রাত ০৯:২১ ; মঙ্গলবার ;  ১৮ জুন, ২০১৯  

তারুণ্যের মেলবন্ধনের দিনগুলোতে কলকাতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

নাবীল অনুসূর্য॥

ঢাকা থেকে বাসে উঠেছিলাম খুব ভোরবেলা। সাড়ে ছয়টায়। বাস যাচ্ছিলও বেশ দ্রুত। কিন্তু সে দ্রুততা থমকে গেল ইমিগ্রেশনে গিয়ে। সীমানার দু'পাশেই প্রচণ্ড ভিড়। সে ভিড় ঠেলে বাংলাদেশ পেরিয়ে ভারতে পা ফেলতে লেগে গেল তিন ঘণ্টারও বেশি।

পরে অবশ্য জানা গেল, আমাদের ভাগ্য নিতান্ত মন্দ; আগের দিনও নাকি ইমিগ্রেশনে ভিড় ছিল না মোটেই। কেবল আমরা যেদিন গেলাম, সেদিনই মারমার কাটকাট ভিড়। আমরা বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ শিক্ষার্থীর একটি দল, যে দলে আমার সঙ্গে আরও ছিল নাট্যকলা বিভাগের রিয়াদ আহমেদ, সমাজকল্যাণ বিভাগের কাজী আবু সালেহ, ফিন্যান্স বিভাগের আবুল হাসান ফারায, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সামি শিহাব, ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজির সামিন ফারহান, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের আদিলুজ্জামান এবং ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের নিশাত রায়হান। আর আমার বিভাগ বাংলা। দলে অবশ্য আরও একজন আছে- অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের জেরিন; তবে ভিসা জটিলতায় ও দলছুট হয়ে পড়েছে। পরে এসে যোগ দেবে আমাদের সঙ্গে।

ইমিগ্রেশনের জটিলতা পেরিয়ে বাসে উঠতে উঠতে বেজে গেল সন্ধ্যা ছয়টা। নিয়ন্ত্রিত গতিতে বাস বনগাঁ পেরিয়ে রানাঘাট পেরিয়ে ছুটতে লাগল কলকাতার উদ্দেশ্যে।

দুই বাংলার মেলবন্ধনে র‍্যালি, ছবি: আদিলুজ্জামান আদিল

বাস কলকাতা পৌঁছুতে পৌঁছুতে প্রায় এগারটা। নামলাম মৌলালি-তে। সেখানে রাজ্য যুব কেন্দ্রে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। ওপারের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এপারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে সংহতি : দুই বাংলার মেলবন্ধন শিরোনামে একটি মশাল র‌্যালির আয়োজন করেছিল। আমরা তাতে অংশগ্রহণ করতেই গিয়েছিলাম। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের বঙ্গ সাহিত্য সমিতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করতে ২০১১ সাল থেকে আয়োজন করে আসছে XAV-উল্লাস শিরোনামের ‍উৎসব। আর সেই উৎসবের পঞ্চম আসরের নতুন সংযোজন এই সংহতির মশাল র‌্যালি।

শান্তির সে মশাল প্রজ্বলিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত শহীদ মিনারে। প্রজ্বলন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। পরে সেই মশাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ ঘুরে গিয়েছে ভারতে। সেখানকার বারাসাত বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে চলে গেছে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে।

একুশে ফেব্রুয়ারির আগের রাতে আমরাও ভারতে পৌঁছলাম। চটজলদি কাপড় ছেড়ে গোসল সেরে মুখে দু-চারটে খাবার গুজেই ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই। বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারির কার্যাবলী রাত ১২টায় অন্ধকারে শোকের চাদর গায়ে জড়িয়ে শুরু হলেও, ভারতে তা শুরু হয় সকাল বেলাতে।

পরের দুই দিন ভীষণ ব্যস্ততায় কাটল। সংহতির মশাল র‌্যালি হল প্রথম দিন। কলকাতার রাজপথে আমরা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গাইতে গাইতে হেঁটে বেড়ালাম। র‌্যালি শেষ হল সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে গিয়ে। সেখানে অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা হল। স্থাপন করা হল সংহতির মশাল। তারপর গাওয়া হল যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীত।

তারপর মূল সাংস্কৃতিক উৎসব। প্রথম দিনের উৎসবের ভেন্যু ছিল সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের কলকাতার পার্ক স্ট্রিট ক্যাম্পাস। আর দ্বিতীয় দিনের উৎসবের ভেন্যু রাঘবপুর ক্যাম্পাস।

এই পার্ক স্ট্রিট আর রাঘবপুর পুরোই দুই মেরুর দুটি জায়গা। পার্ক স্ট্রিট কোলকাতার সবচেয়ে অভিজাত এলাকাগুলোর একটা। আর রাঘবপুর এখনও কলকাতা শহরেই ঠাঁই পায়নি; শহরের অদূরে, এক রকম গ্রামই বলা যেতে পারে।

পার্ক স্ট্রিট ক্যাম্পাসে উৎসবের প্রথম দিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল দশভূজা বাঙালি আর অনুপম রায়ের কনসার্ট। আর দ্বিতীয় দিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ইস্ট বেঙ্গল বনাম মোহনবাগান ফুটবল খেলা। না, সত্যিকার ইস্ট বেঙ্গল আর মোহনবাগান খেলতে নামেনি সেদিন; সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের পার্ক স্ট্রিট ক্যাম্পাসের ছেলেরা ইস্ট বেঙ্গল, আর রাঘবপুরের ছেলেরা মোহনবাগান হয়ে খেলতে নামে।

আর রাঘবপুরের ছেলেদের মোহনবাগান খেলায় জেতার পর টের পেলাম, রাঘবপুরের আর কোলকাতার আনন্দ প্রকাশের ভাষাও পৃথক। উৎসব শেষে সফল সমাপ্তি উদযাপনে পার্ক স্ট্রিট ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েরা আনন্দ প্রকাশ করছিল হিপ হিপ হুররে, থ্রি চিয়ার্স ফর জেভিয়ার্স ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে। আর রাঘবপুরের ছেলেরা ফুটবল খেলায় জেতার পর উল্লাস করল একেবারেই তাদের নিজস্ব ঢংয়ে- রাঘবপুর ক্যাম্পাস, হো হো হো।

রাস্তায় নেই জ্যাম, ট্রাম চলছে ঢিমেতালে 

পরদিন সকাল বেলাটা কাটল ঘুমে। দুপুরে নিউ মার্কেটে চক্কর দিয়ে টুকটাক যা শপিং করার ছিল, সেরে ফেললাম। এর মধ্যে কলকাতার স্ট্রিট ফুডও একটু চেখে নেয়া গেল- পাওভাজি আর ছোলা-বাটোরা; দাম যথাক্রমে ২০ রুপি আর ৩০ রুপি করে। খেতে পাওভাজিটাই বেশি মজা লাগল।

সন্ধ্যায় রওয়ানা দিলাম কলেজ স্ট্রিটের উদ্দেশ্যে। কলেজ স্ট্রিটের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের পুরোটাই বইয়ের দোকানের দখলে। অনেকটা আমাদের নীলক্ষেত, আজিজ মার্কেট আর কাঁটাবনের কনকর্ডের মিলিতরূপ। কলকাতাতে বইয়ের দামও তুলনামূলক কম। অবশ্য প্রকাশনার মানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের বইগুলোকে একটু হলেও এগিয়ে রাখতে হবে। তবে বাংলাদেশের বই চোখে পড়ল না। কলকাতার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওরা বাংলাদেশের বই প্রয়োজন হলে আনিয়ে নেয়।

এই কলেজ স্ট্রিটের আশেপাশেই বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গায়ে গা ঠেকিয়ে রয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো ক্যাম্পাস, ছড়িয়ে আছে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়। তবে মূল ক্যাম্পাস এখানেই। সঙ্গে রয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজ আর হিন্দু কলেজ।

কলেজ স্ট্রিটের আরেকটা আকর্ষণীয় বিষয়— কফি হাউস; মান্না দে-র গানের সেই কফি হাউস। কফিটা আকর্ষণীয় না হলেও, কফি হাউসে এখনও আড্ডা জমে নিয়মিত। বিশেষ করে দুপুরে-বিকালে গেলে নাকি প্রায়ই কলকাতার বিখ্যাত সব লেখক-কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের দেখা পাওয়া যায়। শঙ্খ ঘোষ নাকি প্রায়ই আসেন। মাঝে মাঝে জয় গোস্বামীও আসেন। সবাই যে যার মতো আড্ডা দেয়। কেউ হয়তো চারজনকে কবিতা শোনাচ্ছে, কেউ গিটার বাজিয়ে গান গাইছে, কোথাও তুমুল বিতর্কে কফির কাপে ঝড় উঠছে। কেউ আবার সত্যিই পেটে খিদে নিয়ে এসেছে, চামচে কেটে চপ-কাটলেট খাচ্ছে।

কফি হাউসে একটা হোয়াইট বোর্ডও আছে, ওখানে যে কেউ যা ইচ্ছে লিখতে পারে। ২৩ ফেব্রুয়ারি কফি হাউসে গিয়ে আমরা দেখলাম, তাতে লেখা- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অমর হোক।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সাউথ সিটি শপিং মল। পথে পড়ল কলেজ স্কয়ার লেক। সেখানেও একবার ঢুঁ মারা গেল। সে লেকের চারপাশ বাঁধানো। শুধু বাঁধানোই না, চারপাশ রীতিমতো গ্রিল দিয়ে আটকানো। তবে চারপাশে বসার এবং হাঁটার সুবন্দোবস্ত করা। সেখানেও বিশাল আড্ডা জমেছে। কেউ কেউ পায়চারি করছে, কেউ-বা জগিং করছে। প্রেমিক-প্রেমিকারাও আছে অনেকেই, নিবিষ্ট মনে প্রেমে মগ্ন।

জনাকীর্ণ সাউথ সিটি শপিং মল

সাউথ সিটি শপিং মল কলকাতার সবচেয়ে বড় শপিং মলগুলোর একটি। বেশ ঝাঁ-চকচকে। উচ্চতায় আমাদের বসুন্ধরার থেকে কয়েক তলা কম হলেও, আয়তনে বেশ বড়। কাঠামোও বসুন্ধরার মতোই, তবে আরেকটু গোছানো এবং খোলামেলা। অবশ্য ওখানে একটি সুপার শপ আছে, যার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইংরেজি-বাংলা বই। প্রচুর পরিমাণে। এমনকি ওখানে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইমদাদুল হক মিলন-সেলিনা হোসেনের বইও চোখে পড়ল। দোকানটিতে যে কেবল বইয়ের ভালো সংগ্রহ আছে তাই না, মুভিরও ভালো সংগ্রহ আছে; আছে বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি নানা ভাষার চলচ্চিত্রের ডিভিডি।

পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্র- নন্দন

পরদিন সকালে আমরা দুই দলে ভাগ হয়ে গেলাম। এক দল চলে গেল নিউ মার্কেটে, আরও শপিং করতে। আর আমরা বাকিরা যুব কেন্দ্রের আশেপাশে ঘুরে বেড়ালাম। সুযোগে মাটির ভাঁড়ে চা খাওয়ার অবশ্য-কর্তব্যটাও সেরে ফেললাম। ওখানে দুই ধরনের মাটির ভাঁড়ে চা পাওয়া যায়- ছোট চা আর বড় চা। চায়ের দোকানগুলোর পাশে একটা ঝুড়ি বা বাক্স থাকে। সেখানে চা খাওয়া শেষে মাটির ভাঁড়গুলো ফেলতে হয়।

বাকিদের নিউ মার্কেট থেকে ফিরে এসে খেয়েদেয়ে বেরোতে বেরোতে বিকেল। সে ফাঁকে কলকাতার পরিবহন ব্যবস্থার কথা বলা যাক। কোলকাতায় তেমন ট্রাফিক জ্যাম চোখে পড়ল না। তবে সকালে-বিকালে পিক আওয়ারে বেশ লম্বা লম্বা সিগন্যাল পড়তে দেখলাম। কোলকাতায় ট্রাম-রেল তো অনেক আগে থেকেই ছিল, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেট্রোরেল। আর এই মেট্রোরেলের লাইন বসানোর সময় মাথায় রাখা হয়েছে রেলের রুটগুলো। যেখানে যেখানে রেলস্টেশন আছে, সেখানে মেট্রোরেলের স্টেশন রাখা হয়নি। সঙ্গে ট্রাম-বাস তো আছেই। আরও আছে ট্যাক্সি। তবে কলকাতায় চলতে-ফিরতে গেলে প্রচুর হাঁটতে হয়।

ওদের ট্যাক্সিগুলো অবশ্য আমাদের সিএনজিগুলোর মতোই; মিটারে যেতে চায় না, ভাড়ায় যেতে চায়। মিটারে গেলেও নিদেনপক্ষে ২০-৩০ রুপি বেশি দেয়া লাগে।

ওদের গণপরিবহনে মেয়েদের জন্য সুযোগ-সুবিধাও আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। বাসগুলোতে অর্ধেক সিটই মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত। খালি থাকলে সেগুলোতে ছেলেরা বসে বটে, মেয়েরা আসলে সঙ্গে সঙ্গেই উঠে যায়। মেট্রোর বগিগুলোর মাঝের আসনগুলো মোটামুটি মেয়েদের দখলেই থাকে। মাঝের ওই জায়গাতে মেয়েরাই দাঁড়ায়। ছেলেরা দাঁড়ায় গেটের কাছে। মেয়েদের পাশাপাশি প্রবীণদের জন্যও এসব সুবিধা প্রযোজ্য। বাসগুলোতে লেডিস সিটের পাশাপাশি সিনিয়র সিটিজেন সিটও থাকে।

ওরা বাসে বসার পাশাপাশি দাঁড়ানোটাকেও গুরুত্ব দেয়। আর তাই বাসে সিট বেশ কম। তাতে দাঁড়ানোর জায়গা হয় অনেক, দাঁড়াতেও তেমন কষ্ট হয় না।

তবে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী টানা-রিকশা প্রায় নেই বললেই চলে। ওগুলো একেবারেই কমে গেছে। এই টানা-রিকশা আর আমাদের দেশের রিকশায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য; ওই রিকশায় কোনো প্যাডেল-ট্যাডেল নেই, একজন মানুষ ঠেলাগাড়ি টানার মতো রিকশা টেনে নিয়ে যায়।

নিউ মার্কেট যাওয়া দলের দেরি দেখে আমরাই উল্টো চলে গেলাম। ধর্মতলা নেমে নিউ মার্কেট দিয়ে চলে গেলাম বউবাজারের দিকে। ও অঞ্চলটা একটু ঘুরে-ফিরে দেখলাম। এই বউবাজারে প্রচুর সাদা চামড়ার লোক থাকে। না, এরা ইউরোপিয় নয়, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান— ইউরোপিয় ও ভারতীয়দের শংকর। শুধু বউবাজারই না, ধর্মতলা আর জানবাজারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের দেখা মেলে।

বিকালের গন্তব্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্র- নন্দন, সেখানে গিয়ে সিনেমা দেখব। কিন্তু যেতে যেতে দেরি হয়ে গেল। শো আর ধরা গেল না। চলচ্চিত্রের এই স্বপ্নরাজ্যে স্রেফ পায়চারি আর আড্ডাবাজি করেই ফিরে আসতে হল।

এই নন্দনে প্রেক্ষাগৃহ বা হল আছে ৩টি। বড়টিতে আসন সংখ্যা নয়শর বেশি। ছোট দুটির একটিতে দুইশ, আরেকটিতে একশ। প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি সিনেমা নিয়ে পড়তে-জানতে-দেখতে-শিখতে যা যা কিছু দরকার, সবই আছে সেখানে।

১৯৮৫ সালে নন্দনের উদ্বোধন করেন সত্যজিৎ রায়। নন্দনের লোগোও তারই আঁকা। পরে এই নন্দনকে কেন্দ্র করেই সেখানে একটা সাংস্কৃতিক অঞ্চল গড়ে উঠেছে। চলচ্চিত্র কেন্দ্র নন্দনের আশেপাশেই গড়ে উঠেছে নাটক ও চিত্রকলার এমনি কেন্দ্র। জমে উঠেছে আড্ডাও। খানিক্ষণ আড্ডা দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। অল্পক্ষণের জন্য ঢুঁ মারলাম উল্টোদিকেই অবস্থিত এলিয়ট পার্কে।

তারপরই আবার ছুট। গন্তব্য হুগলী নদীর তীরে, প্রিন্সেপ ঘাট।

প্রিন্সেপ ঘাটের মূল স্থাপত্যটি গ্রিকো-গথিক ধাঁচের। একেবারে ঝাঁ-চকচকে করে রাখা হয়েছে। আর ঘাটও সাজিয়ে-গুছিয়ে একদম টিপটপ করে রাখা, মায় পুলিশ পর্যন্ত টহল দেয়। বাঁধানো ঘাটের পাশে পায়ে চলা রাস্তা। তার দুপাশে সাজানো বাগান, মাঝে মাঝে বেঞ্চি পাতা, তাতে বসে আড্ডা দেয়াও চলে, প্রেম করতেও 'জোশ' জায়গা। পাশেই রেলস্টেশন- প্রিন্সেপ ঘাট স্টেশন। তাতে বেজে চলছে রবীন্দ্রসঙ্গীত।

ঐতিহাসিক প্রিন্সেপ ঘাট 

প্রিন্সেপ ঘাটটি বানানো হয়েছিল ১৮৪১ সালে। নামকরণ করা হয়েছে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ইতিহাসবিদ জেমস প্রিন্সেপের নামে। এই প্রিন্সেপ সম্রাট অশোকের শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেছিলেন। এই প্রিন্সেপ ঘাটের পাশেই দ্বিতীয় হাওড়া ব্রিজ— বিদ্যাসাগর সেতু। সেই সেতুটিও কম সুন্দর নয়।

সেখানে আড্ডা চলল বেশ রাত পর্যন্ত। আড্ডাটা একটু বেশিই লম্বা হল, কারণ পরদিন ভোর হতে না হতেই আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে। বাসের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে ফিরতি যাত্রা শুরু হল। এবার নিজের শহরে ফেরার পালা। খুব ভোরবেলা উঠে চোখ ডলতে ডলতে ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে বাসে উঠে বসলাম। এক সময়ে পৌঁছে গেলাম বর্ডারেও। এবার ভাগ্য নিতান্ত মন্দ নয়। সামান্য কসরতেই পেরিয়ে গেলাম। ঢুকে গেলাম আমার দেশে, আমাদের দেশে। তারপর আমাদের নিয়ে বাস আবার যাত্রা শুরু করল। এবার বাস ছুটতে লাগল আমাদের দেশের রাস্তায়, আমাদের দেশের রোদে, আমাদের দেশের গাছের ছায়ায়। ছুটতে লাগল আমাদের ঢাকা শহরের দিকে, আমার ঢাকা শহরের দিকে।

পেছনে তখনও কোলকাতার স্নিগ্ধ হাতছানি।

/এএলএ/এফএএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।