রাত ১১:৪৭ ; বুধবার ;  ২৬ জুন, ২০১৯  

বাংলাদেশকে পাত্তা দিচ্ছে না ফেসবুক!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম॥

বাংলাদেশে অফিস না থাকা এবং কোনও ধরনের সমঝোতা চুক্তি না থাকায় বারবার 'বিভিন্ন অাইডির' বিপরীতে তথ্য চেয়ে অাবেদন করলেও ফেসবুক থেকে কোনও সাড়া পাচ্ছে না সরকার। এ পর্যন্ত ৩ বার ফেসবুকের কাছে অাবেদন করেও সরকার কোনও উত্তর পায়নি। বরং ফেসবুক সরকারকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা কোনও তথ্য সরকারকে দেবে না।

ফেসবুকের কমিউনিটি শেয়ার নীতিমালা (কোনও অাইডির তথ্য শেয়ার) বিষয়ে এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, অপ্রয়োজনীয় বা সরকারি হস্তক্ষেপ থেকে আমাদের কমিউনিটিকে (ফেসবুক সদস্য) রক্ষা করতে আমরা লড়াই করি। তিনি মনে করেন, সব জায়গার মানুষকে শেয়ার করার ক্ষমতা দেওয়া এবং বিশ্বকে আরও বেশি উন্মুক্ত ও সংযুক্ত করে তোলাই ফেসবুকের লক্ষ্য।

জানা গেছে, যেসব দেশে ফেসবুকের অফিস বা অ্যাডমিন প্যানেল নেই, সেসব দেশের সরকার কোনও ব্যক্তির তথ্য চেয়ে পাঠালেই ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দেয় না। তবে অনুরোধের বিপরীতে যথার্থ কারণ খুঁজে পেলে সংশ্লিষ্ট অাইডি ব্লক করে দেয় বা ক্ষতিকর পোস্ট সরিয়ে ফেলে ফেসবুক।

অার যেসব দেশে অফিস বা অ্যাডমিন প্যানেল রয়েছে বা নিদেনপক্ষে কোনও ধরনের সমঝোতা চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশের সরকারের পক্ষ থেকে কোনও তথ্য চাওয়া হলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তা যাচাই করে দেখে, ওই ব্যক্তি বা অাইডি অান্তর্জাতিক শান্তি নষ্টের জন্য কাজ করছে কি না। কোনও ধরনের সন্ত্রাসবাদ বা সংঘর্ষের সঙ্গে তার যোগসাজশ পাওয়া গেলে ওই ব্যক্তির তথ্য ফেসবুক সরকারকে সরবরাহ করে থাকে এবং সে দেশের সরকারের চাওয়া, অনুরোধকেও গুরুত্ব দেয়। সংশ্লিষ্ট অাইডির অাইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল নম্বর) যদি ওই দেশের হয়ে থাকে তাহলে ফেসবুক সেগুলো বন্ধ করতে পারে বা তথ্য দিয়ে সরকারকে সহায়তা করে। কাঙ্ক্ষিত অাইপি সংশ্লিষ্ট দেশের না হলে ফেসবুক সেগুলোর বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। এ কারণে কোনও সরকারের চাওয়ার বিপরীতে ফেসবুক শতভাগ তথ্য দেয় না।

২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ২ বছরে বাংলাদেশ ৩ বারে ৩৪টি অাইডির তথ্য চেয়ে অনুরোধ জানায় ফেসবুকের কাছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ১টা অাবেদনে ১২ জন, (একই বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৩টি অাইডির কনটেন্ট রেসট্রিক্ট করতে বলে), ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৭টি পৃথক অাবেদনে ১৭ জন এবং একই বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসে ৫টি পৃথক অাবেদনে ৫ জনের বিষয়ে তথ্য চেয়ে অনুরোধ জানায় সরকার।

প্রসঙ্গত, প্রতি ৬ মাস পরপর ফেসবুক 'গভর্মেন্ট রিকোয়েস্ট রিপোর্ট' প্রকাশ করে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা ফেসবুকের কাছে তথ্য চেয়ে অনুরোধ করে, তা জানা জায়নি। তবে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে সবাই বিটিঅারসির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও বিটিঅারসি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করেছে। কমিশনের গণমাধ্যম বিভাগের সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, কমিশন কারও তথ্য ‌‌‌ চেয়ে ফেসবুককে অনুরোধ করেনি। তবে ফেসবুক বা সাইবার হয়রানির ম্যাটারগুলোর বিষয়ে কোনও অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ফেসবুককে অনুরোধ জানায় বিষয়টি সমাধানের জন্য। তিনি জানান, সাইবার হয়রানি থেকে প্রতিকার পেতে কমিশন একটি অভিযোগ বক্স স্থাপন করেছে। ভুক্তভোগীরা সেই অভিযোগ বক্সে অভিযোগ রেখে যান। তিনি অারও জানান, কমিশনে সাইবার হয়রানির যেসব অভিযোগ জমা হয়, তার বেশির ভাগই ফেসবুককে কেন্দ্র করে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিঅাইডি) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও বিটিঅারসির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, কমিশনই তো এ বিষয়ে দায়িত্বশীল সংস্থা। অামাদের কোনও কিছুর প্রয়োজন হলে অামরা বিটিঅারসিকেই অনুরোধ করি। তিনি বলেন, এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি সিঅাইডি থেকে কোনও তথ্য ফেসবুকের কাছে চাওয়া হয়নি।

এদিকে প্রযুক্তি বিশ্লেষক বাংলাদেশ অাইএসপি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি ও ফাইবার অ্যাট হোমের চিফ স্ট্র্যাটেজি অফিসার সুমন অাহমেদ সাবির বলেন, ফেসবুক হলো শক্তের ভক্ত নরমের যম। এ কারণে তারা বাংলাদেশকে পাত্তা দেয় না। চীনের বেলায় দেখেন, ফেসবুক চীন সরকারের কথামতো চলে। তিনি উল্লেখ করেন, ফেসবুকের মতে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা নেই, পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্যবহারকারী নেই। ব্যবসা এবং ব্যবহারকারী পেলে ঠিকই তারা এখানে অফিস করত বা ন্যূনপক্ষে সরকারের সঙ্গে কোনও ধরনের সমঝোতা চুক্তি করে রাখত। অফিস বা কোনও সমঝোতা থাকলে সেদেশের 'স্থানীয় অাইনের সঙ্গে' ফেসবুককে 'কমপ্লাই' করে চলতে হয়।

সুমন অাহমেদ সাবির অারও বলেন, ফেসবুক যদি মনে করে সরকার বিরুদ্ধ মতকে দমন করতে অাইডির তথ্য চাচ্ছে, তাহলে ওরা কোনও সাড়া দেয় না। তবে 'পারসোনাল অ্য‌‌‌াবইউজ' হলে ওরা যাচাই করে দেখে। তথ্য-প্রমাণ পেলে তারা অাইডিটি ব্লক করে দেয় বা কনটেন্ট সরিয়ে নেয় (মুছে ফেলে)।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের একজন বিশিষ্ট প্রযুক্তি বিশ্লেষক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফেসবুক যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সে দেশের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) নিদের্শনা মেনে চলে। বাংলাদেশ ফেসবুকের 'এফসিসি ডিসক্লোজার' কোয়ালিফাই করতে পারেনি বলেই বাংলাদেশ সরকার কোনও তথ্য পায় না। কোয়ালিফাই করতে পারলে সরকার সব ধরনের তথ্য পাবে। তিনি আরও বলেন, ফেসবুকের সব তথ্যই তো উন্মুক্ত। তার কাছে থাকে কেবল সংশ্লিষ্ট অাইডির অাইপি ঠিকানা। অাইডির তথ্য চাওয়ার মানে হলো অাইডিটি কোথায় ব্যবহার হয়। এটা ফেসবুক কেন দেবে প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ফেসবুক তার গ্রাহকের প্রতি যত্নবান। কখনোই চায় না, তার গ্রাহক তার কারণে বিপদে পড়ুক।

বিশেষ একটি মাধ্যমে ফেসবুক ভারতের (ভারতে ফেসবুকের একাধিক অফিস রয়েছে) পরিচালক অাঁখি দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, শিগগিরই বাংলাদেশে ফেসবুকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট ডট অর্গের কার্যক্রম শুরু হবে। সে উপলক্ষে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ডট অর্গের অফিস চালুর সম্ভাবনা রয়েছ। অফিস চালু হলে ওই অফিসের মাধ্যমে ফেসবুক দার দাফতরিক কার্যক্রমও পরিচালনা করবে।

এদিকে বিটিঅারসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে 'অ্যাডমিন প্যানেল' স্থাপনের অাহ্বান জানিয়ে ফেসবুকের কাছে চিঠি পাঠালে এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি তার উত্তর পাঠিয়েছে। ওই চিঠিতে ফেসবুক ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বলে জানা গেছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ অারও কিছু ‌‌‌বিষয় জানতে চেয়ে চিঠিতে উল্লেখ করেছে। ওই বিষয়গুলো কমিশন বিবেচনা করে চিঠির জবাব পাঠাবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে অালাপ করে কমিশন সবকিছু চূড়ান্ত করবে বলে জানা গেছে।

/এইচএএইচ/এমএনএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।