সকাল ০৯:৩৮ ; শুক্রবার ;  ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯  

সম্পর্ক পুনঃনির্ধারিত হতে পারে: মোহাম্মদ জমির

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

দীর্ঘ ত্রিশ বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ জমির। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি। এছাড়াও সর্বশেষ ২০১০ সালের মার্চের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১২ পর্যন্ত তথ্য কমিশনের প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

  মোহাম্মদ জমির তার র্দীঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির জয় এবং বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের নানান বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শেরিফ অাল সায়ার এবং মিজানুর রহমান। বাংলা ট্রিবিউন: বিজেপির জয়ে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে কেমন পরিবর্তন আসবে বলে আপনি মনে করেন? মোহাম্মদ জমির: ভারত দেশের ভেতর অনেক বদল হলেও পররাষ্ট্রনীতে তার প্রভাব পড়বে না। পররাষ্ট্রনীতি সবসময় ঠিক থাকবে। যেমন, কাশ্মির নিয়ে সবসময় সব সরকারই একমত পোষণ করেছেন। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতি বদল হবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। বাংলা ট্রিবিউন: 'তিস্তা বা সীমান্ত চুক্তি' দুটি অমীমাংসিত বিষয়। এ দুটি বিষয়ে কি তাহলে অাগের সরকারের পথেই মোদি সরকার এগিয়ে যাবে? মোহাম্মদ জমির: এই দুটি চুক্তির বিষয়ে বিজেপি আগেই না করে দিয়েছে। মমতাও অাগে থেকে না করেছেন। এবার মমতা পশ্চিমবঙ্গে ৩৪টি আসনে জয় পেয়েছেন। তিনি এখন পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম একজন ইনচার্জ। তিস্তা চুক্তির নিষ্পত্তির সম্ভাবনা একদিকে আমি বলবো কম। অন্যদিকে, মমতার সাথে মোদির শক্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। তাই মোদি বলতে পারে সবকিছু কেন্দ্র সরকারই ঠিক করে দেবে। এক্ষেত্রে কংগ্রেসও সহায়তা করতে পারে। কারণ তারা রাজ্যসভায় আছে। দেখা যাক কী হয়। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে কেন্দ্রই সিদ্ধান্ত নেবে। পানিবণ্টন চুক্তি ঢাকা এবং দিল্লির মধ্যে। সুতরাং কেন্দ্রই মূল সিদ্ধান্ত নেবে। স্থানীয় রাজ্যসভার মতামত থাকতে পারে। কিন্তু এমন না যে কেন্দ্রকে তা মানতেই হবে। তবে যে বিষয়টি নিয়ে আমি চিন্তিত সেটি হচ্ছে ভারতের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিশ চলছে। কয়েক মাসের মধ্যেই রায় বের হবে। প্রশ্ন হচ্ছে রায়টি যদি ভারতের বিপক্ষে যায় তাহলে মোদি তা সহজে গ্রহণ করবে কিনা। এটা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৩.২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করে নিয়েছে ভারতীয় কর্মীরা। সুতরাং মোদি বোকা নয়।

বাংলা ট্রিবিউন: কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সুসম্পর্ক ছিল। সেক্ষেত্রে ক্ষমতার এই বদলে সেই সম্পর্কে কোনো ছেদ পড়বে? মোহাম্মদ জমির: ছেদ পড়বে এ কথা অামি বলবো না। তবে পুনঃনির্ধারণ হতে পারে। তারা কঠিনও হতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না ভারতের রফতানি আয়ের পঞ্চম বৃহত্তম উৎস হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রবাসী ভারতীয়দের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পঞ্চম। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৩.২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করে নিয়েছে ভারতীয় কর্মীরা। সুতরাং মোদি বোকা নয়। চীনের সাথে যোগাযোগের জন্য বিআইসিএম করিডোর ব্যবহার করতে হলে তাদেরকে অবশ্যই যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। ভারত এবং চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখন প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার। এখানে অন্যান্য বিষয়াদি জড়িত। যেমন- বৈদেশিক বিনিয়োগ, জলবায়ুর পরিবর্তনসহ আরও অনেক কিছু। সুতরাং এটি আসলে খুব সহজ প্রক্রিয়া নয়। এটি দুই দিন বা দুই মাসে পরিবর্তন হয়ে যাবে না। আলোচনার ভিত্তিতে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলা ট্রিবিউন: সরকারবিরোধীদের অভিযোগ- বর্তমান সরকার দেশের স্বার্থ রক্ষা না করেই ভারতের সব দাবি মেনে নেয়। বিষয়টি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? মোহাম্মদ জমির: ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে বাংলাদেশ সরকার চলে এটি ঠিক নয়। আমরা ৫ বিলিয়ন ডলার দামের ‌‍'তুলো' এবং ‌'অসম্পূর্ণ টেক্সটাইলস পণ্য' আমদানি করি ভারত থেকে। সাথে আরও দুই-তিন বিলিয়ন ডলারের কর্মক্ষমতা যুক্ত করে ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডিলারের রফতানি হয়। এখন ভারত থেকে এসব কাঁচামাল অাসা যদি বন্ধ হয়ে যায়, বাংলাদেশে কমপক্ষে ২০০ কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের প্রায় ৭০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে ভারতে। আমাদের এখান থেকে দুই থেকে তিন লাখ লোক চিকিৎসার প্রয়োজনে ভারতে যায়। এখন বিষয় হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন করতে হলে অনুধাবন করতে হবে আমাদের কী প্রয়োজন? আমাদের প্রয়োজন ভাগাভাগি করা। একসাথে সমুদ্রে খনিজ খোঁজা। অর্ধেক অর্ধেক শেয়ার। ভারত খরচ করতে রাজি হলে তাদের কিছু বেশি দেওয়া যাবে। সেটা আমাদের বাস্তবতা বুঝেই নির্ধারণ করতে হবে।

এখন ভারত থেকে এসব কাঁচামাল অাসা যদি বন্ধ হয়ে যায়? বাংলাদেশে কমপক্ষে ২০০ কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের প্রায় ৭০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে ভারতে। আমাদের এখান থেকে দুই থেকে তিন লাখ লোক চিকিৎসার প্রয়োজনে ভারতে যায়। এখন বিষয় হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন করতে হলে অনুধাবন করতে হবে আমাদের কী প্রয়োজন?

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বললেন আমাদের ৭০ হাজারের মত শিক্ষার্থী ভারতে পড়াশোনা করছেন। এদিকে মোদির বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব। শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে? মোহাম্মদ জমির: না, তেমন কোনও প্রভাব পড়বে না। হতে পারে যারা এখন অাছে তাদের বলবে তোমরা পড়াশোনা চালিয়ে যাও। এরপর আমরা আর জায়গা করে দিতে পারব না। এমনও হতে পারে তারা শিক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। বাংলা ট্রিবিউন: মোদি তো সরাসরি এবার হিন্দুত্ববাদকে প্রতিষ্ঠা করে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে। এটি কিভাবে সম্ভব হলো? মোহাম্মদ জমির: বিষয়টা হচ্ছে মোদি এবার সঠিক সময়ে সঠিক ডাক দিতে পারেছে। ভারতে অধিকাংশ হিন্দু বাড়িতে মূর্তি আছে। তারা সবধরনের হিন্দু প্রথা পালন করে। অনেকক্ষেত্রে তো মুসলমান ঘরে ঢুকলে সাথে সাথে সেই জায়গা পরিষ্কার করে প্লেট ধুয়ে ফেলে। বাংলা ট্রিবিউন: এসব কী এখনও আছে? মোহাম্মদ জমির: অবশ্যই, তারা এখনও রক্ষণশীল। বলিউডের সিনেমায় অনেক প্রগতি দেখাতে পারে কিন্তু বাস্তব অবস্থাটা এমন নয়। ভারতের মোট জনসংখ্যার অনেক বড় অংশ রক্ষণশীলদের দখলে। সিনেমার মতো থাকলেও সেটা খুবই কম।

বলিউডের সিনেমায় অনেক প্রগতি দেখাতে পারে কিন্তু বাস্তব অবস্থাটা এমন নয়। ভারতের মোট জনসংখ্যার অনেক বড় অংশ রক্ষণশীলদের দখলে।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে? মোহাম্মদ জমির: প্রথম চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বর্তমান সময়ে ভারত অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বাজে সময় অতিক্রম করছে। অতিরিক্ত মূদ্রাস্ফীতিই এর প্রধান কারণ। মোদির জয়ে ভারতে শেয়ার বাজার কিছুটা চাঙ্গা হলেও প্রশ্ন থেকে যায় আসলেই মোদি প্রশাসন ভারতে ব্যবসা করার বিষয়টি সহজ করতে পারবে তো? কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংক পুনর্গঠন এবং দুর্নীতি দূর করতে হবে। মোদিকে অবশ্যই অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়নের জন্য দরকারি পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো মুসলমান এবং সংখ্যালঘুদের সমানভাবে দেখা। গুজরাটে ২০০২ সালে ধর্মীয় দাঙ্গার পর এখন মোদিকে অবশ্যই মুসলমানদের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। তৃতীয়ত তরুণ ভোটারদের জন্য আরও উন্নত জীবনধারা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সবশেষ হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বিদ্যমান জটিলতাগুলো যতদ্রুত সম্ভব মীমাংসা করে ফেলা। বাংলা ট্রিবিউন: বাংলা ট্রিবিউনকে সময় দেওয়ার জন্য অাপনাকে ধন্যবাদ। মোহাম্মদ জমির: অাপনাদেরও ধন্যবাদ।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।