রাত ০১:০১ ; রবিবার ;  ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

বিউটি পার্লার : মৃত্যুর অনন্য ছায়াঘর || জাহিদ সোহাগ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বিউটি পার্লার  নাম শুনে প্রথমেই মনে হয়, এটি নিশ্চয়ই নারী-পুরুষের সৌন্দর্য চর্চার একটি প্রতিষ্ঠান— হ্যাঁ, শুরুতে তেমনটি ছিলও, তবে তা শুধুমাত্র পুরুষের জন্য। এর মালিকের আবার একুরিয়ামে মৎস্য পালনের শখও আছে। যেটা অনেকটা বাড়াবাড়ি রকমের। পার্লারের পেছনের দিকে একটি ঝুপড়ি ঘর, সেখানে মালিক থাকেন, সঙ্গে তার বন্ধুরাও। রাতের বেলায় তারা মহিলাদের পোশাক পড়ে ঘুরতে যায় এবং এই ঘুরে বেড়ানোটা একটু রহস্যময়— তারা কি সমকামী? এই প্রশ্নটা মাথায় আসে, নাকি তারা ট্রান-জেন্ডার বলা মুশকিল! এই দ্বিধা জেগে ওঠে তখনই যখন একজন অসুস্থ সমকামী কোথাও আশ্রয় না পেয়ে পার্লারে আসে— এবং সে নিজেকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাতে সঁপে দিতে চায়, এটাই তার শেষ আশ্রয়। পার্লারের মালিক তাকে সাদরে গ্রহণ করে, নিজ হাতে রোগীর পরিচর্যা করে। এবং এই রোগীর আগমনের মধ্য দিয়ে শহরের মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের একমাত্র ঠিকানা হয়ে ওঠে এই বিউটি পার্লার। তখন এটা আক্ষরিক অর্থেই একটি মৃত্যুসদন। এবং এখানে রয়েছে একমাত্র পুরুষেরই প্রবেশের অধিকার। 
এক একজন রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে একুরিয়ামে পোষা কোনো একটি মাছের মৃত্যুও অনিবার্য নিয়তি দিয়ে নির্ধারিত হয়ে পড়ে। মালিক বিচলিত হয়, যেসব মাছ জীবনের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে পারে, এমন মাছ কিনে আনে। সে একুরিয়ামে মাছের চলাচল দেখে, একটি মাছ কীভাবে নিজের সমগোত্রীয় আর একটি মাছকে খেয়ে ফেলে সেই দৃশ্য দেখে সে জীবনের সারবত্তা বুঝতে চায়। আপাতদৃষ্টিতে মালিককে জীবনবিরোধী মনে হয়।
মৃত্যুপথযাত্রীদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় একুরিয়ামের সংখ্যাও কমে আসে। মালিক দিনরাত অসুস্থ রোগীদের সেবাযত্ন করে, তবে সেটা তাদের বাঁচিয়ে তোলার জন্য নয়, কারণ তাদের নিরাময় অযোগ্য রোগ— মৃত্যুটাকে শান্তিপূর্ণ করার চেষ্টা মাত্র। এভাবে ধীরে ধীরে বিউটি পার্লারটি তার সকল চরিত্র-চারিত্র হারিয়ে ফেলে। সেখানে রোগীদের অসহ্য যন্ত্রণার কাতর গোঙানি ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। 
এই মৃত্যু সদনটির উপর সমাজের সুশীল(?) নাগরিকদের ক্রোধও জমতে থাকে, ফলে একদিন আক্রমণের শিকার হয়, কেউ কেউ পুড়িয়ে দেওয়ার প্ররোচনা দেয়, মালিক পালিয়ে বাঁচে। পুলিশ এসে শেষ যাত্রায় সেটা বাঁচায় কিছু শর্ত-সাপেক্ষে। কিন্তু মৃত্যু সদনের দরোজায় অসুস্থ মানুষের কড়া নাড়া ক্রমাগত বাড়তে থাকে। মালিকের বন্ধুরাও গত হয়েছে। এবং একদিন সে নিজে আবিষ্কার করে তার শরীরে বিশ্রী রকমের ঘা হয়েছে, এবং সে তা ঢেকে রাখার চেষ্টা করে, শরীরের শক্তি ক্ষয়ে যেতে থাকে। ক্লান্তি অবসাদ তাকে পেয়ে বসে তবু সে হতাশ হয় না। রোগীদের ডায়পার বদলে দেয়, কাউকে কাউকে বাথরুম পর্যন্ত এগিয়ে দেয়, বাজার থেকে মুরগীর গিলা-কলিজা কিনে এনে স্যুপ রান্না করে, যা তাদের একমাত্র খাবার, একবেলার জন্যই। 

মারিয়ো বেইয়াতিন

তার মৃত্যুর পর মৃত্যু সদনটির পরিণতি নিয়ে সে চিন্তিত। সে চায় না এটা খ্রিস্টিয় সেবাশ্রমে রূপ নিক। শারীরিক অসুস্থতা বাড়তে থাকলে তাকে হতাশাও পেয়ে বসে; একদিন সে আত্মহত্যার সীদ্ধান্ত নেয়। নিজের যত নকশাদার পোশাক-আশাক ছিল তা জড়ো করে খুপড়ির বাইরের উঠোনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, তাতে সে ঝাঁপ দেবে বলে মনস্থির করে। আত্মহত্যাকেও যেন সে উদযাপন করতে চায় ঘুরে ঘুরে নেচে গেয়ে। কিন্তু শেষে সে আত্মহত্যা করতে পারে না। তার আশা এইটুকুই : ‘আমি যখন থাকব না তখন মৃত্যুসদনটির কী হবে তা নিয়ে আমি আগে অতটা ভাবতাম না। মেহমানরা(রোগী) যেভাবে পারে সেভাবেই চালাবে এমনটা ভাবতাম। আজ, একমাত্র যা আমি চাইতে পারি তা হলো, আসন্ন নির্জনতাকে তারা শ্রদ্ধা করুক।’
বিউটি পার্লার-এর লেখক মারিয়ো বেইয়াতিন। তিনি এ সময়ের হিস্পানি আমেরিকান কথাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। জন্ম ১৯৬০ সালে পেরুতে। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি স্থায়ীভাবে মেহিকোতে বসবাস করে আসছেন। সমালোচকদের মতে বিউটি পার্লার (মূল নাম : সালোন দে বেইয়েসা, প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে) গত ২৫ বছরের হিস্পানি আমেরিকান কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। তিনি চিত্রকলা আর সিনেমা নিয়েও কাজ করেন। ২০১৩ সালে হে-ফেস্টিভ্যালে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন। রিকশায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ঢাকার অলিগলিতে, চড়েছেন বুড়িগঙ্গার নৌকাতেও।

বিউটি পার্লার : মারিয়ো বেইয়াতিন; এস্পানিয়োল থেকে তর্জমা : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী; প্রকাশক : কাগজ প্রকাশন; প্রকাশকাল : ২০১৫; মূল্য ১০০ টাকা; প্রচ্ছদ : সঞ্জয় দে রিপন।                

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।