রাত ১১:৫৩ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

সিটি নির্বাচন : প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলেও গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সালমান তারেক শাকিল॥

অাসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দ্বৈত অাচরণ করছে জামায়াতে ইসলামী। যুদ্ধাপরাধের দায়ে কোণঠাসা দলটি একদিকে নির্বাচন নিয়ে বিরোধিতা করলেও অত্যন্ত গোপনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সমর্থিত প্রার্থী দেওয়া হয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে ৯৩টি ওয়ার্ডের সবকটিতেই। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামে ৩০টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থিতার জন্য দল-সমর্থিতদের গোপন মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। যদিও তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বিবৃতিতে নির্বাচনের বিরোধিতা করে অাসছে দলটি।

সূত্র মতে, অাইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতারের ঘোষণা, ফৌজদারি মামলা, ধরপাকড় ও প্রার্থিতা বাতিলের অাশঙ্কায় এখন পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামে কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের নাম প্রকাশ করছে না জামায়াত। এক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষার করার নির্দেশনা রয়েছে। ফলে, চূড়ান্তভাবে এখন পর্যন্ত কারা দলের সমর্থন পেয়ে মনোনীত হবেন, বিষয়টি সাধারণ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অজানা।

তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মনোভাব কী হবে, সেটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সমর্থিত প্রার্থীদের বিষয়ে মুখ খুলবে না জামায়াত। এমনকি ইসি থেকে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই করার পর নাম প্রকাশ করা হলেও নীরব থাকবে দলটি। সূত্রের যুক্তি, বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বয়কটের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নেতাকর্মীদের মাঠে নামিয়ে চাঙ্গা করা হলেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে এটি শুধুই এখন পর্যন্ত অনুমান।

তবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে এমন একটি সূত্রের দাবি, আগামী ১ ও ২ এপ্রিল মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর ৩ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে জামায়াত। এর অাগে প্রকাশ করা হলে সরকারের ‘ষড়যন্ত্রে’ তাদের নির্বাচনে ‘অযোগ্য’ করা হতে পারে। এ কারণে প্রায় সব ওয়ার্ডেই একাধিক প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। একজন বাদ পড়লে বিকল্পপ্রার্থী তৈরি থাকে। ঢাকায় দুই সিটিতে অন্তত ২০টি ওয়ার্ড জোটের সমর্থন জামায়াত। দক্ষিণ সিটিতে পল্টন, যাত্রাবাড়ী, রমনা, মতিঝিল এলাকার ১৩টি ওয়ার্ডে এবং উত্তরে মিরপুর, রামপুরা, ভাটারা ও বাড্ডায় সাতটি ওয়ার্ডে জোটের সমর্থন চায় জামায়াত।

একই দৃশ্য চট্টগ্রামেও। সেখানকার ৪১টি ওয়ার্ডের ৩০টিতে কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে জামায়াত। এর মধ্যে ৯টি ওয়ার্ডে শরিক বিএনপিকেও ছাড় দিতে রাজি নয়। এসব ওয়ার্ডে জোটের সমর্থন চায় জামায়াত। তবে সমর্থন না পেলে এককভাবেই নির্বাচন করবে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা।

এর অাগে গত শনি ও রবিবার অনেকটা নীরবে ঢাকার ৯৩টি ওয়ার্ডে মনোনয়নপত্র জমা দেয় জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা। গতবারের মতো শোডাউন না করে নিভৃতে, চুপচাপ এবং প্রতিনিধিদের মাধ্যমে মনোনয়নপত্র উত্তোলন এবং দাখিল করে দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা।

এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা দক্ষিণ ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী বোরহান উদ্দীনের সঙ্গে। এই ওয়ার্ড থেকে জামায়াতের অালোচিত ও প্রভাবশালী সাবেক কমিশনার অাবদুর রবও মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন তার এক অাইনজীবীর মাধ্যমে। তবে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় তার স্ত্রী এবং দলীয় নেতা বোরহান উদ্দীনও মনোনয়ন সংগ্রহ ও জমা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বোরহান উদ্দীনের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা নিশ্চিত। পাশাপাশি অনলাইন-সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রশাসনের কাছেও এক ধরনের ক্লিন ইমেজ তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন তিনি।

জানতে চাইলে বোরহান উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্তে একাধিক প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। যদি মামলার কারণে অাবদুর রবের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়. তাহলে আমি প্রার্থী হবো। অার তিনি টিকে গেলে আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করব।’

তিনি জানান, দলীয় সিদ্ধান্তে সব ওয়ার্ডে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। ধর-পাকড়ের কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ নেই। কে কোথায় প্রার্থী হয়েছেন তা মহানগরের নেতারা ছাড়া কেউ জানেন না। বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় চূড়ান্ত হবে, কে কোন ওয়ার্ডে জোটের সমর্থন পাবেন। বাকিরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেবেন। ৩ এপ্রিলের আগে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হবে না।

জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সম্পাদক মনির অাহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অনেকেই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন, জমা দিয়েছেন। কোথাও কোথাও একাধিক ফরম গ্রহণ করেছে, জমাও দিয়েছেন। তবে ঢাকার প্রার্থীদের নাম এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট করে জানা যায়নি।

এর অাগে ২০০২ সালের সিটি নির্বাচনে ৬টি ওয়ার্ডে জামায়াত সমর্থিতরা জোটের সমর্থন পায়। এর মধ্যে দুটিতে জয় পায় তারা।

যদিও তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের বিরোধিতা করে ছিল জামায়াত। এখনও করছে। সিটি নির্বাচনকে চলমান আন্দোলন থামাতে সরকারের ফাঁদ বলে অভিযোগ করেছিল। বিএনপিকেও নির্বাচন বর্জনের পরামর্শ দিয়েছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো বিবৃতিতে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। সরকার দলীয় প্রার্থীদেরকে সিটি করপোরেশনের আসনগুলোতে বসানোর জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যেই এ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।

এর অাগে গতকাল এক বিবৃতিতে ডা. শফিক বলেন, দেশে এক গভীর রাজনৈতিক সংকট চলছে। দেশের মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা। ২০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা হত্যা, গুম, সন্ত্রাস, হামলা, মামলা ও গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ অবস্থায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের আয়োজন চলছে। অরাজনৈতিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান থাকলেও এ তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এতে অংশগ্রহণের জন্য ২০ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থীরা নানা সংকটের মধ্য দিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কিনা সে ব্যাপারে জনগণের আশঙ্কা কাটছে না।

সূত্র মতে, অংশ নিলে এ নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে চায় জামায়াত। এ কারণে প্রস্তুতি হিসেবে ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বুলবুল, নায়েবে আমির মাওলানা আবদুুল হালিম, ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও ড. রেজাউল ইসলাম নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন।

এদিকে চট্টগ্রামে অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া জামায়াত। নয়টি ওয়ার্ডের প্রার্থীরা হলেন, ৪ নম্বরে গোলাম ফারুক, ৮ নম্বরে শামসুজ্জামান হেলালী, ১০ নম্বরে ডা. শাহাদাত হোসেন, ১৩ নম্বরে মাহফুজুল আলম, ২৭ নম্বরে এইচএম সোহেল, ২৯ নম্বরে ফজলে এলাহী মো. শাহীন, ৩০ নম্বরে আবুল মনসুর ও ৩৫ নম্বরে শেখ আহমুদুর রহমান চৌধুরী। এসব ওয়ার্ড-এ বিজয় নিশ্চিত জেনে ২০ দলীয় জোটের কোনও শরিককে ছাড় দিতে নারাজ জামায়াত।
 

/এসটিএস/এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।