বিকাল ০৫:৫৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

ক্রিকেটে প্রযুক্তি এবং থার্ড আম্পায়ার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মুসা ইব্রাহীম, অস্ট্রেলিয়া থেকে

যদিও ষোড়শ শতাব্দী থেকে ক্রিকেট খেলা শুরু হয়েছে, তারপর টেস্ট ম্যাচ শুরু হয়েছিল তারওপর থেকে – ১৮৭৭ সালে। এরপর থেকে দিন দিন এই খেলার শ্রীবৃদ্ধি ঘটেই চলেছে। হালে সংযোজন হয়েছে টি টোয়েন্টি নামের আরেক ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেট বিনোদন। যতোই এগোচ্ছে ক্রিকেট, ততোই এর সবকিছুতে যুক্ত হচ্ছে হরেক রকমের প্রযুক্তি। ক্রিকেট যেহেতু ভদ্রলোকের খেলা, যেহেতু এটা একটা বিনোদন, যেহেতু একে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর পরিসরের আন্তর্জাতিক খেলা হিসাবে ধরা হয়, ফলে এখানে নানা ধরনের প্রযুক্তির সংযোজন করা হচ্ছে একে নিরপেক্ষ এবং নৈর্ব্যক্তিক রাখতে। যদিও দু’জন আম্পায়ার মাঠে দাঁড়িয়ে এই খেলা পরিচালনা করেন, তারপরও তাদের ‘মনুষ্য ভ্রান্তি’ কমাতে আরও একজন আম্পায়ার – থার্ড আম্পায়ার যুক্ত হয়েছেন আধুনিক যুগের সব ফর্মেটের ক্রিকেটে। এই থার্ড আম্পায়ারের কাছে যাওয়ার আগে আসুন একটু চোখ বুলিয়ে নিই ক্রিকেটে ব্যবহৃত প্রযুক্তির তালিকায়:

এক. বোলার কতো গতিতে বল করছে, তা দেখতে 'স্পিড গান' ব্যবহার করা হয়।

দুই. বল ব্যাটে লেগেছে কি না, তা দেখার জন্য 'হটস্পট', 'স্নিক-ও-মিটার', 'সুপার স্লো মোশন' প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

তিন. এলবিডব্লিউয়ের আবেদন রিভিউ করা হলে বল স্ট্যাম্পে আঘাত হানতো কি না, বলের সেই গতিবিধি বের করতে 'হক আই' প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

চার. ব্যাটসম্যান রানআউট হলো কি না, তা দেখতে স্ট্যাম্পে স্থাপিত 'স্ট্যাম্প ক্যামেরা' ব্যবহার করে ব্যাটসম্যান নিজ সীমায় পৌঁছেছে কি না, তা দেখা হয়।

পাঁচ. সম্প্রতি ‘ফিল্ডার অন মাইক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে – মাঠে একজন ফিল্ডার চলমান খেলা নিয়ে কি ভাবছেন, সে সম্পর্কে সরাসরি জানতে।

ছয়. এখন আম্পায়ারের ক্যাপেও ক্যামেরা যুক্ত করা হচ্ছে বোলারের অ্যাকশন বা ওভার স্টেপিং, বলের গতিবিধি ইত্যাদির ওপর নজর রাখার জন্য।

সাত. কোনও ফুলটস বা বীমার-এ ব্যাটসম্যান যদি আউট হয়, সেক্ষেত্রে আম্পায়ার বলটিকে নো বল ঘোষণা করলে বলটি ব্যাটসম্যানের কোমরের ওপর দিয়ে যেতো কিনা, অর্থাৎ বলটি বোলারের হাত থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর এর গতিবিধি কেমন হবে, তা দেখতে 'ডার্ট ফিস' প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

ওপরের যতো প্রযুক্তির কথা বলো হলো, তার সবকিছুই কিন্তু সেই থার্ড আম্পায়ারের দখলে। অর্থাৎ, যদি কোনও ঘটনা, সিদ্ধান্তকে কোনও দলের খেলোয়াড় মাঠে থেকে চ্যালেঞ্জ করতে চান, তাহলে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ‘অন ফিল্ড’ আম্পায়ার বিষয়টি থার্ড আম্পায়ারের কাছে পাঠিয়ে দেন। থার্ড আম্পায়ার তখন সব ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যাচ আউট, এলবিডব্লিউ, নো-বল ইত্যাদি সব রকমের সিদ্ধান্ত রিভিউ করতে পারেন।

কিন্তু গত ১৯ মার্চ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ বনাম ভারতের খেলায় রুবেল হোসেনের যে বলটিকে ‘নো বল’ হিসাবে ঘোষণা দেয়া হলো, তা অন ফিল্ড আম্পায়ার তাদের একক সিদ্ধান্তে ‘নো বল’ কল করেছিলেন। যদিও ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রটোকল অনুযায়ী যদি কোনও বলে কোনও ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যায়, তাহলে সেই বলটি ‘নো বল’ কি না তখনই শুধু চেক করা যাবে। তাহলে ‘অন ফিল্ড’ আম্পায়াররা এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলায় কেন থার্ড আম্পায়ারের সহযোগিতা নিলেন না? নেওয়া হলেই যে সেটা সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ দলের পক্ষে যেত, এমনটা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। তারপরও বাংলাদেশ একটা অন্যায় বিচার থেকে বেঁচে যেতে পারতো। রোহিত শর্মা ৯০ রানেই আটকে গেলে তা বাংলাদেশের পক্ষেই যেত।

মাশরাফির একটি এলবিডব্লিউয়ের আবেদন ‘অন ফিল্ড’ আম্পায়াররা নাকচ করে দেয়ার পর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেখা গেছে যে মাশরাফির সেই আবেদন কতোটুকু সঠিক ছিল। এবার ব্যাটসম্যান ছিলেন সুরেশ রায়না, যিনি এই ম্যাচে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার।

এর পরের যে সিদ্ধান্তটি সব শেষে বাংলাদেশের ভাগ্যকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছে, তা হলো মাহমুদুল্লাহর আউট। রিপ্লেতে দেখা গেছে – শেখর ধাওয়ার যে বলটিকে ক্যাচে পরিণত করেছেন তৃতীয়বারের চেষ্টায়, সেখানে দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় তার পা বাউন্ডারি লাইনে স্পর্শ করছে। যদিও অন ফিল্ড আম্পায়ার এবং থার্ড আম্পায়ার এটাকে ক্যাচ হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। যা শেন ওয়ার্ন, মার্ক ওয়াহ, ব্রায়ান লারাসহ আরও অনেকেই সিক্স হিসাবেই অভিহিত করেছেন। তাদের মন্তব্য – এই খেলায় যদি ভারতের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ না হয়ে অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ড হতো, তাহলে থার্ড আম্পায়ারকে অবশ্যই ‘জুম টেকনোলজি’ ব্যবহার করে ধাওয়ানের পা বাউন্ডারি লাইনে স্পর্শ করলো কি না, তা বারবার দেখতে হতো। এই প্রযুক্তি ব্যবহার না করেও যদিও পরে রিপ্লে’তে দেখা গেছে যে ধাওয়ানের পা আসলেই বাউন্ডারি লাইন স্পর্শ করেছিল।

এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু তা হয় নি। আরেকটু প্রযুক্তির কথা বলি। আইসিসির ওয়েবসাইটে প্রত্যেক ম্যাচের বল বাই বল ট্রাজেক্টরি ভিউ দেখা যায়। একটা ম্যাচের প্রত্যেকটা বল কোথায় পিচড হয়ে কোথায় গিয়েছে, কোন লাইনে গেছে সব জানা যায়। ওখানে ওভার সিলেক্ট করেও সেই ওভারের বল দেখা যায়। ৪০ তম ওভারের ৪র্থ বলে রুবেলের সেই ফুলটস বলটা 'নো' কল দেয় আম্পায়ার। তাই সেই ওভারে ৭টা বল হয়। আইসিসির সাইটে গিয়ে হক-আইয়ে ট্রাজেক্টরি ভিউ দেখতে গিয়ে দেখা গেল আইসিসি সেই ‘নো বল’-এর ভিউ সরিয়ে ফেলেছে। ওই ওভারের যথাক্রমে ১, ২, ৩, ৫, ৬ ও ৭ নাম্বার বল দেখা যায় কিন্তু ৪ নাম্বারটা দেখা যায় না – যেটা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে।

কেমন সেই বিতর্ক? সাবেক শ্রীলংকান অধিনায়ক তো আইসিসিকে এক হাত নিয়ে একে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম কাউন্সিল হিসাবে অভিহিত করেছেন। সৌরভ গাঙ্গুলী বলেছেন, “খেলার ওরকম পর্যায়ে আম্পায়ারের ভুল সিদ্বান্ত একটা দলের মানসিকতা ভেঙ্গে দেয়”। ব্রায়ান লারা ম্যাচ চলাকালীন সময়ে বলেছেন, “রোহিত, রায়না পরিষ্কার আউট ছিল”। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক এবি ডি ভিলিয়ার্স টুইট করেছেন, “রিয়াদ আসলে সিক্স মেরেছে, তবে তাকে আউট দেয়া হয়েছে”। পাকিস্তানের বোলিং সেনসেশান শোয়েব আকতার টুইটে লিখেছেন, “পাকিস্তানের আলিম দার ভারতকে মওকা দিলেন”। নাসের হুসেইন গ্যালারি থেকে ধারাভাষ্যে বলেছেন, “অবিশ্বাস্য! এক ম্যাচে এরকম দুটি সিদ্ধান্ত একটা দলকে ছিটকে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ”। শেন ওয়ার্ন বলেছেন, “এটা কোনওভাবেই নো বল ছিল না। কোমরের নিচে বল ছিলো। এটা ভয়ংকর সিদ্বান্ত। ম্যাচের ভাগ্য ঠিক করে দিলো”। মার্টিন ক্রো বলেছেন, “এটা কোনওভাবেই নো বল ছিল না”। ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ভিভিএস লক্ষণ বলেছেন, “গৌল্ডের সিদ্ধান্তটা একদমই বাজে ছিলো। বলটা নিশ্চিতভাবেই কোমরের ওপরে ছিল না। রোহিত আরেকটা জীবন পেল। এইটাই হয়তো ভারতকে ২০ রান বেশি তুলে দেবে”।

এসব বিতর্কিত বিষয় নিয়ে সারা ক্রিকেট বিশ্বে এখন তোলপাড় চলছে। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং সেনসেশান সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং তো বলেই বসেছেন, “আম্পায়ারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে হারতে হয়েছে বাংলাদেশকে। আমি মনে করি এই ম্যাচ যদি আবার খেলানো হয় তাহলে বাংলাদেশই জিতবে”।

শুধু যে বাংলাদেশের ষোল কোটি দর্শক এখন আইসিসি আর ম্যাচ আম্পায়ারদের দুয়ো শুনিয়ে যাচ্ছেন, তা নয়। বাংলাদেশ-ভারতের ম্যাচটিকে ঘিরে নানা সমালোচনায় জর্জরিত বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থাটি।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।