রাত ১০:০৬ ; রবিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৯  

নির্যাতনের শিকার নারীর সাক্ষ্য

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম॥

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল করতে ২০১২ সালের ২২মার্চ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। আগামী ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে।  ট্রাইব্যুনাল গঠনের এই পাঁচবছরে ১৭টি মামলায় ১৮ জনের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশনের জন্য বেশ কিছু কাজের মধ্যে নারী সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। নির্যাতনের শিকার নারী, নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী নারী, ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া যুদ্ধশিশু ট্রাইব্যুনালের সামনে এসে যুদ্ধাপরাধীদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রসিকিউশন বলছে, নারী সাক্ষী কেবল নন, মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন নারীদের সাক্ষী হিসেবে হাজির করা বড় চ্যালেঞ্জ। যে নারী ৪০বছরের বেশি সময় তার নির্যাতনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন, তার পক্ষে সেটা আদালত ও তার নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তির সামনে তুলে ধরা খুব সহজ ছিল না।

এ পর্যন্ত বেশকিছু মামলায় ক্যামেরা ট্রায়ালের আবেদন জানায় প্রসিকিউশন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোমেনার সাক্ষ্য। যা ছিল খুবই সংবেদনশীল। মৃতুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আরেক আসামি কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন একাধিক নারী সাক্ষী। তারা এসে বিধবাপল্লীর দুঃসহ জীবনের কথা জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালে।

এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সৈয়দ কায়সারকে অন্য অপরাধের পাশাপাশি ধর্ষণের দায়ে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। কায়সারের বিরুদ্ধে দুই নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। ধর্ষিতারা হলেন, সাঁওতাল নারী হীরামনি ও মাজেদা। দুটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দুই বীরাঙ্গনা এবং ধর্ষণের ফলে বীরাঙ্গনা মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহার ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন।

কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ষষ্ঠ অভিযোগে তার ফাঁসির রায় হয়। ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ-সমর্থক হযরত আলীর পুরো পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। দুই বছরের ছোট ভাইকে আছড়ে মারা, দুই বোনকে জবাই, এক বোনকে ধর্ষণ, মাকে গুলি করে মারা- এতগুলো দৃশ্য দেখে নিজে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর মোমেনা বেগমের স্বাভাবিক থাকাটাই ছিল এক ধরনের অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর।

একাত্তরের সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে হাজির হয়েছিলেন তিনিও। মা-ভাই-বোনদের মৃত্যু দেখলেও সেদিন ধরে নেওয়ার পর তার বাবা হযরত আলী লস্করের আর কোনও খবর আর পাননি মোমেনা। তাই সাক্ষীর ডকে দাঁড়িয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো কাদের মোল্লার প্রতি মোমেনার প্রশ্ন ছিল, 'আমি তাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই- আমার বাবা কোথায়?' নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কারণে ওসময় দেওয়া মোমেনার এই সাক্ষ্য বিচার চলাবস্থায় প্রকাশিত হয়নি। আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর এই সাক্ষ্যটি পাওয়া যায়।

সাক্ষীর ডকে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেন মোমেনা। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, 'দাও দিয়ে আমার মাকে তারা জবাই করে। চাপাতি দিয়ে খোদেজাকে (বোন) জবাই করে। তাসলিমাকেও (বোন) জবাই করে। আমার একটি ভাই ছিল বাবু, বয়স ছিল দুই বছর, তাকে আছড়িয়ে মারে।' তিনি আরও বলেন, 'বাবু যখন মা-মা করে চিৎকার করছিল, সে চিৎকার শুনে খাটের তলায় লুকানো আমেনা চিৎকার দিলে, তার অবস্থান জেনে যায় হামলাকারীরা। তারা আমেনাকে টেনে বের করে সব কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলে। এরপর তাকে নির্যাতন করতে থাকে। আমেনা অনেক চিৎকার করছিল, এক সময় চিৎকার থেমে যায়।'

তখন পর্যন্ত মোমেনা খাটের নিচেই লুকিয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা হলে হামলাকারীরা যাওয়ার সময় ঘরের বিভিন্ন জায়গায় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছিল, আর কেউ আছে কি না। একটি খোঁচা মোমেনার পায়ে লাগলে মুখ দিয়ে বের হওয়া শব্দ তার অবস্থান জানিয়ে দেয়। এরপর তার ওপরও চলে নির্যাতন, জ্ঞান হারান তিনি।

কেমন করে এই সাক্ষীদের কথা বলতে রাজি করানো হয়েছে, সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রসিকিউটর রিজিয়া সুলতানা চমন বলেন, আমরা দীর্ঘসময় ধরে তাদের কথা শুনেছি। যেগুলো সম্পৃক্ত না সেসব গল্প শুনেছি। আমরা তাদের আশ্বস্ত করেছি। তারা আস্থা পেয়েছেন যখন, তখনই কেবল কথা বলতে রাজি হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে যে ক্ষোভ, সেটা যেমন দেখেছি, বিচার পাওয়ার পর তাদের যে তৃপ্তি, সেটাও দেখেছি। তিনি বলেন, নির্যাতনের শিকার নারীদের কথা শুনতে গিয়ে আমরাও অঝোরে কেঁদেছি।

আরেক প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরীন আফরোজ বলেন, গত পাঁচ বছরে আমাদের অর্জন অনেক। হাজারো সমালোচনা আর অনাস্থার ভেতর পথচলা শুরু করে ত্রিশলক্ষ শহীদ আর চার লক্ষ মা বোনের জন্য ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই, তাও আবার ৪০বছর পর। মোটেও সহজ ছিল না পথটা। তিনি বলেন, সবচেয়ে কঠিন ছিল নারী সাক্ষীদের হাজির করার প্র‌‌‌ক্রিয়া। যে নারী ৭১-এ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাকে অপরাধীর সামনে দাঁড় করিয়ে সেই নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা বলানো প্রসিকিউশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। যে নারীরা ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের নতুন করে সাহস যোগানোর কাজটুকু করতে হয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।

প্রসিকিউটর জিয়াদ আল মালুম বলেন, প্রসিকিউশন দলের একেকজনের একেক দায়িত্ব ছিল। কেউ সাক্ষীদের কথা শুনেছেন। কেউ তাদের কথা নির্ভয়ে বলার জন্য প্রস্তুত করেছেন। একারণেই ট্রাইব্যুনালে নারী সাক্ষীদের উপস্থিত করা সম্ভব হয়েছে। তবে কথা বলেছেন, এমন অনেক নির্যাতনের শিকার নারী, যারা এতদিন পর আদালতে এসে সবার সামনে তাদের ওপর ঘটে যাওয়া পাশবিক নির্যাতনের কথা বলতে চাননি সামাজিক লজ্জায়। মালুম বলেন, আমরা সাক্ষীদের জোর করিনি। সম্মানের সঙ্গে তাদের সম্মতির ভিত্তিতেই ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

/এমএনএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।