দুপুর ০২:১৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৭ জুন, ২০১৯  

'চির তরুণ' রুমী- শুভ জন্মদিন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

রাশেদ রনী॥

কিছু মানুষের বয়স বাড়ে না। নির্দিষ্ট দিনে আটকে যায়। শহীদ সাফি ইমাম রুমী তাদের একজন। ১৯৭১ সালে হারিয়ে যাওয়া এই চির তরুণের আজ জন্মদিন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নানা লেখনীতে আমরা এই তরুণ বীরকে জেনেছি নানা সময় নানাভাবে। তরুণদের আইকন এই মহান মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে এবার বলেছেন তার ছোট ভাই সাইফ ইমাম জামী ।

'শহীদ রুমীর মনোবল, প্রজ্ঞা, লাইফস্টাইল- সব মিলিয়ে তিনি অনায়াসে একজন স্টাইল আইকন। শুধু স্টাইল নয়, তীব্র মনোবলের ধারক। এমন তরুণ যুগে যুগে কমই আসেন। আর রেখে যান পদচিহ্ন, যেটি অনুসরণ করেন তার অনুজরা।' মঞ্চ অভিনেত্রী শিমূল ইউসুফের বাসায় এক আড্ডায় শহীদ রুমী সম্পর্কে বলেছিলেন তার ভাই জামি। আজ জন্মদিনে সেখান থেকেই চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য।

জামি বলেন, রুমীর বিষয়ে সব জানতেন তিনি। এমনকি যেদিন বাড়ি ছাড়েন সেদিনও ছোট ভাই গাড়িতে তাকে নামিয়ে দিয়ে আসতে গিয়েছিলেন। রুমীর যুদ্ধে যাওয়ার বিষয় নিয়ে বাড়িতে খোলামেলা আলোচনা হতো। আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু তিনি তার বাবা-মাকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, পড়তে না গিয়ে যুদ্ধে যাওয়াই উচিত।

সাইফ ইমাম জামি 

রুমীর কথা বলতে গিয়ে জামী ৭১' এর অনেক স্মৃতিই তুলে ধরলেন। শহীদ জননী ২৫ মার্চের কার্ফু উঠিয়ে নেওয়ার পর ঢাকা ক্লাবে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন লাশের সারি। মালি, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারিসহ অধিকাংশ স্টাফকে মেরে গেলে রাখা হয়েছিল। এমন একটা দৃশ্যই রুমী ও অন্যান্যদের যুদ্ধে যাওয়ার দিকে ধাবিত করেছিল। জামী বলেন, আমি উপলব্ধি করেছিলাম 'মরতেই যদি হয় কয়েকটাকে মেরেই মরব'

জামী বলেন, ভাইয়া আর আমার বয়সের তফাৎ অলমোস্ট সাড়ে তিন বছরের । ভাইয়ার জন্ম ৫১'র মার্চে আর আমার ৫৪'র সেপ্টেম্বরে । ছোটবেলা থেকে ক্লাস নাইনে ওঠা পর্যন্ত আমাদের খুব একটা আদান-প্রদান হতো না। ওই পর্যন্ত ওর বন্ধু ওর, আমার বন্ধু আমার।

তবে অনেক খুনসুটি হতো দুই ভাইয়ে। ঝগড়া হলে ভাইকে বেশ এক হাত দেখে নিতে চাইতেন। জামীর ঘরের মধ্য দিয়ে মায়ের ঘরে যাওয়ার দরজা ছিল। বাইরে বের না হয়েই তিনরুমে যাওয়া আসা করা যেত। রুমীর ঘরে যেতে জামীর ঘরের মধ্য দিয়েই যেতে হতো। ঝগড়া হলেই সেই দরজা বন্ধ করে দিতেন জামী। আর ঝগড়া হতো কমিক বুক নিয়ে।

দুই ভাইকে আত্মরক্ষার জন্য জুডো ও বক্সিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন মা। রুমী পাকিস্তানের ফার্স্ট জুডো টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। বেল্টও ছিল তার। দুই ভাই একসঙ্গে জুডো প্র্যাক্টিস করতেন। জামী জানান, খুব মজা হতো সে সময়।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম 

সিনেমা ভীষণ পছন্দ করতেন রুমী। মাইকেল কেইনের 'দ্য ইপক্রেস ফাইল' ছবি দেখে ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন রুমী। ছবিটি ছিল এক ব্রিটিশ গুপ্তচরকে নিয়ে। সেই ছবির নায়কের কিছু টিপস ভীষণভাবে প্র্যাক্টিস করেছিলেন রুমী। জামী ছিলেন সহযোগী। এগুলো তার মানসিক শক্তিকে আরও মজবুত করেছিল বলেই মনে করেন জামী। হয়তো ধরা পড়ার পর সেসব ট্রিকস ব্যবহার করেছিলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় জামী তার ভাইকে নিয়ে বলে চলেছেন আর আমরাও শুনছিলাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো। বই পড়ার কথা বললেন। সামরিক বাহিনী আর গেরিলা যোদ্ধার পার্থক্য বললেন।

জামী বললেন, 'ও যখন ধরা পড়লো আমার ভেতরে ভেতরে জানা হয়ে গিয়েছিল যে- ওরা ওকে ছাড়বে না, ও আর ফিরে আসবে না । আমি নিজে ধরা পড়ার পর ওখানে গিয়ে দেখলা জুয়েল ভাই, আজাদ ভাই ও বদি ভাই ধরা পড়েছেন। আমি ভাবিনিও কোনওদিন যে আমি ফিরে আসব। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পুরো পরিবার জড়িয়ে কাকে মারবে আমি জানি না। তবে বাঁচব এটা জানতাম না।'

জামী বলে চলেছেন 'আমার চাচাতো ভাই ধরা পড়েছে। আমি তো পুরোপুরি ঠিক করে আছি যে, আজকে শেষ। জুয়েল ভাইকে কীভাবে পেটানো হইছে, হাত ভাঙ্গা, একটা চৌবাচ্চাতে বসিয়ে রাখা হয়েছে একসঙ্গে অনেকজনকে ১৫-২০ জন হবে মুরগির খাঁচার ভেতর যেমন করে ভরে রাখা হয়।

ওই চৌবাচ্চার এক কোণায় একটা পানির কল ছিল । আমাদের সবাইকে বসিয়ে রাখা হয়েছে, জুয়েল ভাই আসন পেতে বসে আছে । কিছুক্ষণ পর পর কয়েকজন জোয়ান ঢুকে নির্বিশেষে এলোপাথারি কিছুক্ষণ পিটিয়ে চলে যাচ্ছে ।

আমাদের যখন প্রথম নিয়ে আসা হয়, তখন আমাকে, আব্বাকে আর মাসুম ভাইকে বড় একটা ঘরে রাখা হয় । ভাইয়া জানি না কোথায়, আলাদা কোথাও নিয়ে গেছে । অনেকক্ষণ আমি আর মাসুম ভাই বসে আছি ওই ঘরে। কয়েকজন জাওয়ান ঢুকল ঐ ঘরে। চিল্লাচিল্লি আর মারা আরম্ভ করল । আমি আসন পেতে বসে ছিলাম, হঠাৎ তীব্র ব্যাথা অনুভূত হলো। পেছন থেকে এসে একেবারে লোয়ার ব্যাক, মানে স্পাইনাল কর্ডে বন্দুকের বাট দিয়ে মারল। ভাগ্যিস আমাকে ওই একটাই মারছিলো ।

কর্ণেল হিরাজির অফিসে থেকে আমাকে বাইরে এসে দাঁড়াতে বলল। উঠানের ঠিক ওই পাশে তখন ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে । ওই প্রথম দেখলাম ওকে আমি, ওখানে নিয়ে যাওয়ার পর। দু'জনেরই নীলচে সবুজ রঙের নাইটড্রেস পরা ছিল। তারপর আমাকে হিরাজির ওখানে নিয়ে গেল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এরপর আমাকে নিয়ে গেল চৌবাচ্চার ওখানে। জুয়েল ভাই বসে আছে, একজন জওয়ান এসে বুট নিয়ে জুয়েল ভাইয়ের পিঠে এমন জোড়ে মারলো তাকে- উনার মাথাটা মেঝেতে গিয়ে ঝাঁকি খেয়ে আবার উঠে আসল। রক্তে ভেসে গেল চারদিক। জওয়ান চলে যাওয়ার পর জুয়েল ভাইকে ধরে পানির কলটার কাছে নিয়ে যাওয়া হয় । এইভাবেই কাটছিল, সময়ের কোনও হদিস নাই। আব্বাকে, মাসুম ভাইকে মাঝে মাঝে কয়েকবারে ডেকে নিলে গেলেও আমাকে একবারই ডেকে নিয়েছিল।

রাতে নয়টা বা কোনও একসময় ভাইয়াকে নিয়ে আসলো কয়েকজনের সঙ্গে । কিছু বুঝলাম না । ভাইয়া কাছে এসে বলল- তোমরা কাউকে কিছু বলবা না।, তোমরা কিছু জানো না। আমি বাজে ধরনের বখাটে ছেলে, নিজের মতো চলে গেছি। আমি এভাবেই বলতেছি ওদেরকে। তোমরা ঘুণাক্ষরেও কোন কিছু স্বীকার করবে না ।

ও বলছিল ঠিকই, কিন্তু আমি জানি না – ও আর্মির সঙ্গে কোনও ধরনের চুক্তি করে ছিল কিনা। হতে পারে ও বলেছিল যে, আমার পরিবারকে ছেড়ে দাও।

ভাইয়ার অপারেশন সম্পর্কে ওরা জেনে গিয়েছিল। ওরা (পাকিরা) একদম পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। কারণ অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। অপারেশনের পর ভাইয়া বাড়িতে ফিরে আসার পর আব্বা বলেছিলেন- তোমরা কেউ বাসায় থেকো না । বদি ভাইও যায় নাই। ঢাকাতেই ছিল। ফরিদের (ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষের ছেলে) বাসায় যেত প্রত্যেকদিন। ওই বাসা থেকেই ধরিয়ে দিল ... একবার যেহেতু স্বীকার করে ফেলছে, পাকিস্তানী আর্মিরা আর ছাড়ার কথা না। ছাড়েওনি। কনসিকিয়েন্স অব ওয়ার । অপারেশনের চারদিন পরেই ধরা পড়ছে তো। কাজী ভাই আর আলম ভাই ছাড়া সবাই তো ধরা পড়ছিল, আর কাজী ভাই যে কিভাবে পালাইছিলো, গড !

ভাইয়ারও তো চলে যাওয়ার কথা ছিল। ও চলেও গিয়েছিল... সব অস্ত্রগুলো ২৯

তারিখে আমাদের বাসায় ঢোকানো হলো, আমাদের গ্রাউন্ডফ্লোরের ট্যাঙ্ক খালি করে দুটো টুল নিয়ে অস্ত্রগুলো প্লাস্টিক আর ছালা দিয়ে বেঁধে টুলের ওপর রাখা হয়। ট্যাংকে আবার পানি দেওয়া হয়। এমনভাবে রাখা হয়েছিল যে বাইরে থেকে কেউ দেখতে পারবে না।

২৮ আগস্ট ও যখন বাসায় ফিরে আসল, আব্বা খুব রেগে গেছিলেন। ২৯ তারিখ হাফিজ ভাইয়া আসলেন বাসায়, ভাইয়া বললেন, হাফিজ ভাইয়ের সঙ্গে একরাত থেকে কালকে চলে যাবেন। খুব খারাপ সিদ্ধান্ত ছিল সেটি।

জামি বললেন, ভাইয়ার কোনও খবর ছিল না, কি যে অসহায় একটা অবস্থা তখন। ভেবে দেখ কোন অবস্থায় পড়লে আম্মার মতো একজন পাগলা পীরের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করেন ! পাগলা পীরের ওখানে সকাল সাতটা থেকে গিয়ে বসে থাকতাম- কোন খবর যদি পাওয়া যায়, মিষ্টি নিয়ে যেতে হতো। পরে জানলাম- সেই পাগলা পীর ছিল আর্মির ইনফরমার, যারা ধরা পড়তো, তাদের ফ্যামিলীকে অবজার্ভেশনে রাখার জন্যেই ছিল ওই কর্মকাণ্ড ।

৩০ তারিখ রাতে কোনও একসময় এমপি হোস্টেলে দরজা খুলে সবাইকে বাইরে উঠানে নিয়ে বসানো হলো, কিছুক্ষণ পর সবাইকে লাইন করানো হলো, একটা ভ্যান আসলো । যখন লাইন করে ভ্যানে তোলা হচ্ছিলো- তখন আমরা ভাবছি যে- এটাই মনে হয় লাস্ট রাইড, কোথায় নিয়ে লাইন করে ব্রাশ ফায়ার করবে । তা না হলে গভীর রাতে কেন বের করে নিয়ে যাচ্ছে !

সব উঠলাম ভ্যানে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জানি না, রাতের অন্ধকারে। আমাদের নিয়ে গেল রমনা থানায় । রমনা থানাতেই সেইরাতে আমাদের রেখে দেয়। ওখানে নিয়ে যখন আমাদের ঢোকানো হলো- যারা আগে থেকেই ছিল সবাই এগিয়ে আসল – কার কি লাগবে, কার কি অবস্থা, পানি লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে আমাদের সেবাযত্ন করতে লাগলো ওরাও কিন্তু টর্চাড ছিলো সকাল বেলায় (৩১ শে আগস্ট) একি ভ্যানে করে আবার এমপি হোস্টেলে নিয়ে গেল । ওইদিনই দুপুরে আমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হলো । রমনা থানা থেকে নিয়ে আসার সময়ই ভাইয়াকে শেষ দেখি, তারপর আর দেখিনি ভাইয়াকে । শুধু ২৫ তারিখ অপারেশন শেষ করে আসার দিন ভাইয়ার যে জ্বলজ্বলে মুখ দেখেছিলাম, সেটাই মনে পড়ে খুব।

/এফএএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।