রাত ১০:২০ ; শনিবার ;  ২০ এপ্রিল, ২০১৯  

ক্ষুদে পরিবেশবিদ তাওহীদ

প্রকাশিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট॥

ছোটোবেলা থেকেই ছেলেটার মজার কাজ ছিল মানুষকে ভরকে দেওয়া। জমজ দুই ভাই হলে যা হয়, বাবা-মায়ের সামনেও দোষ ঢাকতে ভাইয়ের নাম বলা। কতবার ভাইয়ের ক্লাসে গিয়ে প্রক্সি দেওয়া। এটা কে তুমি না তোমার ভাই- এই প্রশ্নের উত্তর যে তাকে কতবার দিতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। জমজ হিসেবে টিভি শো, শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের মডেল হওয়া সবই করেছেন। হুট করেই এই ছেলেটা পাল্টে গেল। সিরিয়াস সব কাজ কর্ম নিয়ে ঘুরেফিরে। প্র্যাক্টিক্যাল অ্যাকশন ইউকে আয়োজিত অর্গানিক ফার্টিলাইজার স্টাডি বিষয়ক ওয়ার্কশপে গিয়ে দেখে সবচেয়ে ছোট সেই। বড়বড় গবেষক, এমফিল, পিএইচডি'র ছাত্রদের মধ্যে তিনিই হচ্ছে সবচেয়ে কমবয়সী তরুণ। যে কিনা ইতোমধ্যে পরিবেশ নিয়ে বিশাল বিশাল কাজ শুরু করে দিয়েছে। ছেলেটির নাম তাওহীদ হোসাইন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতক শেষ করেছেন।

পড়াশোনা মাটি, পানি ও পরিবেশ নিয়ে তাই তার কাজ কর্মও শুরু হয়েছে এইসব ঘিরেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেউড়ি পাড়ি দেওয়ার আগেই তৈরি করেছেন এনভায়রনমেন্টমুভ ডটকম। বাংলাদেশের একমাত্র পরিবেশ বিষয়ক নিউজ পোর্টাল। শুধু এই নিউজ পোর্টালেই থেমে থাকেননি তাওহীদ। পরিবেশ নিয়ে নানা কাজ শুরু করেছেন তিনি। পেয়েছেন প্রচুর সম্মাননা ও অ্যাওয়ার্ড।

লাঞ্চপ্যাডে উদ্যোক্তার পুরস্কার জেতার দিন 

এত কিছু থাকতে কেনও এনভায়রনমেন্টমুভ ডট কম ( www.environmentmove.com) নিয়ে কাজ শুরু করলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানালেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় তিনি একটি নিউজপোর্টালের আন্তর্জাতিক ডেস্কে কাজ করতেন। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদের চেয়ে বিদেশি ওয়েবসাইটগুলোর পরিবেশ-প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী আর কৃষি নিয়ে তাদের তথ্যসমৃদ্ধ ফিচারগুলোতে তার চোখ ছিল বেশি। ইংরেজিতে এসব লেখা-ছবি আর ভিডিও কনটেন্ট গুলো দেখতে দেখতে বাংলায়ও এমন সব কনটেন্ট আর প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া এবং পড়ার জন্য মনের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু ওয়েবের দুনিয়ায় এমন কোনও বাংলা প্লাটফর্ম পেলাম না যেখান থেকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও আনন্দদায়ক করে বাংলায় পরিবেশ- প্রকৃতি- বন্যপ্রাণী বিষয়ক নানা তথ্য তুলে ধরা যায়। সেখান থেকেই এনভায়রনমেন্টমুভ ডট কম।

তাওহীদ আরও জানান, এনভায়রনমেন্টমুভ ডট কম মূলত ওয়েব ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় ব্যাক্তি মানুষেরও। সেখান থেকেই এই যাত্রা। এরই অংশ হিসেবে ওয়েবসাইটটিতে ২০০০ এর বেশি কনটেন্ট সমবেত করেছে তাওহীদ ও তার টিম। পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক যেকোনও চলতি খবর, দিবস ও কর্মসূচির নিয়মিত খবর তো আছেই

তাওহীদ বলেন, ২০১৪ সাল ছিল এনভায়রনমেন্টমুভ ডট কমের জন্য একটি সাফল্যের বছর। ২০১২ সালে যাত্রা শুরুর পর একজন থেকে দশজনের একটি টিম তৈরি করতে পেরেছেন তারা। টিমের সদস্যরা সবাই পরিবেশবিজ্ঞান-জীববিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রী। গত ২৯ অগাস্ট এই দলটি জিতে নেয় লাঞ্চপ্যাড বাংলাদেশ সিজন ওয়ানের চ্যাম্পিয়নের সম্মান। ইএমকে সেন্টার ঢাকা ও ইউএস গভর্নমেন্ট ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট এর সহযোগিতায় দা প্রেনরস' এর উদ্যোগে ব্যবসায়ী ও তরুণ উদ্যোক্তা বিষয়ক সম্মাননা ছিল এটি। আর সিড ক্যাপিটাল হিসেবে ২.৫ লাখ টাকা পুরস্কারও পান তাওহীদ ও তার দল।

দিল্লি থেকে জেতা পুরস্কার 

২০১৪ এর ডিসেম্বরে পান আরও একটি সাফল্য। পরিবেশ-প্রকৃতি- বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতনতা তৈরিতে এনভায়রনমেন্টমুভ ডটকম জিতে নেয় দ্য মানথান অ্যাওয়ার্ড ফর সাউথ এশিয়া অ্যান্ড এশিয়া প্যাসিফিক-২০১৪। দিল্লিতে আয়োজিত এই সম্মাননার ই-নিউজ ও জার্নালিজম ক্যাটাগরিতে শীর্ষস্থান অর্জন করে তাওহীদের ওয়েবসাইট। ইতোমধ্যে এই ওয়েবসাইটটি যুক্ত হয়েছে সমুদ্ররক্ষা বিষয়ক সংগঠন সেভ আওয়ার সি এর সঙ্গে। এদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে কাজ না করলেও নানা উদ্যোগের সংবাদ নিয়মিত প্রচারের দায়িত্ব এনভারয়মেন্টমুভ ডটকমের।

তাওহীদ সরকারি কিংবা ব্যাংকের চাকরির জন্য মাথা গুঁজে গাইড বই পড়তে রাজী নন। স্বপ্ন দেখেন এনভাইরনমেন্টমুভ ডটকমকে বাংলাদেশের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বা ডিসকভারি করে গড়ে তুলতে। প্রাণ প্রকৃতি আর বৈচিত্র্যের আধার এই বাংলাদেশের কথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি।

দুরন্ত এই ছেলেটি এতকিছু থাকতে পরিবেশ নিয়ে পড়লেন কেন এমন প্রশ্নে বললেন, আমি তো প্রকৃতিরই ছেলে। পরিবেশ যদি সুস্থ না থাকে প্রকৃতি যদি ভালো না থাকে, আমরাও ভালো থাকবো না। অন্যভাবে বলা যায়, আমাদের দেশে খেলাধুলা, বিনোদন, লাইফস্টাইল, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর গণমাধ্যম রয়েছে যে কারণে আমরা অনেক বেশি জানি সেগুলো সম্পর্কে কিন্তু আমাদের আগ্রহ কিংবা জানার পরিধি ততটা নেই পরিবেশ- প্রকৃতির ক্ষেত্রে। নিজের দায়িত্ব মনেই করেই এগিয়ে যাচ্ছেন।

তার এই পথচলাতে অনুপ্রেরণা পরিবারের মানুষগুলো। আর যারা প্রকৃতি ভালোবাসেন তারা। যারা বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন তারাও তার ভীষণ অনুপ্রেরণার মানুষ। পরিবেশের কাজের বাইরে প্রিয় কাজ হচ্ছে ঘুরে বেড়াতে। সুযোগ পেলেই শহর ছেড়ে ভাগেন তিনি। ছাত্র জীবনে অবসর শব্দটি নেই। তবু যখনই সময় পান সবুজের খোঁজে ছুটে বেড়ান ওয়েব সাইটগুলোতে। তার ভাষায় সবুজ সন্ধানে ওয়েব ব্রাউজিং।

তাওহীদ ও তার কাজ সম্পর্কে ইতোমধ্যে জেনে গেছি। কিন্তু তরুণ এই শিক্ষার্থীর পড়াশোনার হাল-হকিকত জানা হয়নি। জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন, এই মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগে এমএস করছেন।। এমএস এর গবেষণা অংশ হিসেবে কাজ করছেন, বাংলাদেশের তামাক জাত পণ্যে কি পরিমাণ হেভি মেটাল অর্থাৎ ক্যাডমিয়াম, লেড, ও ক্রোমিয়াম রয়েছে এবং এতে করে আমাদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কতটুকু তার ওপরে। এই গবেষণার জন্য ইতোমধ্যে জনহপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ এর ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল টোবাকো কন্ট্রোল থেকে গ্রান্টি হিসেবে মনোনীত হয়েছেন।

সুযোগ পেলেই হারিয়ে যান প্রকৃতির কোলে 

বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণের ওপরে গবেষণা বৃদ্ধির লক্ষে তারা এই গ্রান্ট দিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এর জন্য তিনি পেয়েছেন পাঁচ হাজার ডলারের শিক্ষাবৃত্তি।

মতিঝিল মডেল স্কুল থেকে এসএসসি, বিজ্ঞান কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর। তাওহীদের স্বপ্ন আলমা ম্যাটারে নামের তালিকাটা আরও দীর্ঘ হবে। বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিবেশ বিষয়ক উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরতে চান তিনি।

/এফএএন/  

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।