রাত ১০:৫৩ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছি গল্পকথনের ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে। || সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লেখালেখি শুরু করেছেন সত্তর দশকের গোড়াতেই। কিন্তু জীবনের প্রথম গল্পটি প্রকাশের পর তিনি প্রায় ফাঁপরে পড়ে গিয়েছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নেতিবাচক মন্তব্যে। কিছুদিন পর, আবার ইলিয়াসই মনজুরের অন্য একটি গল্পের প্রশংসা করলেন। নিজের ভেতরে আত্মবিশ্বাস ও সৃজনের আনন্দটুকু ফিরে পেলেন। 
আর মনজুর, গল্পে তো বটেই, তাঁর যে-কোনো রচনায় এমন এক প্রাঞ্জল ও কমিউনিকেটিভ গদ্যভাষা ব্যবহার করেন, যা পাঠককে অনায়াসে টেনে নেয় রচনার গভীরে। আর তাঁর বলার ভঙিটি যতটা না লেখকের তারচেয়ে বেশি কথকের। তাঁর গল্পে আছে মানুষের প্রতিদিনের দুঃখ-আনন্দ কিংবা কালচক্রের ছায়াও : কীভাবে সমাজ বদলাচ্ছে, মানুষের প্রেম ও ক্লেদ, আক্রোশ ও অভিঘাত এবং সময় ও সম্পর্কের লাবণ্যটুকু পাল্টে যাচ্ছে— এসবের অনুপম ও সূক্ষ্ম সংবেদী বয়ান। 
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের জন্ম ১৮ জানুয়ারি ১৯৫১, সিলেটে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, শিল্পকলায় প্রাজ্ঞ প্রাবন্ধিক, সমাজনিষ্ঠ কলামলেখক এবং কথাসাহিত্যিক। তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত গল্পগন্থের নাম— মেঘশিকারি (২০১৫); তালপাতার সেপাই ও অন্যান্য গল্প (২০১৫)। তাঁর ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ গল্পগ্রন্থটি ১৪১১ সালের প্রথম আলো বর্ষসেরা সৃজনশীল বইয়ের পুরস্কার পায় এবং ১৯৯৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাসউদ আহমাদ] 


লেখালেখি যে একধরনের সৃজনশীল কাজ, ভাবনার করোটিতে সেটা করায়ত্ত হয়নি তখনও, তবু আপনি লিখতেন; পাকিস্তানি খবর, রঙধনু ইত্যাদি পত্রিকায়। সেই দিনগুলোকে মনে পড়লে কী অনুভূতি হয়? 
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সেই দিনগুলিতে আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়। ফিরে গিয়ে জানতে ইচ্ছে হয়, প্রথম লেখাটা কোন অবাক রসায়নে তৈরি হয়েছিল, প্রথম গল্পটির কাঠামো কিভাবে তৈরি হয়েছিল? ১৯৬১ সালে যখন ক্লাস সিক্স-এ পড়ি, ময়মনসিংহ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত শিক্ষক সমাচার-এর ছোটদের পাতায় একটা গল্প ছাপা হয়েছিল। বাবা তখন ময়মনসিংহের শিক্ষা বিভাগে চাকরি করতেন। তিনিই আমাকে লিখতে বলেছিলেন। তাঁর নিশ্চয়ই অপছন্দ হয়নি। তারপর রংধনুতে লিখেছি ক্লাস নাইন-টেনে পড়ার সময়। একটা কথা বলতে হয়— একটা গল্প শেষ করতে পারাটা খুব আনন্দের ব্যাপার। সেই আনন্দটাই সেই দিনগুলিকে এখনো ভুলতে দেয়নি আমাকে। 

ছোটবেলায়, পারিবারিক আবহ আপনাকে লেখক হয়ে উঠতে কীভাবে সহায়তা করেছে?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমার মা’র কাছে আমার হাতেখড়ি হয়েছে। আমার জন্মের আগে থেকেই মা শিক্ষকতা করতেন সিলেট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। তাঁর ছিল বই পড়ার নেশা। আমার বাবাও ছিলেন পড়ুয়া। বইও লিখেছেন, ‘বড়দের লেখাপড়া’ ও ভূগোল বিষয়ে একটি বই। বাড়িতে এক আলমারি বই ছিল। জন্মদিনে বই দিতেন মা। বাড়ির বইবান্ধব আবহটি বইয়ের প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করেছে। আমার মা’র আপন মামা ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি ১৯৬৪ সালে একবার সিলেটে এসে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি আমার অটোগ্রাফের খাতায় রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার চার লাইন লিখে নিচে ‘হুরু নানা’ স্বাক্ষর দিয়ে বলেছিলেন— পড়বে এবং লিখবে। সবাইকে একথা তিনি বলতেন। আমার বাবা খুব কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমাদের গল্প উপন্যাস পড়া আর লেখালেখির ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুব উদার।  

আপনার নানার প্রসঙ্গ যেহেতু এসেই গেলো, তিনি তো আমাদের ভাষার একজন খ্যাতিমান রম্যগল্প-লেখকও; সৈয়দ মুজতবা আলী, তাঁর কথা কিছু বলুন তাঁর সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কেমন ছিল?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমি প্রথম দেখি ১৯৬৪ সালে। এরপর ১৯৭২ সালে তিনি যখন ঢাকায় চলে এলেন, তাঁর ধানমণ্ডির ১ নাম্বার রোডের বাড়িতে; এরপর অনেকবার গিয়েছি। তিনি ভাগ্না-ভাগ্নি, ভাতিজা-ভাতিজিদের এবং নাতি-নাতনি বাহিনিটিকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি পুরান ঢাকার বাখরখানি আর সূতি কাবাব খেতে খুব পছন্দ করতেন। অথচ নানি সেগুলো তাঁকে খেতে দিতেন না, স্বাস্থ্যগত কারণে। আমার একটা সাইকেল ছিল তখন। সেটি চালিয়ে পুরান ঢাকা থেকে দুয়েকবার এসব নিষিদ্ধ খাবার কিনে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেছি। নানিকে লুকিয়ে নানাসহ ছাদে চলে গেছি। তিনি খুব তৃপ্তি নিয়ে খেতেন। খুব আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন। অসম্ভব মেধাবী এবং বুদ্ধিদীপ্ত ছিল তাঁর কথাবার্তা, আর রস কৌতুকে ভরা। তাঁর শ্রোতা হওয়াটা ছিল একটা ভাগ্যের ব্যাপার। 

সিরিয়াসলি আপনার প্রথম গল্প বিশাল মৃত্যু প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিচিত্রায়, ১৯৭৩ সালে; তারপর দীর্ঘ বিরতি। কিন্তু এরইমধ্যে একাডেমিক লেখালেখি-শিল্পকলা-শিক্ষা-সাহিত্য নিয়ে বিপুল রচনা আমরা পেয়েছি, এছাড়া আপনি নিয়মিত কলাম লিখে চলেছেন। এসব কিছুর ভেতর দিয়েও আপনার গল্পকার পরিচয়টি উজ্জ্বলতর। সবকিছু ছাপিয়ে আপনার গল্পকার সত্তার শুরুর কথা ও বিকাশের গল্পটি যদি বলতেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : হ্যাঁ, ‘বিশাল মৃত্যু’ দিয়ে আমার গল্প লেখা শুরু হয়, ১৯৭৩ সালে। আমার এক বন্ধুর বাবা মারা যাচ্ছিলেন— মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়ে তিনি একটি ঘড়ি দেখতেন, দেয়ালে টাঙানো। তাঁর স্ত্রী বেশ কিছুদিন আগে গত হয়েছেন, স্ত্রী কিনে দিয়েছিলেন বলেই স্ত্রীর স্মৃতি হয়ত সেই ঘড়িতে তিনি খুঁজে পেতেন। শব্দ হয় বলে ঘড়িটা তার ছেলে সরিয়ে ফেলেছিল। সেখানে একটা সাদা দাগ ছিল, সেটা দেখে তিনি আঁতকে উঠতেন। চাঁদের মতো, থালার মতো গোল, ঘড়ি যেখানে অনুপস্থিত, সেই জায়গাটা অন্য জায়গা থেকে আলাদা। উনি এত বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন যে, পরে আবার ঘড়িটা সেখানে স্থাপন করা হয়েছিল। এই বিষয়টা আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল, একটা ঘড়ির শূন্যতা একজন মানুষকে এভাবে আর্ত করে! এটি মাথায় রেখে আমি গল্পটি লিখেছিলাম। গল্পটি ছিল এক ধরনের মুহূর্ত বর্ণনা। দুজন মানুষ শব্দ ও শব্দহীনতার পরস্পর-বিরোধী ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করছেন— কোনটা প্রকৃত, কোনটা অপ্রকৃত; সেই বিবেচনা সেখানে অর্থহীন। আর গল্প লেখার সময়টা ছিল খুব বেখাপ্পা— আমি মাঝে মাঝেই আজ, গতকাল আর আগামীকালের বিভ্রমে পড়তে হতো।  আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গল্পটি পড়ে বললেন, ভালো লাগলো না। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। আর কোনো ব্যাখ্যা দিলেন না। উনি কম কথা বলতেন। কিন্তু যা বলতেন, পরিষ্কার আর স্পষ্ট করে বলতেন। লেখক হিসেবে যেমন অসাধারণ ছিলেন, মানুষ হিসেবেও তেমন। তখন আমি একটু মনোক্ষুণ্ন হয়ে ভাবলাম যে, এতবড় একজন লেখক যখন আমাকে এভাবে নাকচ করে দিলেন, তখন আমার আর লেখার দরকার নেই, আপাতত। ততদিনে পিএইচডি করতে কানাডায় যাব, এই নিয়ে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। আর তখন আমি নতুন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ক্লাসের জন্য আমাকে প্রচুর সময় দিতে হতো। একটা ক্লাসে যাওয়ার আগে চার-পাঁচঘণ্টা প্রস্তুতি নিতে হতো। ফলে হাতে সময় বিশেষ থাকতো না। কানাডায় গিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে। একসময় পিএইচডি শেষ হলো। যখন দেশে ফিরলাম, গোছাতে গোছাতে সময় চলে গেল। নতুন করে আবার শুরু করতে সময় গেলো। আমি বাইরে থেকে প্রচুর বই এনেছিলাম, সেসব বই ছিল সাহিত্য বিষয়ের। ল্যাটিন আমেরকিার গল্প উপন্যাস ও সমালোচনাগ্রন্থও ছিল বেশ কয়েকটি। আর ছিল কিছু গল্প ও কবিতা সংকলন। আর ষাটের দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় সাহিত্যের যে বিশাল বিকাশ ঘটে গেলো, যাকে বলা হয় বুম টাইম বা বুম লিটারেচার; তার কিছু ফসলও ছিল। এদের অনেকে পরে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, যেমন মারিয়ো বার্গাস য়োসা, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, অক্টাবিয়া পাস। এরা সবাই তখন প্রচুর লিখছেন। কিছু কবির লেখা, কিউবার দু-একজন লেখক, তাদের চার-পাঁচটি করে বইও আমার সংগ্রহে ছিল। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে একটি করে বইয়ের দোকান থাকে, সেই দোকানে পাওয়া যায় না এমন বই প্রায় নেই, দোকানে না থাকলেও দিনের মধ্যে আনিয়ে নিতে পারতো। আমার সংগ্রহের বইগুলো জাহাজে করে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, খুব কম খরচে। হাসনাত ভাই তখন দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। 

এখন যিনি কালি ও কলম সাহিত্যপত্রের সম্পাদক, আবুল হাসনাত?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এখন তিনি কালি ও কলমে আছেন। হাসনাত ভাই আমাকে বললেন, বিদেশি সাহিত্য পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য একটা কলাম লেখেন। হাসনাত ভাই এমন মানুষ যে না করা যায় না। আমি রবীন্দ্রনাথের একটি গান থেকে কলামের নামটি নিলাম— অলস দিনের হাওয়া। কলামটি ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল, এবং আমার মনে হলো, বোধহয় ভালো একটি কাজ করছি। আশির দশকে যারা পড়াশুনা করতেন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই কলামটি পড়তেন। তখন সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীটি একমাত্র ছিল বাংলাদেশে, বড় কাগজের। আর লিটল ম্যাগাজিন তো অনেক ছিল। শহীদুল জহির, এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, আমার লেখা থেকে তিনি প্রথম জাদুবাস্তুবতার কথা শোনেন। আমি সাহিত্যের অনেক বিষয় ব্যাখ্যা করতাম, উদাহরণ দিয়ে। এভাবে প্রবন্ধের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়লাম। আর শিল্পকলার প্রতি আমার বহু আগে থেকেই আকর্ষণ ছিল। সেই ১৯৬৮ সাল থেকে আমি শিল্পকলা নিয়ে লেখালেখি করছি। দেশে ফেরার পর দেখলাম, ইংরেজিতে শিল্পকলা ও সংস্কৃতির ওপর লেখার একটা দাবি উঠছে। কারণ শিল্পকলার চাহিদা বাড়ছে। প্রদর্শনীর সংখ্যা বাড়ছে। শিল্পীদের কাজ বিক্রি হচ্ছে। পশ্চিমে আমাদের শিল্পীদের বিভিন্ন কাজ যাচ্ছে। ফলে ইংরেজিতে একটা লেখালেখির চাপ আমার ওপরে এলো। আর বাংলায় তো ছিলই। সব মিলিয়ে প্রবন্ধ এবং গবেষণা আর শিল্পকলার নিয়ে লেখালেখি আমাকে ব্যস্ত রেখেছিল।

কিন্তু মাঝখানে গল্প লেখায় দীর্ঘ বিরতির নেপথ্যে কোনো বিশেষ ব্যাপার ছিল কিনা?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : না, তেমন কোনো কারণ নেই। আমি এরকম মানুষ নই যে, একটা বিশেষ চিন্তা আমার মাথায় আসছে বলে সেটাকেই আমি শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়ব। উল্টোটিই বরং। আমি কোনোকিছুতেই মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে দিই না। যখন যা ইচ্ছে হয় তাই করি। যখন যেটা ভালোলাগে সেটা করি, আমার নিজের জন্যেই করি। ১৯৮৯ সালে আফসান চৌধুরী আমাকে একটা গল্প লিখতে বললেন বিচিন্তার জন্য। ‘বিশাল মৃত্যু’ গল্পের যে কজন পাঠক ছিলেন তার মধ্যে একজন হচ্ছেন আফসান। তিনি নিজেও লেখালেখি করেন। ভালো গদ্যকার। বিচিন্তার সম্পাদক ছিলেন মিনার মনসুর। আফসান চৌধুরীর পিড়াপিড়িতে গল্পটা লিখলাম। সেই গল্পটিও ছিল বাস্তবভিত্তিক— পুরান ঢাকার জীবন নিয়ে, যেটা আমার নিজের চোখে দেখা। সেটি বিচিন্তায় বেরুনোর পর খুব পাঠকপ্রিয়তা পেল। অনেকে আমার সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে বললেন, আপনি গল্প লেখেন। মজার ব্যাপার হলো, আমি এক কপি বিচিন্তা ইলিয়াস ভাইকে পৌঁছে দিলাম। এরকম একটা শঙ্কা নিয়ে যে, তিনি আবার আমাকে চিরস্থায়ীভাবে গল্প লিখতে নিষেধ করবেন। কয়েকদিন পর তাঁর সঙ্গে পথে দেখা। আবেদিন কাদের নামে বিটিভির এক তরুণ প্রডিউসার ছিলেন, লেখালেখিও করতেন; এখন তিনি নিউইয়র্কে থাকেন। আমি আর আবেদীন কাদের ছিলাম একসঙ্গে। ইলিয়াস ভাই বললেন, তুমি  সেদিন যে গল্পটি দিলে, ভালোই তো লাগল। বেশ মজার গল্প। পুরান ঢাকায় তুমি ছিলে নাকি কখনো? আমি বললাম, আমি তো একসময় তিন মাসের জন্য ছিলাম, ১৯৭৩ সালে। বললেন, হ্যাঁ। ভালোই হয়েছে। এর বেশি কিছু না। কিন্তু এই কথাকটিই আমার কাছে মনে হলো বিশাল একটা পাওয়া। এর কিছুদিন পর ভোরের কাগজ বেরুলো এবং পাঠকদের সমর্থন পেলো। ভোরের কাগজ সাময়িকীতে ‘পূর্বপুরুষ’ নামে একটা গল্প লিখলাম। সৈয়দ শামসুল হক ফোন করে বললেন, মনজুর, খুব ভালো লেগেছে গল্পটি। হক ভাই এর থেকে বেশি কিছু বললেন না, কিন্তু আমি খুব অনুপ্রাণিত হলাম। এভাবে একটা দুটো করে কিছু গল্প বেরুতে থাকলো। হঠাৎ একদিন আবদুল মান্নান সৈয়দ আমাকে বললেন, আপনি তো একসময় কবিতাও লিখতেন, এখন গল্পতো ভালোই লিখছেন।

আপনি সত্যিই কবিতা লিখতেন নাকি?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমার ২/৩ টি কবিতা ছাপা হয়েছে এমন সব কাগজে, যেগুলো পাঠকের সমীহ আদায় করতো। যেমন সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল; আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কণ্ঠস্বর; পরিক্রমা ইত্যাদি। আমি বললাম, মান্নান ভাই, কবিতা আমার ভালোলাগে না। তিনি বললেন, এটা কেমন কথা হলো? আমি বললাম, আমার নিজের কবিতা একদম ভালো লাগছে না। মান্নান ভাই বললেন, এতো খুব মজার। আমি বললাম, কবিতা না, আমি গল্প লিখব। মান্নান ভাই একাধারে শক্তিশালী কবি এবং গল্পকার। বাংলা সাহিত্যে এরকম প্রতিভা খুব কম দেখা যায়। সত্যের মতো বদমাশ নামে তার একটি বই আছে। 

মান্নান সৈয়দের প্রথম গল্পগ্রন্থ?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : হ্যাঁ। এত সাহসী গল্প, সুন্দর গল্প। অথবা জন্মন্ধ কবিতাগুচ্ছ। দুই ভুবনে দুই শ্রেষ্ঠ কাজ করে বসে আছেন। আর প্রবন্ধ? মানিকের উপর লিখছেন, জীবনানন্দের ওপর লিখেছেন। আমাকে কিছু বই দিয়েছেন। নিজের হাতে লিখে দিতেন। তার সাথে একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। মান্নান ভাই বললেন, আমার মনে হয় আপনি গল্প লিখতে পারবেন। তখনও মান্নান ভাই আমার একটি মাত্র গল্প পড়েছেন। তারপর যখন চার পাঁচটা গল্প হলো, উনি একদিন আমাকে ডেকে বললেন, বেশ মজা লাগলো তো গল্পগুলো পড়ে। তখন বইমেলা চলছিল। সেই সময় চায়ের দোকান ছিল। বসা যেত, আড্ডা মারা যেত। আড্ডায় তিনি বললেন, ভালোই তো। হঠাৎ দেখি, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ। বইমেলাতে প্রায়ই আড্ডার আসরে আসতেন আতিকুল্লাহ। বললেন, মনজুর, আমি তো জানতাম না, আপনি গল্প লিখছেন। অনেক উৎকণ্ঠা নিয়ে একটি গল্প দিলাম। পড়ে বললেন, মান্নান ভাইয়ের মতো— ভালোই তো। এরপর আমার আর কোনো দ্বিধা থাকলো না। বড় বড় মানুষজন এভাবে বলার পর দারুণ অনুপ্রেরণা তৈরি হলো নিজের ভেতরে। আপনার পুরনো প্রশ্নে ফিরে গিয়ে বলতে পারি, এই যে দীর্ঘসময় আমি কাজ করিনি, তার কারণ গল্প লেখার জন্য কিছু অনুপ্রেরণা হয়তো খুঁজছিলাম।  বাইরের অনুপ্রেরণা থেকেও তো নিজের ভেতরে অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। আমি বিশ্বাস করি যে, আমার ভেতরে গল্প তৈরি হচ্ছিলো। আমার গল্পগুলির বেশিরভাগই জীবন থেকে নেয়া। বেশিরভাগ গল্পই খবরের কাগজের পাতা, আমার ছাত্রছাত্রীদের জীবনের বর্ণনা, তাদের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। আর আমার নিজের তো আছেই। কখনো কয়েকটি গল্প জোড়া লেগে একটা গল্প তৈরি হয়ে যায়। 

আপনার গল্প লেখার প্রেরণা বা নেপথ্যে গুরুর প্রসঙ্গ এলে নিজ শহরের এক বৃদ্ধা, যিনি সম্পর্কে আপনার দাদি এবং বাসার কাজে নিযুক্ত হাবিব ভায়ের কথা বলে থাকেন; এই দুজন মানুষ সম্পর্কে আরেকবার যদি বলেন!
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : যে বৃদ্ধার কথা বলেছি, তিনি আমাদের পাড়ার এক হিন্দু বিধবা ছিলেন। খুবই শুচিবায়ুগ্রস্থ ছিলেন। আমরা কেউ তাকে দিদা কেউ দাদু বলে ডাকতাম। দাদির বয়সী। তিনি নিজেকে একটা বৃত্তের মাঝে রাখতেন, যেখানে কাউকে ঢুকতে দিতেন না। পান খেতেন। যাঁতা দিয়ে সুপারি কাটতেন আর গল্প বলতেন। গল্প বলায় তার ভেতরে যেন একটা বাধ্যবাধকতা ছিল। কম্পালসিভ স্টোরি টেলার বলে ইংরেজিতে একটা বর্ণনা কোলরিজের সেই এ্যানশেন্ট ম্যারনিার যার উদাহরণ। ওই বুড়ো নাবিকটি গল্প না বললে বাঁচবে না। আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতে সেই বৃদ্ধা পছন্দ করতেন। নিঃসঙ্গতা হয়ত ছিল, সেটা ভরাট করতেন। তিনি যখন গল্প বলতেন, অবাক কাণ্ড, গল্প শেষ করতে চাইতেন না। গল্পটা নিয়ে তিনি খেলতেন। একটা জায়গায় এসে তিনি হঠাৎ করে গল্প বলা থামিয়ে দিতেন। হয়তো তিনি সুপারি কাটছেন, আমরা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, কী দাদু, এরপর কী হলো? তিনি বলতেন, আরে গল্প তো হাওয়া হয়ে যায় না। কথাটা এখনও আমার কানে লেগে আছে। তারপর তিনিই বলতেন, তোরাই বল না, গল্পটা কীভাবে শেষ হলো। আমি যখন গল্পটা শেষ করতাম, দুষ্টুমি করে রাজকন্যাকে মেরেই ফেলতাম। সবাই রেগে যেতো, ঘুষি লাগাতো। আরেকজন হয়ত রাজকন্যাকে বিয়ে দিয়ে খুব আনন্দ পেল। দিদা বলতেন, রাজকন্যা বেঁচে গিয়ে বিয়েও করতে পারে, অথবা মারাও যেতে পারে। সব সম্ভাবনা গল্পের ভেতরে থাকে। তার কাছে গল্পের ভেতরটা ছিল একটা জীবন্ত বাস্তবতা। তিনি সেই গল্পের অঞ্চলেই বসবাস করতেন। আর একজন ছিলেন আমার বাসার কাজের মানুষ, হাবিব ভাই। কালো, দীর্ঘদেহী স্বাস্থ্যবান মানুষ। বিশাল দরাজ গলা ছিল। আমি যে এত ভক্ত হাছন রাজা এবং রাধা রমনের, তার কারণ হচ্ছে হাবিব ভাই। দরাজ গলায় গানগুলি গাইতেন। এখন যে ভ্রমর কইয়ো গিয়া বলে টান দিয়ে গান গেয়ে ওঠে অনেকে, সেটা উনি গাইতেন। একদম অরিজিনাল সুরে। হাছন রাজার অনেক গান এখন বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আয়না দিয়া চাইয়া দেখি— ওটা সুনামগঞ্জের সিলেটি ভাষায় হাবিব ভাই গাইতেন। ফলে আদি গানগুলো আমি শুনতাম। আর গল্প বলতেন। ছোটবেলায় আমার বেশকিছু অসুখ-বিসুখ থাকায় স্কুলে যেতে দেরি হয়েছিল। মা ছিলেন শিক্ষিকা, বাবা তো বিভিন্ন জেলায় কাজ করতেন; আমি মায়ের সঙ্গে সিলেটে থাকতাম। মা যখন স্কুলে চলে যেতেন, হাবিব ভাইয়ের পাল্লায় পড়তাম তখন আমি। আমার ছোট বোনটা এত ছোট ছিল যে, ঘুমিয়েই থাকতো। কাজের মহিলাও ছিলেন। সে ছোটবোনকে দেখতো। আমার দেখাশোনা করতেন হাবিব ভাই। আমার বাকি ভাইবোন যারা বড়, স্কুলে চলে যেতেন মায়ের সঙ্গে। এই সময়টা ছিল আমার জন্য দুর্দান্ত সময়। হাবিব ভাই আমাকে অনেক সময় কাঁধে তুলে নিতেন। কাঁধে নিলে আমি একটা এরিয়্যাল ভিউ পেতাম, আকাশ থেকে দেখার মত আর কি। আর সেই গানগুলি গাইতেন মাঝে মাঝে এবং গল্প বলতেন। এবং গল্পের সাথে গান, অভিনয়। গল্পের ভাব-অভিমানগুলি, দুঃখ-চিৎকার ইত্যাদি তিনি অভিনয় করে শোনাতেন। গল্প বলার ভঙ্গি যে এত সুন্দর হতে পারে, হাবিব ভাই সেই ছোটবেলায় আমাকে তা দেখালেন। এর একটা প্রভাব আমার ওপর পড়েছিল। আমার মনে হয়, গল্প বলার ভঙ্গিটি এমন হওয়া উচিৎ যাতে আমি মানুষকে স্পর্শ করতে পারি। সিরিয়াস গল্প আমি কখনো লিখতে পারিনি। আমাদের দেশে কিন্তু দুটো ঐতিহ্য আছে, গল্প বলার এবং গল্প লেখার। যে দেশে মাত্র কিছুদিন আগে ৬০% মানুষ শিক্ষিত হলো (আগে তো ১০-৩০% মানুষ শিক্ষিত ছিল)। সে দেশে তো গল্প লেখার বিষয়টা অনেক পরের। সেটা যে খুব পুরুষ্টু, তাও নয়। সৃষ্টি হওয়ার কথা কিন্তু মানুষ গল্প তো বলে আসছে সেই অনন্তকাল ধরে। গ্রামের মজলিশে, উঠানে, ঘরের দাওয়ায়, বিছানায় দাদু বা হাবিব ভাইয়ের মতো মানুষ সেই কতকাল থেকে গল্প বলে আসছে। ফলে লেখার চেয়েও আমি কথনে বিশ্বাসী। লেখার বিষয়টা যদি প্রধান হয়ে ওঠে, তাহলে গল্প হয়ত আধুনিক পশ্চিমাদের মতো একটা খোলস পরে দাঁড়িয়ে থাকবে। যার ভেতরে প্রবেশ করাটা কঠিন। এই ধারার গল্প যে হয়নি, তা নয়। প্রচুর হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে সবার জন্য উৎকর্ষ অর্জন সম্ভব হয়নি। যারা পেরেছেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক অথবা আবদুল মান্নান সৈয়দ— তারা ভালোভাবেই পেরেছেন। তবে এদের মধ্যে গল্পকথনের ঐতিহ্যটাও আছে। শওকত ওসমানের ভেতরে আছে, শওকত আলীর ভেতরে হয়ত নেই, কিন্তু তার যে ভাষা এবং বর্ণনা, গতিময়তা, তা নিমেষেই আমাদেরকে তার গল্পের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই দুই ধারার সংমিশ্রণে আমাদের গল্পের ভূমি গড়ে উঠেছে। আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছি গল্পকথনের ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে।

গল্প লেখার ক্ষেত্রে আপনার বিশেষ ভঙ্গি বা প্যাটার্ন মনোযোগ আকর্ষণ করে। এই যে ভঙ্গি, এটাকে স্টাইল অব সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলব, নাকি নিরীক্ষাপ্রবণতা?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আধুনিক সাহিত্যিকরা যেভাবে টাইম শিফট বা চেতন প্রবাহের টেকনিক নিয়ে কাজ করেন, আমি ঠিক ওভাবে জেনে শুনে নিরীক্ষাতে যাইনি। আমার কথা হচ্ছে, আমার গল্প তো দাঁড়িয়ে যায় নিজে নিজে। একটা ভঙ্গিও এতদিনে দাঁড়িয়ে গেছে, যেটা আবার কথনের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলে যায়। মিলান কুন্ডেরার কথা বলি, আমার অসম্ভব প্রিয় একজন লেখক। তিনি যখন জীবনকে দেখেন তার মাঝখানে হঠাৎ যেন একটা রহস্য ঘনিয়ে ওঠে। তার মানব-মানবীর চরিত্রের ব্যাখ্যা দেয়া, সম্পর্কের গূঢ় তত্ত্বগুলি আবিষ্কার করা— এসবের মধ্যে নিজেকে গল্পে স্থাপন করা। এই ধারাগুলি আমার খুব ভালো লাগতো, যখন পড়তাম। আমার যে ধারাটা, এটি মূলত সহজিয়া একটি ধারা। এই ধারায় লিখে আনন্দ পাই। লেখার উপাদানগুলি আমার নিজের ভেতরেই ছিল, যখন সাজাতে বসলাম, দেখলাম একটা স্টাইল তৈরি হয়ে গেছে। আমার মতো অনেক তরুণ লিখছেন, হয়ত আমার চেয়ে ভালো লিখছেন। আমি নিশ্চিত যে, আগামীতে আরও ভালো লিখবেন। সব মিলিয়ে মানুষ যখন বলে, আপনার ধারাটা ভিন্ন, আমার বেশ ভালোই লাগে। আমার প্রিয় লেখকদের কিছু প্রভাব তো আছেই। কিন্তু তা কাজ করেছে গল্প বলার পদ্ধতিটাকে কিছুটা ঘষামাজা করতে । গল্প তো বয়নশিল্প, বাবুই পাখি যেমন বাসা বানায় নানান খড়কুটো দিয়ে। আমি মনে করি গল্পও তেমন এক নির্মাণপ্রক্রিয়া।

গল্প পাঠের পর, পাঠকের এই যে অনুরাগ বা মগ্ন ঘোরগ্রস্ততা, ফলে কখনো এটিকে উদ্ভট বা পরাবাস্তবও মনে হয়। এটা কি আপনার সচেতন কোনো প্রবণতা?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : পরাবাস্তব তো আমাদের জীবনেই আছে। কারো এমন হয়নি— কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না— কোনো না কোনো সময়, গভীর রাতে অথবা দুপুর-অপরাহ্ণে হঠাৎ কোনো ঘোর লাগেনি। রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে আমি গন্তব্য ভুলে গেছি। অথবা একটা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছে যে মেয়েটিকে আমি সারাজীবন দেখতে চাই; বা একজন ভিক্ষুকের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, আমি একজন ইতর মানুষ। বাস্তব আর পরাবাস্তব কিন্তু দূরের বিষয় নয়। বাস্তবের ভেতরেই পরাবাস্তবতা লুকিয়ে থাকে। এক দুপুরবেলা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে দেখছি, একটা লোক খাচ্ছে আর কাঁদছে। কিছুক্ষণ পর খাওয়া বন্ধ করে কাঁদতে শুরু করেছে। বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি কি অসুস্থ? সে বলল, না স্যার, উনি মাঝে মাঝে এসে কাঁদেন। পরে যখন লোকটি বেরিয়ে গেল, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে, মনে হলো যেন কিছুই হয়নি তার। বেয়ারাটি বলল, একসময় এক মহিলাকে নিয়ে এখানে খেতে আসতেন। হয়ত উনি মরে-টরে গেছেন। তো এই লোকের বাস্তব থেকেও বড় একটা বাস্তব আছে। এখানে এলে তার তা মনে পড়ে। আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতায় আমরা পরাবাস্তবকে দূরে রাখতে চেষ্টা করি। কিন্তু রাত তিনটার সময় যখন প্যাঁচা এসে ডাকে, যেমনটি আছে আট বছর আগের একদিন কবিতায়, তখন বোঝা যায়, পরাবাস্তবটা কী সত্য! অথবা জীবনানন্দের কবিতায় হেমন্তের ধানক্ষেতের যে বর্ণনা, তা বাস্তবের মাত্রাটা ছড়িয়ে যায়, যে মাত্রায় আমি নিজেকে কখনো দেখতে পাইনি। ছিন্নপত্র-এ রবীন্দ্রনাথ রাতের যে বর্ণনা দিয়েছেন, মনে হয় এমন অন্ধকার আমি কোনোদিন দেখিনি। দেখতে গিয়ে মনে হয়, এই অন্ধকার আর দশটা অন্ধকারের মতো নয়। 

এ প্রসঙ্গে ‘জলপুরুষের প্রার্থনা’ গল্পটির উল্লেখ করতে পারি, যেখানে মৎস্যকন্যাকে আমাদের ম্যাজিক মনে হয় না যদিও এটি কথিত বা বাস্তবে সাগরের ঢেউ মাত্র; তবু তা হয়ে ওঠে বাস্তবেরই জলদেবী। ফলে জলকন্যার সাথে শেকুল আরেফিন নামের যুবক, যে তার কোম্পানি থেকে ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে এসেছে সমুদ্রসৈকতে, পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। সে গালগল্পে বা স্নান-উল্লাসে মেতে উঠলে আমাদের বোধগুলো কেমন স্থবিরতা পায়। এ সম্পর্কে আপনার বিবেচনা কী?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এই গল্পটি লেখার একটা পটভূমি আছে। কয়েক বছর আগে— তাইওয়ান এয়ারপোর্ট থেকে একটা বিমানে রওনা হয়েছি। কিন্তু কী কারণে কিছুক্ষণ পর বিমান নিচু দিয়েই চক্কর খেতে থাকে। এয়ার করিডোর এত ব্যস্ত, যে উচ্চতায় প্লেনটা উড়বে সেই পথে হয়ত আরেকটা প্লেন আসছে। আমাদেরকে বলা হলো, করিডোরে যেতে কিছুক্ষণ সময় লাগবে। তাই চক্কর দিচ্ছে বিমান। বিমানে এমন হয়। বিমানটা একটু নিচে নামিয়ে আনলেন পাইলট। তিনি বললেন, আপনারা দেখুন, এই বে-টা কী সুন্দর! বে মানে নিচের উপসাগর। আমি বসেছিলাম জানালার পাশে। পাইলট হাসতে হাসতে বললেন, আপনারা জানেন কি, এই সমুদ্রে একসময় মৎস্যকন্যা দেখা যেত? জলকন্যারা খেলতেন আর পুরুষেরা দাঁড়িয়ে হাততালি দিতেন। এখনও খুঁজে দেখলে দু’একটা মৎস্যকন্যা দেখতে পেতেও পারেন। পাইলট কথাটা বলছিলেন যে, তার সামান্য ভুল হলে বা বৈজ্ঞানিক ত্রুটি হলে তিনিও মরবেন, সাথে আমরাও। তার কথাটা বৈজ্ঞানিক কোনো সত্য নয়, একটা গল্প মাত্র, অথবা মিথ— দূরবর্তী একটা মিথ; আজকালকার কোনো গল্পও নয়। পাইলটের কথা শুনে প্রত্যেক যাত্রী নিচে তাকিয়ে বলতে শুরু করল, কই কই...? আমার তখন মনে হয়েছিল, এই জলকন্যা আসলে জলকন্যা নয়, এটা আমাদের ভেতরের একটা কাল্পনিক ছবি। তারা সবাই যে উঁকি মারলেন, আমার খুব মজা লাগলো। বেশিরভাগ লোকই কিন্তু সাদা, যাদেরকে আমরা মনে করি খুবই যুক্তিবাদি বা যুক্তিবাদিতার পরাকাষ্ঠা। তারা যখন কই কই করে নিচের দিকে তাকালো, ভাবলাম, প্রত্যেকের ভেতরে একটা শিশু লুকিয়ে থাকে। পাইলট নিজেও একটা শিশুর মতো কাজ করল। আর মানুষগুলোও শিশুর মতো একটা বিশ্বাসের বস্তু খুঁজছে। কিছু কিছু মিথ আমাদের জীবনে এমনভাবে মিশে যায় যেগুলো থেকে বিচ্যুত করাটা আমার কাছে খুব নির্মম মনে হয়। আমি কোথাও বলিনি, জলকন্যা কোনো অপ্রকৃত বিষয়। হোটেলের মালিকও একসময় জলকন্যাকে কাঁধে তুলেছিলেন। পুরোটাই আজগুবি। কিন্তু একটা স্তরে পুরোটাই সম্ভাবনার গল্প। 

এখানে একটা কথা বলবার যে, আটপৌরে বাস্তব কাহিনি দিয়ে গল্পের শুরু হলেও আপনার গল্পের পরিণতি খুঁজে পায় রূপকথার মতো, কেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমার গল্পে পরিণতিটা কখনো কখনো রূপকথার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু অনেক গল্পেই তো দুঃখ এবং বিষাদ থেকে যায়। আমি রূপকথার কিছু উপাদান ব্যবহার করি, কাঠামোটি নয়। রূপকথার প্রতীকী মাত্রাটি হয়তো থাকে কোনো কোনো সময়। রূপকথার রাজপুত্র একজন প্রতীকী চরিত্র, যিনি তলোয়ার হাতে সবাইকে শায়েস্তা করেন। রাজকন্যা হচ্ছেন সৌন্দর্যের ও প্রেমের প্রতীক যাকে তিনি রক্ষা করবেন। আমরা যদি এই প্রতীকী মাত্রাটি  জীবনে খুঁজতে যাই, দেখব এই রূপকথা আমাদের জীবনে। প্রত্যেকটি মানুষের জীবন একটা রূপকথার মধ্য দিয়ে যায়। কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আপনার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, কী চাইছেন? তিনি হাত তুলেই হয়ত বলবেন, হ্যাপিলি এভার আফটার। এই চাওয়াটা রূপকথার। বাস্তব জীবনে কিন্তু কেউ অতদিন বাঁচে না, বিয়ের তিন বছরের মধ্যে ছাড়াছাড়িও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ওই মুহূর্তটিতে ঠিক তাই মনে হয়। আমার কোনো ছাত্র বা ছাত্রীর যখন বিয়ে হয় এবং আমি বিয়েতে যাই, দোয়া করতে বললে মনে মনে বলি যেন হ্যাপিলি এভার আফটার থাকো। রূপকথার কল্পনাটা আমাদের ভেতরে সবসময় কাজ করে। রূপকথার মতো আমাদের জীবনের গল্পটিকে সাজাতে চাই। তার মানে এই নয়, একটি অলীক কল্পনার হাতে আমরা নিজেদের ছেড়ে দিচ্ছি। আমি বরং আমাদের ভেতরের বাইরের যে বাস্তবতা, তার ভেতর দিয়ে নিত্যদিন পথচলা আমাদের। আমার গল্পটিকে বসিয়ে দেই। একটা গল্পের কথা বলি, ‘মলিনার এক রাত্রী’— সুখদুঃখের গল্প বইতে এটি আছে। ভয়ানক এক দুঃখের গল্প। রূপকথা থেকে হাজার মাইল দূরের গল্প। আমি যে শুধু অলীকভাবে গল্প সাজাই তা নয়, বাস্তব অবাস্তবের মাঝে একটা ভারসাম্য রেখেই চলি। 

আচ্ছা মনে করেন, ঢাকার শাহবাগ মোড়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটলো : বাসের তলায় পড়ে একটা স্বল্পচোখে দেখা সুন্দরী তরুণী নিহত হলো। এখন দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক এটাকে নিয়ে প্রতিবেদন লিখলো, টেলিভিশনের রিপোর্টার বিভিন্ন ফুটেজ সংগ্রহ করে মানুষের মতামত বা প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে প্রতিবেদন প্রচার করলো। কিন্তু একজন গল্পকারের চোখে বিষয়টি কীভাবে ধরা দেয়?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি যদি এমন দেখি, প্রথমে ভাববো আমি একজন মানুষ। আমার চোখের সামনে একটি মৃত্যু দেখছি। ফলে প্রথমেই আমার ভেতরে কান্না আসবে, ক্রোধ আসবে। এটি সবার ভেতরেই হবে, যদি সে অমানুষ না হয়। এমনকি যার গাড়ির নিচে পড়ে তরুণীটি মারা গেছে, সেই লোকটিও একসময় নিজেকে অপরাধী হিসেবে ভাবতেও পারে। ফলে প্রথমেই গল্পের বিষয়টা মাথায় আসবে না। কোনো গল্পকারই এতখানি নির্মম নন যে, জীবনের সামনে এরকম একটা সৌন্দর্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি বিচলিত হবেন না। গল্পটা পরে আসবে। সে জন্য সময় লাগবে। গল্পটা তাহলে কখন আসবে? আমি যখন জানব, মেয়েটি ঝাঁপ দিয়েছে বাসের নিচে বা আগামীকাল তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। অথবা সে ফুল দেখতে গিয়েছিল ভাবি স্বামীর সঙ্গে। স্বামীর চোখের সামনে মেয়েটি মারা গেছে। একশ রকম ঘটনা থাকতে পারে। আমি চেষ্টা করব, এটিকে জীবন্ত রাখার জন্য। যাতে আমরা ভুলে না যাই। আমি যদি এই মৃত্যুতে আলোড়িত হই তাহলে মেয়েটিকে তুলে রাখতে হবে, আর দশটি মেয়ের মতো তাকে হারিয়ে যেতে দেব না, আমি ভাবব। দেখি না এই মেয়েটিকে নিয়ে আগামীতে মানুষ ভাবে কিনা, তখন সেই মেয়েটির সম্পর্কে কিছু না জেনেও একটা গল্প তৈরি করে ফেলতে পারি। তার পেছনে আরেকটা কারণটা থাকবে : যে অভিঘাত আমার উপর পড়েছে, তার আবেগমোক্ষণটাও তো দরকার। সে কারণেও হয়ত আমি গল্পটি লিখব। লিখতে গিয়ে হয়ত আমি গল্পের ভেতর অন্যান্য উপাদান যুক্ত করে দিতে পারি। হয়ত সেখানে যেটি ছিল না তা নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু মেয়েটির মত্যুর নির্মমতাটি আমার গল্পে থাকবে, এটিকে আমি আড়াল করার কোনো চেষ্টা করব না। সেই নির্মমতার কারণে যে মেয়েটি হারিয়ে গেল, হারানোর এই বোধ যেন পাঠকের মনে কান্না তৈরি করে। আবার এই কান্না এবং ক্রোধে যেন নিজেকে আত্মস্থ করারও একটা সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে গল্পটি যেন একটি শিল্পও হয়। যেন খবরের প্রতিবেদন না হয়, তার থেকে সামান্য কিছু বেশি হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখব। 

লেখালেখির ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে আপনি কীভাবে বিচার করেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : অন্যের কথা বলতে পারব না, আমার নিজের কাছে মনে হয় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যার অভিজ্ঞতা পরিব্যাপ্ত নয় তার পক্ষে গল্পের অঞ্চলে বেশিদূর যাওয়াটা খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে। গল্পের আকর্ষণটা তখন আর তীব্র হয় না। গল্পে আকর্ষণ তৈরির জন্য বাস্তব জীবনের কিছু কিছু অভিজ্ঞতা থাকা দরকার। যে কারণে বিমূর্ত একটি গল্প যখন কেউ ছাপান তখন সেটি পড়ে পাঠক খুব আনন্দ পান বলে মনে হয় না। বিমূর্ত গল্পও লেখা যায়, শিল্পের একটা অঞ্চলে বাস্তবকে অস্বীকার করে গল্প লিখা সম্ভব— সেরকম গল্প লেখাও হয়েছে প্রচুর। কিন্তু আমি যে ধরনের গল্প লিখি সেখানে বাস্তব থেকে যদি খুব দূরে চলে যাই তাহলে মানুষ ভাববে ওই গল্পে কোনো অংশগ্রহণ নেই। এখানে বিপরীত কোনো চিত্র আমার থেকে এসেছে। আমি একটা ব্যাখ্যা দেই— একটা মুক্তা, তার ভেতরে যদি বালির দানা না থাকে তাহলে কিন্তু মুক্তাটা মুক্তা হয়ে উঠবে না। বালির দানাটা বাস্তব, মুক্তাটা হচ্ছে গল্প। আর বাস্তবতার ওপর, তার চারদিকে কল্পনার, এমনকি অলীক ভাবনার ঘেরাটোপ দিলেও গল্পের জীবনসত্যটা আড়াল পড়ে না, অনেক আকর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায় বরং।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।