছু করার ইচ্ছা ছিল। ম্যাথ-ফিজিক্সে পড়ার আগ্রহ ছিল। সিএসইতে ভর্তির পর বেসিক বিষয়গুলো বুঝে পড়ার চেষ্টা ছিল। ভালো করে বিষয়গুলো আয়ত্বে আনতে চেয়েছি। আসলে নম্বর পাওয়া বা রেজাল্ট ভালো করার চেয়ে পড়ার বিষয়গুলো ভালো করে বুঝতে পারাটাই বেশি জরুরি। মুখস্ত করার প্রবণতা ছাড়তে হবে।'

নগীব জানান, এখন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং অনলাইনে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সংক্রান্ত অনেক ধরনের কনটেস্ট হয়। এগুলোতে অংশ নেওয়া যায়। কনটেস্টগুলো শুরুতে কঠিন মনে হলেও অংশ নিতে নিতে সহজ লাগে। ধীরে ধীরে প্রোগ্রামিংয়ের ওপর দখল বাড়বে।

এখন প্রতিবছরই ACM ICDC কনটেস্ট হয় এবং সেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ের দক্ষ প্রোগ্রামারদের বের করে আনার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান নগীব। তিনি আরও জানান, অনলাইন কনটেস্টগুলোর মধ্য দিয়ে যেসব যোগ্য প্রোগ্রামার বের হয়ে আসে তাদের আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোও গুরুত্ব দিচ্ছে।

অন্য কোনও বিষয়ে লেখাপড়া করেও সফটওয়্যার প্রোগ্রামিং নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তারা। অনলাইনে এ ধরনের কাজ শেখার ও প্রোগ্রামিংয়ে অংশ নেওয়ার অনেক সুযোগ আছে। এখন দেশের অনেকগুলো সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রকৌশল নিয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। অন্য যে কোনও বিষয়ে পড়লেও অনলাইনে প্রোগ্রামিংয়ে কাজ করা যায়।

গুগলে গিয়ে-

সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পেলেও গুগলে গিয়ে আসলে কী করতে হবে- তা এখনও জানেন না সাকিব-নগীব।

তারা জানান, গুগলে আলাদা আলাদা হরেক রকমের প্রজেক্টে কাজ হয়। তারা জয়েন করবেন ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলের প্রধান কার্যালয়ে। তবে সাত বাংলাদেশির কে কোন প্রজেক্টে কাজ করবেন তা ঠিক করা হবে জয়েন করার পরে। হয়তো প্রজেক্ট ঠিক হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনও দেশে গিয়েও কাজ করতে হতে পারে। আর গুগলে কতদিন কাজ করতে হবে, তারও কোনও সময় ধরাবাধা নেই।

ইন্টারনেট জায়ান্ট গুগলে কাজ করতে যাওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে নগীব জানান, 'এমন একটি জায়গায় কাজ করছি যেখান থেকে কোটি কোটি মানুষকে সেবা দেওয়া যায়, মানুষের জীবন ভালোর দিকে পাল্টে দেওয়া যায়, ভাবতেই ভালো লাগে। আমাদের দেশে দূর-প্রান্তরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ডিজিটালাইজ করার কথা আমরা বলি। কিন্তু এই সুবিধা দেওয়ার মতো অবকাঠামো বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আমাদের নেই। কিন্তু আমরা এমন একটা জায়গায় কাজের সুযোগ পেয়েছি যারা ইতোমধ্যেই এই সেবাগুলো দিয়ে যাচ্ছে। অনেক মানুষের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে কাজ করছে। তাই খুব ভালো লাগছে।'

সাকিব বলেন, 'এরকম কোনও জায়গায় কাজ করবো ভাবতাম আগে থেকেই। এখন তো সুযোগ পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। ওরা কীভাবে সারা বিশ্বে সেবা দিচ্ছে তা কাছ থেকে দেখতে পারবো। বাংলাদেশের জন্য কী করা যায় সেই ভাবনাটাও থাকবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কীভাবে এ ধরনের কাজের মান বাড়ানো যায় সেব্যাপারে কাজের চেষ্টা তো থাকবেই।'

পরিবারের উৎসাহ-

দুই সহোদরই জানান, পরিবার থেকে সর্বোচ্চ সমর্থন ও উৎসাহটাই পেয়েছেন তারা। কোনও বিষয়ে জোরজবরদস্তি ছিল না। লেখাপড়ার ব্যাপারে কোনও নির্দিষ্ট দিকে যাওয়ার চাপ ছিল না তাদের ওপর। 'কী পড়বো, কোন বিষয়ে পড়বো, কী করবো এসব ব্যাপারে কোন চাপ ছিল না। বরং আমাদের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে' বলেন দুজনেই। মা-বাবা দুজনেই পাশে থেকেছেন।

নগীব ও সাকিব দুইজনের তাদের ব্যক্তিগত জীবনও গুছিয়ে নিয়েছেন বেশ। নগীবের স্ত্রী মিমসা ইসলাম পেশায় চিকিৎসক। তাদের একটি ছেলেও আছে। আর সাকিবের স্ত্রী সাইদা আফরোজ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক।

/ এফএএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।