সন্ধ্যা ০৬:০৩ ; বুধবার ;  ২৬ জুন, ২০১৯  

বিডি সাইক্লিস্ট: দুই চাকায় করবে বাংলাদেশ জয়

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ঈষাণ শাহরিয়ার॥

ভিত্তরিও ডি সিকা'র 'বাইসাকেল থিভস' সিনেমাটার কথা মনে আছে? গল্পটা পিতা-পুত্র, আর একটা বাইসাইকেলের। পুত্রকে সাথে নিয়ে একজন বাবা হন্যে হয়ে তার চুরি যাওয়া বাইসাইকেলটা খুঁজে বেড়ায়। সাইকেলটা না খুঁজে পেলে তার যে চাকরিটাই থাকবে না, আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এত কষ্টে জোগানো চাকরিটা হাতছাড়া হয়ে গেলে যে না খেয়ে মরতে হবে!

সে তো গেল অনেকদিন আগের কথা। কিন্তু, আমাদের সাইক্লিস্টরা তো সাইকেল না থাকলে চাকরিও হারাচ্ছে না,আবার না খেতে পেয়ে মরছেও না, তাহলে তারা সাইকেল এত সাইকেল 'পাগল' কেন? সবার উত্তর একটাই- সাইক্লিং এর প্রতি ভালবাসা!

বিডি সাইক্লিস্টের অন্যতম সংগঠক আমিনুল শাফায়েত, ছবি: লতিফ হোসেন  

ভালবাসাটা কতটুকু গভীর হলে তারা শত ব্যাস্ততার মাঝেও সাইকেল চালানোর জন্যে প্রতিদিন কিছুটা হলেও সময় ঠিকই খুঁজে নেয়। কথা হচ্ছিল বাংলাদেশের প্রথম সংঘবদ্ধ সাইক্লিস্ট গ্রুপ ''বিডি সাইক্লিস্ট'' এর সদস্য আমিনুল হক শাফায়াত এর সঙ্গে। এটি পরিচালিত হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক দ্বারা। কিছুক্ষণ আগেই মাত্র স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সাইকেল র‍্যালি শেষ করে ফিরলেন। কিন্তু এতক্ষন সাইকেল চালানোর পরেও কোনও ক্লান্তির ছাপ নেই, বরং চোখেমুখে একটা আনন্দ আর তৃপ্তি খেলা করছে।

খুব আগ্রহ নিয়েই শোনালেন তাদের পথ চলার গল্প, 'চার-পাঁচ বছর আগে যখন আমরা অল্প কয়েকজন মিলে গ্রুপটা তৈরি করি, তখন একটা ইভেন্টে সাইক্লিস্ট হতো সর্বসাকুল্যে ১৫০-২০০ জন। আর আজকে তো নিজের চোখেই দেখলেন, প্রায় ২০০০ মানুষের বিশাল র‍্যালি। এটাই প্রমাণ করে সাইক্লিং এর জনপ্রিয়তা আজ কতখানি!'

বিজয় দিবসের র‍্যালিতে সাইক্লিস্টরা, ছবি: ইষাণ 

আসলেই তাই। ভোর সাতটা বাজতে না বাজতেই মানিক মিয়া এভিনিউ সাইক্লিস্টদের কোলাহলে মুখরিত। র‍্যালি শুরু হতে তখনও প্রায় এক ঘণ্টা। ছোট ছোট দলে, আবার কেউ বা একাই সাইকেল নিয়ে এসে মিশে যাচ্ছে বড় দলটার সাথে। কেউ মাথায় বেঁধেছে লাল সবুজের পতাকা, আবার কারও সাইকেলের সঙ্গে বাঁধা পতাকাটা উড়ছে পতপত করে। কেউ হয়ত হাত অথবা মুখ রাঙিয়ে নিচ্ছে লাল-সবুজের আঁচড়ে।

'স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনভাবে রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে স্বাধীনতা উপভোগ করার চেয়ে আনন্দের আর কি কিছু হতে পারে একজন সাইক্লিস্টের জন্যে?' - হাস্যোজ্জল মুখে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন শাফায়াত।

সাইক্লিং এর প্রতি এত ভালবাসা কেন? এই প্রশ্নের উত্তরটা যেন তৈরই ছিল, 'দেখুন, সাইকেল পরিবেশবান্ধব। এই যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ইস্যুতে প্রতি বছর পৃথিবীব্যাপী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে, এখনইতো সময় আমাদের পরিবেশের বিষয়ে আরও যত্নশীল হওয়ার, তাইনা? আর সাইকেল ব্যাবহারে জ্বালানিও বাঁচে। আবার মুফতে শরীরচর্চাও হয়ে যাচ্ছে। একজন সাইক্লিস্ট অন্য যে কোনও সাধারণ মানুষের চেয়ে শারীরিকভাবে অনেক বেশি সুস্থ থাকে। আর সাইক্লিস্টদের কাছে সাইকেল মানেই স্বাধীনতা। যখন যেখানে যেতে মন চাইবে, সাইকেলটা সঙ্গী করে রাস্তায় নেমে পড়লেই হলো!'

পরিবেশ রক্ষায় জেলা থেকে জেলায় সেমিনার করছে সাইক্লিস্টদের দল, ছবি: শাফায়েত

যারা নিয়মিত সাইক্লিং করেন, তারা প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১০০০ কিলোমিটারের মতো পথ পাড়ি দেন। তাদের সাইকেল চালানোটা কেবল শহরের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনা, সুযোগ পেলেই তারা শহর ছেড়ে চলে যান দূর-দূরান্তে, প্রকৃতির আরও কাছে। কখনও ঢাকার কাছেই, সাভার বা মানিকগঞ্জ, কখনও আবার সিলেট বা চট্টগ্রাম। সাইক্লিং আর ক্যাম্পিং, দুটোর আনন্দই পাওয়া যায় এতে। একটানা দশ-এগার ঘণ্টা সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতাও আছে অনেকেরই।

শাফায়াত জানান, 'সাইকেল চালানোর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। অনেক অনেক নতুন বন্ধু পাওয়া আর সর্বোপরি মানুষের ভালবাসা পাওয়া।'

বিডি সাইক্লিস্ট প্রতি সপ্তাহেই নিয়মিত সাইকেল র‍্যালি আয়োজন করে। এছাড়া বিশেষ দিবসগুলোয় বিশেষ সাইকেল র‍্যালি তো আছেই। অংশগ্রহণ করতে চান? একটা সাইকেল নিয়ে প্যাডেল মেরে চলে আসুন। ব্যাস, হয়ে গেল। সাইকেল চালাবার আনন্দ তো পাবেনই, উপরি পাওনা নতুন কিছু অসম্ভব বন্ধুবৎসল মানুষের সান্নিধ্য। এছাড়াও বিডি সাইক্লিস্ট গ্রুপের সদস্যরা ছোটখাটো সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ করে আসছে বহুদিন ধরেই।

বিডি সাইক্ল্রিস্টের সদস্যরা ৬৪ জেলায় ৬৪টি ভালো কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই ভালো কাজ ৬৪ গুড অ্যাকটস নামে পরিচিত। এছাড়াও সম্প্রতি সবুজ বাঁচাও ও পরিবেশ দূষণ থেকে বাঁচতে জনসচেতনতামূলক র‍্যালি করেছে দলটি। ইতিমধ্যে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনায় সাইকেল নিয়ে ঘুরে এসেছেন এই সবুজ বাঁচাও উদ্যোগ নিয়ে। আটদিন ব্যাপি এই র‍্যালির সহায়তায় ছিল জার্মান ভিত্তিক সংগঠন মাটি।

জার্মান স্বেচ্ছাসেবী দলের সঙ্গে চার জেলায় সাইক্লিং, ছবি: শাফায়েত 

নতুন পৃথিবী কেনা সম্ভব নয়, আসুন আমাদের পৃথিবীকেই বসবাসযোগ্য করি- এই স্লোগানে দুই চাকায় চেপেছিলেন বিডি সাইক্লিস্টরা। পাঁচ জার্মান সেচ্ছাসেবিসহ ১১ সাইক্লিস্ট জেলায় জেলায় প্রতি ১০ কিলোমিটার এলাকা পর পর প্রচারণা চালিয়েছেন পরিবেশ রক্ষা নিয়ে। করেছেন ওয়ার্কশপও। আট দিনের এই সফরে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়েছেন তারা।

এছাড়াও প্রতিনিয়ত চলছে নানা কাজ। প্রায়ই সেচ্ছা রক্তদান, শীতবস্ত্র বিতরণ, দুস্থদের সহায়তা, কর্মসংস্থান তৈরিসহ নানা আয়োজনের সঙ্গে জড়িত এই দুইচাকার দলটি।

বিডি সাইক্লিস্টের অধীনে বিভিন্ন জেলা বা থানায় সাইক্লিস্ট গ্রুপ রয়েছে। ঢাকা শহরেই রয়েছে ৩০-৪০টির বেশি গ্রুপ। যারা বিভিন্ন উৎসবে বিডি সাইক্লিস্টের সঙ্গে অংশ নেয়। শুধু ঢাকা নয় ঢাকার বাইরেও এই দলগুলো বেশ সক্রিয়। শুধুই যে কাজের জন্য এই দলগুলো ঘুরে বেড়ায় এমন নয়। আনন্দ, হইচই আড্ডাতেও প্রায়শই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে দলের সদস্যরা। মোট কথা সবসময় একটা আনন্দময় ও ইতিবাচক সময় কাটাতেই ইচ্ছুক বিডি সাইক্লিস্টের তরুণরা।

শাফায়াত জানালেন, সাইকেল চালানো শুরু করার জন্য কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়ে। প্রথমেই আপনাকে একটা মোটামুটি ভাল মানের সাইকেলের মালিক হতে হবে। এরকম সাইকেলগুলো নানা ব্র্যান্ডের এবং বিভিন্নরকম সুযোগসুবিধা সম্পন্ন হয়ে থাকে। ব্র্যান্ড এবং সুবিধাভেদে দামেরও তারতম্য হয়। নিম্নে ৪-৫ হাজার থেকে শুরু করে ৪০ হাজার টাকার মধ্যেই একটা ভাল সাইকেল কিনে ফেলা সম্ভব। ঢাকার গুলশান, বনানী, তেজগাঁও আর বংশাল এলাকায় বেশ কিছু ভাল সাইকেলের দোকান রয়েছে। এরপর আসে নিরাপত্তার বিষয়টা। সাইকেল চালানোর জন্য হেলমেট পরাও বাধ্যতামূলক। হাতের জন্য গ্লাভস ব্যাবহার করা যেতে পারে। রাতের বেলায় আবার হেডলাইট মাস্ট।

আবার ফিরে আসা যাক 'বাইসাইকেল থিভস' সিনেমা প্রসঙ্গে। সিনেমায় যেমন সাইকেলটা চুরি গিয়েছিল, তেমনি আমাদের দেশেও সাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়ে গিয়েছে সাইকেল চুরি যাবার মতো ঘটনা। এই চুরি রোধেও পরামার্শ দিলেন শাফায়াত, 'আপনার এত দাম দিয়ে কেনা এত শখের সাইকেলটা চুরি গেলে নিশ্চই আপনার ভাল লাগবে না, তাইনা? তাহলে কেন সাইকেল কেনার সঙ্গে সঙ্গেই মাত্র ৪০০-৫০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ করে সাইকেলের জন্য একটা তালা কিনে ফেলছেন না? সাইকেলের জন্য ভাল একটা তালা কিনে ফেললেই সাইকেল চুরি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।'

হালুয়াঘাটের এক গির্জায় চলছে পরিবেশ রক্ষা বিষয়ক সেমিনার, ছবি: শাফায়েত 

সাইক্লিংয়ের গল্প শুনতে শুনতে পেরিয়ে গেল অনেকটা সময়। এরমাঝেই অন্য সাইক্লিস্টরা বেশ কয়েকবার এসে তাড়া দিয়ে গেলেন। এখনই যে তাদের আবার বেরিয়ে পরতে হবে সাইকেল নিয়ে, ছুটির দিনের ফাঁকা শহরটায় একটা চক্কর দিতে তাদের আর তর সইছে না। তাই আলোচনার এখানেই সমাপ্তি টানতে হল, আর তারা তাদের দুই চাকার পঙ্খিরাজে উঠে বসে প্যাডেল চাপলেন। কে জানে, হয়ত নতুন কোনও অ্যাডভেঞ্চার হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

চলছে পথচলা, ছবি:  শাফায়েত

/এএলএ/এফএএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।