রাত ০৪:২৭ ; সোমবার ;  ২০ মে, ২০১৯  

চুলের জট ছাড়ানোই তাদের কাজ

প্রকাশিত:

বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ॥

নওগাঁর মান্দা উপজেলার নারীরা ব্যতিক্রমী একটি পেশার মাধ্যমে সংসারের জন্য বাড়তি আয় করছেন। সাধারণত নারীরা চুল আঁচড়ানোর পর তাদের জট বাঁধা চুল ফেলে দেন। আর সেই চুল সংগ্রহ করে জট ছাড়ানোর পর প্রক্রিয়াকরণ করাই তাদের কাজ। এতে গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারগুলোর যেমন অার্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে তেমনি নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

জানা যায়, এই উপজেলার নারীরা সংসারের কাজের ফাঁকে এ কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এ পেশায় কর্মরত শ্রমিকদের কেউ বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, গৃহবধূ আবার কেউ শিক্ষার্থী। সবাই হতদরিদ্র পরিবারের। অভাব ছিল তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। সংসার চালাতে হতো স্বামীদের অায়ের উপর। বর্তমানে চুল প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় কাজ করে তারা বাড়তি আয় করছেন। এতে তাদের সংসারে ফিরে আসছে স্বচ্ছলতা।

এ উপজেলায় ১২টি চুল প্রক্রিয়াকরণ কারখানা রয়েছে। এতে কর্মসংস্থানের পথ বেছে নিয়েছেন প্রায় ৮ শতাধিক হতদরিদ্র নারী।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বনিহারী গ্রামের উজ্জল নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে গড়ে তোলা চুল প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় কাজ করছেন ৫২ জন হতদরিদ্র নারী। বিউটি বিবি এ কারখানার দলনেতা। নিজের কাজের পাশাপাশি কারখানায় কর্মরত নারীদের তদারকি করেন তিনি।

কারখানায় কর্মরত আয়েশা বিবি জানান, পরপর তিন মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে স্বামী তাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি ২০ বছর ধরে বাবার বাড়িতে অাছেন। শ্রমিকের কাজ করে অনেক কষ্টে সংসার চালাচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে এলাকাবাসির সহায়তায় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এ কারখানায় মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা চুক্তিতে কাজ করে আগের চেয়ে অনেক ভালো অাছেন।

কারখানার শ্রমিক ছায়েরা বিবি জানায়, স্বামী মোজাফফর হোসেন অসুস্থ্যতার কারণে কোনও কাজ করতে পারেনা। কষ্টে তাদের দিন চলতো। এখন কারখানার বাড়তি আয়ে তাদের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

এছাড়া কারখানায় কর্মরত ময়জান বিবি, পারুল বিবি, জরিনা বিবিসহ আরও অনেকে জানান, স্বামীর সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। এখন স্বামীর আয়ের সঙ্গে কারখানার বাড়তি আয় যোগ হওয়ায় সংসারে স্বাচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

এদিকে সীমা রানী, শাকিলা পারভীন নামে দুজন শিক্ষার্থী এ কারাখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। সীমা এ বছর এইচএসসি প্রথম বর্ষের ও শাকিলা নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ছুটির দিনে তারা এখানে কাজ করেন। কারখানার পারিশ্রমিক দিয়ে তারা খাতা ও কলমসহ লেখাপড়ার আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করেন। এখন ছোট-খাট বিষয় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছেও আর তাদের অার হাত পাততে হয় না।

চুলের কারখানার ম্যানেজার মজিবর রহমান মন্টু জানান, ফেরিওয়ালারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে নারীদের মাথা থেকে ঝরে পড়া চুল সংগ্রহ করেন। চুলগুলো উপজেলার চৌবাড়িয়া হাটে মহাজনদের কাছে তারা কিনে নিয়ে আসেন। সোমবার ও শুক্রবার সেখানে চুলের হাট বসে। এ হাট থেকে মালিকরা প্রতি কেজি চুল ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় কিনে কারখানায় সরবরাহ করেন। উপজেলার চৌবাড়িয়াহাট থেকে কেজি দরে চুল কিনে এনে এসব কারখানায় প্রথমে চুল ফাটানো হয়। এ কাজের জন্য এলাকার হতদরিদ্র নারীদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের তিনটি কারখানায় ১৬০ জন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এজন্য প্রত্যেক নারীকে মাসে এক হাজার ৫০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।

কারখানার মালিক আমানুর বিশ্বাস জানান, এখানকার কারখানায় ফাটানো চুলগুলো ঢাকার কারখানায় নেওয়া হয়। সেখানে কাটিং মেশিনে পুন প্রক্রিয়া ও প্যাকেটজাত করে চীনে রফতানি করা হয়।

শ্রমিকদের মজুরি কম দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'কারাখানায় কর্মরত নারীরা এখনও কাজে দক্ষ হয়ে উঠেনি। ফলে অনেক চুল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে অামারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। কাজে দক্ষ হয়ে উঠলে বেতন বাড়ানো হবে।

/এমডিপি/এমআর/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।