দুপুর ০২:৪২ ; রবিবার ;  ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮  

বিলুপ্তির পথে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার নীহাররঞ্জন গুপ্ত’র পৈত্রিক নিবাস

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সুলতান মাহমুদ, নড়াইল॥

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র কাহিনীকার ডা: নীহাররঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক নিবাস বিলুপ্তির পথে। সংস্কারের অভাবে এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদাসীনতায় জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হবার পথে। মুছে যাবার পথে তার পূর্ব-পুরুষের সব স্মৃতিচিহ্নও।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পাওয়া প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ইতনা হাইস্কুল থেকে মাত্র তিনশ’ গজ দূরে ও স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কাছেই নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়ির বিশাল স্থাপনা অবস্থিত। প্রায় দু’একর জমিতে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নির্মিত পাকা দ্বিতল বাড়িটির ইট-সুড়কি এখন খসে পড়ছে। সুরম্য স্থাপনার কিছু কিছু অংশ ইতোমধ্যে ভেঙ্গে ফেলেছে স্থানীয় একটি কুচক্র মহল।

নীহাররঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক বাড়ির প্রতিবেশী, শিক্ষানুরাগী ও চিত্রকর এসএম আলী আজগর রাজা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নীহাররঞ্জন গুপ্তের পরিত্যক্ত বাড়িতে ইতনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল। পরবর্তীতে ইতনা হাইস্কুল লাগোয়া জায়গায় প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থানান্তর হলে বাড়িসহ জায়গাটি স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে।

আলী আজগর রাজা, নারায়ণ চন্দ্রসহ অন্যান্য শিক্ষাবিদরা বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান এবং নড়াইলের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আলী হোসেনকে বাড়ি দখলের বিষয়টি অবহিত করেন। পরবর্তীতে নীহাররঞ্জন গুপ্তের পরিত্যক্ত বাড়িটিকে চিত্রাঙ্কন পাঠশালা শিশুস্বর্গ-২ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৯৩ সালের ২৪ নভেম্বর এই বাড়িতে শিশুস্বর্গ-২ এর উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান। শিশুস্বর্গের কার্যক্রম কিছুদিন চলার পর বন্ধ হয়ে গেলে বাড়িটি আবারও পরিত্যক্ত হয়ে যায়। মূল্যবান কাঠ দিয়ে তৈরি বাড়িটির জানালা-দরজা খুলে নিয়ে গেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। ভাঙাচোরা অবস্থায় কালের স্বাক্ষী হয়ে শুধুমাত্র ভবনটি জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে। জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে সেই আমলে নির্মিত বাড়ি সংলগ্ন মন্দিরটি। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন বাড়িটির আকর্ষণ হারিয়ে যাচ্ছে।

ইতনা হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক হরিদাস ব্যানার্জী বলেন, 'ডা. নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় নিয়ে সংস্কার করলে এটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হবে। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এটি পরিদর্শনে আসবে। এর মাধ্যমে একজন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র কাহিনীকারের অবদানকে মূল্যায়িত করা হবে। অন্যদিকে ইতনা তথা নড়াইলকে সারা বিশ্ব চিনবে।’

ইতনা ইউপি চেয়ারম্যান সিহানুক রহমান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, 'নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়িটি সংস্কার করে এর রক্ষনাবেক্ষণের জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে (প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ) এ বিষয়ে বারবার লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়ে আসছি। কিন্তু তাদের কাছ থেকে আশ্বাস ছাড়া বাস্তবে আর কিছুই পাইনি।'

নড়াইলের জেলা প্রশাসক আবদুল গফফার খান জানান, নীহাররঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক নিবাস একটি দর্শনীয় স্থান। এটিকে সংস্কার ও রক্ষনাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আশাকরি কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।

নীহাররঞ্জন গুপ্ত ১৯১১ সালের ৬ জুন বাবার কর্মস্থল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সত্যরঞ্জন গুপ্ত। তিনি ১৯৩০ সালে কোননগর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। পরবর্তীতে কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে আই.এস.সি এবং কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজ (বর্তমান নাম আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ) থেকে ডাক্তারি পাশ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সামরিক বাহিনীতে ডাক্তার হিসেবে যোগ দেন। তবে স্বাধীনচেতা নীহাররঞ্জন গুপ্ত চাকরির বাধ্যবাধকতা মানতে না পেরে সেখান থেকে সরে এসে স্বাধীনভাবে চিকিৎসা পেশা শুরু করেন। অল্পদিনের মধ্যে তিনি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কলকাতায় বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।

নীহাররঞ্জন গুপ্ত পেশায় ডাক্তার হলেও লেখার হাতে খড়ি তার শৈশব থেকেই। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার প্রথম উপন্যাস 'রাজকুমারী' প্রকাশিত হয়। পরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার গল্প-উপন্যাস নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে।

নীহাররঞ্জন গুপ্তের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় দু’শ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে কাগজের ফুল, চৌধুরী বাড়ী, লালুভুলু, দোস্তী, কালভোমর, উল্কা, নীলতারা, কনক, বহ্নিশিখা, মঙ্গলসূত্র, মধুমতি, রাতের গাড়ী, রাত্রিশেষ, মায়ামৃগ, ময়ূরমহল, দেবযানী, বধূ, কন্যাকুমারী, নিশিপদ্ম, কাজললতা, ছিন্নপত্র, বাদশা, মেঘকালো, কলংকিনী, কংকাবতী প্রভৃতি। তিনি রোমান্টিক পদ্মিনী নাটকের মাধ্যমে নাটকের জগতে প্রবেশ করেন। তার চল্লিশটিরও বেশি উপন্যাসের চলচ্চিত্র রুপায়ন হয়েছে। শরৎচন্দ্রের পর তার উপন্যাসের চিত্ররুপ সর্বাধিক।

১৯৮৬ সালের ২০ জানুয়ারি খ্যাতিমান এ ঔপন্যাসিক মারা যান।

/বিএল/এফএস/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।